ষষ্ঠ শ্রেণিতে বৃত্তি পরীক্ষার চাপ ও বই সংকট: ত্রিমুখী সংকটে শিক্ষার্থীরা

প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ বলেন, “স্কলারশিপ বা স্টাইপেন্ড মূলত শিক্ষার্থীদের আরও অনুপ্রাণিত করার জন্য দেওয়া হয়। আমাদের উদ্দেশ্য হচ্ছে শিক্ষার্থীদের উৎসাহিত করা। যেকোনো উদ্যোগই চাইলে অনেকভাবে সমালোচনা করা যায়।”

school kids
Representational image of school children. File photo: Collected

মামলার জট কাটিয়ে অবশেষে গত বছরের স্থগিত হওয়া প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষা আগামী এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। তবে শিক্ষার্থীরা ইতোমধ্যে ৬ষ্ঠ শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হয়ে নতুন শিক্ষাবর্ষের তিন মাস পার করে দেওয়ায় এই সিদ্ধান্ত নিয়ে শিক্ষক, অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে উদ্বেগ ও দুশ্চিন্তা দেখা দিয়েছে।

প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ঈদুল আজহার আগে এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে এই পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হতে পারে। এ বছর প্রথমবারের মতো কিন্ডারগার্টেনের শিক্ষার্থীরাও এতে অংশ নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছে। বৃত্তি বণ্টনের ক্ষেত্রে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ৮০ শতাংশ এবং কিন্ডারগার্টেনসহ বেসরকারি বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ২০ শতাংশ কোটা পাবে।

শিক্ষাবর্ষ শুরু হওয়ার তিন মাস পর এই পরীক্ষার সময়সূচি ঘোষণা করায় শিক্ষার্থীরা বড় ধরনের সংকটে পড়েছে। বর্তমানে ৬ষ্ঠ শ্রেণিতে পড়া শিক্ষার্থীদের এখন পুনরায় ৫ম শ্রেণির বাংলা, ইংরেজি, গণিত, বিজ্ঞান ও সমাজ—এই ৪০০ নম্বরের বিশাল সিলেবাসের প্রস্তুতি নিতে হবে।

ফরিদপুরের মুন্সিপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী বিজয় মালো জানায়, সে ও তার অনেক সহপাঠী ইতোমধ্যে ৫ম শ্রেণির বই বিক্রি করে দিয়েছে। এখন নতুন করে বই সংগ্রহ বা ফটোকপি ও গাইড বইয়ের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে তাদের। অনেকেই বইয়ের অভাবে পরীক্ষায় অংশ নেওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তায় রয়েছে।

ফেব্রুয়ারি-মার্চ পেরিয়ে যাওয়ার পর এই পরীক্ষা আয়োজন এবং ‘কোটা’ পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন শিক্ষাবিদরাও। সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, “বেসরকারি বিদ্যালয়ের ২০ শতাংশ শিক্ষার্থীকে বৃত্তি দেওয়ার বিষয়টি রয়েছে। যে কোটার জন্য আমাদের সন্তানেরা প্রাণ দিল, সেই কোটা আবার ফিরে এল—এটা বড় প্রশ্নবোধক চিহ্ন। ২০ শতাংশ বাচ্চাকে আলাদা করে দিলে তাদের ওপর এক ধরনের অসুস্থ প্রতিযোগিতা তৈরি হয়। এই বয়সের বাচ্চারা যদি খুব ছোট বয়সেই এমন প্রতিযোগিতার মধ্যে পড়ে, সেটি ভালো ফল বয়ে আনে না।”

তিনি আরও বলেন, “এই ধরনের পরীক্ষা-পরীক্ষা চালু করে আমরা বৈষম্য ও ব্যয় বাড়াচ্ছি। শিক্ষার্থীরা কেবল পরীক্ষার্থী হয়ে যাবে—গাইড বই, কোচিং আর মুখস্থনির্ভর শিক্ষায় আটকে পড়বে। আসলে আমরা আমাদের বাচ্চাদের গিনিপিগ বানিয়ে ফেলেছি।”

এ প্রসঙ্গে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ বলেন, “স্কলারশিপ বা স্টাইপেন্ড মূলত শিক্ষার্থীদের আরও অনুপ্রাণিত করার জন্য দেওয়া হয়। আমাদের উদ্দেশ্য হচ্ছে শিক্ষার্থীদের উৎসাহিত করা। যেকোনো উদ্যোগই চাইলে অনেকভাবে সমালোচনা করা যায়।”

তিনি আরও বলেন, “রাজনৈতিকসহ নানা পরিস্থিতির কারণে গত বছর এটি স্থগিত ছিল। আমরা বিষয়টি বিবেচনা করে পুনরায় চালু করেছি। আমরা কোচিং বাণিজ্য বন্ধ করতে চাই। তবে বন্ধ করা মানে শুধু নিষেধাজ্ঞা নয়—আমরা স্কুলের ও শিক্ষকদের সক্ষমতা বাড়াব। স্কুলের মধ্যেই অতিরিক্ত সময় রেখে কোচিংয়ের মতো সহায়ক পাঠের ব্যবস্থা করা হবে।”

নীলফামারী জেলার তিল্লাই জয়চন্ডী উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা নাজমুন নাহার মনে করেন, এ বছর পরীক্ষা না নেওয়ার সিদ্ধান্তই বজায় রাখা উচিত ছিল। হঠাৎ সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের কারণে শিক্ষার্থীরা অপ্রস্তুত অবস্থায় ভোগান্তিতে পড়েছে।

অভিভাবকদের দাবি, পরীক্ষা নিতে হলে শিক্ষাবর্ষের শুরুতেই নেওয়া উচিত ছিল। মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের অভিভাবক ইসরাত জাহান বলেন, “আমার বাচ্চা এখন পুরোপুরি ষষ্ঠ শ্রেণির পড়াশোনায় ব্যস্ত। এর মধ্যে আবার ৫ম শ্রেণির পড়া রিভিশন করা ওর জন্য বাড়তি মানসিক চাপ তৈরি করছে।”

সংশ্লিষ্টদের মতে, ৪০০ নম্বরের এই পরীক্ষায় বসতে গিয়ে শিক্ষার্থীরা যেন তাদের বর্তমান শ্রেণির নিয়মিত পড়াশোনা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে না পড়ে, সেদিকে নজর দেওয়া জরুরি। পাশাপাশি দ্রুত বইয়ের সংকট সমাধান না হলে অনেক মেধাবী শিক্ষার্থী এই প্রতিযোগিতা থেকে ছিটকে পড়তে পারে।