এআই কেড়ে নিচ্ছে কাজ, বিপাকে বিশ্বজুড়ে হাজারো অনুবাদক

ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে আইরিশ ভাষার অনুবাদক হিসেবে টিমোথি ম্যাককিওনের বেশ কদর ছিল। বছরের পর বছর এই কাজই ছিল তাঁর আয়ের প্রধান উৎস। কিন্তু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই) আসার পর তাঁর সেই চেনা জগতটা অনেকটুকুই ওলটপালট হয়ে গেছে।

Translator
ছবিঃ সংগৃহীত

টিমোথি জানান, ইইউর অনুবাদের কাজ কমে যাওয়ায় তাঁর আয় এখন ৭০ শতাংশ কমে গেছে। বর্তমানে তাঁর কাছে যেসব কাজ আসছে, তার বেশির ভাগই হলো মেশিনে করা অনুবাদ একটু ‘ঘষামাজা’ বা ঠিকঠাক করে দেওয়া। কিন্তু টিমোথি নীতিগতভাবে এসব কাজ নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। কেন? কারণ তিনি মনে করেন, এই ঘষামাজা করার মাধ্যমেই তিনি আসলে সফটওয়্যারটিকে আরও দক্ষ করে তুলছেন, যা ভবিষ্যতে তাঁর মতো মানুষের কাজ আরও কমিয়ে দেবে।

টিমোথির ভাষায়, ‘সফটওয়্যার যত বেশি শিখবে, আপনি তত বেশি অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়বেন। অনেকটা নিজের পেশার কবর নিজেই খোঁড়ার মতো অবস্থা।’ 

সুইজারল্যান্ডের দাভোসে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের সভাতেও এআই নিয়ে উদ্বেগ দেখা গেছে। তবে অনুবাদ শিল্পের জন্য এটি আর কোনো ভবিষ্যতের আশঙ্কা নয়, বরং বর্তমানের কঠিন বাস্তবতা। গুগল ট্রান্সলেটের মতো অ্যাপগুলো আগে থেকেই মানুষের প্রয়োজন কমিয়ে দিচ্ছিল, আর এখন ‘জেনারেটিভ এআই’ সেই গতিকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

যুক্তরাজ্যের ‘সোসাইটি অব অথরস’-এর ২০২৪ সালের এক জরিপ বলছে, জেনারেটিভ এআইয়ের কারণে এক-তৃতীয়াংশের বেশি অনুবাদক তাঁদের কাজ হারিয়েছেন। আর ৪৩ শতাংশ অনুবাদক জানিয়েছেন, এই প্রযুক্তির কারণে তাঁদের আয় নাটকীয়ভাবে কমে গেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের ২০১০ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক কার্ল ফ্রে ও পেড্রো ল্যানোস-পারেডেস দেখিয়েছেন, যেসব অঞ্চলে গুগল ট্রান্সলেটের ব্যবহার বেশি, সেখানে অনুবাদকের সংখ্যা বাড়ার গতি বেশ ধীর। ২০১৬ সালে গুগল ট্রান্সলেট যখন আরও উন্নত ও প্রাকৃতিক ভাষা ব্যবহারের প্রযুক্তি চালু করে, তখন থেকেই এই সংকট বাড়তে থাকে।

গবেষক কার্ল ফ্রে বলেন, ‘আমাদের ধারণা, মেশিন ট্রান্সলেশন না থাকলে এ সময়ে আরও অন্তত ২৮ হাজার অনুবাদকের কর্মসংস্থান তৈরি হতো।’ তিনি মনে করেন, এটি কেবল শুরু; ভবিষ্যতে অনুবাদের বাজার থেকে মানুষ আরও বড় আকারে ছিটকে পড়তে পারে।

বিশ্বজুড়ে অনুবাদকদের চিত্রটা এখন প্রায় একই রকম। টিমোথি ম্যাককিওন ‘গেরিলা মিডিয়া কালেক্টিভ’ নামে একটি আন্তর্জাতিক অনুবাদক ও যোগাযোগ পেশাজীবীদের সংগঠনের সদস্য। তিনি জানালেন, তাঁর দলের সবাই এখন অনুবাদের পাশাপাশি অন্য কোনো কাজ করে বাড়তি আয়ের চেষ্টা করছেন। কারণ, এআইয়ের দাপটে অনুবাদের কাজ এখন অনেক কমে গেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের উইসকনসিন অঙ্গরাজ্যের চিত্র আরও উদ্বেগের। সেখানকার ‘গ্রিন লিঙ্গুইস্টিকস’ নামের একটি অনুবাদ সেবা প্রতিষ্ঠানের প্রধান ক্রিস্টিনা গ্রিন নিজে আদালতের একজন দোভাষী। তিনি এখন বড় এক আশঙ্কায় দিন কাটাচ্ছেন। সেখানে এমন একটি আইন পাসের প্রক্রিয়া চলছে, যা কার্যকর হলে দেওয়ানি ও ফৌজদারি মামলার শুনানিতে দোভাষীর বদলে এআই বা মেশিন অনুবাদ ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হবে।

গত মে মাস থেকে ক্রিস্টিনা ও তাঁর সহকর্মীরা এই প্রস্তাবের বিরুদ্ধে লড়াই করছেন। ক্রিস্টিনা বলেন, ‘পুরো যুক্তরাষ্ট্র এখন উইসকনসিনের দিকে তাকিয়ে আছে।’ কারণ, এখানে এই আইন পাস হলে তা সারা দেশের জন্য একটি নজির হয়ে থাকবে। তাঁদের আন্দোলনের কারণে বিলটি আপাতত আটকে আছে।

আদালতের কাজ এখনো টিকে থাকলেও ক্রিস্টিনার নিজের প্রতিষ্ঠানটি বড় ধাক্কা খেয়েছে। তাঁর প্রতিষ্ঠানের অন্যতম বড় এক মক্কেল (বিশ্বের শীর্ষ ১০টি কোম্পানির একটি) এখন মানুষের বদলে এআই ব্যবহার করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ওই একটি মক্কেল থেকেই ক্রিস্টিনার প্রতিষ্ঠানের সিংহভাগ আয় আসত। কাজ হারিয়ে বাধ্য হয়ে তাঁকে এখন কর্মী ছাঁটাই করতে হচ্ছে।

ক্রিস্টিনা গ্রিন মনে করেন, এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে অনেক প্রতিষ্ঠান খরচ কমানোর কথা ভাবছে। কিন্তু এর ঝুঁকি সম্পর্কে তারা মোটেও সচেতন নয়। তিনি বলেন, ‘মানুষ ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান মনে করছে এআই ব্যবহারে তাদের টাকা বাঁচবে। কিন্তু এই প্রযুক্তি আসলে কী, এটি ব্যক্তিগত গোপনীয়তাকে কীভাবে প্রভাবিত করে এবং এর ভবিষ্যৎ ফল কী হতে পারে—সে সম্পর্কে তাদের বিন্দুমাত্র ধারণা নেই।’ 

লন্ডনে বসবাসরত ফেরদৌস একজন অভিজ্ঞ আরবি অনুবাদক ও দোভাষী। তিনি সিএনএনসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে কাজ করেন। ফেরদৌস লক্ষ্য করেছেন, গত কয়েক বছরে লিখিত অনুবাদের কাজ অনেক কমে গেছে। তাঁর মতে, প্রযুক্তির দ্রুত উন্নয়ন আর বিশ্বজুড়ে সংবাদমাধ্যমগুলোর আর্থিক সংকটের কারণে এই পেশায় ধস নেমেছে।

পেশাগত কাজের পাশাপাশি ফেরদৌস বর্তমানে অনুবাদ শিল্পের ওপর পিএইচডি করছেন। তাঁর গবেষণাতেও উঠে এসেছে এক আশঙ্কাজনক তথ্য। তিনি জানান, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বর্তমানে অনুবাদক ও দোভাষীদের ওপর ‘বিশাল প্রভাব’ ফেলছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক বিষয় হলো, সরকারগুলো এই সংকট মোকাবিলায় এখনো যথেষ্ট পদক্ষেপ নিচ্ছে না।

অনুবাদকদের এই সংকট শুধু ব্যক্তিগত পর্যায়ে সীমাবদ্ধ থাকছে না, এর প্রভাব পড়ছে বড় বড় আন্তর্জাতিক সংস্থাতেও। লন্ডনের গবেষক ও অনুবাদক ফেরদৌস বলেন, ‘সরকারগুলো যদি অনুবাদকদের পেশা পরিবর্তনের বা নতুন কাজের সুযোগ করে দিতে এগিয়ে না আসে, তবে সমাজে বৈষম্য বাড়বে। এর ফলে অভাব ও দারিদ্র্যও বাড়তে পারে।’

অনুবাদকদের সংগঠনগুলোর তথ্যেও এই করুণ চিত্র ফুটে উঠেছে। যুক্তরাজ্যের সোসাইটি অব অথরসের অনুবাদক সমিতির চেয়ারম্যান ইয়ান জাইলস জানান, অনুবাদের কাজে এখন আর আগের মতো আয় নেই। ফলে অনেক অনুবাদক বাধ্য হয়ে নতুন কোনো পেশায় যাওয়ার জন্য আবার প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন। যুক্তরাষ্ট্রের চিত্রও একই। আমেরিকান ট্রান্সলেটরস অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট অ্যান্ডি বেঞ্জো জানান, দেশটিতে অনেক অনুবাদক এই পেশা ছেড়ে অন্য পথে চলে যাচ্ছেন।

তবে সবচেয়ে বড় ধাক্কার খবর এসেছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) থেকে। সুইজারল্যান্ডের দাভোসে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের সম্মেলনে আইএমএফের প্রধান ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা জানান, প্রযুক্তির ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় আইএমএফে অনুবাদক ও দোভাষীর সংখ্যা ২০০ থেকে কমিয়ে এখন মাত্র ৫০ জনে নামিয়ে আনা হয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে ফেরদৌস মনে করেন, যারা এখনো এই পেশায় টিকে আছেন, তাঁদের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে শক্তিশালী শ্রম সুরক্ষা বা আইনি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

তবে আশার কথা হলো, মেশিন ল্যাঙ্গুয়েজ বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দ্রুত উন্নত হলেও তা এখনো মানুষের পুরোপুরি বিকল্প হয়ে উঠতে পারেনি। ভাষা ও অনুবাদের সূক্ষ্ম বিষয়গুলো বুঝতে এখনো মানুষের ছোঁয়া অপরিহার্য।

দৈনন্দিন কাজে, যেমন—রাস্তা খুঁজে বের করার মতো ছোটখাটো বিষয়ে এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করা ঝুঁকিমুক্ত হতে পারে। কিন্তু কূটনীতি, আইন, অর্থায়ন কিংবা চিকিৎসার মতো সংবেদনশীল ক্ষেত্রে এখনো মানুষের বিকল্প নেই। এসব ক্ষেত্রে একটি ছোট ভুল অনুবাদের পরিণতি হতে পারে ভয়াবহ।

আমেরিকান ট্রান্সলেটরস অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট অ্যান্ডি বেঞ্জো নিজে একজন অনুবাদক ও আইনজীবী। তাঁর মতে, আইন বা চিকিৎসার মতো পেশায় প্রতিটি শব্দের ব্যবহার অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও সুনির্দিষ্ট। এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রযুক্তি এখনো সেই মানে পৌঁছাতে পারেনি।

মেশিন অনুবাদের ঝুঁকি কতটা ভয়ানক হতে পারে, তার প্রমাণ মিলেছে ভারতেও। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মেটা তাদের স্বয়ংক্রিয় অনুবাদক সরঞ্জামের মাধ্যমে কর্ণাটকের মুখ্যমন্ত্রী সিদ্দারামাইয়ার মৃত্যুর একটি ভুল বার্তা প্রচার করেছিল। এই ‘মারাত্মক ভুল’ বার্তার জন্য পরে মেটা দুঃখ প্রকাশ করতে বাধ্য হয়।

সাহিত্যের অনুবাদেও মেশিন এখনো মানুষের চেয়ে অনেক পিছিয়ে। স্ক্যান্ডিনেভিয়ান ভাষা থেকে ইংরেজি অনুবাদ করা ইয়ান জাইলস জানান, বড় বড় কোম্পানির বাণিজ্যিক কাজগুলো এআইয়ের দখলে চলে গেলেও গল্পের বই বা সাহিত্যের অনুবাদের কাজ এখনো তাঁর কাছে আসছে। কারণ সাহিত্যের রস ও আবেগ বুঝতে মানুষের মস্তিষ্কের বিকল্প নেই।

অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক কার্ল ফ্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে করিয়ে দিয়েছেন—তা হলো মানুষের সঙ্গে মানুষের ব্যক্তিগত সম্পর্ক। তিনি বলেন, মেশিন হয়তো আপনার কথা অন্য ভাষায় পৌঁছে দেবে, কিন্তু অপর প্রান্তের মানুষের সঙ্গে আত্মিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারবে না। ফ্রে-র ভাষায়, ‘মেশিন অনুবাদ চারদিকে ছড়িয়ে পড়ার মানে এই নয় যে, আপনি ফরাসি ভাষা না জেনে একজন ফরাসির সঙ্গে গভীর সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারবেন।’