রাখাইন ভাষা: সৃষ্টি, সংগ্রাম ও ভবিষ্যতের প্রশ্ন
এই ভাষার গুরুত্ব বিরাজ করে একটি জাতির ইতিহাস, সংস্কৃতি ও আত্মপরিচয়ের সাথে। পৃথিবীর সকল জাতির নিজস্ব বৈচিত্র্যময় ভাষা আছে।
রাখাইন ভাষা: সৃষ্টি, সংগ্রাম ও ভবিষ্যতের প্রশ্ন
এই ভাষার গুরুত্ব বিরাজ করে একটি জাতির ইতিহাস, সংস্কৃতি ও আত্মপরিচয়ের সাথে। পৃথিবীর সকল জাতির নিজস্ব বৈচিত্র্যময় ভাষা আছে।
যদিও মহান ভাষা আন্দোলনের ত্যাগের মাধ্যমে আমরা আমাদের ভাষাকে অক্ষুণ্ণ রাখতে পেরেছি, আজ বাংলাদেশের এমন অনেক ভাষা আছে, যারা তাদের নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার সংগ্রাম করছে।
যদি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস আমাদের এই ভাষাকে টিকিয়ে রাখার সংগ্রামের সঙ্গে এগিয়ে এসে সকল ভাষাকে সমান মর্যাদা দিয়ে বাঁচিয়ে রাখার সুযোগ তৈরি করে দেয়, তাহলেই আমরা এমন একটি বাংলাদেশ বিনির্মাণ করতে পারব, যেখানে সকল মানুষের নিজের ভাষার কথা বলার অধিকার থাকবে।
বাংলাদেশের ভাষাগত বৈচিত্র্যের কথা বলতে গেলে আমরা সবসময় বড় সংখ্যক জনগোষ্ঠীর ভাষার কথা স্মরণ করি। অথচ এই মাটির সঙ্গে জড়িয়ে আছে অনেক ভাষা, যার সমৃদ্ধি কোনো ক্ষেত্রেই বাংলার থেকে কম নয়।
রাখাইন ভাষা শুধু এই বৈচিত্র্যময় জাতিগোষ্ঠীর কথা বলার মাধ্যম নয়, বরং তাদের চিন্তাচেতনা, ইতিহাস ও সমৃদ্ধির পরিচয় হয়ে এখনও বেঁচে আছে। এর মাধ্যমে যুগে যুগে জড়িয়ে আছে একটি গোষ্ঠীর আত্মপরিচয়।
নামের ভিতরেই ইতিহাস
“রাখাইন” শব্দটির উৎপত্তি পালি ভাষার আরক্কা বা রকখপুরা থেকে, যার অর্থ “রক্ষক”। শব্দটি ধীরে ধীরে রকখিতা থেকে রাখাইন হয়ে বর্তমান রূপ পেয়েছে। এই রাখাইন শব্দটির বিবর্তনের মাধ্যমে বোঝা যায় যে, ভাষা শুধু শব্দের সমষ্টি নয়, বরং এটি ইতিহাসের সাক্ষী।
ধারণা করা হয় যে, রাখাইন ভাষার উৎপত্তি হাজার বছর আগে ভারতের মগধ অঞ্চলে। এই উত্তরভারতীয় উৎস থেকে আসা বর্ণমালা আরাকান অঞ্চলে উন্নত হয় এবং বিভিন্ন রাজবংশ যেমন ধন্যওয়াদি, বৈশাখী, লেই ম্রো ও ম্রাউক-উ এর মাধ্যমে এর লিখিত রূপ পরিবর্তিত ও সমৃদ্ধ হয়েছে।
শব্দের ভিতরের বিশেষত্ব
প্রধানত রাখাইন জনগোষ্ঠী এই রাখাইন ভাষাই ব্যবহার করে। এই রাখাইন জনগোষ্ঠীকে আমরা উপকূলীয় অঞ্চলে বসবাস করতে দেখি। বাংলাদেশের কক্সবাজার, পটুয়াখালী ও বরগুনা জেলায় তাদের বসবাস। এই অঞ্চলে প্রায় ৩৫ হাজার থেকে ৫০ হাজার মানুষ সাবলীলভাবে রাখাইন ভাষায় কথা বলে। তবে তাদের প্রধান জনগোষ্ঠী বার্মার আরাকান রাজ্যে; সেখানে প্রায় ২২ লাখ রাখাইন জনগোষ্ঠী বসবাস করে।
রাখাইন ভাষার কিছু বৈশিষ্ট্য রয়েছে যা বাংলা ও ইংরেজিতে পাওয়া যায় না। রাখাইন ভাষায় ব্যঞ্জনধ্বনি তুলনামূলক শক্ত ও তীক্ষ্ণ, “র” ধ্বনিটি বেশি ঘূর্ণিত ও জোরালো। কিছু তনযুক্ত স্বরধ্বনি ভাষার উচ্চারণে বিশেষ পরিবর্তন আনে। এই ধ্বনিগত বৈচিত্র্য ভাষার উচ্চারণকে আলাদা করে ফুটিয়ে তোলে।
রাখাইন লিপি মূলত দক্ষিণ ব্রাহ্মী লিপিপরিবারের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত। প্রাচীন শিলালিপিতে চতুষ্কোণ অক্ষর ব্যবহৃত হলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে গোলাকার রূপ ধারণ করেছে। আজ এই লিপি হলো মানক রাখাইন লিপি। এই লিপির বিকাশ সবচেয়ে বেশি দেখা যায় ম্রাউক-উ রাজবংশের অধীনে। বর্তমানে এই লিপিতে ৩৩টি ব্যঞ্জনবর্ণ ও ১২টি স্বরবর্ণ আছে।
সংস্কৃতি, শিক্ষা ও নীতিগত সহায়তা
রাখাইন সংস্কৃতিতে সবচেয়ে বেশি যে স্তরে রাখাইন ভাষা ব্যবহৃত হয়, তা হলো সামাজিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানে। এটি হতে পারে বৌদ্ধ ধর্মের উৎসব যেমন মাঘী পূর্ণিমা বা বৌদ্ধ পূর্ণিমা, অথবা জল উৎসব, ঐতিহ্যবাহী বিয়ে বা গ্রামভিত্তিক বিভিন্ন উৎসব। এছাড়াও সাংস্কৃতিক মঞ্চের বিভিন্ন কবিতা, গান, নাটক ও উপন্যাসে খুব সক্রিয়ভাবে ব্যবহার হয় রাখাইন ভাষা। লোকগান, ধাঁধা প্রতিযোগিতা ও ইতিহাস চর্চা তাদের সামাজিক জীবনের অপরিহার্য অংশ।
বাংলাদেশ সরকার ইতিমধ্যেই ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সংরক্ষণের কিছু উদ্যোগ নিয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো মাতৃভাষা ভিত্তিক প্রাথমিক শিক্ষা চালু, আদিবাসী সংস্কৃতি একাডেমীর কার্যক্রম এবং কিছু ভাষার পাঠ্যবই প্রকাশের উদ্যোগ।
তবে, রাখাইন জনগোষ্ঠী উপকূলীয় অঞ্চলে ছড়িয়ে থাকার কারণে দেখা যায় বেশিরভাগ উদ্যোগ বাস্তবায়ন হতে ত্রুটির শিকার হয়। সরকারের উচিত আরও ভালোভাবে কার্যক্রম পরিচালনা করা, যাতে সঠিক সুফল জনগোষ্ঠীর সকল মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারে।
জনগোষ্ঠীর কণ্ঠ: এক তরুণের অভিজ্ঞতা
রাখাইন ভাষার বর্তমান অবস্থা নিয়ে জানতে রাখাইন সম্প্রদায়ের তরুণ থিন লং নাইং বলেন,
“আমরা ছোটবেলা থেকে ভাষা শিখে বড় হয়েছি, কিন্তু বর্তমান অবস্থা দেখে বুঝতে পারছি এই ভাষাকে টিকিয়ে রাখা কতটা কঠিন হবে।”
তার অভিজ্ঞতা মূলত এসেছে কারণ তার গ্রামের ছোট ছেলে ও মেয়ে আজ রাখাইন ভাষা শিখতে আগ্রহী নয়। কথা বলার সময় দেখা যায় বাক্যে কিছু বাংলা বা ইংরেজি শব্দ ব্যবহার হচ্ছে। এমন অনেক শব্দ আছে যা আমাদের পূর্বপুরুষরা ব্যবহার করত, যা ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে।
থিন লং নাইং বলেন, “যত সময় যাচ্ছে, স্পষ্ট হয়ে উঠছে যে ভাষা শুধু আমার মনের ভাব প্রকাশের মাধ্যম নয়, বরং আমার রাখাইন সম্প্রদায়ের আত্মপরিচয়ের মাধ্যম। তাই আমাদের সকলের মিলে এই ভাষাকে টিকিয়ে রাখতে হবে। আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম যাতে মনে রাখতে পারে যে আমাদের বৈচিত্র্যময় ঐতিহ্য ও ইতিহাস রয়েছে।”
তার কথার মাধ্যমে বোঝা যায় সমস্যার গভীরতা। তার মতে, যদি ভাষাকে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে হয়, তাহলে ডিজিটাল উপস্থিতি তৈরি করতে হবে। তার মতে, “সোশ্যাল মিডিয়া, ইন্টারনেট এবং আলাদা রাখাইন কীবোর্ডের মাধ্যমে একটি ডিজিটাল উপস্থিতি তৈরি করতে হবে। এজন্য সরকারের সহযোগিতা ও তরুণদের আকাঙ্ক্ষা প্রয়োজন।”
রাখাইন সমাজে তাদের ভাষা প্রধানত ঘরে, কমিউনিটি সভা, ধর্মীয় অনুষ্ঠান বা সাংস্কৃতিক উৎসবে ব্যবহৃত হয়। এছাড়া বাজারে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও প্রশাসনিক কাজে বাংলা, এবং প্রযুক্তিগত, ডিজিটাল বা আন্তর্জাতিক কোনো মঞ্চে ইংরেজি ব্যবহৃত হয়। এই কারণে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে বাংলা ও ইংরেজির প্রভাব বেশি দেখা যায়।
থিন লং নাইং এর মতে , “স্কুল-কলেজে শিক্ষার জন্য মূলত বাংলায় পড়তে হয়, বই সব বাংলায়, ফলে নিজের বাসার শিক্ষার সুযোগ খুবই কম। এইভাবে চলতে থাকলে রাখাইন ভাষা শুধু বাসার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে।”
শিশু শিক্ষার বিষয়ে তার মতামত হলো, “শিশুরা মাতৃভাষা হিসেবে রাখাইন শিখছে, তবে পড়ালেখার সুযোগ কম। শিক্ষা সামগ্রী প্রায় নেই বলেই চলে।”
সংকটের কারণ
বাংলাদেশে রাখাইন ভাষা বলার মানুষের সংখ্যা ক্রমাগত কমছে। এর সবচেয়ে বড় কারণ হলো মাতৃভাষায় শিক্ষার উপযুক্ত সুযোগ না থাকা। এর ফলে নতুন প্রজন্মের কাছে এর গুরুত্ব কমে যাচ্ছে। তাছাড়া লিখিত বই ও ডিজিটাল কনটেন্টের সীমাবদ্ধতা শেখার সুযোগ দিচ্ছে না।
তরুণদের শিক্ষার জন্য বাংলা ব্যবহার করতে হয়, এবং প্রযুক্তিগত ক্ষেত্রে ইংরেজি জানতে হয়। অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হতে বাংলা জানা অপরিহার্য। এই কারণে কিছু পরিবারের ভিতরেই ভাষা ব্যবহার কমে যাচ্ছে। শহরে গেলে এই কমিউনিটি থেকেও দুর হয়ে যায়। তাই ভাষার সঙ্গে কোনো পরিচয় থাকে না।
থিন লং নাইং জানালো, “যখন শিশু নিজের বাসার ভাষা পড়তে পারে না, তখন তার ভাষা বলার প্রতি আত্মবিশ্বাস কমে যায়। ফলে সে নিজে থেকে আর কখনও ভাষা বলার চেষ্টা করে না।”
সংরক্ষণের জন্য পদক্ষেপ
রাখাইন ভাষাকে টিকিয়ে রাখতে আমাদের কিছু কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:
১। মাতৃভাষার পাঠ্যবই, গল্পের বই ও অভিধান তৈরি।
২। রাখাইন সংস্কৃতি যেমন লোকগান, গল্প ও গীতকে ডিজিটালভাবে সংরক্ষণ।
এই দুইটি কর্মসূচি সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করলে রাখাইন ভাষা বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব হবে।
এই আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস আমাদের সকল মাতৃভাষার প্রতি সম্মান শেখায়। সকল ভাষাকে শ্রদ্ধা করে নিজ মাতৃভূমিকে এগিয়ে নেওয়াই আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের প্রধান লক্ষ্য।
আমাদের উপলব্ধি করা প্রয়োজন যে রাখাইন ভাষা বাঁচলে বাংলাদেশের ঐতিহ্যের একটি অংশ বেঁচে থাকবে। রাখাইন এর মতো বিলুপ্তপ্রায় ভাষাগুলো বাংলাদেশের বৈচিত্র্যের অনন্য প্রতীক।