বাংলাদেশে বদলে যাওয়া ঈদ শপিং এর গল্প

ব্র্যান্ডের বিস্তার, অনলাইন শপিংয়ের উত্থান এবং নতুন প্রজন্মের রুচি, সব মিলিয়ে ঈদকে ঘিরে তৈরি হচ্ছে নতুন শপিং সংস্কৃতি।

eid shop
ছবিঃ রাজীব ধর

মুসলিম বিশ্বের সবচেয়ে বড় আনন্দের উপলক্ষ বছরের দুটি ঈদ। তার মধ্যে প্রথমে আসে ঈদ-উল-ফিতর, যা আমাদের কাছে রোজার ঈদ নামেও পরিচিত।

দীর্ঘ এক মাস রোজা পালনের পর পরিবার-পরিজনকে নিয়ে একসঙ্গে ঈদ উদযাপন, সুস্বাদু খাবারের আয়োজন এবং নতুন পোশাক পরার আনন্দ, সব মিলিয়ে এই ঈদের আবহই আলাদা। অন্যদিকে ঈদ-উল-আজহায় কোরবানির ব্যস্ততা বেশি থাকায় ঘোরাঘুরি, খাওয়া-দাওয়া ও নতুন জামাকাপড় কেনার ক্ষেত্রে রোজার ঈদই তুলনামূলকভাবে বেশি প্রাধান্য পায়।

নতুন জামাকাপড় ছাড়া ঈদ-উল-ফিতর সাধারণত কল্পনা করা যায় না। এই ঈদে নতুন বা ভালো পোশাক পরার প্রচলন নবী করিম (সা.)-এর সুন্নাহ এবং আরবীয় সংস্কৃতি থেকে শুরু হয়েছে। ইতিহাস বলছে, ৬২৪ খ্রিস্টাব্দে প্রথম ঈদ উদযাপনের সময় থেকেই এই রীতি প্রচলিত। রমজান মাসের সাধনা শেষে নতুন সজীবতা, আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা এবং উৎসবকে বিশেষ মর্যাদা

দেওয়ার প্রতীক হিসেবেই এই ঐতিহ্য গড়ে উঠেছে। যদিও এটি ধর্মীয়ভাবে অপরিহার্য নয়, তবে দীর্ঘদিন ধরে এটি একটি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক রীতিতে পরিণত হয়েছে।

বাংলাদেশে ঈদকে কেন্দ্র করে পোশাক কেনাবেচার ধরন সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ব্যাপকভাবে পরিবর্তিত হয়েছে। মুসলিম-প্রধান দেশ হওয়ায় এখানে ঈদের সময় পোশাক কেনাবেচা ঈদ-উল-ফিতরের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই উপলক্ষকে সামনে রেখে প্রতিবছরই বিভিন্ন ফ্যাশন ব্র্যান্ড বাজারে আনে নতুন নতুন পোশাকের বিশাল সংগ্রহ। দেশীয় পোশাকের পাশাপাশি বাজারে পাকিস্তানি ও ভারতীয় পোশাকের প্রভাবও লক্ষ্য করা যায়।

একসময় বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ ঈদের পোশাক কিনতে ঢাকায় আসত। রাজধানী শহর হওয়ায় বড় ব্র্যান্ডগুলোর মূল আকর্ষণ ছিল ঢাকার মার্কেটগুলো। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই চিত্র বদলেছে। বর্তমানে প্রায় সব বিভাগীয় শহরেই বিভিন্ন ব্র্যান্ডের আউটলেট রয়েছে। উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা এবং ব্যবসা সম্প্রসারণের ফলে অনেক জেলা শহরেও পৌঁছে যাচ্ছে নামিদামি ব্র্যান্ডের পোশাক।

স্মার্টফোন ও ইন্টারনেটের সহজলভ্যতায় বাংলাদেশে অনলাইনে পণ্য কেনাবেচা এখন বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে ঈদকে সামনে রেখে অনলাইন শপিংয়ের প্রবণতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। আগে যেখানে ঈদের কেনাকাটার জন্য মানুষকে বড় বড় শপিং মল বা মার্কেটে ভিড় করতে হতো, এখন অনেকেই ঘরে বসেই মোবাইল ফোনে পছন্দের পোশাক অর্ডার করে ফেলছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক ছোট উদ্যোক্তা, অনলাইন বুটিক এবং ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মগুলো এই পরিবর্তনে বড় ভূমিকা রাখছে। ফেসবুক লাইভ, অনলাইন ক্যাটালগ কিংবা ভিডিও রিভিউ দেখে ক্রেতারা সহজেই পণ্যের ধরন, দাম ও মান সম্পর্কে ধারণা পাচ্ছেন।

সদ্য পড়াশোনা শেষ করা তরুণী নওশিন তারানুমকে শপিংয়ের ক্ষেত্রে কোন মাধ্যমকে প্রাধান্য দেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, “নির্ভর করে ব্যক্তিগত সুযোগ-সুবিধার ওপর। অনলাইনে বেশি করা হয়, কারণ অফলাইন শপিং বেশ সময়সাপেক্ষ। তবে কিছু জিনিস আছে যা অনলাইনে কেনা সম্ভব নয়, সেগুলো অবশ্যই অফলাইনেই কিনতে হয়।”

এদিকে দেশীয় ফ্যাশন ব্র্যান্ডগুলোর মধ্যেও ঈদকে ঘিরে নতুন ধরনের প্রতিযোগিতা তৈরি হয়েছে। প্রতিবছরই তারা ঈদ উপলক্ষে বিশেষ কালেকশন নিয়ে আসে, যেখানে ঐতিহ্যবাহী নকশা ও আধুনিক ফ্যাশনের মিশেল দেখা যায়। জামদানি, খাদি, লিনেন কিংবা হ্যান্ডলুমের মতো দেশীয় কাপড় দিয়ে তৈরি পোশাক এখন অনেক বেশি জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। একই সঙ্গে তরুণ প্রজন্মের রুচির কথা মাথায় রেখে বিভিন্ন ব্র্যান্ড ডিজাইন, রঙ ও কাটে নতুনত্ব আনার চেষ্টা করছে।

ঈদের শপিং সংস্কৃতিতে আরেকটি বড় পরিবর্তন এসেছে কেনাকাটার সময় ও ধরনে। আগে ঈদের কেনাকাটা মূলত শেষ কয়েক দিনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকত। এখন অনেকেই আগেভাগেই কেনাকাটা সেরে ফেলেন, আবার কেউ কেউ অনলাইনে অর্ডার দিয়ে নির্দিষ্ট দিনে ডেলিভারি নিয়ে থাকেন। ফলে বাজারের চাপও ধীরে ধীরে সময়ের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ছে। তবে ঈদের ঠিক আগে মার্কেটগুলোতে মানুষের ঢল নামার দৃশ্য এখনো কমেনি; বরং অনেকের কাছে এই ভিড়ই ঈদের আনন্দের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ।

পরিবারভিত্তিক কেনাকাটার সংস্কৃতিও ঈদের শপিংয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। অনেক পরিবার এখনো একসঙ্গে শপিং মলে গিয়ে কেনাকাটা করতে পছন্দ করেন। এতে কেনাকাটার পাশাপাশি এক ধরনের পারিবারিক বিনোদনের পরিবেশ তৈরি হয়।

শিশুদের জন্য নতুন জামা বেছে নেওয়া, বড়দের সঙ্গে ঘুরে ঘুরে বিভিন্ন দোকান দেখা, সব মিলিয়ে এটি একটি সামাজিক অভিজ্ঞতাও হয়ে ওঠে।

একটি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মাস্টার্সের শিক্ষার্থী মিরাজ আহমেদ পরিবারের জন্য কেনাকাটাকে ঈদের আনন্দের গুরুত্বপূর্ণ অংশ বলে মনে করেন। তিনি অনলাইনের তুলনায় অফলাইন কেনাকাটাকেই বেশি নির্ভরযোগ্য মনে করেন। তিনি মনে করেন, “এখনো অনলাইনকে পুরোপুরি বিশ্বাস করা হয় না। তাই ঈদের মতো সংবেদনশীল সময়ে আমি অফলাইনেই কিনতে পছন্দ করি। ট্রায়াল করে দেখার সুযোগ থাকায় অফলাইন কেনাকাটাই আমার কাছে বেশি নির্ভরযোগ্য।”

অন্যদিকে ছোট ব্যবসায়ী ও অস্থায়ী বিক্রেতাদের জন্যও ঈদ মৌসুম একটি বড় অর্থনৈতিক সুযোগ তৈরি করে। ফুটপাতের দোকান, অস্থায়ী স্টল কিংবা স্থানীয় বাজারগুলোতেও ঈদ উপলক্ষে নতুন পোশাক, জুতা এবং নানা ধরনের অ্যাক্সেসরিজের সমাহার দেখা যায়। সীমিত আয়ের অনেক মানুষের জন্য এসব জায়গাই হয়ে ওঠে ঈদের কেনাকাটার প্রধান ভরসা।

সব মিলিয়ে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশে ঈদকে ঘিরে শপিং সংস্কৃতিতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। ঢাকার বড় মার্কেটকেন্দ্রিক কেনাকাটা থেকে শুরু করে বিভাগীয় ও জেলা শহরে ব্র্যান্ডের বিস্তার, এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অনলাইন কেনাকাটার নতুন ধারা। প্রযুক্তি, যোগাযোগব্যবস্থা এবং ভোক্তাদের পরিবর্তিত রুচির সমন্বয়ে ঈদের শপিং এখন আর শুধু কেনাকাটার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই; বরং এটি হয়ে উঠেছে একটি বৃহৎ সামাজিক ও অর্থনৈতিক আয়োজন।