শীতের যে প্রসাধনী বদলায়নি, নয় সেকেলেও: তিব্বত পমেডের সাত দশকের গল্প

অধিকাংশ মানুষ এই পণ্যকে ঠোঁটের প্রসাধনী হিসেবে জানলেও, ব্যক্তিভেদে এর বৈচিত্র্যময় ব্যবহারে রয়েছে। কেউ ব্যবহার করেন ঠোঁটে, কেউ হাতে-পায়ে, কেউ মুখে কিংবা পুরো শরীরে। আবার কেউ কেউ চুলের জেল হিসেবেও ব্যবহার করেন তিব্বত পমেড। তাদের মতে, এতে চুল চকচকে ও সুন্দরভাবে সেট থাকে।

1766213168248_0

ঘ্রাণের সঙ্গে অসংখ্য মিষ্টি মধুর স্মৃতি জড়িয়ে থাকে মানুষের। কখনো এটি ফিরিয়ে নিয়ে যায় শৈশবের কোনো সময়ে, কখনো বা মনে করিয়ে দেয় হারিয়ে যাওয়া কোনো মুখ।

প্রিয় সুভাস নাকে লাগতেই বন্ধ চোখে যেন জীবন্ত হয়ে ওঠে অতীতের সমস্ত দৃশ্যপট!ঠিক এমনই এক চেনা ঘ্রাণের বর্ণনা দিচ্ছিলেন চল্লিশোর্ধ্ব মশিউর আহমেদ, “দুপুরের গোসল শেষে আম্মার একটা নির্দিষ্ট রুটিন ছিল। গোসল সেরে প্রথমেই নামাজ পড়তেন। তারপর জানালার ধারে এসে বসতেন রোদের দিকে মুখ করে। হাঁটু ছুঁইছুঁই লম্বা চুলগুলো খুলে দিতেন সূর্যের আলোয়। একটা পান বানিয়ে মুখে নিতেন। এরপর খুব যত্ন করে হাত-পায়ে পমেড মাখতেন। সুবহানআল্লাহ! আম্মার শরীর থেকে কী যে মিষ্টি একটা খুশবু ভেসে আসত! সুযোগ পেলেই আমি আম্মার পাশে গিয়ে ঘেঁষাঘেঁষি করতাম শুধু ওই গন্ধটার জন্য।”

মশিউরের স্মৃতিতে যে পমেডের কথা উঠে আসে, সেটি ‘তিব্বত পমেড’। এই পমেডের ঘ্রাণের সঙ্গে এমন আবেগী স্মৃতি শুধু তার একার নয়, বরং বাংলাদেশের অগণিত মানুষের। গ্রাম-গঞ্জ, হাট-বাজার, শহর বা মফস্বল—সবখানেই একসময় দেখা যেতো তিব্বত পমেডের ছোট হলুদ কাচের কৌটা।পমেডের আরেক ব্যবহারকারী সাবিনা আহমেদের কণ্ঠ ভারী হয়ে আসে স্মৃতি কথা বলতে গিয়ে। তার কাছে এই ঘ্রাণ মানেই চোখের কোণে জমে ওঠা অশ্রু।

“শীতকাল আসলেই আমার মা এই পমেড ব্যবহার করতেন। মা চলে গেছেন ১০ বছরেরও বেশি সময় আগে। কিন্তু এখনো কাউকে পমেড মাখতে দেখলে, কিংবা হঠাৎ এই গন্ধটা নাকে এলে মায়ের কথা খুব মনে পড়ে,” বললেন সাবিনা। আবার কারো কাছে তিব্বত পমেড মানেই শীতের সকালের শুরু। এই যেমন স্কুলে যাওয়ার আগে কিংবা ঘুমানোর সময় মায়ের হাতে যত্ন করে পমেড মাখার স্মৃতি আজও উজ্জ্বল উর্মি রহমানের। “স্কুলে যাওয়ার আগে আম্মা নিজ হাতে আমার পায়ে-মুখে-ঠোঁটে পমেড মাখিয়ে দিতেন, রাতের বেলায়ও তাই করতেন। দীর্ঘদিন এভাবে চলার কারণে আমিও এটায় অভ্যস্ত হয়ে গেছি বলতে পারেন। এখন শীতকালের পাশাপাশি বছরের অন্য সময়গুলোতেও পমেড ব্যবহারকরি,” বলছিলেন উর্মি। উর্মির পরিবারের তিন প্রজন্ম পর্যন্ত এই পমেড ব্যবহার করছেন। শুরুটা করেছেন তার মা। এখন তিনি ও তার মেয়ে করছেন। পঞ্চাশ ছুঁইছুঁই উর্মির কাছে তাই শীত মানেই ঠোঁটের যত্নে তিব্বতের সেই হলুদ রঙের কাচের কৌটা!

উর্মি বা সাবিনার মতো তিব্বত পমেড নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মানুষের স্মৃতির কথাও কম নয়। অবশ্য আজকের ঝকঝকে, আধুনিক প্যাকেজিংয়ের দুনিয়ায় তিব্বত পমেড হয়তো অনেকের চোখে সেকেলে। কিন্তু যারা এটি ব্যবহার করে আসছেন দীর্ঘকাল ধরে, তাদের কাছে এটি বিলাসী পণ্যই।

ছবিঃ আসমা সুলতানা প্রভা

এ ধরনের সুগন্ধিযুক্ত ক্রিম আধুনিক সময়ের আগে, বিশেষত ১৯৫০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে নারীদের জন্য এক বিলাসবহুল পণ্য হিসেবে বাজারে এসেছিল। তখনকার দিনে দৈনন্দিন ব্যবহারের জন্য এমন ক্রিম খুব বেশি প্রচলিত ছিল না। নারীরা মূলত সৌন্দর্য রক্ষার উদ্দেশ্যে এটি ব্যবহার করতেন। আজ, সাত দশক পেরিয়েও টিকে আছে তিব্বত পমেড। এই যাত্রার শুরু ১৯৫৬ সালে। সে সময় কিছু বিদেশি উদ্যোক্তার হাত ধরে ঢাকার শিল্পাঞ্চল তেজগাঁওয়ে যাত্রা শুরু করে কোহিনূর কেমিক্যালস।

১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর প্রতিষ্ঠানটি জাতীয়করণ করা হয়। মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী রাষ্ট্র পুনর্গঠনের প্রক্রিয়ায় ১৯৭২ সালে কোহিনূর কেমিক্যালস অধিগ্রহণ করে বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন (বিসিআইসি)। দীর্ঘদিন সরকারি ব্যবস্থাপনায় চলেছে প্রতিষ্ঠানটি।পরবর্তীতে ১৯৯৩ সালে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন কোহিনূর কেমিক্যাল কোম্পানি লিমিটেডের দায়িত্ব নেয় ওরিয়ন গ্রুপ।

সরকারি ব্যবস্থাপনা থেকে বেসরকারি উদ্যোগে আসার পর প্রতিষ্ঠানটি নতুন করে গতি পায়। ঠিক তখন থেকেই ‘তিব্বত’ নামটি ধীরে ধীরে মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে আরও গভীরভাবে মিশে যেতে থাকে।প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম ধরে চলছে এই পণ্যের ব্যবহার। তবে বাজারে একাধিক পমেড থাকলেও তিব্বত যেভাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে, অন্য কোনো ব্র্যান্ড এখনো সেই জায়গায় পৌঁছাতে পারেনি বলে মত কোহিনূর কেমিক্যালসের ব্র‍্যান্ড নির্বাহী রাব্বির আহসান।

ছবিঃ আসমা সুলতানা প্রভা

এর কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে আহসান বলেন, “তিব্বত পমেডের জনপ্রিয়তা আসলে এক-দুই বছরের নয়। বলা ভালো এর পেছনে রয়েছে প্রায় সাত দশকের সমৃদ্ধ ইতিহাস ও মানুষের দীর্ঘদিনের আস্থা।”কথা প্রসঙ্গে রাব্বির আহসান জানালেন অনেকেই তাকে প্রশ্ন করেন, “এত বছর পেরিয়েও কেন তিব্বত পমেডের প্যাকেজিং বদলায়নি, কেন এতে আধুনিকতার ছোঁয়া নেই?”

উত্তরে তিনি বলেন, “দীর্ঘদিন ধরে যারা এই পণ্য ব্যবহার করছেন, তারা সামান্য পরিবর্তনও সহজে গ্রহণ করতে চান না। তাদের কাছে পমেড মানেই কাচের কৌটা, কমলা রঙ আর সেই চেনা ঘ্রাণ। তাছাড়া, ক্রেতাদের বড় একটি অংশই ট্র্যাডিশনাল। তাই লয়াল গ্রাহকদের অনুভূতিকে গুরুত্ব দিয়েই প্যাকেজিং ও পণ্যের মানও রাখা হয়েছে আগের মতো।” এমনকি নতুন কোনো ভ্যারিয়েন্টও নিয়ে আসা হয়নি। কারণ পুরনো গ্রাহকরা তিব্বত পমেডকে পরিচিত রূপেই পেতে চান বলে জানালেন তিনি।

তবে তিব্বত পমেডের এই দীর্ঘ পথচলায় একেবারেই যে কোনো পরিবর্তন আসেনি তা নয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্যাকেজিংয়ে এসেছে খুবই সামান্য কিছু বদল। একসময় বোতলের গায়ে থাকত কাগজের স্টিকার, যা এখন বদলে গেছে প্লাস্টিকের লেবেলে। লেবেলে যুক্ত হয়েছে কিছু অতিরিক্ত তথ্যও।

তবে এই পরিবর্তনগুলো এতটাই সূক্ষ্ম ও পরিমিত যে, খুব মনোযোগ দিয়ে না দেখলে চোখেই পড়বে না। এর কারণ পুরোনো ব্যবহারকারীদের আবেগে যেন কোনো আঁচ না লাগে। মূলত নতুন প্রজন্মের অনেকের কাছে সেকেলে মনে হওয়ায় পুরোনো প্যাকেজিংয়ের চরিত্র বজায় রেখেই আনা হয়েছে এই হালকা রূপান্তর। তবে মানে কোনো এদিক-ওদিক নেই।

ছবিঃ আসমা সুলতানা প্রভা

একই সাথে তিব্বত পমেডকে নকল হওয়া থেকে রক্ষা করতে শক্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থাও গ্রহণ করেছেন তারা।

ব্র‍্যান্ড এক্সিকিউটিভ আহসান বলেন, “আমাদের আসল পণ্যে থাকে কিউআর কোড, মনোগ্রাম, সিল এবং বিশেষ সিকিউরিটি সিল—যা সহজে নকল করা সম্ভব নয়।”

তার দাবি, ৭০ বছরের ইতিহাসে কার্যকরভাবে কেউ-ই এই পমেডের নকল তৈরি করতে সক্ষম হয়নি। তার একটি বড় কারণ হলো এটির নিয়মিত ব্যবহারকারীরা। তারা হাতে নিয়েই বুঝে ফেলেন ঠিক আসল কোনটি এবং কোনটি নকল।

এ কারণে বাজারে অসংখ্য পণ্য থাকা সত্ত্বেও তিব্বত পমেডের বিক্রি কমেনি, বরং দিনদিন বেড়েছে।

ক্রেতাদের কথা মাথায় রেখে দামও রাখা হয়েছে সাধ্যের মধ্যে। বাজারে যেকোনো দোকানে ৬০ থেকে ৭০ টাকায় কিনতে পাওয়া যায় এটি।

কোহিনূর কেমিক্যালস এর জুনিয়র ব্র‍্যান্ড এক্সিকিউটিভ সুমাইয়া আহমেদ জানান, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তিব্বত পমেডের বিক্রি আগের তুলনায় প্রায় ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। শুধু পুরোনো ক্রেতারাই নন, নতুন প্রজন্মের মধ্যেও ধীরে ধীরে বাড়ছে এর ব্যবহার।

প্রতিবছরই আগের বছরের তুলনায় বিক্রি বাড়ছে, ফলে বাড়ছে পণ্য উৎপাদনও। তবে বিক্রি বাড়ার কারণ হিসেবে রাব্বির আহসান তাদের ফিক্সড বা লয়াল কাস্টমারদের কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, “আমার কাছে মনে হয় যারা নিজেরা ব্যবহার করে সন্তুষ্ট, তারাই পরবর্তী প্রজন্ম অর্থাৎ তাদের ছেলে-মেয়ে বা পরিবারের অন্য সদস্যদেরও এই পণ্য ব্যবহারে প্রভাবিত করছেন।”

অধিকাংশ মানুষ এই পণ্যকে ঠোঁটের প্রসাধনী হিসেবে জানলেও, ব্যক্তিভেদে এর বৈচিত্র্যময় ব্যবহারে রয়েছে। কেউ ব্যবহার করেন ঠোঁটে, কেউ হাতে-পায়ে, কেউ মুখে কিংবা পুরো শরীরে। আবার কেউ কেউ চুলের জেল হিসেবেও ব্যবহার করেন তিব্বত পমেড। তাদের মতে, এতে চুল চকচকে ও সুন্দরভাবে সেট থাকে।এখন সময় বদলেছে। বদলেছে মানুষের জীবনযাত্রা এবং সাজসজ্জার ঢংও।

প্রসাধনীর ব্যবহারে এসেছে বৈচিত্র্য। দেশের অলিগলিতে ঢুকে পড়েছে ভিনদেশি ব্র্যান্ডের নামি-দামি সব পণ্য। সাজসজ্জার জন্য প্রতিনিয়ত নতুন নতুন জিনিস আসছে ক্রেতাদের হাতের নাগালে। তবুও আধুনিক ‘স্কিন কেয়ার প্রোডাক্ট’ এর ভিড়ে শীত ঋতুতে তিব্বত পমেড এখনো আগের মতোই জনপ্রিয়। দেশি-বিদেশি নানা পণ্যের ভিড়ে তাই এই ছোট্ট হলুদ বোতল আজও টিকে আছে মানুষের বিশ্বাসে, অভ্যাসে আর সবচেয়ে বেশি স্মৃতিতে।