বাংলা ভাষার জন্ম ও গর্বের ইতিহাস
বাংলা ভাষা শুধু কথা বলার জন্য নয়, এটি আমাদের পরিচয়, অনুভূতি আর ইতিহাসের অংশ। আমরা যখন প্রথম কথা বলতে শিখি, মায়ের মুখে প্রথমে যে ভাষা শুনি, সেটিই বাংলা।
বাংলা ভাষার জন্ম ও গর্বের ইতিহাস
বাংলা ভাষা শুধু কথা বলার জন্য নয়, এটি আমাদের পরিচয়, অনুভূতি আর ইতিহাসের অংশ। আমরা যখন প্রথম কথা বলতে শিখি, মায়ের মুখে প্রথমে যে ভাষা শুনি, সেটিই বাংলা।
আমাদের হাসি, রাগ, অভিমান, স্বপ্ন সবকিছুই এই ভাষায় প্রকাশ পায়। পৃথিবীর বহু ভাষা আছে, কিন্তু খুব কম ভাষার পেছনে আছে এমন আবেগ, ত্যাগ আর গৌরবের গল্প। বাংলা সেই বিরল ভাষাগুলোর একটি যার ইতিহাসে আছে সাধনার আলো, নবজাগরণের দীপ্তি, আর রক্তঝরা সংগ্রামের স্মৃতি।
বাংলা ভাষা প্রাচীন ভারতীয় আর্য ভাষা থেকে ধীরে ধীরে জন্ম নিয়েছে। ভাষাবিদদের মতে, বাংলা মূলত মাগধী প্রাকৃত নামের এক কথ্য ভাষা থেকে এসেছে, যা তখন সাধারণ মানুষ ব্যবহার করত। পরে এই ভাষা ধীরে ধীরে বদলাতে থাকে। অপভ্রংশ নামে একটি মধ্যবর্তী ভাষার ধাপ পেরিয়ে বাংলা নিজের আলাদা রূপ পায়।
প্রায় এক হাজার বছর আগে আমরা বাংলার প্রথম চিহ্ন দেখতে পাই। বাংলা ভাষার সবচেয়ে পুরোনো সাহিত্য হিসেবে ধরা হয় চর্যাপদ-কে। এটি ছিল বৌদ্ধ সাধকদের লেখা কিছু গানের মতো কবিতা, যা ৮ম থেকে ১২শ শতকের মধ্যে রচিত।
এসব রচনায় ধর্মীয় ভাবনার পাশাপাশি সেই সময়ের সমাজজীবনেরও কিছু ছবি পাওয়া যায়। ভাষাটি তখন পুরোপুরি আজকের মতো বাংলা ছিল না, তবে তার ভেতরে আধুনিক বাংলার স্পষ্ট আভাস দেখা যায়। এখান থেকেই বাংলা ভাষার দীর্ঘ যাত্রার শুরু।
মধ্যযুগে বাংলা ভাষা আরও শক্তভাবে গড়ে ওঠে। তখন অনেক কবি সহজ বাংলায় ধর্মীয় ও লোককাহিনি লিখতে শুরু করেন। কৃত্তিবাস ওঝা এই সময়ের একজন পরিচিত কবি। তিনি সংস্কৃত ভাষার রামায়ণকে সহজ বাংলায় অনুবাদ করেন।
তাঁর এই অনুবাদ ‘কৃত্তিবাসী রামায়ণ’ নামে পরিচিত। এর ফলে সাধারণ মানুষ নিজের ভাষায় রামায়ণের গল্প পড়তে পারে। একই সময়ে মঙ্গলকাব্য নামে কিছু কাব্য রচিত হয়, যেখানে বিভিন্ন দেবদেবীর গল্প ছিল। মুসলিম কবিরাও বাংলা ভাষায় অনেক সুন্দর কাব্য রচনা করেন। ফলে বাংলা ভাষা হিন্দু ও মুসলিম দুই সংস্কৃতির মিলনে আরও সমৃদ্ধ হয়।
এরপর উনবিংশ শতকে আসে বড় পরিবর্তন। ব্রিটিশ শাসনের সময় শিক্ষা ও ছাপাখানার প্রচলন বাড়ে। তখন বাংলা ভাষায় সংবাদপত্র, প্রবন্ধ ও নতুন ধরনের সাহিত্য লেখা শুরু হয়। এই সময়কে বলা হয় বঙ্গীয় নবজাগরণ।
এই সময়ে বাংলা সাহিত্য নতুন রূপ পায়। এই যুগের সবচেয়ে বড় নাম রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তিনি কবিতা, গান, গল্প ও উপন্যাস লিখে বাংলা ভাষাকে সারা পৃথিবীতে পরিচিত করে তোলেন। ১৯১৩ সালে তিনি নোবেল পুরস্কার পান। তাঁর লেখায় বাংলা ভাষা আরও সহজ, সুন্দর ও গভীর হয়ে ওঠে।
বাংলা ভাষার ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হলো ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন। তখন পূর্ববাংলা পাকিস্তানের অংশ ছিল। পাকিস্তান সরকার উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করতে চেয়েছিল।
কিন্তু পূর্ববাংলার মানুষ বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি তোলে। ২১ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়-এর ছাত্ররা আন্দোলনে অংশ নেন। পুলিশের গুলিতে কয়েকজন ছাত্র শহীদ হন। এই ঘটনা ইতিহাসে ভাষা আন্দোলন নামে পরিচিত। তাঁদের আত্মত্যাগের ফলে বাংলা রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি পায়। পরে ২১ ফেব্রুয়ারি দিনটিকে ইউনেস্কো ঘোষণা করে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে। এখন এই দিনটি সারা বিশ্বে পালিত হয়।
বাংলা বিশ্বের অন্যতম বেশি ব্যবহৃত ভাষা। এটি বাংলাদেশ-এর রাষ্ট্রভাষা। পাশাপাশি ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ও ত্রিপুরা-তেও বাংলা বহুল প্রচলিত। বইমেলা থেকে শুরু করে গান, নাটক, সিনেমা, টেলিভিশন, সংবাদমাধ্যম, সব জায়গায় বাংলা আপন শক্তিতে দাঁড়িয়ে আছে।
এখন প্রযুক্তির যুগ, মানুষ মোবাইলে লেখে, সামাজিক মাধ্যমে কথা বলে, অনলাইনে পড়াশোনা করে, সেখানেও বাংলা ধীরে ধীরে নিজের জায়গা করে নিচ্ছে। নতুন প্রজন্ম হয়তো একটু ভিন্ন ভঙ্গিতে বাংলা ব্যবহার করছে, কিন্তু ভাষার ভেতরের টান আর আবেগ এখনো একই রকম।
বাংলা ভাষার ইতিহাস আমাদের একটি বড় শিক্ষা দেয়। ভাষা শুধু শব্দ নয়, এটি মানুষের অধিকার, আত্মসম্মান আর অস্তিত্বের প্রশ্ন। বহু বছরের পথচলায় বাংলা অনেক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে গেছে। কবিদের কলমে এটি সুন্দর হয়েছে, চিন্তাবিদদের ভাবনায় গভীর হয়েছে, আর শহীদদের রক্তে এটি মর্যাদা পেয়েছে।
তাই বাংলা শুধু একটি ভাষা নয়। এটি আমাদের গর্ব, আমাদের শিকড়, আমাদের নিজের পরিচয়। যখন আমরা বাংলা বলি, তখন অজান্তেই সেই দীর্ঘ ইতিহাসকে সঙ্গে নিয়ে চলি। এই ভাষা বেঁচে থাকবে, যতদিন আমরা ভালোবেসে, যত্ন করে, নিজের বলে ব্যবহার করব।