বিশ্ববিদ্যালয়ের অঘোষীত সংসারঃ হল থেকে হোম
রাইসা জানত, জীবনের পরের ধাপে ঢুকলে মানুষ বদলে যায়। চারপাশ বদলায়, নিয়ম বদলায়, আর সবচেয়ে ভয়ংকরভাবে বদলায় “আপনজন”রা।
বিশ্ববিদ্যালয়ের অঘোষীত সংসারঃ হল থেকে হোম
রাইসা জানত, জীবনের পরের ধাপে ঢুকলে মানুষ বদলে যায়। চারপাশ বদলায়, নিয়ম বদলায়, আর সবচেয়ে ভয়ংকরভাবে বদলায় “আপনজন”রা।
সে শুধু জানত না, এই রূপান্তরের জন্য বিয়ে নয়, সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি হলই যথেষ্ট।
এই জায়গাগুলোতে নিয়ম খুব কম লেখা থাকে, কিন্তু মানতে হয় খুব বেশি। ভুল করলে বলা হয়, এটা তোমার ভালোর জন্য। আর চুপ থাকলে ধরে নেওয়া হয়, তুমি বুঝে গেছ।
ছোটবেলা থেকেই রাইসা এসব গল্প শুনে এসেছে। মেয়েদের জীবনে নাকি এমন এক অধ্যায় আসে, যেখানে নিজের একটা ছাদ থাকে, কিন্তু নিজের সিদ্ধান্তগুলো ধীরে ধীরে সমষ্টিগত হয়ে যায়।
তবে রাইসা ভাবেনি, সেই অধ্যায়ের সূচনা হবে তার বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষের হল জীবন দিয়ে।
হলের সংসার
বিদেশের হোস্টেলগুলো তাদের শিক্ষাব্যবস্থার মতোই সাজানো, ঝকঝকে, প্রায় রাজপ্রাসাদের মতো। আর আমাদের দেশের সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলো ঠিক তার উল্টো।
দেয়ালে দেয়ালে খসে পড়া প্লাস্টার, জানালার গ্রিলে জং, আর একটা স্থায়ী ক্লান্তি পুরো ঘরজুড়ে লেগে থাকে। ঢাকার ঘনবসতিপূর্ণ বিশেষ এলাকার মতোই এর চেহারা। স্ট্যাটাসের খাতিরে এই বিদঘুটে বাস্তবতাও মেনে নিতে রাইসার খুব একটা সমস্যা হয়নি।
থাকাটা ফ্রি, অথবা নামমাত্র মূল্যে। কিন্তু এই বিনিময়ে যে মানসিক ভাড়াটা দিতে হয়, সেটা আগে থেকে বলা থাকে না। কর্তৃপক্ষ অভিভাবকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। তারা সব জানে, সব বোঝে, এবং সব সিদ্ধান্ত নেওয়ার যোগ্য বলে মনে করে।
একই ঘরে অনেকজন গাদাগাদি করে থাকার সুফলের চেয়ে কুফলই বেশি। আর সেটা যদি হয় সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের গণরুম, তাহলে পাশের বাড়ির আন্টিদের মতো যে কেউ, যে কোনো সময়, বিনা আমন্ত্রণে এসে খোঁচা দিয়ে কথা বলতে পারে। এর পর বাকি দিনটা নিজ দায়িত্বে সামলাতে হয়।
এখানে এমন কিছু মানুষও থাকে, যারা শুরুতেই আপন হওয়ার ঘোষণা দেয়। প্রিয়জনের মতো আগলে রাখার প্রতিশ্রুতি দেয়। এই প্রতিশ্রুতির সরবরাহ এত বেশি যে, এর অভাব কখনোই অনুভূত হয় না।
এত মিল থাকা সত্ত্বেও রাইসা প্রথমে বুঝে উঠতে পারছিল না, সে ঠিক কোন গল্পের ভেতরে ঢুকে পড়েছে। কিন্তু প্রবেশের রাতেই সেই আপন মানুষগুলোর আচরণ তার এই বিভ্রান্তি দূর করে দেয়।
ক্যান্টিনের খাবার রাইসার জন্য আরেকটি বাস্তবতার ধাক্কা। অখাদ্য শব্দটি ব্যবহার করলে খাবারের প্রতি অবিচার করা হয়।
ফলে নিজের রান্না নিজেকেই করতে হয়।
তবে রান্না শুধু নিজের জন্য করলে সেটা ব্যক্তিস্বার্থ হিসেবে গণ্য হয়। নতুন আগন্তুক হিসেবে রাইসাকে খুব দ্রুত বুঝিয়ে দেওয়া হয়, রান্না একটি সামাজিক দায়িত্ব। রুমমেট, সিনিয়র, কখনো কখনো অঘোষিত অতিথিও এর আওতায় পড়ে।
নতুন মানুষের হাতের রান্না ভালো না খারাপ, এই প্রশ্নের রায় খুব দ্রুত দেওয়া হয়। রাইসার মা আগেই তাকে এসব বিষয়ে সতর্ক করেছিলেন। তবে এই অধ্যায়ের শুরু যে এত তাড়াতাড়ি হবে, সেটা রাইসা কল্পনাও করেনি।
প্যাঁচের আইরনি
মেয়েদের জন্য সমাজের কিছু অলিখিত নিয়ম যে আছে, সেটা রাইসার অজানা ছিল না। কিন্তু এখানে এসে সে আবিষ্কার করে, নিয়ম শুধু সমাজ বানায় না, প্রতিষ্ঠানও বানায়।
প্রশাসনের নিয়ম-নীতির এমন এক শৃঙ্খলা আছে, যা মানুষকে ধীরে ধীরে অভ্যস্ত করে তোলে। কখন ঢুকতে হবে, কখন বেরোতে হবে, কতটা কথা বলা নিরাপদ, আর কতটা চুপ থাকলে সমস্যা হয় না, সবকিছুরই একটা গ্রহণযোগ্য মাত্রা আছে।
শুরুর দিকে এসব রাইসার খুব খারাপ লাগত। কিন্তু ফ্রি কিংবা অল্প টাকার বিনিময়ে পাওয়া এই ছাদ যে সহজে পাওয়া যায় না, সেটা বুঝতে তার বেশি সময় লাগেনি।
আইন, নিয়মানুবর্তিতা আর অধ্যবসায় যদি সত্যিই সফলতার চাবিকাঠি হয়, তাহলে রাইসা নিঃসন্দেহে সেই পথেই এগোচ্ছিল। শুধু প্রশ্ন থেকে যায়, রাইসা কি জানত, সে ঠিক কিসের জন্য প্রস্তুত হচ্ছে।
এই স্বল্প সময়ের যুদ্ধ একদিন শেষ হয়। রাইসা অন্য এক জীবনের পথে এগিয়ে যায়। আর হল জীবনের এই শিক্ষা, এই অভ্যাস, এই নীরব সমঝোতাগুলো পরবর্তীতে তার জীবনে অদ্ভুত রকম কাজে লাগে।
তবু হঠাৎ কোনো একদিন, অকারণেই হল জীবনের স্মৃতিগুলো রাইসার মাথায় ভিড় করে। নিজের অজান্তেই সে বলে ওঠে,
“আগে কী সুন্দর দিন কাটাইতাম।”