ককবরক ভাষা: বর্তমান ও ভবিষ্যত

ফেব্রুয়ারি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় গৌরবময় ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনকে। এই আন্দোলনের প্রেক্ষাপটেই আমরা আমাদের মাতৃভাষার মর্যাদা সংরক্ষণ করতে পেরেছিলাম। এই দিন আমাদের সেই সকল ভাষার সংগ্রামের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়, যারা আজও অস্তিত্বের জন্য লড়াই করছে।

Language Cover S3 kokborok.jpg

যে রাষ্ট্র ভাষা সংগ্রামের প্রেক্ষাপটের উপর ভিত্তি করে নিজের ভাষার মর্যাদা ধরে রেখেছে, তার গুরু দায়িত্ব রয়েছে সেই সকল ভাষার প্রতি, যাদের অস্তিত্ব এখন সঙ্কটাপন্ন।

তেমনি একটি অমূল্য সম্পদ হলো ককবরক ভাষা। এই ভাষা মূলত ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর মাতৃভাষা। আধুনিক যুগের শিক্ষা ব্যবস্থা, ডিজিটাল মাধ্যম ও ভাষাগত মিশ্রণের প্রেক্ষাপটে এই ভাষাগুলো নতুন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে। তবে এই সব সমস্যাকে উপেক্ষা করে ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর আত্মা টিকিয়ে আছে ককবরক ভাষা।

ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের সদস্য লাইরাং ত্রিপুরা, যিনি বর্তমানে রুয়েটের একজন শিক্ষার্থী, বলেন:
“ককবরক আমাদের জন্য শুধু একটি ভাষা নয়, এটি আমাদের পরিচয়। আমি যখন বাড়িতে থাকি, পরিবারের সঙ্গে কথা বলি বা নিজের কমিউনিটির মানুষদের সঙ্গে চলাফেরা করি, তখন বুঝতে পারি যে এই ভাষা কতটা আমাদের নিজ শিকড়ের সঙ্গে যুক্ত করেছে।”

ভাষার উৎস ও ঐতিহ্যের প্রেক্ষাপট

ককবরক মূলত চীন-তিব্বতীয় ভাষা, যার শিকড় তিব্বত-বর্মন এবং পরে বোরো-গারো ভাষাগোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পর্কিত। “কক” অর্থ ভাষা এবং “বরক” অর্থ মানুষ।

অতএব, ককবরক মানে হলো “মানুষের ভাষা”। এই ভাষা উপুড় পূর্ব অঞ্চলের অন্যতম প্রাচীন ভাষা এবং এতে একটি বড় সময়ের মৌখিক ইতিহাস বিদ্যমান। তাই এটি ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর গর্ব এবং বাংলাদেশের ভাষাগত সমৃদ্ধির বহিঃপ্রকাশ।

এই ভাষার নিজস্ব কোনো লিপি নেই। সাধারণত বাংলা-আসামি লিপি বা রোমান লিপি ব্যবহার হয়। এই বিষয়ে লাইরাং বলেন,
“লিপি না থাকা আমাদের সবচেয়ে বড় সমস্যা। গ্রামের মানুষ ছাড়া আরও অনেকেই রোমান লিপি পড়তে পারে না। এই কারণে ভাষাকে লিখিত রূপে রাখা কঠিন হয়ে যায়।”

ধ্বনি, শব্দ ও সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য

ককবরক ভাষার কিছু ধ্বনিগত বৈশিষ্ট্য অন্য ভাষা থেকে আলাদা করে তোলে। বিশেষ করে “W” এবং স্বরধ্বনির সূক্ষ্ম পরিবর্তন এমন এক উচ্চারণ তৈরি করে, যা বাংলা ও ইংরেজিতে পাওয়া যায় না। এই ধ্বনিগত বৈচিত্র শুধু ভাষাগত নয়, সংস্কৃতির দিকেও আলাদা ভূমিকা পালন করে। এই বৈচিত্র্যের কারণে ত্রিপুরা মানুষের ভাবপ্রকাশ, জীবনযাপন ও সংস্কৃতি আলাদা রূপে ফুটে উঠে।

ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের ভাষা টিকিয়ে আছে তাদের ঐতিহ্যবাহী গল্প “ককডুমা”, লোককথা, প্রবাদ ও লোকসঙ্গীতের মাধ্যমে। বিয়ের অনুষ্ঠানে “E hu hu hu!!” ধ্বনি দিয়ে আনন্দ প্রকাশ করা হয় এবং অনুষ্ঠানের মধ্যে বিভিন্ন শব্দ ব্যবহার হয়। এই অনুষ্ঠান ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে ভাষার ব্যবহার মানুষের সুখ ও প্রার্থনার আবেগ ফুটিয়ে তোলে।

লাইরাং বলেন,  “আমাদের ভাষার অনেক শব্দ আছে, যার অর্থ অন্য ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। এগুলো শুধু শব্দ নয়, মানুষের অনুভূতি। আমাদের যেকোনো উৎসবে যখন গান গাই, তখনই বোঝা যায় আমাদের সংস্কৃতি ভাষা ছাড়া অসম্পূর্ণ।”

ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর সবচেয়ে বড় উৎসব হলো বুইগু। এই উৎসব ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর প্রাণকেন্দ্র এবং আনন্দের বহিঃপ্রকাশ। এই উৎসবে “বিউইশুরওয়াচমওং” বা ঐতিহ্যবাহী নাচ দিয়ে উদযাপন করা হয়।

লাইরাং বলেন,  “যতদিন আমরা নিজেদের ভাষা ব্যবহার করে অনুষ্ঠান উদযাপন করব, ততদিন এই ভাষা বেঁচে থাকবে। সমস্যা শুরু হয় যখন আমরা নিজেরাই অন্য ভাষা ব্যবহার করি।”

ভাষার অস্তিত্বের চ্যালেঞ্জ

ককবরক ভাষার সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো তার নিজস্ব লিপির অভাব। এই ভাষায় অনেকেই কথা বলতে পারলেও খুবই কম সংখ্যক মানুষ রোমান লিপি দিয়ে লিখতে পারে। এর কারণে সাহিত্য সৃষ্টি ও জ্ঞান সংরক্ষণের সীমাবদ্ধতা রয়ে গেছে। গ্রামীণ অঞ্চলে শিক্ষার হার কম হওয়ায় লিখিত রূপে চর্চা করা সকলের জন্য কঠিন হয়ে যাচ্ছে।

বর্তমানে তরুণদের উচ্চশিক্ষার জন্য বাংলা ও ইংরেজি শিখতে হচ্ছে। লিপি না থাকায় পড়ালেখার একমাত্র মাধ্যম হলো এই দুই ভাষা। ফলে নতুন প্রজন্ম ক্রমাগত নিজ ভাষা থেকে দূরে চলে যাচ্ছে। অনেক তরুণ ককবরক ভাষা বলার সময় বাংলা ও ইংরেজি শব্দ মিশিয়ে ব্যবহার করছে। লাইরাং বলেন,
“আমরা আমাদের ভাষা বলতে গিয়ে প্রতিদিনই বাংলা ও ইংরেজি শব্দ মিশিয়ে ফেলি। এটি হয়তো সুবিধার জন্য করি, তবে এতে আমাদের ভাষার শব্দ কমে যাচ্ছে।”

প্রযুক্তিগত দিক থেকেও ভাষার উপস্থিতি সীমিত। নিজ ভাষার কনটেন্টের অভাব, নিজ ভাষার কীবোর্ড ও অনলাইনে তথ্যগত ত্রুটির কারণে তরুণ প্রজন্মের কাছে আকর্ষণ সৃষ্টি হচ্ছে না।

আরেকটি বড় সমস্যা হলো সামাজিক মানসিকতা। অনেক পরিবার মনে করে শুধু বাংলা ও ইংরেজি ব্যবহার করাই ভবিষ্যতের জন্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তবে এতে মানুষ ভুলে যায় যে, নিজ ভাষা ত্যাগ করে অন্য ভাষায় কেউ কখনও নিজের মনের ভাব ও বিকাশের সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছাতে পারবে না। সমন্বিতভাবে এই সমস্যা সমাধান না করলে আমাদের ভাষা বিলুপ্তির পথে চলে যাবে।

সরকারী উদ্যোগ ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ

বাংলাদেশ সরকার সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ভাষা ও সংস্কৃতি রক্ষার জন্য কিছু মূল্যবান উদ্যোগ নিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে মাতৃভাষায় শেখার পরীক্ষামূলক কার্যক্রম এবং বিভিন্ন একাডেমী তৈরি করে আদিবাসী সংস্কৃতি চর্চার স্থান তৈরি করা।

তবে ককবরক ভাষার ক্ষেত্রে পাঠ্যবই, প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ও ভাষা শিক্ষার কাঠামো পর্যাপ্ত নয়। বিশেষ করে রোমান লিপিতে ভাষা সংরক্ষণের জন্য আরও ভালো উদ্যোগ প্রয়োজন।

সমাধান শুরু হতে পারে প্রাথমিক পর্যায় থেকে। মাতৃভাষা ভিত্তিক শিশুতোষ বই তৈরি ও উপযুক্ত শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দিয়ে একটি কার্যকর শিক্ষাব্যবস্থা তৈরি করা। 

ডিজিটাল মাধ্যমে অনলাইন কনটেন্ট তৈরি এবং রোমান লিপিতে ককবরক কীবোর্ড তৈরি করে নতুন প্রজন্মকে সংযুক্ত রাখা যাবে। এছাড়াও বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কমিউনিটি সেন্টার তৈরি করে সাংস্কৃতিক চর্চায় উৎসাহিত করা হবে। ভাষা-ভিত্তিক গবেষণা করে উপযুক্ত ইতিহাস ও সংস্কৃতিকে সংরক্ষণ করা জরুরি।

লাইরাং বলেন, “যদি আমরা সবাই পড়তে-লিখতে শিখি, তাহলে ভাষা নিজে থেকেই এগিয়ে যাবে। কর্মশালা, ভাষা শিক্ষা প্রোগ্রাম ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম খুব গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের নিজেদেরই এগিয়ে আসতে হবে।”

এই আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে আমাদের সকল ভাষাকে টিকিয়ে রাখার সংগ্রাম চালিয়ে যেতে হবে। এই সকল ভাষা শুধু মানসিক চিন্তার বহিঃপ্রকাশ নয়, বরং একটি সম্প্রদায়ের মানুষের গল্প। ককবরক ভাষা ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের গৌরব এবং বাংলাদেশের অমূল্য সম্পদ। লাইরাং শেষ কথায় বলেন,

“আমরা যদি নিজের ভাষাকে ভালোবাসি এবং ব্যবহার করি, তাহলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম অবশ্যই এটি ধরে রাখবে।”