একুশের আলপনা আলাপন
সাদা প্রলেপের ওপর লাল, নীল, হলুদ রঙের বাহারি নকশার আলপনা। ১৪৩২ বঙ্গাব্দের ফাল্গুনে কেন্দ্রীয় শহিদ মিনার সেজে উঠেছে নতুন রূপে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শহিদ মিনার চত্বর এবং আশপাশের দেয়ালে তুলির আঁচড় জানান দিচ্ছে আসন্ন ৮ ফাল্গুনের কথা। যে ফাল্গুনে রক্তে রাঙা হয়েছিল ঢাকার রাজপথ, সেই ফাল্গুন এখন রাঙানো হয় আলপনার রঙিন আভায়।
একুশের আলপনা আলাপন
সাদা প্রলেপের ওপর লাল, নীল, হলুদ রঙের বাহারি নকশার আলপনা। ১৪৩২ বঙ্গাব্দের ফাল্গুনে কেন্দ্রীয় শহিদ মিনার সেজে উঠেছে নতুন রূপে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শহিদ মিনার চত্বর এবং আশপাশের দেয়ালে তুলির আঁচড় জানান দিচ্ছে আসন্ন ৮ ফাল্গুনের কথা। যে ফাল্গুনে রক্তে রাঙা হয়েছিল ঢাকার রাজপথ, সেই ফাল্গুন এখন রাঙানো হয় আলপনার রঙিন আভায়।
“আসলে এমনও হয়, পরের দিন এসে দেখি নিজের হাতে আঁকা আলপনার ওপর দিয়ে সারি সারি গাড়ি চলে গেছে। রঙিন নকশা পুরো ফিকে হয়ে গেছে। নিজের তুলির আঁচড়ে আঁকা একটা পাপড়ির ডানপাশটাই নেই। তবু আফসোস হয় না। কারণ দেশের জন্য এত গর্বের আর সুন্দর একটি কাজ আমরা প্রতি বছর করার সুযোগ পাই। এই সুযোগই বা কয়জন পায়?”
কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারে আলপনা এঁকে দুপুর নাগাদ শহিদ মিনার চত্বর থেকে বের হচ্ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ড্রয়িং অ্যান্ড পেইন্টিং বিভাগের শিক্ষার্থী তোয়াহা তানভিন। ঠিক তখনই কথা হয় তার সঙ্গে।
সাদা প্রলেপের ওপর লাল, নীল, হলুদ রঙের বাহারি নকশার আলপনা। ১৪৩২ বঙ্গাব্দের ফাল্গুনে কেন্দ্রীয় শহিদ মিনার সেজে উঠেছে নতুন রূপে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শহিদ মিনার চত্বর এবং আশপাশের দেয়ালে তুলির আঁচড় জানান দিচ্ছে আসন্ন ৮ ফাল্গুনের কথা। যে ফাল্গুনে রক্তে রাঙা হয়েছিল ঢাকার রাজপথ, সেই ফাল্গুন এখন রাঙানো হয় আলপনার রঙিন আভায়।
প্রতিবছর ২১ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে বিশ্বব্যাপী উদযাপিত হয়। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারির বাংলা তারিখ ছিল ৮ ফাল্গুন, ১৩৫৮। বাংলা ভাষার জন্য যে দিনে রক্ত ঝরেছিল, সেই দিনটির বাংলা তারিখের রয়েছে আলাদা আবেদন।
আলপনা: কেমন করে এলো?
অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছিলেন, “আর্টের একটি লক্ষণ আড়ম্বরশূন্যতা, সরলতা। অনাবশ্যক রঙতুলির বাহুল্য, দোয়াত-কলম, বাজনা-বাদ্যি—এসব সে মোটেই সয় না।” বাঙালি মায়েদের আলপনায় সেই সরলতার ছাপ স্পষ্টভাবে দেখা যায়।
প্রাচীনকাল থেকেই বাংলার নারীরা ধর্মীয় ও সামাজিক অনুষ্ঠানে ঘরের আঙিনা সাজিয়ে তুলতেন আলপনায়। ঘরের চৌকাঠ থেকে সদর দরজার সামনে পর্যন্ত আতপ চালের গুঁড়া দিয়ে আঁকা হতো আলপনা। আতপ চালের গুঁড়ায় পানি মিশিয়ে তৈরি করা হতো সাদা রঙ। পরে এই সাদা আলপনাকে ফুটিয়ে তুলতে যুক্ত হয় লাল রঙ, যা আসত সিঁদূর থেকে। আর হলুদ রঙের জন্য ব্যবহার করা হতো গুঁড়া হলুদ।

বিয়েতে আলপনা আঁকা শুরু হয় সৌভাগ্যের প্রতীক হিসেবে। যা কিছু সুন্দর, তা সৌভাগ্য বয়ে আনে—এই ধারণা থেকেই আলপনা বিয়ে, পূজা ও ব্রতের মতো বিভিন্ন অনুষ্ঠানে স্থান পায়।
১৯১৯ সালে নন্দলাল বসুকে শান্তিনিকেতনের কলা ভবনের অধ্যক্ষ হিসেবে আমন্ত্রণ জানানো হয়। সেখানে সুকুমারি দেবীর আলপনায় মুগ্ধ হয়ে তিনি আলপনা শিল্পকে আরও বিস্তৃত করার উদ্যোগ নেন। তিনি আলপনায় রঙ ও শেড ব্যবহারের নতুন মাত্রা যোগ করেন। ধীরে ধীরে শান্তিনিকেতনের বিভিন্ন অনুষ্ঠানেও আলপনা আঁকার রীতি চালু হয়।
বাংলাদেশেও আলপনার দীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে। ভাষা আন্দোলনের সময় ঢাকা আর্ট কলেজের শিক্ষার্থীরা রাজপথে আলপনা আঁকেন। সেই থেকে আলপনা জড়িয়ে পড়ে ভাষা দিবসের ইতিহাসের সঙ্গে। ১৯৫৩ সাল থেকেই ভাষা দিবসের উদযাপনে আলপনা আঁকা শুরু হয়। তবে পাকিস্তান সরকার এতে আপত্তি জানায়। ধর্মীয় অজুহাতে আলপনার সংস্কৃতিকে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু বাঙালি তা মেনে নেয়নি। আলপনা রাজপথ থেকে দেয়ালে স্থান করে নেয়, এবং ধীরে ধীরে এটি জাতীয় অনুষ্ঠানের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফলিত গণিত বিভাগের সামনের রঙিন বাগানবিলাস জানিয়ে দিচ্ছে ফাগুনের আগমন। আর সেই পথেই চারুকলার শিক্ষার্থীদের রঙতুলির আয়োজন জানান দিচ্ছে ভাষা দিবসের প্রস্তুতির কথা।

চারুকলা অনুষদের শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী বিধান গাইন বলেন, “এই আলপনার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা প্রতিটি মুহূর্তই আমার কাছে বিশেষ। সাধারণত ১৯ ও ২০ ফেব্রুয়ারি দিনব্যাপী আলপনা আঁকার কাজ চলে। বেদিতে মোট নয়টি আলপনা আঁকা হয়। যেহেতু এটি একটি রাষ্ট্রীয় উৎসবের অংশ, তাই আমাদের নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে কাজ করতে হয়। প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীরা অনেকেই কোনো অভিজ্ঞতা ছাড়াই এতে অংশ নেয়। তবে আলপনা আঁকার এই কাজ এতটাই গর্ব ও আনন্দের যে, অন্য কোনো বাধ্যবাধকতার প্রয়োজন হয় না।”
তিনি আরও জানান, এই কাজে বর্তমান ও প্রাক্তন শিক্ষার্থী এবং শিক্ষকরা অংশ নেন। অন্য বছর শহিদ মিনারে প্রবেশপথের দেয়ালেও আলপনা আঁকা হয়। তবে এবার দেয়ালের গ্রাফিতি না মুছে তার ওপর ছবি সেঁটে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
দেয়ালজুড়ে বর্ণমালার আঁচড়। ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’ থেকে ভাষা নিয়ে লেখা নানা কবিতা ও গান উঠে এসেছে আলপনায়। শিল্পীদের সৃজনশীলতায় অক্ষরগুলো দেয়ালে জায়গা করে নিয়েছে গভীর মমতায়।
৮ ফাল্গুনের প্রথম প্রহর থেকেই শুরু হয়েছে শহিদ বেদিতে শ্রদ্ধা নিবেদনের পালা। আলপনায় মোড়া রাস্তায় খালি পায়ে হাঁটছে ছেলে, বুড়ো, শিশু। দেয়ালে আঁকা বাংলা অক্ষরগুলোর চারপাশে জমছে মানুষের ভিড়। ছবি তোলার হুড়োহুড়িতে মুখর হয়ে উঠেছে পুরো প্রাঙ্গণ।

৯ ফাল্গুন এলেই সেই আলপনাগুলো একলাসেরে হয়ে পড়ে থাকবে, অপেক্ষায় থাকবে পরের ফাল্গুনের। কেন্দ্রীয় শহিদ মিনার পড়ে থাকবে অযত্নে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে অবস্থিত এই শহিদ মিনার প্রাঙ্গন অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে কখনো কখনো মাদকসেবীদের আড্ডাস্থলে পরিণত হয়। নিজের ক্যানভাসের ওপর এই অবমাননা ও অসম্মান মেনে নিতে হয় আলপনা শিল্পীদের।
বিগত ৭৫ বছরে অনেকেই এসেছেন, এঁকেছেন। আবার অনেকেই আসবেন, আঁকবেন। ফাল্গুনে রক্তরাঙা পলাশ ফুল আমাদের নতুন করে লড়াইয়ের বার্তা দেয়। সেই লড়াই হোক কলমে কিংবা তুলিতে।
ছবি: বিধান গাইন