ডাইনোসরের ডিমের মতো লবণ: হারিয়ে যেতে বসা ঐতিহ্যের নতুন প্রত্যাবর্তন
ফিলিপাইনের একটি ছোট দ্বীপে তৈরি হয় বিশ্বের অন্যতম বিরল লবণ, আসিন তিবুওক। ডিমের মতো দেখতে এই লবণ একসময় স্থানীয় জীবনের অংশ ছিল। কিন্তু ধীরে ধীরে তা বিলুপ্তির পথে চলে যায়। এখন নতুন প্রজন্মের শেফ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাবে এটি আবার আলোচনায় ফিরে এসেছে।
ডাইনোসরের ডিমের মতো লবণ: হারিয়ে যেতে বসা ঐতিহ্যের নতুন প্রত্যাবর্তন
ফিলিপাইনের একটি ছোট দ্বীপে তৈরি হয় বিশ্বের অন্যতম বিরল লবণ, আসিন তিবুওক। ডিমের মতো দেখতে এই লবণ একসময় স্থানীয় জীবনের অংশ ছিল। কিন্তু ধীরে ধীরে তা বিলুপ্তির পথে চলে যায়। এখন নতুন প্রজন্মের শেফ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাবে এটি আবার আলোচনায় ফিরে এসেছে।
বোহোল দ্বীপের একটি সাধারণ খড়ের ছাউনি দেওয়া কর্মশালায় ৬৮ বছর বয়সী রোমানো আপাতায় নারকেলের খোল দিয়ে তৈরি একটি হাতিয়ার ব্যবহার করে লবণাক্ত পানি ঢালছেন গোলাকার মাটির পাত্রে।
পাত্রগুলো আগুনের ওপর ঝুলছে। কিছু সময় পর পাত্রে ফাটল ধরলে তিনি সেগুলো নামিয়ে ঠান্ডা করেন। এরপর সাবধানে ভেঙে ভেতর থেকে বের করেন একটি সাদা গোলক, যা বিশ্বের অন্যতম বিরল লবণ।
এই লবণের নাম আসিন তিবুওক, যার অর্থ অখণ্ড লবণ। তবে এর আকৃতির কারণে এটি ডাইনোসর ডিম নামেও পরিচিত। একসময় বোহোল দ্বীপে এই লবণ ব্যাপকভাবে তৈরি হতো, কিন্তু এখন তা প্রায় বিলুপ্তির মুখে। আপাতায় এখন এই ঐতিহ্য ধরে রাখার জন্য কাজ করা অল্প কয়েকজনের একজন।
শতাব্দীপ্রাচীন ঐতিহ্য
আসিন তিবুওক তৈরির ইতিহাস অন্তত ১৬০০ সাল পর্যন্ত পৌঁছায়। স্প্যানিশ মিশনারিরা তখন এই পদ্ধতির কথা উল্লেখ করেছিলেন, যেখানে পোড়া নারকেলের খোসার ছাই দিয়ে সমুদ্রের পানি ছেঁকে মাটির পাত্রে সিদ্ধ করে লবণ তৈরি করা হতো।
তবে গবেষক আন্দ্রেয়া ইয়ানকোভস্কির মতে, এই পদ্ধতি আরও পুরোনো এবং স্প্যানিশদের আগমনের আগেই স্থানীয়দের মধ্যে প্রচলিত ছিল। তিনি প্রায় ২০ বছর আগে এই লবণ সম্পর্কে জানতে পারেন এবং ২০১৯ সালে দেখেন যে লবণ প্রস্তুতকারীর সংখ্যা খুবই কমে গেছে।
একসময় দ্বীপের উপকূলবর্তী অনেক পরিবার এই লবণ তৈরি করত। এটি চাল ও অন্যান্য কৃষিপণ্যের বিনিময়ে বাণিজ্য হতো এবং অন্যান্য দ্বীপেও পাঠানো হতো। মানুষ এই লবণ সুতোয় বেঁধে ভাত বা পায়েসে ডুবিয়ে খেত।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই শ্রমসাধ্য কাজ থেকে মানুষ সরে যেতে থাকে। একসময় প্রায় ১০০টি পরিবার এই লবণ তৈরি করলেও এখন তা হাতে গোনা কয়েকজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ।
পুনর্জাগরণের গল্প
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং তরুণ শেফদের আগ্রহের কারণে এই লবণ আবার জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। ২০২১ সালে এক জনপ্রিয় ইউটিউবার এই লবণ তৈরির ভিডিও প্রকাশ করলে তা ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। ২০২৩ সালে একটি নাটকেও এই লবণ দেখানো হয়। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে ইউনেস্কো এটিকে সংরক্ষণের জরুরি প্রয়োজন রয়েছে এমন সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।
১৯৯৫ সালে ফিলিপাইন সরকার সব লবণে আয়োডিন মেশানো বাধ্যতামূলক করেছিল। এর ফলে আসিন তিবুওকের উৎপাদন কমে যায়। তবে ২০২৪ সালে এই নিয়ম শিথিল করা হলে আবার এই লবণ তৈরির সুযোগ তৈরি হয়।
ফাদার ক্রিস মানোঙ্গাস, যিনি লবণ প্রস্তুতকারীর পরিবারে জন্মেছিলেন, বহু বছর পর আবার এই ব্যবসা শুরু করেন। প্রথমে তার পরিবার রাজি না হলেও পরে তারা টান ইনং ম্যানুফ্যাকচারিং কর্পোরেশন নামে নতুনভাবে উৎপাদন শুরু করে।
এই লবণ তৈরি করতে সময় লাগে প্রায় সাড়ে চার মাস। প্রথমে হাজারের বেশি নারকেলের খোসা সংগ্রহ করে সমুদ্রের পানিতে ভিজিয়ে রাখা হয়। এরপর শুকিয়ে তা কয়েক দিন ধরে পোড়ানো হয়। সেই ছাই দিয়ে তৈরি ফিল্টারে সমুদ্রের পানি ঢেলে তৈরি করা হয় লবণাক্ত দ্রবণ। পরে তা মাটির পাত্রে সিদ্ধ করা হয়।
আগে এই কাজ করতে বাঁশের ভেলা বা গরুর গাড়ি ব্যবহার করা হতো, কিন্তু এখন কিছু আধুনিক পদ্ধতিও যুক্ত হয়েছে।
এই প্রক্রিয়ায় কিছু নিয়ম মানা হয়। কাজের সময় কোনো অলংকার পরা যাবে না। তৈলাক্ত খাবার খাওয়া যাবে না। শামুকের খোল ব্যবহার করতে হবে পানি ঢালার জন্য।
এই লবণের দাম অনেক বেশি, প্রায় ১৫০ ডলার পর্যন্ত। ফলে এটি সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যায়। শুরুতে বাজার না থাকলেও পরে বিদেশি ক্রেতা ও পর্যটকদের আগ্রহ বাড়তে থাকে।
করোনা মহামারী ও প্রাকৃতিক দুর্যোগে ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হলেও স্থানীয়দের সহায়তায় তা আবার ঘুরে দাঁড়ায়। বর্তমানে একটি সমবায় গড়ে উঠেছে এবং উৎপাদন বাড়ছে।
খাবারে নতুন ব্যবহার
বর্তমানে বিখ্যাত শেফরা এই লবণ বিভিন্নভাবে ব্যবহার করছেন। কেউ এটি আইসক্রিমের সঙ্গে পরিবেশন করছেন, কেউ চকোলেটে ব্যবহার করছেন। এই লবণের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো এর দুই পাশে আলাদা স্বাদ। এক পাশে ধোঁয়ার স্বাদ বেশি, অন্য পাশে তুলনামূলক মৃদু।
বোহোলের এক চকোলেট প্রস্তুতকারক বলেন, এই লবণ চকলেটের স্বাদকে আরও সমৃদ্ধ করে তোলে।
আজও রোমানো আপাতায় প্রতিদিন পরিশ্রম করে এই লবণ তৈরি করেন। কখনো তাকে টানা কয়েক দিন ঘুম ছাড়াই কাজ করতে হয়। তবুও নতুন প্রজন্মের আগ্রহ তাকে অনুপ্রাণিত করে।
তিনি বলেন, এই ঐতিহ্য ধরে রাখতে পারা তার জন্য গর্বের বিষয়।
আসিন তিবুওক শুধু একটি লবণ নয়। এটি একটি ইতিহাস, একটি সংস্কৃতি, এবং মানুষের পরিচয়ের অংশ। এখন সময়ই বলে দেবে, এই ডাইনোসরের ডিম আবার কতটা জায়গা করে নিতে পারে বিশ্বের রান্নাঘরে।