বাংলাদেশের মানচিত্রে তঞ্চঙ্গ্যা ভাষা: অস্তিত্ব, আত্মপরিচয় ও সংরক্ষণের লড়াই
ভাষা শুধু মানুষের অন্তরের কথা বলার মাধ্যম নয়, বরং একটি গোষ্ঠীর সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও আত্মপরিচয়। এই ভাষা হারিয়ে গেলে তার নিজের আত্মপরিচয়ও হারিয়ে যায়।
বাংলাদেশের মানচিত্রে তঞ্চঙ্গ্যা ভাষা: অস্তিত্ব, আত্মপরিচয় ও সংরক্ষণের লড়াই
ভাষা শুধু মানুষের অন্তরের কথা বলার মাধ্যম নয়, বরং একটি গোষ্ঠীর সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও আত্মপরিচয়। এই ভাষা হারিয়ে গেলে তার নিজের আত্মপরিচয়ও হারিয়ে যায়।
আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উদযাপন করার একটি উদ্দেশ্য হল আমরা সকলেই নিজেদের মাতৃভাষা নিয়ে গর্বিত এবং এই ভাষাগুলিকে পরবর্তী প্রজন্মের জন্য টিকিয়ে রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এই মাতৃভাষা দিবস আমাদেরকে ভাষা আন্দোলনের গৌরবের কথা স্মরণ করিয়ে দেয় এবং আমাদের নিজ মাতৃভাষাকে সম্মান করতে শেখায়। তাই এই বিশেষ মাসে, দৃষ্টি আকর্ষণ করছি আমাদের দেশের বিভিন্ন জাতিসত্তার নিজ মাতৃভাষা রক্ষার প্রচেষ্টার উপর যার মধ্যে একটি উল্লেখযোগ্য ভাষা হলো তঞ্চঙ্গ্যা।
তঞ্চঙ্গ্যা ভাষা ও জনগোষ্ঠী
তঞ্চঙ্গ্যা জনগোষ্ঠীর ভাষা হলো তঞ্চঙ্গ্যা। এই জনগোষ্ঠীকে প্রধানত পার্বত্য চট্টগ্রামের রাঙামাটি ও বান্দরবান জেলায় দেখা যায়। এছাড়াও তাদের কক্সবাজারের উখিয়া ও দেখনা ফিল্ডেও একটি বড় জনসংখ্যা দেখা যায়। তাদের মোট জনসংখ্যা কিছুটা বেশি হলেও, প্রকৃতভাবে মাতৃভাষা হিসেবে তঞ্চঙ্গ্যা ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় ৫০–৬০ হাজারের মতো। এই ভাষা ব্যবহারকারীর বেশির ভাগ মানুষ পাহাড়ি গ্রাম অঞ্চলে বসবাস করে।
ভাষাতাত্ত্বিক দিক দিয়ে বিবেচনা করলে তঞ্চঙ্গ্যা হলো একটি Indo-European ভাষার পূর্বাঞ্চলীয় শাখা। এই জনগোষ্ঠী ঐতিহাসিকভাবে ভারতের মগধ অঞ্চলে বসবাস করত, তবে সেখান থেকে আরাকান হয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামে তারা তাদের বসতি স্থাপন করেছে। এই যাতায়াতের কারণে তাদের সংস্কৃতি, ভাষা ও জীবনযাপনে বিশাল পরিবর্তন এসেছে।
তঞ্চঙ্গ্যা ভাষায় রয়েছে এমন কিছু সুরভিত শরভঙ্গি ও গোল্টাল স্টপ, যা বাংলা ও ইংরেজি দুই ভাষাতেই পাওয়া যায় না। কিছু ব্যঞ্জনধ্বনির উচ্চারণে বিশেষ ধরনের নিশ্বাসমিশ্রিত স্বর শোনা যায়। এই সব কারণে তঞ্চঙ্গ্যা ভাষা কিছুটা বিশেষত্ব পায়।
তঞ্চঙ্গ্যা ভাষার নিজস্ব লিপি আছে, যাকে তঞ্চঙ্গ্যা লিপি বা “কা-পা” নামে পরিচিত।
তঞ্চঙ্গ্যা ভাষা হলো তঞ্চঙ্গ্যা সংস্কৃতির মিলিত উপাদান। বিজু উৎসব (নববর্ষ), বৌদ্ধ ধর্মীয় অনুষ্ঠান যেমন বৌদ্ধ পূর্ণিমা ও মাঘি পূর্ণিমা, গিলা খেলায় ব্যবহৃত অনেক শব্দ যা বাংলা ভাষায় পাওয়া যায় না। তাই এই ভাষা হারিয়ে গেলে এই সব অনুষ্ঠানের মৌলিক কাঠামোও হারিয়ে যাবে।
এর মধ্যে বিশেষভাবে হারিয়ে যাবে তঞ্চঙ্গ্যা ভাষার প্রাণ “উভাগীত”। উভাগীত হলো তঞ্চঙ্গ্যা লোকগাথা ও লোকগান। এই উভাগীতের মাধ্যমে তঞ্চঙ্গ্যা পূর্বপুরুষদের সাংস্কৃতিক চর্চা, প্রকৃতির সঙ্গে সম্পর্কিত গল্প, প্রেমের কাহিনী ও অভিবাসনের কাহিনী যুগ যুগ ধরে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে ছড়িয়ে যাচ্ছে। এর মাধ্যমে প্রত্যেক শিশুর তঞ্চঙ্গ্যা সাহিত্যের সঙ্গে পরিচয় হয়। এর ফলে তঞ্চঙ্গ্যা গোষ্ঠীর মৌখিক ইতিহাস রচিত হয়েছে।
প্রজন্মভেদে ভাষার পরিবর্তন
বয়স্করা এখনো খাটি রূপে তঞ্চঙ্গ্যা ভাষায় কথা বলতে পারে। এই খাটি রূপে বহু প্রাচীন শব্দ ব্যবহৃত হয়। তবে আজ দেখা যায় যে তরুণ প্রজন্ম সম্পূর্ণরূপে বাংলার দ্বারা প্রভাবিত। প্রায়শই তঞ্চঙ্গ্যা বাক্যে বাংলা ক্রীড়া ব্যবহার করে কথা বলে। এছাড়াও আধুনিক বা প্রযুক্তিগত বিষয়ে কথা বলতে গেলে প্রায় পুরোপুরি বাংলা বা ইংরেজি ব্যবহার করে।
এখনো পাহাড়ী গ্রামে অনেক শিশুরাই তঞ্চঙ্গ্যা ভাষা শিখে বড় হয়। কিন্তু শহরে থাকা শিশুদের এই সুযোগ নেই। তাদের প্রথমেই স্কুলে বাংলা শেখানো হয়। তাই তাদের প্রধান ভাষা হয়ে যায় বাংলা। তাদের মাতৃভাষা ঘরের ভিতরেই সীমিত থাকে। এটি আমাদের অস্তিত্বের উপর হুমকি।
এই বিষয়ে কথা বলার জন্য তঞ্চঙ্গ্যা তরুণ ও সম্প্রদায়ের সদস্য সৌহার্দ্য তঞ্চঙ্গ্যা বলেন,
“আমাদের জনসংখ্যা বাড়ছে ঠিকই, কিন্তু আমাদের ভাষায় কথা বলা মানুষের সংখ্যা ক্রমাগত কমে যাচ্ছে। আগের প্রজন্ম যে শব্দগুলো ব্যবহার করত তা আজ আর ব্যবহার করা হয় না। এইভাবে চলতে থাকলে দেখা যাবে ভাষার প্রত্যেক বাক্যই পরিবর্তিত হয়ে যাবে।”
সৌহার্দ্য এর মাতৃভাষার স্কুলে কোনো বই নেই। এই কারণে পড়ালেখা মানেই শিশুদের বাংলা পড়তে হবে। এর ফলে তঞ্চঙ্গ্যা ভাষা তরুণ প্রজন্মের কাছে অপ্রয়োজনীয় মনে হচ্ছে এবং সৌহার্দ্যর মতো তরুণেরা আজ নিজ সংস্কৃতির থেকে দূরে সরে যাচ্ছে।
“এই ধারণা না পরিবর্তন করলে আমাদের ভাষা টিকবে না।”
লিপির প্রসঙ্গে তিনি আশাবাদী হয়ে বলেন,
“কা-পা লিপি শেখানো গেলে, ডিজিটাল ফন্ট ও ভাষাভিত্তিক কীবোর্ড বানালে তরুণদের ভাষার প্রতি আরও আগ্রহী করা যাবে। এই মোবাইল ও ইন্টারনেট যুগে ভাষাকে শুধু মৌখিক চর্চায় নয়, বরং ডিজিটালভাবে অনলাইনে ধরে রাখা না গেলে, বাস্তব জীবনেও টিকে থাকবে না।”
তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হিসেবে উল্লেখ করেন,
“আমাদের অনেক প্রবীণ শিল্পী আছেন, যারা শত শত উভাগীত জানেন। তারা চলে গেলে এই সমৃদ্ধ গানগুলোও চলে যাবে। তাই এখনই রেকর্ড করা দরকার, যাতে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে দেখানো যায়।”
তার মতে ভাষা শুধু শব্দ নয়, বরং মানুষের চিন্তার ধরন। আমরা যখন বাংলা বা ইংরেজিতে কথা বলি, তখন আমাদের নিজ গল্প বলার ভঙ্গিটাই বদলে যায়। এইভাবে চলতে থাকলে আমাদের নিজের ইতিহাস অন্য ভাষায় প্রকাশ করতে হবে। তখন আমাদের সন্তানরা কখনও জানতেও পারবে না তাদের পূর্বপুরুষদের রচিত গল্প, উপন্যাস ও গান। তারা তাদের আসল ভাষা হারিয়ে ফেলবে।
সংরক্ষণ
তঞ্চঙ্গ্যা ভাষাকে রক্ষা করলে বাংলাদেশের যে জাতিগত বৈচিত্র্য রয়েছে তা আরও ভালোভাবে ফুটে উঠবে। তাই কিছু পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি:
- মাতৃভাষা প্রাথমিক শিক্ষা: প্রত্যেক তঞ্চঙ্গ্যা শিশুকে প্রাথমিক স্তরে তঞ্চঙ্গ্যা ভাষায় পাঠ্যবই ও শিক্ষা উপকরণ তৈরি করে দিতে হবে। এর মাধ্যমে তারা নিজেদের ভাষার সঙ্গে পরিচিত হবে এবং মনের ভাব স্পষ্টভাবে প্রকাশ করতে পারবে।
- ডিজিটাল উপস্থিতি: তঞ্চঙ্গ্যা লিপির উপস্থিতি প্রযুক্তিগত ক্ষেত্রে তৈরি করতে হবে। তঞ্চঙ্গ্যা লিপি, ফন্ট, কীবোর্ড ও অনলাইন কন্টেন্ট তৈরি করা জরুরি। এই অনলাইন যুগে ডিজিটাল উপস্থিতি না থাকলে ভাষা তরুণদের কাছে জনপ্রিয় হবে না।
- কমিউনিটি পর্যায়ে লিপির ব্যবহার ও শিক্ষা: কমিউনিটি সেন্টারে কা-পা লিপি নিয়ে নিয়মিত ক্লাস চালু করলে আরও মানুষের মধ্যে পড়ালেখার চর্চা বাড়বে।
- মৌলিক ঐতিহ্য নথিভুক্তকরণ: আঞ্চলিক ইতিহাস, গান, সংস্কৃতি ও আচার-অনুষ্ঠান ভালোভাবে সংরক্ষণ করতে হবে।
এই আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় ভাষার গুরুত্ব ও মূল্যবোধ। এই দিনে আমরা বুঝতে পারি, ভাষার জন্য সংগ্রাম শুধু অতীতের নয় বা কোনো এক জাতিগোষ্ঠীর জন্য নয়, বরং পৃথিবীর সকল মানুষের নিজ ভাষা ও সংস্কৃতি টিকিয়ে রাখার লড়াই। তাই আমাদের এই তঞ্চঙ্গ্যা সহ বাংলাদেশের সকল আদিবাসী সমাজের মানুষের ভাষাকে সঠিক মর্যাদা দিয়ে সবাইকে একসাথে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে।