রমজান আর পুরান ঢাকার কাসিদা: হারানো ঐতিহ্য বাঁচিয়ে রাখার লড়াই

ঘড়িতে সময় রাত চারটা বেজে দশ মিনিট।

Kashida
Photo: Collected

সুনসান নিশুতি পুরান ঢাকার লালবাগ এলাকা। মূল রাস্তায় কিছু রিকশা আর মানুষের আনাগোনা থাকলেও অলিগলিগুলো নিচ্ছিদ্র অন্ধকারে ঢাকা। হঠাৎ লালবাগের হরনাথ ঘোষ রোড থেকে ভেসে এল সুরেলা আওয়াজে হ্যান্ডমাইকের হাঁক—

‘ওঠো রোজদারো

সাহরি খা-লো

সাহরি কা ওয়াক্ত হো গেয়া

ওঠ যাও দিলওয়ালো’ 

সাথে টুংটুং করে ঘণ্টা বাজাচ্ছেন আরেকজন। এদের খোঁজেই তো ছিলাম!

শব্দের পথ ধরে এগিয়ে যেতেই দেখা মিলল মোহাম্মদ রমজান আর তার ভাগনে শিবলুর। হাতে ছোট একটা হ্যান্ড মাইক নিয়ে সুর করে কাসিদা গাচ্ছেন মোহাম্মদ রমজান। আর শিবলু একটা ছোট ঘণ্টা বাজাচ্ছেন। দু’জনের কেউই চোখে দেখতে পান না। তবে প্রতি রমজানেই তারা এভাবে কাসিদা গেয়ে এলাকাবাসীর ঘুম ভাঙান সেহরির ঠিক আগে।

প্রায় ৫০ বছরেরও বেশি সময় ধরে রমজানে এই কাজ করছেন মোহাম্মদ রমজান। ঈদের আগে এলাকাবাসী উনাকে বকশিশ দিয়ে খুশি করে দেয়। তিনি বলেন, ‘প্রতি বছর হাজার দশেক টাকার মতো উঠে। এলাকার সবাই আমাকে খুশি হয়ে বকশিশ দেয়, আমি নিজে থেকে কারো কাছে চাই না। দিনের বেলা অন্য কাজ করে খাই।’ 

(বাম থেকে) শিবলু ও মোহাম্মদ রমজান, দু’জনই অন্ধ, কিন্তু গেয়ে যান কাসিদা।

ইতিহাস আর সংস্কৃতির শহর ঢাকা। শত শত বছরের ঐতিহ্য এখানে এসে মিলেমিশে একাকার হয়েছে। ঢাকাবাসী আপন করে নিয়েছে সবকিছুই। যখন যেই সাম্রাজ্যের অধীনে শাসিত হয়েছে এই নগরী, তাদের সংস্কৃতিই লালিত হয়েছে এখানে।

একসময়ে নবাবদের শাসন ছিল ঢাকায়। তাদের আসরে নিয়মিত চর্চা হতো কাসিদা আর কাওয়ালি। সারাবছর বিভিন্ন ঘরানার গানে মশগুল থাকতো নবাবরা। তবে রমজান মাসে মজতো কাসিদার সুরে।

২১ শতকের প্রথম দশকেও সেহরির আগে ঢাকার রোজাদারদের ঘুম ভাঙানোর জন্য কাসিদার মিছিল বের হতো। পাড়ার যুবক-বৃদ্ধরা দলবল নিয়ে ঘুরে বেড়াতো আর গাইতো কাসিদা। ভোর রাতের সে কাসিদা শোনার জন্য বাড়ির জানালা আর বারান্দায় কান পেতে রইতো নারী ও শিশুরা।

সময় বদলেছে, কমেছে কাসিদার কদর। এখন সেই আগের জৌলুস আর নেই। সেহরির সময় ঘুম ভাঙানোর জন্য মোবাইল ফোনের অ্যালার্মের ওপরই নির্ভর করে সবাই।

তবে কাসিদার প্রতি খাঁটি পুরান ঢাকাইয়া মানুষের একটা টান এখনও আছে। প্রতিবছরই ২০ রমজানে পুরান ঢাকার কয়েকটি পঞ্চায়েত আয়োজন করে কাসিদা প্রতিযোগিতা। এছাড়াও পুরান ঢাকার অনেক অঞ্চল, যেমন- লালবাগ, উর্দু রোড, কসাইটুলী, বকশীবাজার, হোসেনী দালান, কলতা বাজার, বংশাল ইত্যাদি এলাকায় সেহরীর আগে কাসিদা গাওয়া হয় এলাকাবাসীর ঘুম ভাঙানোর জন্য।

কোথা থেকে এলো?

কাসিদা মূলত একটি ফারসি শব্দ। আরবি ‘ক্বাসদ’ থেকে এর উৎপত্তি, যার অর্থ কবিতার ছন্দে প্রিয়জনের প্রশংসা করা। প্রাক-ইসলামি আরবে এর প্রচলন শুরু হলেও পরবর্তীতে পারস্য হয়ে এটি দক্ষিণ এশিয়ায় বিস্তার লাভ করে।

আরবে কাসিদার গোড়াপত্তন হলেও, কখনই মাত্র ধর্মীয় বন্দনা হিসেবে এর প্রসার ঘটেনি। যে-কোনো বিশেষ উপলক্ষ্য, উৎসব বা কারো প্রশংসা করার জন্যও পাঠ করা হতো কাসিদা। কাসিদার পরিচিতি নিয়ে বিস্তারিত জানা যায় ‘কাসিদা বারদা’ থেকে। ইমাম আর বাসিরি এবং ইবনে আরাবির সংগ্রহ করা ধ্রুপদী কাসিদার সংকলন হলো কাসিদা বারদা।

কাসিদার একদম প্রাচীন রূপ  ছিল কিছুটা কবিতার মতো। কবিতার প্রতি লাইনে ছন্দ আর অন্ত্যমিল থাকতো। একেকটি কাসিদা হতো পঞ্চাশ বা একশো লাইনেরও বেশি। যদিও একশো লাইনের বেশি বড় কাসিদার চল শুরু হয় পারস্যের কবিদের হাতে।

আরবের লেখক ইবনে কুতাইবাহ আরবি কাসিদাকে তিন অংশে ভাগ করেছেন। এ নিয়ে তিনি নবম শতকে ‘কিতাব আল-শিরওয়া-আল-শুয়ারা’ নামে একটি বই লিখেছিলেন। এখানে পাওয়া যায় আরবি কাসিদার গঠন তত্ত্ব।

আরবি কাসিদার প্রথম অংশকে বলা হয় ‘নসিব’। এখানে নস্টালজিয়া বা স্মৃতিচারণ করা হয়। পরের অংশের নাম ‘তাখাল্লাস’। এখানেও স্মৃতিচারণা করা হয়। স্মৃতিচারণার রেশ ধরে যাওয়া হয় শেষ অংশে। শেষ অংশের নাম ‘রাহিল’। এখানে কাসিদা পাঠকারী গোষ্ঠীর জীবনযাত্রা আর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের বর্ণনা থাকতো। আরও থাকতো বিভিন্ন উপদেশ।

রাহিলের আবার আছে তিনটি অংশ। প্রথম অংশের নাম ‘ফাখর’। এখানে কাসিদা পাঠকারী গোষ্ঠীর গুণকীর্তন থাকে। পরের অংশের নাম ‘হিজা’। এখানে থাকে ব্যঙ্গ বা স্যাটায়ার। শেষ অংশের নাম ‘হিকাম’। এতে থাকে নৈতিক বাণী।

কাসিদার মূল উৎস আসলে পারস্য থেকেই। দশম শতাব্দীতে ইরানের কবিদের লেখা কাসিদা ছিল বৈচিত্র্যময়। পারস্যের কবি নাসির খসরু আর আভিসেন্নার কাসিদায় থাকতো দর্শনতত্ত্ব, ঈশ্বরতত্ত্ব আর নৈতিকতার বিভিন্ন রূপ। প্রকৃতির অবস্থাভেদেও লেখা হতো এটি। বসন্তে লেখা কাসিদাকে বলা হতো ‘বাহারিয়াহ’ আর শরতের কাসিদাকে বলা হতো ‘খাজানিয়াহ’।

জুম্মন মিয়ার লেখা ‘চান রাতি আমাদ’ কাসিদা, সন: ১৯৪৯ ইং

৮৫৮ খ্রিষ্টাব্দে জন্ম নিয়েছিলেন পারস্যের কবি রুদাকি। কাসিদার ধাঁচে লেখা প্রথম কবিতা তারই লেখা। ফারসি কাসিদার অন্যতম বৈশিষ্ট হলো এর অন্ত্যমিল। পুরো কাসিদায় অন্ত্যমিল একই থাকে। তবে মাত্রা ভিন্ন হতে পারে। ষাট থেকে একশো লাইন দীর্ঘ হতো একেকটি কাসিদা। আবার কিছু কাসিদা হতো দুইশো লাইনেরও বেশি।

পারস্যের কবি উনসুরি, আসজাদি, ফাররোখির আর আনভারির নাম না বললেই নয়। গজনীর সুলতান মাহমুদের দরবারের যে ৪০০ জন কবি ছিলেন, তাদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ ছিলেন ফাররোখি। ফারসি ভাষার শ্রেষ্ঠ কবিরাই কাসিদা রচনা করেছেন একটা সময়ে।

১৪ শতকে এসে কাসিদার চেয়ে গজল বেশি জনপ্রিয়তা পাওয়া শুরু হয়। কারণ গজল এত বেশি বড় ছিল না। কাসিদার প্রথম অংশকে সম্পাদনা করেই তৈরি করা হতো গজল। গজল রচনা করা ছিল তুলনামূলক সহজ।

পারস্যে কাসিদার জনপ্রিয়তা যখন কমতে শুরু করে, তখনই উর্দুতে কাসিদা চর্চা শুরু হয়। উর্দু কাসিদা ছিল স্তুতিমূলক আর ব্যঙ্গাত্মক। বিভিন্ন উপলক্ষকে ঘিরেও রচিত হতো উর্দু কাসিদা।

বাংলায় কাসিদার আগমন

আমাদের অঞ্চলে কাসিদার প্রবেশ হয় মোগলদের হাত ধরে। সে সময়ে ফারসি ছিল দরবারি ও প্রশাসনিক ভাষা। যার ফলে এ অঞ্চলে ফারসি কাসিদার প্রচলন হতে খুব বেশি একটা কাঠখড় পোড়াতে হয়নি। বাংলায় কাসিদার সবচেয়ে পুরোনো হদিশ পাওয়া যায় এক মোগল সেনাপতি মির্জা নাথানের ‘বাহারিস্তান-ই-গায়বি’ গ্রন্থে। 

১৬০৮ সালে ইসলাম খান চিশতির সাথে এ মোগল সেনাপতি যান যশোর অঞ্চলে। সেখানে বড় আনন্দ উৎসবের আয়োজন করা হয়েছিল। সেখানের কবিরা নিজেদের লেখা কাসিদা পেশ করেছিলেন মোগলদের জন্য। যশোরের আবহাওয়া নিয়ে স্বরচিত কাসিদা আবৃত্তি করেছিলেন কবি আগাহি, এমন তথ্য পাওয়া যায় মির্জা নাথানের লেখনিতে।

মোগল আমলে এবং এরপরেও ঢাকার বিভিন্ন নবাবরা কাসিদার পৃষ্ঠপোষকতা করেছেন। নবাবজাদা আব্দুল গণির সময়ে পুরান ঢাকায় মহল্লাভিত্তিক পঞ্চায়েতের চল শুরু হয়। পঞ্চায়েত সর্দাররা কাসিদা শিল্পীদের বিশেষ সুযোগ-সুবিধা ও সম্মান দিতেন। নবাব আহসান উল্লাহর সময়েও কাসিদা চর্চা হয়েছে।

জুম্মন মিয়ার কাসিদার খাতা হাতে তার ভাতিজা মানিক চান।

বাংলায় কাসিদার ধারক ও বাহক হলো খাঁটি পুরান ঢাকাইয়ারা। প্রতি বছর রমজানে মহানবি (সা.) এর শান-শওকত নিয়ে কাসিদা রচনা করা হতো এ অঞ্চলে। শুধু রমজানই নয়, ঈদ-উল-ফিতর ও মহরম উপলক্ষেও কাসিদা লেখা হতো।

কাসিদা রচনার দিক দিয়ে আবার ঢাকাইয়ারা ছিল দুই ভাগে বিভক্ত। এক অংশ ঢাকাইয়া ‘সোব্বাসী’, আরেক অংশ ছিল ‘কুট্টি’। 

সোব্বাসীরা মোগল ঐতিহ্যের শেষ ধারক ছিলেন। তারা ফারসি আর উর্দুতে কাসিদা লিখতেন ও গাইতেন। আর কুট্টিরা বাংলার সাথে উর্দু ও হিন্দি মিলিয়ে কাসিদা লিখতেন।

ঠিক কবে থেকে ঢাকাবাসীদের কাছে রমজান আর কাসিদা মিলেমিশে একাকার হয়েছে তা সঠিক করে কেউ বলতে পারে না। অনেকে বলেন মোগল আমলের পর থেকেই, আবার কেউ বলেন ঊনবিংশ শতকের শুরু থেকে।

রমজান মাসে পুরান ঢাকার বিভিন্ন মহল্লায় তরুণরা দলবেঁধে ঘুরে বেড়াতো। বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহার খুব একটা ছিল না। হারমোনিয়াম, ঢোল, করতাল, ঘণ্টা-এসবের ব্যবহার ছিল কয়েকটি জায়গায়। বেশিরভাগ জায়গায় খালি গলায়ই গাওয়া হতো কাসিদা। হাতে হ্যাজাক বাতি আর লাঠি নিয়ে অলি-গলি ঘুরে বেড়াতো সবাই। লাঠি থাকতো কুকুর তাড়ানোর জন্য।

পুরান ঢাকায় কাসিদা গাওয়া হতো বিভিন্নভাবে। রমজানের চাঁদ ওঠার আনন্দে গাওয়া হয় ‘চানরাতি আমাদ’। রমজানের প্রথম দশ দিন গাওয়া হয় ‘আমাদি’। রমজানকে স্বাগত জানিয়ে ও নানাভাবে মহিমান্বিত করে লেখা হয় আমাদির গান। 

মাঝের দশ দিন গাওয়া হয় ‘ফাজায়েলি’। রমজানের ফজিলত বর্ণনা করা থাকে ফাজায়েলিতে। শেষ দশ দিনের কাসিদাকে বলা হয় ‘রুখসাতি’ বা ‘আল-বিদা’। রমজান শেষ হওয়ার বিরহে গাওয়া হয় রুখসাতির কাসিদা।

বাংলার কাসিদার জন্য বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন সুর ও তাল ব্যবহার করা হয়েছে। শাহেদী, মার্সিয়া, নাত-এ-রাসূল, ভৈরবী, মালকোষ এসব সুরের কথা জানা যায়।

পুরান ঢাকার বিখ্যাত কাসিদা গায়কদের মধ্যে কয়েকজন হচ্ছেন জুম্মন মিয়া, মনজুর আলম, আবদুস সামাদ, মানিক চান, সৈয়দ ফাসীহ হোসেন, জজ মিয়া, চান মিয়া, ইয়াসিন প্রমুখ।

ঢাকায় কাসিদার বর্তমান অবস্থা

কাসিদা পাঠকারীর সংখ্যা দিন দিন কমছে। তবে এখনও সেহরির আগে পুরান ঢাকার বিভিন্ন মহল্লাসহ ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় কাসিদা গায়করা হাঁকডাক দিয়ে ঘুম ভাঙান এলাকার মানুষদের। তবে এর মধ্যে অনেকেই আছেন যারা সঠিকরূপে কাসিদা গাইতে জানেন না। 

কাসিদা যারা গায়, তারা কখনোই জোর করে বকশিশ আদায় করে না ঈদের আগে। তাদেরকে ঈদের আগে এলাকাবাসী নিজে থেকে যে বকশিস দেয়, তাতেই তারা খুশি থাকে। কিন্তু বর্তমানে অনেক এলাকায় জোর করে চাঁদা আদায় করা হয়। তারা কাসিদা গাইতে পারেন না। কিন্তু সেহরীর আগে ঠিকই বেসুরা গলায় মাইক দিয়ে চিৎকার-চেঁচামেচি করেন। এতে করে অনেকেই বিরক্ত হন।

মোহাম্মদপুরে সেহরির আগে ঘুম ভাঙানোর নামে চাঁদা তোলার রশিদ।

লালবাগের কাসিদা গায়ক মোহাম্মদ রমজান বলেন, ‘এখন তো সবাই আসলে মোবাইলের শব্দ (অ্যালার্ম) দিয়ে জেগে যায়। আমাদেরকে আর প্রয়োজন নাই কারো। তাও আমরা বাপ-দাদার শিখায়ে দেয়া কাসিদা গেয়ে যাই। মানুষ খুশি হয়ে হাদিয়া (বকশিশ) দেয়। অনেক দল আবার ঢাক-ঢোল পিটায়ে ঝামেলা করে ভোর রাতে। ওদের সাথে অনেকে আমাদেরকে মিলায়ে ফেলে।’ 

ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখতে প্রতিযোগিতা

২০ শতকের শুরু থেকে পুরান ঢাকার বিভিন্ন অঞ্চলে কাসিদার প্রতিযোগিতা শুরু হয়। এসব অঞ্চলে ছিল মহল্লাভিত্তিক পঞ্চায়েত। পঞ্চায়েতগুলোই মূলত কাসিদা প্রতিযোগিতার মূল পৃষ্ঠপোষক হিসেবে কাজ করতো। পঞ্চায়েত সর্দারের নির্দেশনা থাকতো কাসিদার বিভিন্ন দল গড়ে তোলার পেছনে।

কার কাসিদা দল কত ভালো করতো, এর ওপর নির্ভর করতো মহল্লা আর পঞ্চায়েতের সম্মান। পুরান ঢাকার ঘনবসতির কারণে খেলাধুলা বা আলাদা সাংস্কৃতিক আয়োজনের খুব একটা সুযোগ থাকতো না। যার ফলে কাসিদা প্রতিযোগিতা ছিল পুরান ঢাকাবাসীর বিনোদনের অন্যতম মাধ্যম।

দ্বিগুবাবু লেনের মানিক চান ও তার দল।

কাসিদা যেন চিরতরে হারিয়ে না যায়, সেজন্য পুরান ঢাকাবাসী এখনো আয়োজন করেন কাসিদা প্রতিযোগিতা। প্রতিবছর বিশ রমজানে আয়োজন করা হয় এই উৎসবের। বিভিন্ন মহল্লায় প্রতিযোগিতা চলে শেষ রোজা পর্যন্ত। বিভিন্ন মহল্লার পঞ্চায়েত হয় এসব কাসিদা প্রতিযোগিতার প্রধান পৃষ্ঠপোষক।

দেশ স্বাধীন হওয়ার আগে কাসিদা প্রতিযোগিতা হতো পুরান ঢাকার ৩০টির বেশি মহল্লায়। এখন তা কমতে কমতে নেমে এসেছে দুই-তিনটিতে।

এ বছর কাসিদা প্রতিযোগিতা হয়েছে পুরান ঢাকার কাজিমুদ্দিন সিদ্দিকী লেনে। এলাকাবাসীর এ আয়োজনের প্রধান পৃষ্ঠপোষক ছিলেন ঢাকা-৭ আসনের এমপি হামিদুর রহমান। রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা থাকার কারণে বেশ বড় করেই আয়োজন হয়েছে এবারের কাসিদা প্রতিযোগিতা। 

এ প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠানের অন্যতম আয়োজক কুশল ইয়াসির। তার সাথে আলাপে জানা গেল, কাসিদা প্রতিযোগিতা একটা সময় নিয়মিতই হতো পুরান ঢাকায়। খাঁটি পুরান ঢাকাইয়ারা ছোট বেলা থেকেই এটি দেখে বড় হয়েছেন। কিন্তু বর্তমানে আর সাড়ম্বরে তেমন আয়োজন করা হয় না। তবে এ বছর এলাকার এমপির নির্দেশনায় বড় করে প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়েছে। এমপি হামিদুর রহমান নিজেও এই এলাকারই সন্তান। পুরান ঢাকাইয়ার নতুন প্রজন্মের মন থেকে কাসিদার চর্চা যেন হারিয়ে না যায়, সেজন্য তিনি এবার বড় করে কাসিদা প্রতিযোগিতা করার আয়োজন করতে চেয়েছেন।

প্রতি বছরই এমন আয়োজন চালিয়ে যাওয়ার ইচ্ছা পোষণ করেন আয়োজনকারীরা।

রাত দুইটার সময়ও প্রতিযোগিতার আসর পরিপূর্ণ।

কাসিদা প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছিলেন পুরান ঢাকার মানুষরাই। তারা দল গঠন করে অংশ নেন এ প্রতিযোগিতায়। কসাইটুলীর তাজউদ্দিন পাপ্পু, উর্দু রোডের হাজী মো. চান মিয়া, বকশিবাজার রোডের পারভেজ রেজা, দ্বিগুবাবু লেনের মানিক চান, হোসেনী দালান রোডের সাজ্জাদ হোসেনসহ আরও কয়েকজন বিখ্যাত কাসিদা গায়ক অংশ নেন দল নিয়ে।

এর মাঝে কথা হয় তাজউদ্দিন পাপ্পুর সাথে। তিনি বলেন, ‘এ বছর বড় করে আয়োজন হচ্ছে। এতে আমরা সবাই আনন্দিত। এর আগে আমি নিজেই আয়োজন করতাম। আমার ভাইয়ের নামের ব্যানার—’সোহেল স্মৃতি সংসদের’ নামে আয়োজনে হতো কাসিদা প্রতিযোগিতা। এ বছর বড় আয়োজন দেখে আমি নিজেই কাসিদা গাওয়ার জন্য আমার দল নিয়ে চলে এসেছি এখানে।’ 

আরেকজন বিখ্যাত কাসিদা গায়ক দ্বিগুবাবু লেনের মোহাম্মদ মানিক চান। তার আরেকটি পরিচয়ও আছে, যে পরিচয়ের দেশের অনেক মানুষই তাকে চেনে। দ্বিগুবাবু লেনের বিখ্যাত মানিক চানের পোলাও বিক্রি হয়, উনিই সেই মানিক চান।

মানিক চান আরেক বিখ্যাত কাসিদা লেখক ও গায়ক জুম্মন মিয়ার ভাতিজা। জুম্মন মিয়া পঞ্চাশের দশক থেকে কাসিদা লিখেছেন উর্দু আর বাংলায়। জুম্মন মিয়ার লেখা কাসিদা এখনও বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় দল নিয়ে গেয়ে বেড়ান তার ভাতিজা মানিক চান। মানিক চান নিজেও লিখেছেন অনেক কাসিদা।

কাসিদা প্রতিযোগিতায় আরও অংশ নিয়েছেন মোহাম্মদ চান মিয়া। দীর্ঘ ৫৫ বছর পর এবার তিনি আবার কাসিদা প্রতিযোগিতার জন্য মঞ্চে উঠেছিলেন। এ অনুষ্ঠানে তাকে দেয়া হয় আজীবন সম্মাননা।

কাসিদা প্রতিযোগিতায় বিচার করা হয় অনন্য প্রক্রিয়ায়। বিচারের মানদণ্ড চারটি। প্রথমটি হলো ‘কালাম’। কাসিদার লেখনীর সৌন্দর্য বিচার করা হয় কালাম দিয়ে। এরপরে আসে ‘তালফজ’। কাসিদা পাঠের সময় উচ্চারণ ঠিক আছে কী না তার বিচার করা হয় তালফজ দিয়ে। এরপরের ধাপ হলো ‘তারান্নুম’, অর্থাৎ সুর। কাসিদার সুরের সৌন্দর্য বিচার করা হয়। শেষ ধাপ হলো ‘আদাবে মাহফিল’। কাসিদা পরিবেশনার আদব ঠিক আছে কিনা, অনুষ্ঠানের সকল নিয়ম-কানুন মানা হচ্ছে কিনা, এগুলোও খেয়াল করা হয়।

পুরষ্কার হিসেবে ট্রফি গ্রহণ।

কাসিদা প্রতিযোগিতা হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের কোনো প্রতিযোগিতা না। এ প্রতিযোগিতার মূল উদ্দেশ্য হলো কাসিদা শিল্পীদের পুনর্মিলনী আর পুরান ঢাকাবাসীর কাছে কাসিদাকে এখনো বাঁচিয়ে রাখা।

কোনো অর্থ পুরষ্কারও নেই এই প্রতিযোগিতায়। অংশগ্রহণকারী সকল দলের জন্য আছে ট্রফি। প্রথম তিন বিজয়ীর জন্য রাখা হয়েছে একটু বড় আকারের ট্রফি। প্রতিযোগিতায় বিজয়ী হয়েছেন, প্রথম থেকে- বকশীবাজারের পারভেজ রেজা, কিশলয় যুব সংঘের ফারহান হোসেন ও হোসেনি দালান পঞ্চায়েতের সাজ্জাদ হোসেন।

দুই সন্তান নিয়ে কাসিদা প্রতিযোগিতা দেখতে এসেছিলেন আরমানিটোলার বাসিন্দা ফিরোজ আহমেদ। তিনি বলেন, ‘সেই ছোটবেলার আনন্দ আর পাই না। কেমন জানি সব ফিকে হয়ে গেল! করোনার সময়েই আসলে কমে গেছে প্রতিযোগিতার আসর। আমরা মহল্লার পোলাপান সবাই মিলে রমজানে ঘুরে ঘুরে কাসিদা গাইতাম। বকশিশ পেতাম ভালো। সে টাকা দিয়ে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করে নিতাম পরিবারের সাথে। এখন আমার ছেলেরা জানেও না কাসিদা কী জিনিস! তাই ওদেরকে দেখাতে নিয়ে আসলাম আজকে। সামনে এমন আয়োজন আরও হোক এটাই আমরা সব পুরান ঢাকাবাসীর চাওয়া।’