আচিক কুসিক: গারোদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রক্ষায় মাতৃভাষার সংগ্রাম

২১ ফেব্রুয়ারি আমরা আমাদের মহান ভাষা আন্দোলনের আত্মত্যাগের কথা ও পৃথিবীর সকল ভাষার অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রামের কথা স্মরণ করি। এই দিন আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, ভাষা শুধু একটি মানুষের যোগাযোগের মাধ্যম নয়, বরং এটি একটি জাতির ইতিহাস, সংস্কৃতি ও আত্মপরিচয়ের ধারক।

Language Cover S5.jpg

বাংলাদেশে অনেক ভাষা রয়েছে, যারা তাদের আত্মপরিচয় ও অস্তিত্বের জন্য লড়াই করছে। তার মধ্যে আচিক কুসিক ভাষা অন্যতম।

এই গারো সম্প্রদায়ের জন্য গারো বা “আচিক কুসিক” এমন এক ভাষা যা দিয়ে তাদের ঐতিহ্য, ধর্ম ও ইতিহাস যুগে যুগ ধরে টিকে আছে।

এই গারো সম্প্রদায়ের মানুষ মূলত ভারতের মেঘালয় রাজ্যের পাহাড়ি অঞ্চলে বসবাস করে। বাংলাদেশে তাদের উপস্থিতি দেখা যায় ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা ও শেরপুর জেলায়। বাংলাদেশে প্রায় ২ লাখ মানুষ রয়েছে, যারা গারো ভাষায় কথা বলেন। এই গারো ভাষা মূলত একটি সিনো-তিব্বতীয় পরিবারের ভাষা, যা তিব্বত-বর্মী শাখার অন্তর্ভুক্ত। এই ভাষা মূলত মৌখিক ইতিহাসের মাধ্যমে টিকে আছে।

ভাষার ধ্বনি ও বৈশিষ্ট্য: স্বাতন্ত্র্যের পরিচয়

গারো ভাষার সঙ্গে ইংরেজি বা বাংলার প্রধান পার্থক্য হলো নাসাল বা নাক দিয়ে উচ্চারিত ধ্বনি। এই ধ্বনিগত বৈশিষ্ট্য ভাষাটিকে একটি আলাদা সুর ও ছন্দ দেয়। এই ভাষা মূলত মৌখিক চর্চায় বেঁচে থাকলেও, বর্তমানে রোমান লিপি ব্যবহার করা হয়। গারো ভাষার নিজস্ব লিপি বা বর্ণমালা নেই, এবং রোমান লিপি চিহ্ন ব্যবহার করে উচ্চারণ বোঝানো হয়।

এই ভাষায় আরও কিছু ভিন্নতা লক্ষ্য করা যায়, যার মধ্যে অন্যতম হলো শব্দভাণ্ডার থেকে বিভিন্ন কৃষি, প্রকৃতি ও উৎসব ভিত্তিক শব্দ, যা বাংলায় সরাসরি অনুবাদ করা যায় না। তাই এই ভাষা গারো সম্প্রদায়ের সাংস্কৃতিক জগতের দরজা।

সংস্কৃতি, উৎসব ও মৌখিক ঐতিহ্য

গারো সম্প্রদায়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উৎসব হলো ওয়াঙ্গালা। এই উৎসবের সময় বিভিন্ন গান, লোককথা ও নাচ দিয়ে উদযাপন করা হয়। এই উৎসবমুখী গান, লোককথা ও নাচের ভাষা দৈনন্দিন জীবনের ভাষা থেকে কিছুটা ভিন্ন। তাই এই ভাষা ছাড়া এই উৎসবগুলি অসম্পূর্ণ রয়ে যাবে। গারো সম্প্রদায়ের একজন তরুণ সদস্য রিনচাং মারাক বলেন,
“আমাদের উৎসব আর গানগুলো যদি অন্য ভাষায় হয়, তাহলে সেই আনন্দ থাকে না। ভাষার সঙ্গে আমাদের আবেগ জড়িত। তাই ভাষা টিকিয়ে রাখতে সংস্কৃতি ধরে রাখা খুব জরুরি।”

বর্তমানের গ্রাম ও পাহাড়ি এলাকায় অনেক মানুষ প্রথম ভাষা হিসেবে গারো শিখছে। এর প্রধান কারণ হলো তাদের সমাজের সকল ব্যবস্থায় এই ভাষা ব্যবহার হয়। তবে শহরমুখী হলে এই বাস্তবতা ভিন্ন হয়ে যায়। নিজের পরিবারের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে প্রায় সকলেই বাংলা বা ইংরেজি ভাষাকে প্রাধান্য দিচ্ছে। এতে শিশুরা নিজ ভাষা শেখার আগ্রহ হারাচ্ছে। তাই নতুন প্রজন্মের কাছে এই ভাষার ব্যবহার ক্রমাগত কমে যাচ্ছে।

গ্রামের প্রবীণরা শুদ্ধ ভাষায় কথা বলতে পারলেও, তরুণ প্রজন্মের মধ্যে বাংলা ও ইংরেজি মিশিয়ে কথা বলার প্রবণতা বেড়েই যাচ্ছে। এছাড়াও অর্থনৈতিক, শিক্ষা ও প্রশাসনিক কাজের জন্য বাংলা শেখা জরুরি হওয়ায় মানুষের মধ্যে নিজ মাতৃভাষাকে প্রাধান্য দেওয়া আর সম্ভব হচ্ছে না।
রিনচাংয়ের ভাষায়,
“আমরা নিজেদের মধ্যে গারো বলি, কিন্তু বাইরে গেলে বাংলা বা ইংরেজি ব্যবহার করি। এতে ধীরে ধীরে ভাষার অনেক শব্দ হারিয়ে যাচ্ছে।”

চ্যালেঞ্জ: অস্তিত্বের প্রশ্ন

বর্তমানে ভাষা প্রধানত বাসা, ধর্মীয় উৎসব, অনুষ্ঠান ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে ব্যবহার করা হয়। এছাড়াও শিক্ষা, প্রশাসন ও আন্তর্জাতিক ও প্রযুক্তিগত স্থানে ইংরেজি ব্যবহার করা হয়, ফলে মাতৃভাষার ব্যবহার সীমিত হয়ে যাচ্ছে।

এই সময় আমরা দেখতে পাচ্ছি গারো ভাষার ব্যবহার ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে। এর প্রধান কারণ হলো মাতৃভাষা শিক্ষার অভাব। শিশুদের স্কুলে প্রাথমিক শিক্ষার জন্য বাংলা শেখার ফলে তাদের নিজ মাতৃভাষা থেকে একটি দূরত্ব তৈরি হচ্ছে। এছাড়াও শহরমুখী জীবনযাত্রা, লিখিত চর্চায় সীমাবদ্ধতা ও সামাজিকভাবে বাংলা ও ইংরেজিকে প্রাধান্য দেওয়া গারো ভাষাকে আস্তে আস্তে বিলুপ্তির পথে ঠেলে দিচ্ছে।

গণমাধ্যম ও প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতার কারণে নতুন প্রজন্ম নিজ ভাষা শিখতে পারছে না। অনেক পরিবার মনে করে মাতৃভাষা শেখার চেয়ে জাতীয় ভাষা শেখা বেশি জরুরি, যা দীর্ঘমেয়াদে ভাষার অস্তিত্বকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে। এর ফলে গারো ভাষা খুব বড় হুমকির মুখে পড়েছে।

ধীরে ধীরে এই ভাষার ব্যবহারকারী সংখ্যা কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। মাতৃভাষার শিক্ষা না থাকলে ভাষা শুধুমাত্র ঘরোয়া যোগাযোগের মাধ্যম হয়ে পড়ে, যা দীর্ঘমেয়াদে ভাষার অস্তিত্বকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে।