সীমিত অবকাঠামোয় বাড়তি শিক্ষার্থী, চাপে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠদান
আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী একটি শ্রেণিকক্ষে ৩০ থেকে ৪০ জন শিক্ষার্থীর উপস্থিতি আদর্শ হিসেবে ধরা হয়। তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৮৪টি বিভাগের মধ্যে প্রায় অর্ধেক বিভাগই এই মান বজায় রাখতে পারছে না। বিশ্লেষকদের মতে, এর প্রভাব পড়ছে পাঠদান প্রক্রিয়া, শিক্ষক শিক্ষার্থী মিথস্ক্রিয়া এবং শিক্ষার্থীদের নলেজ ইনডেক্সের ওপর।
সীমিত অবকাঠামোয় বাড়তি শিক্ষার্থী, চাপে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠদান
আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী একটি শ্রেণিকক্ষে ৩০ থেকে ৪০ জন শিক্ষার্থীর উপস্থিতি আদর্শ হিসেবে ধরা হয়। তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৮৪টি বিভাগের মধ্যে প্রায় অর্ধেক বিভাগই এই মান বজায় রাখতে পারছে না। বিশ্লেষকদের মতে, এর প্রভাব পড়ছে পাঠদান প্রক্রিয়া, শিক্ষক শিক্ষার্থী মিথস্ক্রিয়া এবং শিক্ষার্থীদের নলেজ ইনডেক্সের ওপর।
শ্রেণিকক্ষের সংকট ও সক্ষমতার চেয়ে বেশি শিক্ষার্থী ভর্তি করায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশ কয়েকটি বিভাগে গাদাগাদি করে ক্লাস করতে হচ্ছে শিক্ষার্থীদের। বিশেষ করে, বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা অনুষদের বিভাগগুলোর এ সংকট দীর্ঘদিনের।
আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী একটি শ্রেণিকক্ষে ৩০ থেকে ৪০ জন শিক্ষার্থীর উপস্থিতি আদর্শ হিসেবে ধরা হয়। তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৮৪টি বিভাগের মধ্যে প্রায় অর্ধেক বিভাগই এই মান বজায় রাখতে পারছে না। বিশ্লেষকদের মতে, এর প্রভাব পড়ছে পাঠদান প্রক্রিয়া, শিক্ষক শিক্ষার্থী মিথস্ক্রিয়া এবং শিক্ষার্থীদের নলেজ ইনডেক্সের ওপর।
শ্রেণিকক্ষের সংকট কলাভবনে
বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা অনুষদের ডিন অফিসের তথ্য মতে, অনুষদটির মোট ৫৭টি কক্ষের মধ্যে ১৭ টি বিভাগের জন্য বরাদ্দ রয়েছে ৪২ টি কক্ষ, এর মধ্যে বেশিরভাগ বিভাগের জন্য দুটি করে কক্ষ বরাদ্দ। এছাড়া ডিন অফিসের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে ১৭ টি কক্ষ। এ কক্ষগুলো বিভাগের চাহিদা মোতাবেক যৌথভাবে ক্লাস নেওয়ার জন্য বরাদ্দ দেয় ডিন অফিস।
অনুষদটির বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী মাহফুজা আকতার চৈতী সম্প্রতি দ্য বিজনেজ স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, আমাদের ছয়টা ব্যাচ, দুটো কক্ষে সংকুলান হয় না। অনেক সময় ক্লাস শেষের ১০-১৫ মিনিট আগে শ্রেণি প্রতিনিধিরা দৌড়াদৌড়ি করে কোন কক্ষ ফাঁকা আছে খুঁজে বের করে রাখে। মাঝে মাঝে দেখা যায়, একটা কক্ষে আমরাও ক্লাস করতে চাই অন্য বিভাগও ক্লাস করতে চায়, ফলে যেকোনো একজনকে কক্ষ ছাড়তে হয়।
ইতিহাস বিভাগের স্নাতকোত্তরের শিক্ষার্থী বুরহান উদ্দিন দ্য বিজনেজ স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, আমরা ১১০ জন শিক্ষার্থী একসাথে ক্লাস করি৷ আমাদের বিভাগের তিনটা কক্ষ, এর মধ্যে একটা কক্ষে আবার স্থান সংকুলান হয় না। মাঝে মাঝে অন্য বিভাগের শ্রেণিকক্ষে গিয়ে ক্লাস করতে হয়।
বাংলা বিভাগের অধ্যাপক তারিক মনজুর দ্য বিজনেজ স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করার জন্য আদর্শ ও আধুনিক ক্লাসরুম থাকা দরকার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিশেষত কলাভবনে এ রকম ক্লাসরুম নেই। সম্প্রতি ইউজিসি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নতুন শিক্ষাক্রম চালু করেছে। সেটি মানতে হলে একটি ক্লাসরুমে ৪০-৫০ জনের বেশি শিক্ষার্থীকে বসানোর সুযোগ নেই ।
কলা অনুষদের ডিন (ভারপ্রাপ্ত) অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ছিদ্দিকুর রহমান খান এ সংকটের কথা স্বীকার করে দ্য বিজনেজ স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, সম্প্রতি কয়েকটি বিভাগের সঙ্গে আলোচনা করে ক্লাসের স্লট পুনর্বিন্যাস করা হয়েছে, এতে বিভাগভিত্তিক শ্রেণিকক্ষ ব্যবহারের সুযোগ কিছুটা বেড়েছে।
আন্তর্জাতিক মানদন্ডের বাইরে ছাত্র-শিক্ষক অনুপাত
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করার জন্য ছাত্র-শিক্ষক অনুপাত একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক। উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে বিষয়ভেদে একটি শ্রেণিকক্ষে সর্বোচ্চ ৪০ জন শিক্ষার্থীর উপস্থিতি আদর্শ হিসেবে ধরা হয়।
তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগ থেকে পাওয়া তথ্য মতে, বাংলা, আরবি, ইতিহাস, দর্শন, ইসলামিক স্টাডিজ, সমাজবিজ্ঞান, আইন, সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইন্সটিটিউট, পদার্থবিজ্ঞান, মৃত্তিকা, পানি ও পরিবেশ বিজ্ঞান, ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্টসহ অন্তত ১৫ টি বিভাগে প্রায় শতাধিক শিক্ষার্থী একসাথে ক্লাস করে।
সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদভুক্ত সমাজবিজ্ঞান বিভাগের তৃতীয় বর্ষের একজন শিক্ষার্থী নাম প্রকাশ না করার শর্তে দ্য বিজনেজ স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, আমরা দেড় শতাধিক শিক্ষার্থী একসাথে ক্লাস করি। ফলে আমাদের ছাত্র-শিক্ষক যে মিথষ্ক্রিয়া হওয়ার কথা সেটা হয় না। এত শিক্ষার্থীর ফলে নিয়মমাফিক ক্লাস না হওয়া, মিড উইক ফলো না করা, ফল প্রকাশে দেরি হওয়া নিয়মিত ঘটনা।
বিভাগটির চেয়ারম্যান অধ্যাপক ফাতেমা রেজিনা ইকবালের সাথে কথা বলতে চাইলে তিনি এ বিষয়ে কথা বলতে অস্বীকৃতি জানান।
লোকপ্রশাসন বিভাগের রায়হান আহমেদ সিব্বির দ্য বিজনেজ স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, বিভিন্ন ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে আমরা আসি। যখন দেখি ক্লাসে শতাধিক শিক্ষার্থী তখন মনোযোগ দিতে পারে না। একইসাথে পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়া বা জ্ঞান বিনিময় এটাও সম্ভব হয় না।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইন্সটিটিউটের অধ্যাপক ড. মনিনুর রশীদ দ্য বিজনেজ স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য ছাত্র-শিক্ষক অনুপাত যেখানে শিক্ষক প্রতি সর্বোচ্চ ৪০ জন শিক্ষার্থী, সেখানে ১০০ জনের বেশি শিক্ষার্থী নিয়ে ক্লাস চলছে। এত সংখ্যক শিক্ষার্থীকে একসঙ্গে পাঠদান করা একজন শিক্ষকের পক্ষে বাস্তবসম্মত নয়। কেননা একজন শিক্ষক কেবল লেকচার দেবেন এমন নয়; আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থায় প্রজেক্টভিত্তিক, অভিজ্ঞতাভিত্তিক ও সমস্যা সমাধানভিত্তিক শিক্ষণ-পদ্ধতির কথা বলা হয়।
সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নেই প্রশাসনের
অবকাঠামো সুবিধার তুলনায় শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেশি হওয়ায় ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষ থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় এক হাজার আসন সংখ্যা কমানো হয়। এ আসন সংখ্যা ধীরে ধীরে আরও পর্যালোচনার কথাও জানিয়েছিল তৎকালীন প্রশাসন। তবে শিক্ষার্থী সংখ্যা কমানোর ধারণার সঙ্গে একমত নন বর্তমান প্রশাসনের কেউ কেউ।
কলা অনুষদের ডিন (ভারপ্রাপ্ত) ছিদ্দিকুর রহমান খান দ্য বিজনেজ স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, গত একশ বছর ধরেই এ ধরনের সীমাবদ্ধতা ছিল, তারপরও আমরা ভালো মানের গ্র্যাজুয়েট তৈরি করেছি। কেবল ক্লাসের আকার ছোট করা বা শিক্ষার্থী সংখ্যা কমালেই মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত হবে এমন না। দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর উচ্চশিক্ষার সুযোগ অবারিত রেখে বিদ্যমান কাঠামোর মধ্যেই শিক্ষাদানের সক্ষমতা বাড়ানোর দিকেই গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদ দ্য বিজনেজ স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, আমাদের সীমাবদ্ধতার কারনে কিছু বিষয় আমরা ওভারকাম করতে পারি না। সবকিছু উন্নতির জন্য আমরা চেষ্টা করছি।
সক্ষমতা পর্যালোচনার তাগিদ বিশেষজ্ঞদের
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের আবাসনব্যবস্থা, গ্রন্থাগার সুবিধা, শ্রেণিকক্ষ ও পরিবহন থেকে শুরু করে সর্বত্র অতিরিক্ত শিক্ষার্থীর চাপ রয়েছে৷ গত দুই দশকে অপরিকল্পিতভাবে নতুন নতুন বিভাগ-ইনস্টিটিউট খোলা ও একই অনুপাতে অবকাঠামো না বাড়ায় এ অবস্থা তৈরি হয়েছে৷
অধ্যাপক মনিনুর রশীদ দ্য বিজনেজ স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, কোনো সুস্পষ্ট নীতিমালা ছাড়াই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ভর্তি করানো হচ্ছে, যা একটি দেশের জন্য শেষ পর্যন্ত বুমেরাং হয়ে দাঁড়ায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব গবেষণা থাকা দরকার, যাতে বোঝা যায় দেশের জন্য কী ধরনের জনশক্তি প্রয়োজন, বিশ্ববিদ্যালয়ের সক্ষমতা কতটুকু এবং বিদ্যমান সম্পদের মধ্যে কীভাবে মানসম্মত শিক্ষা দেওয়া সম্ভব।