ম্রো ভাষার ইতিহাস, সংস্কৃতি ও সংরক্ষণের প্রশ্ন

২১শে ফেব্রুয়ারি আমাদের সবাইকে স্মরণ করিয়ে দেয় যে পৃথিবীর সব ভাষাই সমান এবং মানুষের সাবলীল বিকাশের জন্য নিজ মাতৃভাষা রক্ষা করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

Language Cover S4.jpg

নিজ ভাষা ত্যাগ করে কেউ কখনও নিজের মনের ভাব সঠিকভাবে প্রকাশ করতে পারবে না।

নিজের ভাষার প্রতি সম্মান থেকেই আমাদেরকে মনে করতে হবে সেই সব ভাষাকে যারা নিজের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য সংগ্রাম করেই যাচ্ছে।

বাংলাদেশের পাহাড়ি অঞ্চলে বসবাসকারী ম্রো জাতিগোষ্ঠীর ম্রো ভাষা তার মধ্যে অন্যতম। এই ভাষা ম্রো জাতিগোষ্ঠীর পরিচয় এবং তাদের সংস্কৃতি ও ইতিহাসের প্রধান অংশ।

ম্রো জাতিগোষ্ঠীর বসবাস প্রধানত বান্দরবান জেলার লামা, রুমা, আলীকদম ও থানচি এলাকায়। এই জাতিগোষ্ঠী মূলত ম্রো ভাষাই কথা বলে এবং এই ভাষার ধারক। এই ম্রো ভাষা মূলত সিনো-তিব্বতীয় ভাষা পরিবারের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত।

এটি তার অস্তিত্বের সময় থেকেই মৌখিকভাবে প্রচলিত ছিল, তবে ১৯৮০ সালের দিকে ম্রো লিপি বা ক্রামা স্ক্রিপ্ট তৈরির মাধ্যমে এটি একটি লিখিত ভাষার রূপ ধারণ করে। বর্তমানে এই লিপির মোট ৩১টি বর্ণ রয়েছে।

ভাষা ও সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক

ম্রো জনগোষ্ঠীর কাছে এটি শুধু কোনো যোগাযোগের মাধ্যম নয়, এটি তাদের ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক, সামাজিক ও প্রকৃতির সাথে সম্পর্কের প্রতিফলন। ম্রো সম্প্রদায়ের ধর্ম “ক্রামা”-র বিভিন্ন ধর্মীয় রীতিতে এই ভাষার ব্যবহার হয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ধর্মীয় মন্ত্র, আচার-সংক্রান্ত শব্দ ও উৎসবের গান। এই ব্যবহারের মধ্যেই ভাষার সাংস্কৃতিক রূপের বহিঃপ্রকাশ ঘটে।

ম্রো সম্প্রদায় একটি বিশেষ বাদ্যযন্ত্র ব্যবহার করে, যা তাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অংশ। তা হলো “প্ লুং” (বাঁশের বাঁশি)। এই যন্ত্র দিয়ে যে গান পরিবেশন করা হয় তা শুধু ম্রো জাতিগোষ্ঠীতেই পাওয়া যায়। এই গানগুলোর মাধ্যমে তারা তাদের দৈনন্দিন জীবনের সুখ, দুঃখ ও পূর্বপুরুষের গল্প পরের প্রজন্মের কাছে শুনায়। তাদের ধর্মীয় রীতিতে প্রকৃতি খুবই গুরুত্বপূর্ণ অংশ, তাই তারা এই ভাষা দিয়ে প্রকৃতির সাথে সম্পর্ক ফুটিয়ে তোলে। বহু শতাব্দী ধরে এই ভাষা কোনো লিখিত রূপ ছাড়াও টিকে আছে শুধু মানুষের মৌখিক চর্চার আদলে।

এই বিষয়ে আমরা বিস্তারিত জানতে পারি ম্রো সম্প্রদায়ের একজন যুবক, মেনক ম্রোর কাছ থেকে। সে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষার্থী। মেনক বলেন,
“আমাদের ভাষা বেঁচে আছে মূলত গল্প, গান আর ধর্মীয় আচারগুলোর মাধ্যমে। আগে লিখিত কিছু না থাকলেও মানুষ মুখে মুখে ইতিহাস ধরে রেখেছে। তাই এই ভাষা হারানো মানে আমাদের সকল ধর্মীয় রীতি, মৌখিক ইতিহাস ও আমাদের সংস্কৃতিকে হারিয়ে ফেলার সমান।”

দৈনন্দিন ব্যবহার ও প্রজন্মগত বাস্তবতা

ম্রো ভাষা মূলত পাহাড়ি গ্রামগুলোতেই বেঁচে আছে। তাদের সামাজিক জীবনের প্রধান মাধ্যম হিসেবে এই ভাষা টিকে আছে। মূলত স্থানীয় বাজার, ধর্মীয় অনুষ্ঠান ও গ্রামসভায় এই ভাষা ব্যবহৃত হয়। তবে বাইরের মানুষ ও অন্য জনগোষ্ঠীর সাথে যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে বাংলা ব্যবহৃত হয়। যেহেতু এই ভাষার লিখিত রূপ আগে থেকে ছিল না, তাই প্রবীণ মানুষের কাছে লিখিত রূপে ভাষা বোঝা খুবই কষ্টের। পার্বত্য গ্রামগুলোতে এই ভাষার চর্চা টিকে থাকলেও শহরের কাছে মানুষ উচ্চশিক্ষা ও ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে বাংলা শেখাকে অগ্রাধিকার দেয়। এই সিদ্ধান্তের কারণে আমাদের সহমুখী জনগোষ্ঠীর মধ্যে ম্রো ভাষা প্রায় কমে গিয়েছে।

মেনক ম্রো বলেন, “যখন শিশুরা স্কুলে গিয়ে দেখে সবকিছু অন্য ভাষায়, তখন তারা নিজের ভাষাকে কম গুরুত্বপূর্ণ মনে করতে শুরু করে। এটাই সবচেয়ে বড় সমস্যা।”

তার কোনো বাংলা ভাষার প্রতি বিদ্বেষ নেই। তার মূল যুক্তি হলো, বাংলা শেখার আগে নিজ মাতৃভাষার চর্চা না থাকলে সে কখনও তার মনের ভাব স্পষ্টভাবে প্রকাশ করতে পারবে না।

চ্যালেঞ্জ: টিকে থাকার সংগ্রাম

ম্রো ভাষা সংরক্ষণের ক্ষেত্রে কিছু বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। প্রথমত, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার অভাব। মাতৃভাষায় সঠিক বই ও সরঞ্জাম না থাকায় শিশুদের প্রাথমিক শিক্ষার যোগান দেওয়া প্রায় সকল পরিবারের জন্য কষ্ট হয়ে যায়। এছাড়াও স্কুলে মাতৃভাষা শিক্ষা না থাকায় লিখিত রূপে ব্যবহার থেকে তারা বঞ্চিত।

দ্বিতীয়ত, বাংলার ব্যবহার। দেখা যায়, প্রায় সকল মানুষকে তার নিজ জীবিকা অর্জনের জন্য বাংলা বেশি ব্যবহার করতে হয়। প্রাথমিক শিক্ষা থেকে যখনই উচ্চশিক্ষার জন্য পা দেয়, তখনই বেশি করে বাংলা ও ইংরেজি শিক্ষার প্রয়োজন হয়। এতে নিজের ভাষা ব্যবহারের স্থান কমে যাচ্ছে।

তৃতীয়ত, ডিজিটাল সীমাবদ্ধতা। ম্রো লিপি এখনো ডিজিটাল মাধ্যমে ব্যবহার করার উপযোগী নয়। এছাড়াও আমাদের ভাষার কোনো নির্দিষ্ট কীবোর্ড তৈরি করা নেই। তাই আমাদের তরুণরা অনলাইন মাধ্যম ও কর্মক্ষেত্রে ম্রো ভাষা ব্যবহার করতে পারে না। এছাড়াও সামাজিক ও ভূমি পরিবর্তনের সাথে ভাষার ব্যবহার হুমকির মধ্যে পড়েছে।

মেনক ম্রোর মতে, “আমাদের শহর অঞ্চলে প্রায় সবাই বাংলায় কথা বলা শুরু করেছে। আগের প্রজন্মের কাছে লিখিত রূপে ভাষা না থাকায় তাদের নিজ চর্চা কমে গিয়েছে, তাই তারাও তাদের শিশুদের শেখাতে পারছে না। এইভাবে চলতে থাকলে আমাদের ভাষা বিলুপ্তির পথে চলে যাবে।”

সরকারি নীতি

বাংলাদেশের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ভাষা ও সংস্কৃতি সংরক্ষণের জন্য সরকার প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতা, আদিবাসী সাংস্কৃতিক একাডেমির কার্যক্রম ও নিজ মাতৃভাষায় পাঠ্যবই ছাপার উদ্যোগ নিয়েছে। তবে ম্রো ভাষার জন্য প্রয়োগ এখনো সীমিত। এর মূল কারণ হলো নতুন লিপির বই ও প্রশিক্ষকের অভাব।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, স্থানীয় ভাষার শিক্ষা কেন্দ্র, কমিউনিটি শিক্ষকের প্রশিক্ষণ ও ম্রো লিপিতে ডিজিটাল মাধ্যমে কনটেন্ট তৈরি করলে সংরক্ষণের চেষ্টা আরও কার্যকর হবে। ম্রো সাংস্কৃতিক একাডেমি তৈরি করে ম্রো শিশুদের নিজ সংস্কৃতির চর্চার স্থান তৈরি করে দিলে তারা নিজ সংস্কৃতির সাথে সবসময় জড়িত থাকবে। এছাড়াও বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা কেন্দ্রে আমাদের এই মৌখিক ইতিহাস, যুগের পর যুগ চলে আসা রীতি, লোকগান ও গল্পকে লিখিত রূপে ব্যবহার করে পরের প্রজন্মের কাছে সংরক্ষণ করে রাখতে হবে।

মেনক ম্রোর মতে, “আমাদের ভাষা রক্ষার জন্য সবাইকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে। যদি আমরা নিজেরাই ব্যবহার করি ও পরের প্রজন্মকে শেখাই, তাহলেই আমরা আমাদের ভাষার অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে পারব।”

সংরক্ষণের পথ

এই ভাষা যে হুমকির মধ্যে পড়েছে তা থেকে উদ্ধার করতে হলে একটি সম্মিলিত পদক্ষেপের প্রয়োজন। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো মাতৃভাষাভিত্তিক প্রাথমিক শিক্ষা। শিশুদের কাছে নিজ ভাষাকে ছোটবেলা থেকেই সঠিকভাবে পৌঁছালে তারা তাদের নিজ ভাষা নিয়ে আত্মবিশ্বাসী হবে। এছাড়াও উচ্চশ্রেণী পর্যন্ত নিজ মাতৃভাষা শেখার পাঠ্যবই তৈরি করে সম্প্রদায়ের সকল মানুষকে নিজ ভাষার চর্চা করানো হলে সর্বোচ্চ কার্যকর হতো।

এছাড়াও ম্রো ভাষাভিত্তিক কীবোর্ড তৈরি, ডিজিটাল কনটেন্ট ও অনলাইন প্রশিক্ষণের মাধ্যমে ভাষা চর্চাকে সকল কমিউনিটির কাছে উপস্থাপন করা জরুরি।

এই আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস আমাদের সকল মাতৃভাষাকে সমান মর্যাদা দিতে শেখায়। একটি ভাষা হলো একটি জনগোষ্ঠীর মনের বহিঃপ্রকাশ। তাই আমাদের সকল ভাষার সংরক্ষণের সংগ্রামে সহযোগিতা করতে হবে। এই ভাষার বিলুপ্তি হলে তাদের জীবনগল্প ও সংস্কৃতিও হারিয়ে যাবে।

এই নিয়ে মেনক ম্রো বলেন, “এই ভাষা আমাদের জনকণ্ঠ ও বাংলাদেশের একটি অনন্য সম্পদ। আমাদের এই ভাষা হারিয়ে গেলে বাংলাদেশের বৈচিত্র্য ধ্বংস হয়ে যাবে। আমি আশাবাদী যে সরকার ও কমিউনিটির সম্মিলিত প্রচেষ্টা সফল হবে এবং আমাদের ভাষার গৌরব টিকিয়ে থাকবে।”