১২৮ বছরেরও পুরনো খুলনার যে লাইব্রেরি

মোট ৪৩ হাজার ৫০০ বই আছে এই লাইব্রেরিতে। খোলা থাকে প্রতিদিন বিকেল ৩টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত। রোববার সাপ্তাহিক ছুটি। লাইব্রেরির কর্মচারীদের প্রত্যেককেই নিজেদের অন্নসংস্থানের উদ্দেশ্যে কিছু না কিছু কাজ করতে হয়। তাই সেই বিবেচনায় দুপুর থেকেই খোলা রাখা হয় লাইব্রেরি।

Khulna library
উমেশচন্দ্র পাঠাগারের সদস্য না হয়েও এখানে বসে বিনামূল্যে যে কেউ পড়তে পারেন। ছবি: অনুস্কা ব্যানার্জী/টিবিএস

আমি একা কত তাকের ধুলো ঝাড়ব? কেউ যদি বইয়ে হাত দিয়ে না দেখে, শুধু ধুলো ঝেড়ে তো আর ধুলো আটকে রাখা যায় না। দীর্ঘদিন এসব বই পড়ে আছে অবহেলায়। অথচ কী চমৎকার সব বই! এমন বইয়ের কালেকশন সারা বাংলাদেশে খুঁজলেও খুব বেশি লাইব্রেরিতে মিলবে না—আক্ষেপের সঙ্গে জানাচ্ছিলেন উমেশচন্দ্র পাঠাগারের গ্রন্থাগারিক শ্যামল দেবনাথ।

উমেশচন্দ্র পাঠাগারের সদস্য না হয়েও এখানে বসে বিনামূল্যে যে কেউ বই পড়তে পারেন। তাই অনেক চাকরিপ্রার্থী নিরিবিলি পরিবেশে বসে চাকরির পড়াও পড়েন এখানে। তবে তাদের আগ্রহ নেই সাহিত্য থেকে গবেষণার বইগুলোর প্রতি। অনেকের প্রায় দু–তিন বছর ধরে নিয়মিত যাতায়াত এখানে। কিন্তু কখনো নেড়েচেড়ে দেখতেও চান না সিলেবাসের বাইরের কোনো বই।

শ্যামলের ভাষ্যে, লাইব্রেরির বর্তমান কর্মচারীর সংখ্যা তিন। লাইব্রেরির তেমন কোনো ফান্ড না থাকায় তারা প্রত্যেকেই অবৈতনিক। লাইব্রেরির প্রতি ভালোবাসা থেকেই তারা রোজ ছুটে আসেন এখানে। তবু তিনজনের পক্ষে সব দিক দেখা সম্ভব হয় না। তাই ধুলো জমে থাকে বইয়ের তাকে। 

প্রতিদিন বিকেল ৩টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত খোলা থাকে এই গ্রন্থাগার। রোববার সাপ্তাহিক ছুটি। লাইব্রেরির কর্মচারীদের প্রত্যেককেই নিজেদের অন্নসংস্থানের উদ্দেশ্যে কিছু না কিছু কাজ করতে হয়। তাই সেই বিবেচনায় দুপুর থেকেই খোলা রাখা হয় লাইব্রেরি।

কথা হলো উমেশচন্দ্র পাবলিক লাইব্রেরির গ্রন্থাগারিক শ্যামল দেবনাথের সঙ্গে। ১৯৭৬ সাল থেকে তিনি এই লাইব্রেরির গ্রন্থাগারিকের দায়িত্ব পালন করে আসছেন। তখন তার বয়স ছিল ২৫ বছর। ৭৪ বছরের জীবনে অনেক প্রিয় মানুষ, অনেক পুরোনো অভ্যাস ছাড়তে হয়েছে তাকে। তবে ছাড়তে পারেননি উমেশচন্দ্র পাবলিক লাইব্রেরিকে। 

বইপত্রের হিসাব রাখা থেকে লাইব্রেরির টুকিটাকি কাজ, কিছুটা গল্পগুজব—এসব ছাড়া নিজের একটা দিন আজও কল্পনা করতে পারেন না শ্যামল।

তখন কেবল সন্ধ্যা নামছে। পাখিরা কিচিরমিচির শব্দে জানিয়ে দিচ্ছে ঘরে ফেরার কথা। সেই কিচিরমিচিরের ঠিক বিপরীতে পিন পড়ার শব্দ শোনা যায় এমন নীরবতামাখা একখানা বিশাল হলঘর। তাকে তাকে রাখা বই—কিছুটা ধুলোজমা, হলদে পাতা, লালচে মলাটে মোড়া। বিজ্ঞান, ইতিহাস, রাজনীতি, সাহিত্য, গবেষণা—কী নেই! 

খুলনা শহরের কোলাহলমুখর, নিরন্তর ছুটে চলা জীবনের মাঝখানে যেন দুদণ্ড শান্তির ঠিকানা উমেশচন্দ্র পাবলিক লাইব্রেরি। পাঠকের কমতি দেখা গেল না ১২৮ বছরের পুরোনো এই লাইব্রেরিজুড়ে। খুলনা জেলার সবচেয়ে পুরোনো পাঠাগার এটি।

উনিশ শতকের প্রথম দিককার কথা। বাংলার নবজাগরণের ঢেউ এসে পৌঁছেছিল কলকাতার নিকটবর্তী খুলনাতেও। ধীরে ধীরে খুলনায় গড়ে উঠতে শুরু করে এক শিক্ষিত অভিজাত ও মধ্যবিত্ত শ্রেণী। এই শ্রেণী সমাজের উন্নয়ন সাধনে নানা জনহিতৈষীমূলক কাজ করতেন। 

১৮৯৭ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি খুলনা শহরের জ্ঞানী ও গুণীজনের আয়োজিত এক বৈঠকে একটি লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, যাতে স্থানীয় মানুষ সহজেই জ্ঞান আহরণ করতে পারেন। এই প্রস্তাব বাস্তবায়নে এগিয়ে আসেন নড়াইলের তৎকালীন জমিদার রায়বাহাদুর কিরণচন্দ্র রায়। তার অর্থসাহায্যে, তার প্রয়াত পিতা উমেশচন্দ্র রায়ের নামে ওই বছরের ১ মে প্রতিষ্ঠিত হয় উমেশচন্দ্র পাবলিক লাইব্রেরি।

সে সময়ের পৌরসভা ও টাউনহলের পাশে একটি ছোট্ট কক্ষে এই লাইব্রেরিটি প্রাথমিকভাবে শুরু হয়। প্রতিষ্ঠার পর থেকেই এটি বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রে পরিণত হতে থাকে। 

১৮৯৯ সালে খুলনা পৌরভবন নির্মাণের সময় মূল ভবনের দুই পাশে দুটি কক্ষ তৈরি করা হয়। বামদিকের কক্ষে লাইব্রেরির কার্যক্রম চলতে থাকে। ১৯৩১ সালে পৌরসভার তৎকালীন চেয়ারম্যান মহেন্দ্রকুমার ঘোষ পৌরভবন সম্প্রসারণ করে নবনির্মিত দুটি কক্ষে লাইব্রেরিটি স্থানান্তর করেন। তবে ওই দুটি কক্ষে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ায় লাইব্রেরির কার্যক্রম ব্যাহত হতে থাকে।

এ নিয়ে লাইব্রেরির সঙ্গে যুক্ত মানুষদের আন্তরিক প্রচেষ্টার কমতি ছিল না। বছরের পর বছর তারা জায়গার সংকট নিয়ে আলাপ-আলোচনা চালিয়েছেন। সেই নিরন্তর প্রচেষ্টা আশির দশকে এসে আলোর মুখ দেখে। ১৯৮৪ সালে প্রয়াত মুক্তিযোদ্ধা জাহিদুর রহমান জাহিদের স্মৃতিতে নির্মিত জাহিদ স্মৃতিভবনে লাইব্রেরিটি পুনরায় স্থানান্তরিত হয়। পরবর্তীতে এই ভবনের দ্বিতীয় ও তৃতীয় তলা নির্মাণের ফলে প্রচুর বই রাখার জায়গা তৈরি হয়। বর্তমানে লাইব্রেরিটি খুলনা শহরের কমরেড রতন সেন সরণিতে অবস্থিত।

শ্যামল জানালেন, এই লাইব্রেরিতে সর্বমোট ৪৩ হাজার ৫০০ বই আছে। ১৯৭৬ সালে তিনি যখন গ্রন্থাগারিক হিসেবে কাজ শুরু করেন, তখন বইয়ের সংখ্যা ছিল প্রায় ১৫ হাজার। প্রতি বছর লাইব্রেরির জন্য নতুন বই কেনা হয়। পাশাপাশি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিগত উদ্যোগে অনেকেই বই দান করেন। এভাবেই বাড়তে থাকে সংগ্রহ। 

শ্যামল আরও জানালেন, “জাহিদ স্মৃতি ভবনে আসার পর পাঠকদের জন্য পর্যাপ্ত জায়গা তৈরি হয়েছে। নিচতলায় রয়েছে অডিটোরিয়াম, আর দ্বিতীয় ও তৃতীয় তলাজুড়ে বইয়ের সমাহার। পত্রপত্রিকার পাঠকদের জন্য তৃতীয় তলায় আছে আলাদা পাঠকক্ষ। সেখানে জাতীয় ও স্থানীয় দৈনিকের পাশাপাশি সাপ্তাহিক, পাক্ষিক ও মাসিক পত্রিকা রাখা হয়। শিশুদের জন্য রয়েছে আলাদা শিশু কর্নারও।” 

“প্রতি তলায় প্রায় ১৩০ জন পাঠক বসতে পারেন। নিচতলার অডিটোরিয়ামটি নিজেদের অনুষ্ঠানের জন্য রাখা হলেও খালি থাকলে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠনকে ভাড়াও দেওয়া হয়,” বলেন তিনি।

দেখা মিলল এমন দুজন পাঠকের, যারা উমেশচন্দ্র পাবলিক লাইব্রেরিতে সাধারণ সদস্য হতে এসেছিলেন। তাদের একজন প্রজেশ দত্ত। তিনি বললেন, “বহুদিন ধরে রাস্তা দিয়ে যাতায়াত করতে করতে লাইব্রেরিটি চোখে পড়ে। তবে কখনো ভেতরে ঢোকা হয়নি। আজ ঢুকে কিছু বই নেড়েচেড়ে দেখে ভালো লেগেছে। তাই নিয়মিত সদস্য হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।”

৫৫০ টাকা দিয়ে সদস্য হয়েছেন তিনি। এরপর প্রতি মাসে ২০ টাকা করে দিতে হবে। লাইব্রেরিয়ানের কাছ থেকে জেনেছেন, নিয়মিত সদস্যরা কোনো জরিমানা ছাড়াই ১৫ দিন পর্যন্ত বই বাড়িতে রাখতে পারেন।

গ্রন্থাগারিক শ্যামলের কাছে এখন এমন দিন খুব বেশি আসে না। দুজন নতুন সদস্য পেয়ে তিনি বেশ হাস্যোজ্জ্বল। সময়ের সঙ্গে মানুষের জীবনযাত্রা যেমন বদলেছে, তেমনি কমেছে বই পড়ার অভ্যাস। আশি ও নব্বইয়ের দশকে এই লাইব্রেরিতে নিয়মিত ৩৫০ থেকে ৪০০ জন সদস্যের যাতায়াত ছিল। প্রতিদিন অনেকেই আসতেন। কেউ কেউ বসে বসেই বই পড়তেন, আবার কেউ বই নিয়ে বাড়ি যেতেন। একদিনে একটি বই শেষ করা তরুণ পাঠকের সংখ্যাও কম ছিল না।

এখন নিয়মিত সদস্যের সংখ্যা এসে ঠেকেছে ৫০-এ। বর্তমানে ৫৫০ টাকায় সাধারণ সদস্য, এককালীন ৫ হাজার টাকায় আজীবন সদস্য এবং এককালীন ২৫ হাজার টাকায় দাতা সদস্য হওয়া যায়। শিক্ষার্থীদের জন্য মাসিক চাঁদা ১৫ টাকা। 

আজকাল প্রয়োজন ছাড়া খুব কম মানুষই লাইব্রেরিতে আসেন। তবে গ্রন্থাগারিক হিসেবে শ্যামল প্রতিদিনই বইয়ের দেখভাল করতে আসেন। অভিভাবকেরা শিশুদের নিয়ে খুব একটা আসেন না, তাই শিশু কর্নারটিও প্রায় ফাঁকা পড়ে থাকে। গল্পের ছলে তিনি লাইব্রেরির নানা তথ্য জানিয়ে যাচ্ছিলেন।

উমেশচন্দ্র লাইব্রেরির একজন সাধারণ সদস্য খেজের মোল্ল্যা। কবিতার বই পড়তে তিনি ভীষণ ভালোবাসেন। বছর পাঁচেক আগেও নিয়মিত লাইব্রেরিতে আসতেন। এখন গুরুতর অসুস্থতায় হেঁটে বের হওয়া তার পক্ষে অনেকটাই কঠিন। তাই মোবাইলেই ই–বুক পড়ে কবিতার তৃষ্ণা মেটান। প্রযুক্তির সঙ্গে তেমন সখ্য না থাকায় ছেলেমেয়েদের সাহায্য নিতে হয়। আক্ষেপের সুরে তিনি বলছিলেন উমেশচন্দ্র গ্রন্থাগারে কাটানো সেই সুন্দর বিকেলগুলোর কথা।

লাইব্রেরিটি ১৯৯৬ সালে শতবর্ষ অতিক্রম করেছে। প্রতিষ্ঠাতা জমিদার রায়বাহাদুর কিরণচন্দ্র রায়ের পরিবার দেশভাগের পর ১৯৪৭ সালে ভারতে চলে যায়। এরপর থেকে তাদের সঙ্গে লাইব্রেরি কর্তৃপক্ষের তেমন যোগাযোগ ছিল না। তবে শতবর্ষ উদযাপনের সময় কিরণচন্দ্র রায়ের বংশধর কলকাতা থেকে একটি চিঠি পাঠিয়ে লাইব্রেরিটি টিকিয়ে রাখার জন্য কর্তৃপক্ষকে ধন্যবাদ জানান বলে জানা যায়।

গ্রন্থাগারিক শ্যামল চান, যতদিন বেঁচে থাকবেন ততদিন নিজ দায়িত্বেই তিনি এই লাইব্রেরির সঙ্গে থাকবেন। তার মৃত্যুর পরও যেন কর্মচারী ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে এটি বন্ধ না হয়ে যায়—এই চিন্তাই তাকে ভাবায়। উমেশচন্দ্র লাইব্রেরির জায়গা ও বই বাড়ানোর স্বপ্নে তিনি মগ্ন। বই পড়তে তিনি ভালোবাসেন, বইকে ছড়িয়ে দিতে চান সবার মাঝে। 

১২৮ বছরের ইতিহাস বুকে নিয়ে উমেশচন্দ্র পাবলিক লাইব্রেরি আজও দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু তার ভেতরের কোলাহল ধীরে ধীরে হারিয়ে গেছে। শ্যামল দেবনাথের মতো কয়েকজন মানুষের নিঃশব্দ ভালোবাসায় এই লাইব্রেরিটি এখনো টিকে আছে। ইন্টারনেট আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে পুরোনো দিনের সেই লাইব্রেরিতে বসে সত্যিকারের বইয়ের পাতা ওলটানো, নতুন বইয়ের গন্ধ আর চায়ের সঙ্গে গল্প–উপন্যাসের আড্ডা—সবকিছুই যেন ক্রমে অধরা হয়ে উঠছে।