কঠোর ভিসা নীতিতে এশিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বাড়ছে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীর সংখ্যা
এশিয়ার শিক্ষার্থীরা স্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করতে আগ্রহী হচ্ছেন কয়েকটি কারণে। বড় চারটি দেশ—আমেরিকা, ব্রিটেন, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়ায় অভিবাসন নিয়ম কঠোর হয়ে যাওয়ায় বিদেশে পড়তে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।
কঠোর ভিসা নীতিতে এশিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বাড়ছে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীর সংখ্যা
এশিয়ার শিক্ষার্থীরা স্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করতে আগ্রহী হচ্ছেন কয়েকটি কারণে। বড় চারটি দেশ—আমেরিকা, ব্রিটেন, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়ায় অভিবাসন নিয়ম কঠোর হয়ে যাওয়ায় বিদেশে পড়তে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।
১৩ বছর বয়স থেকেই আমেরিকায় পড়াশোনার স্বপ্ন ছিল ইয়াংয়ের। বোস্টনে ঘুরতে গিয়ে তিনি দেখেছিলেন, শিক্ষার্থীরা ঘাসের ওপর শুয়ে বই পড়ছে। তার মনে হয়েছিল, ‘বিদেশে পড়াশোনা মানেই এমন হওয়া উচিত’।
২০২২ সালে কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক শেষ করার পর তিনি পিএইচডি করার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু তখন আন্তর্জাতিক সম্পর্কের টানাপোড়েন বেড়ে যায় এবং আমেরিকা ভিসা নীতি কঠোর করে।
শেষ পর্যন্ত তিনি যান সিঙ্গাপুরে। এখানে তাকে আর কাগজপত্র নিয়ে দুশ্চিন্তায় থাকতে হয় না। পাশাপাশি, হুবেই প্রদেশে তার পরিবারের বসবাস এবং তাদের কাছাকাছি থাকাটাও তার কাছে বড় সুবিধা।
বছরের পর বছর উচ্চাকাঙ্ক্ষী এশীয় শিক্ষার্থীরা পড়াশোনার জন্য ভিড় করেছেন ইংরেজিভাষী চার দেশ—আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, ব্রিটেন ও কানাডায়। এসব দেশ শুধু তরুণ মেধা নয়, বিপুল পরিমাণ অর্থও অর্জন করেছে তাদের কাছ থেকে।
কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে সেই প্রচলিত গন্তব্যগুলোর আকর্ষণ কিছুটা কমে এসেছে। ধারণা করা হয়, বর্তমানে তারা বিশ্বের মোট আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীর প্রায় ৩৫ শতাংশকে গ্রহণ করছে, যেখানে ২০২০ সালে এ হার ছিল প্রায় ৪০ শতাংশ।
এখন অনেক এশীয় শিক্ষার্থী বিদেশে পড়তে চাইলে নিজেদের অঞ্চলেই গন্তব্য খুঁজে নিতে আগ্রহী হচ্ছেন।
এশিয়ার শিক্ষার্থীরা স্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করতে আগ্রহী হচ্ছেন কয়েকটি কারণে। বড় চারটি দেশ—আমেরিকা, ব্রিটেন, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়ায় অভিবাসন নিয়ম কঠোর হয়ে যাওয়ায় বিদেশে পড়তে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।
অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সাইমন মার্জিনসন জানান, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পূর্ব এশিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়গুলো দ্রুতই আন্তর্জাতিক তালিকায় উপরের দিকে উঠছে। ফলে তাদের মর্যাদাও বেড়েছে।
আরেকটি বড় কারণ কম খরচ। বিদেশে পড়াশোনার পরামর্শদাতা এক বিশেষজ্ঞ বলেন, খরচের বিষয়েই এখন ভারতীয় শিক্ষার্থীরা জাপান, তাইওয়ান ও দক্ষিণ কোরিয়া সম্পর্কে বেশি জানতে চাইছেন। আগে তাদের নজর ছিল কেবল ওই বড় চার দেশের দিকেই।
মহামারি এই প্রবণতাকে আরও ত্বরান্বিত করেছে। অনেক এশীয় শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবক মনে করেছেন, ঘরের কাছাকাছি পড়াশোনা করাই নিরাপদ। সেই অভ্যাস এখনও রয়ে গেছে। পশ্চিমা দেশগুলোকে অনেকেই এখন অস্থির ও ঝুঁকিপূর্ণ মনে করছেন।
ব্রিটিশ কাউন্সিলের এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, ২০১৬ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে পূর্ব এশিয়ায় বিদেশি এশীয় শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ৪০ শতাংশ বেড়েছে।
বিদেশি শিক্ষার্থী আকর্ষণে বড় সুযোগ দেখছে কয়েকটি এশীয় দেশ। ২০২৩ সালে জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও তাইওয়ান নতুন লক্ষ্য ঠিক করেছে।
জাপান গত বছর ৩ লাখ ৩৭ হাজার শিক্ষার্থীকে স্বাগত জানিয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় ২১ শতাংশ বেশি। এর মধ্যে ৯০ শতাংশেরও বেশি এসেছিল এশিয়ার দেশগুলো থেকে। দেশটি ২০৩৩ সালের মধ্যে বিদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৪ লাখে নিতে চায়।
তাইওয়ান ২০৩০ সালের মধ্যে শিক্ষার্থী আগমনের সংখ্যা দ্বিগুণ করে ৩ লাখ ২০ হাজারে পৌঁছানোর পরিকল্পনা করছে। তিন দেশই ইংরেজি ভাষায় কোর্স বাড়াচ্ছে, বাড়াচ্ছে বৃত্তির পরিমাণ এবং স্নাতক শেষের পর কাজের সুযোগও সহজ করছে।
হংকংও এই দৌড়ে যোগ দিয়েছে। চলতি মাসে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে স্নাতক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে অর্ধেক বিদেশি হতে পারবেন। ২০২৪ সালে এ হার ছিল ৪০ শতাংশ, আর তার আগের সময়ে মাত্র ২০ শতাংশ।
নিম্ন জন্মহার অনেক দেশকে বিদেশি শিক্ষার্থীদের প্রতি আরও আগ্রহী করে তুলেছে। শ্রমবাজারে ঘাটতি মেটাতেও তারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করেন জাপানের হিতোৎসুবাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হিরোশি ওতা। তার মতে, বিদেশ থেকে শিক্ষার্থী না এলে জাপানের কিছু বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে।
শিক্ষার্থীদের আকৃষ্ট করার পেছনে ‘সফট পাওয়ার’-এর লক্ষ্যও রয়েছে। তাইওয়ান তাদের ‘নিউ সাউথবাউন্ড পলিসি’র মাধ্যমে দক্ষিণ-পূর্ব ও দক্ষিণ এশিয়ার শিক্ষার্থীদের টানতে চাইছে। এই নীতির উদ্দেশ্য প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলা।
তবে এখনো চ্যালেঞ্জ রয়েছে। হংকং, সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ার মতো জায়গায় প্রবৃদ্ধির সীমা আছে। ২০১৯ সালের পর থেকে মালয়েশিয়ায় চীনা শিক্ষার্থীর সংখ্যা দ্রুত বেড়েছে, কিন্তু আরও বেশি বাড়ার সুযোগ কম।
ভাষাগত বাধা চীন, দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানের প্রতি আগ্রহ কমিয়ে দেয়, বিশেষ করে যারা পড়াশোনা শেষে স্থানীয় চাকরি করতে চান তাদের জন্য।
অন্যদিকে অভিবাসন নিয়ে জনমনে উদ্বেগও বাড়ছে। জাপানের কট্টর ডানপন্থী দল সানসেইতো অভিযোগ করেছে, চীন থেকে ক্রমেই বেশি শিক্ষার্থী আসছে। ২০২৩ সালে জাপানে প্রায় ১ লাখ ১৫ হাজার চীনা শিক্ষার্থী ভর্তি হয়েছেন, যা ২০১৯ সালের তুলনায় ১৫ হাজার বেশি।
এশিয়ার অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে সবচেয়ে বেশি বিদেশি শিক্ষার্থী এখন চীনের। তবে এ প্রবাহ কমতে পারে, কারণ দেশটিতে তরুণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে। অন্যদিকে, বিদেশি ডিগ্রির চাহিদা ভারতীয়দের মধ্যে আরও বাড়বে বলেই ধারণা করা হচ্ছে।
গবেষণা প্রতিষ্ঠান কোয়াকরেলি সাইমন্ডস (কিউএস) জানিয়েছে, বিশ্বজুড়ে বর্তমানে প্রায় ৭০ লাখ আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী রয়েছে। ২০৩০ সালের মধ্যে এ সংখ্যা বেড়ে ৮৫ লাখে পৌঁছাতে পারে। ফলে প্রতিভা আকর্ষণের প্রতিযোগিতা আরও তীব্র হবে।