মিরর সেলফিতে নতুন ট্রেন্ড: স্মার্ট এলইডি মিরর এখন তৈরি হচ্ছে দেশেই
সামাজিক মাধ্যমে মিরর সেলফির চল নতুন নয়। তবে ছবির আয়নাটিতে যদি থাকে শিল্পের ছোঁয়া, তাহলে অভিজ্ঞতাটাও যেন আরও এক ধাপ এগিয়ে যায়। তাই তো বাসাবাড়ি থেকে শুরু করে পার্লার-রেস্টুরেন্ট—সবখানেই আয়নার সৌন্দর্য বাড়াতে এখন সবার মনোযোগ। এ সূত্র ধরেই দেশের বাজারে জনপ্রিয় হয়েছে বিশেষ এক ধরনের আয়না, যার নাম ‘স্মার্ট এলইডি মিরর’।
মিরর সেলফিতে নতুন ট্রেন্ড: স্মার্ট এলইডি মিরর এখন তৈরি হচ্ছে দেশেই
সামাজিক মাধ্যমে মিরর সেলফির চল নতুন নয়। তবে ছবির আয়নাটিতে যদি থাকে শিল্পের ছোঁয়া, তাহলে অভিজ্ঞতাটাও যেন আরও এক ধাপ এগিয়ে যায়। তাই তো বাসাবাড়ি থেকে শুরু করে পার্লার-রেস্টুরেন্ট—সবখানেই আয়নার সৌন্দর্য বাড়াতে এখন সবার মনোযোগ। এ সূত্র ধরেই দেশের বাজারে জনপ্রিয় হয়েছে বিশেষ এক ধরনের আয়না, যার নাম ‘স্মার্ট এলইডি মিরর’।
দামি ফোন কিনেছেন, কিংবা কোনো বিশেষ দিনে নিজেকে সাজিয়েছেন বাড়তি যত্নে? এবার আপনার কাজ কী, বলুন তো? হ্যাঁ, ঠিকই ধরেছেন—আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে একখানা মিরর সেলফি!
সামাজিক মাধ্যমে মিরর সেলফির চল নতুন নয়। তবে ছবির আয়নাটিতে যদি থাকে শিল্পের ছোঁয়া, তাহলে অভিজ্ঞতাটাও যেন আরও এক ধাপ এগিয়ে যায়। তাই তো বাসাবাড়ি থেকে শুরু করে পার্লার-রেস্টুরেন্ট—সবখানেই আয়নার সৌন্দর্য বাড়াতে এখন সবার মনোযোগ। এ সূত্র ধরেই দেশের বাজারে জনপ্রিয় হয়েছে বিশেষ এক ধরনের আয়না, যার নাম ‘স্মার্ট এলইডি মিরর’।
নিজেকে একটু বিশেষ করে দেখা
‘আয়নাতে ঐ মুখ দেখবে যখন, কপোলের কালো তিল পড়বে চোখে।’
আয়না বরাবরই একটি শৌখিন অনুষঙ্গ। তাই নিজেকে দেখার এই সাধারণ যন্ত্রটিকে ঘিরে মানুষের নান্দনিকতার চর্চাও কম নয়। সেই ধারাবাহিকতায় সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে আয়নায় লেগেছে আধুনিকতার ছোঁয়া। আর তাতেই নিজেকে দেখতে লাগছে আরও একটু বিশেষ।
স্মার্ট এলইডি বাতিযুক্ত আয়নাগুলো এখন শুধু ব্যবহারিক প্রয়োজনই মেটাচ্ছে না, ঘরের ভেতরে এনে দিচ্ছে বাড়তি আভিজাত্যের ছোঁয়া। এসব আয়না এখন আধুনিক ইন্টেরিওর ডিজাইনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।
আয়নার চারপাশজুড়ে বসানো থাকে এলইডি বাতি। স্মার্ট সেন্সরে আঙুলের আলতো এক ছোঁয়াতেই ছড়িয়ে পড়ে নরম, মন ভালো করা আলো। আরেক স্পর্শে আলোর রং বদলে যায়—সাদা থেকে সোনালি। এই ছোট্ট পরিবর্তনেই বদলে যায় পুরো ঘরের আবহ। আর আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটির সৌন্দর্যও যেন আরও ফুটে ওঠে।
এই এলইডি মিররগুলোতে থাকে রুচিমাফিক নানা নকশা। আয়নাগুলোর বৈচিত্র্যও চোখে পড়ার মতো—কোনোটি নিখুঁত গোলাকার, কোনোটি পরিপাটি চৌকোনা, আবার কোনোটি বিমূর্ত আকৃতির। আয়নাতেই আলোর উৎস থাকায় প্রতিচ্ছবিটিও হয়ে ওঠে আরও আকর্ষণীয়।
ঢাকার অভিজাত এলাকাগুলোতে এ ধরনের আয়না এখন বেশ জনপ্রিয়। গুলশান, বনানী কিংবা ধানমন্ডির আধুনিক ফ্ল্যাট, হোটেল এবং ‘ফ্যান্সি’ রেস্তোরাঁয় ঢুকলেই চোখে পড়ে ঝকঝকে এলইডি মিরর।
এ নিয়ে কথা হচ্ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী ঐশ্বর্য শওকতের সঙ্গে। তিনি জানান, বিষয়টি এখন আর শুধু উচ্চবিত্তদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। ধীরে ধীরে মধ্যবিত্ত বাসাবাড়িতেও জায়গা করে নিচ্ছে এই স্মার্ট আয়না। তার মতে, এটি এখন শুধু সৌন্দর্যের অনুষঙ্গ নয়, এক ধরনের স্টেটমেন্টও বটে।
“সোশ্যাল মিডিয়ায় ছবি দিতে চাইলে এই এলইডি মিররের মতো পারফেক্ট ব্যাকড্রপ আর হয় না। আয়না থেকে আলো যখন মুখে পড়ে, তখন ছবিটা একটু বেশি ‘এস্থেটিক’ লাগে,” বললেন ঐশ্বর্য।
দেশের বাজারে যেভাবে এলো
উন্নত বিশ্বে এলইডি মিররের ব্যবহার বেশ পুরনো। তবে বাংলাদেশে দৃশ্যপট ছিল কিছুটা ভিন্ন। এতদিন দেশের অভিজাত শ্রেণির এই শৌখিন চাহিদা মিটত মূলত চীন থেকে আমদানিকৃত আয়নার মাধ্যমে। কিন্তু সেই পথে ছিল দুটি বড় বাধা—আকাশছোঁয়া আমদানি শুল্ক এবং পরিবহন খরচ। ফলে সাধারণ ক্রেতার কাছে এই আয়নার দাম হয়ে যেত আকাশচুম্বী।
আবার একসঙ্গে প্রচুর পণ্য আনার বাধ্যবাধকতা থাকায় সাধারণ ব্যবসায়ীদের পক্ষে এই ব্যবসায় পুঁজি বিনিয়োগ করাও ছিল বেশ দুঃসাধ্য। ফলে দীর্ঘ একটা সময় এসব আয়না দেখা যেত কেবল উচ্চবিত্তের লিভিংরুমেই।
তবে একদিন সাধারণ মানুষের মধ্যেও যে এলইডি মিররের চাহিদা তৈরি হবে, এমনটি আগেই ভেবেছিলেন মোহাম্মদ সোলায়মান হক সোহাগ। তার বাবা মোহাম্মদ সামসু কয়েক যুগ ধরে বাবুবাজারে আয়নার পাইকারি ব্যবসা করছেন। আয়না নিয়ে এই পারিবারিক ব্যবসার সঙ্গে বেড়ে ওঠা সোহাগ বুঝতে পেরেছিলেন, ভবিষ্যতের আয়না আর শুধু সাধারণ ফ্রেমে আবদ্ধ থাকবে না; প্রযুক্তির ছোঁয়ায় এলইডি মিররই হয়ে উঠবে নতুন ট্রেন্ড। সেই ভাবনা থেকেই ২০১৯ সালে সাধারণ ক্রেতাদের জন্য তিনি এলইডি মিরর তৈরির উদ্যোগ নেন।
তবে এ পথ মোটেও মসৃণ ছিল না। এলইডি মিররের স্মার্ট সেন্সর, বাতি এবং অন্যান্য উপকরণ খুঁজে বের করতে তিনি পাড়ি জমান ভারতের রাজধানী দিল্লিতে। সেখানকার বিভিন্ন মার্কেট ঘুরে বেশ কিছু পণ্য কেনেন। পরিকল্পনা ছিল, সেসব পণ্য ট্রেনে করে দেশে পাঠাবেন। কিন্তু সীমান্তে আটকে যায় পুরো চালান। সেই ধাক্কায় থেমে না গিয়ে পরবর্তী প্রচেষ্টায় সফলতা পান তিনি।
দেশে ফিরে পরিবারের পুরোনো আয়নার ব্যবসার পাশাপাশি নিজস্ব কারখানায় এলইডি মিরর তৈরির কাজ শুরু করেন। ধীরে ধীরে তার এই উদ্যোগই তাকে এনে দেয় সাফল্য। তার দেখাদেখি আরও অনেকেই এই কাজে যুক্ত হন। এভাবেই বিদেশি পণ্যের ওপর নির্ভরতা কমতে থাকে, আর দেশীয় এলইডি মিররেই সাজতে শুরু করে বাসা, সেলুন, বিউটি পার্লারসহ নানা সৌখিন জায়গা।
পুরান ঢাকার বাবুবাজারে মোনা কমপ্লেক্সের নিচতলা পুরোটা ‘গ্লাস মার্কেট’ নামে পরিচিত। সেখানেই সারি সারি কাচ–আয়নাবিক্রেতার মাঝখানে রয়েছে মোহাম্মদ সোলায়মান হক সোহাগের দোকান ‘মেসার্স সামসু গ্লাস হাউস’। পাশের মার্কেটেই রয়েছে তার কারখানা। এই ছোট দোকান থেকেই তিনি সারাদেশে ছড়িয়ে দিচ্ছেন সৌখিন এসব আয়না।
“বিদেশ থেকে আয়না আমদানিতে ১৩৩ শতাংশ শুল্ক দিতে হয়। যে আয়না আমার কাছে ৭ হাজার টাকায় পাবেন, সেটি আমদানি করলে খরচ পড়ত ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা। এ কারণেই আমি দেশে তৈরির উদ্যোগ নিয়েছি,” বললেন সোহাগ।
বাবুবাজারের মোনা কমপ্লেক্সে রয়েছে আরও একাধিক দোকান। ব্যবসায়ীরা জানান, এলইডি মিরর তৈরিতে মূলত দুই ধরনের কাচ ব্যবহৃত হয়। এরমধ্যে চীন থেকে আমদানি করা কাচ তুলনামূলক সস্তা। ফলে বাজেটের মধ্যে আয়না নিতে চাইলে সেটিই জনপ্রিয় পছন্দ।
অন্যদিকে ‘বেলজিয়ান গ্লাস’ নামে পরিচিত উন্নত মানের কাচ ব্যবহার করে আয়না তৈরি করলে খরচ কিছুটা বেড়ে যায়। তবে এর প্রতিফলন এবং স্থায়িত্ব বেশি বলে জানান ব্যবসায়ীরা।
অনলাইনে বিক্রি বেশি
রাজধানীর উত্তরা, মিরপুর, মোহাম্মদপুর এবং হাতিরপুলে এলইডি মিররের বেশ কিছু দোকান রয়েছে। এসব দোকান ঘুরলেই চোখে পড়ে নানা আকার, নকশা এবং আলোর আয়নার সম্ভার। তবে ঢাকার বাইরের ক্রেতাদের জন্য অনলাইন পেজগুলোই এখন প্রধান ভরসা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আয়নার ব্যবসা বেশ জমে উঠেছে।
সোহাগ জানান, তিনি পাইকারি ও খুচরা—দুই ধরনের বিক্রিই চালিয়ে যাচ্ছেন। তার কাছ থেকে পণ্য নিয়ে অনেকেই খুচরা কিংবা অনলাইন ব্যবসায় নেমে সফল হয়েছেন।
তিনি বলেন, “অনেকে আমার কাছ থেকে আয়না নিয়ে ফেসবুক পেজ খুলে বিক্রি শুরু করেছেন। আমি নিজেও খুচরা বিক্রি এবং অনলাইনে মনোযোগ বাড়াচ্ছি।”
তবে অনলাইনে আয়না বিক্রির পথে প্রধান বাধা হলো পরিবহন। একাধিক অনলাইন ব্যবসায়ী জানান, কাচের পণ্য হওয়ায় এলইডি মিরর পরিবহনে ঝুঁকি থাকে। বিশেষ প্যাকেজিংয়ের প্রয়োজন হয়, ফলে কুরিয়ার খরচও তুলনামূলক বেড়ে যায়। আবার অনেক সময় ক্রেতারাও আস্থা রাখতে পারেন না। তবুও এসব সীমাবদ্ধতার মধ্যেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমজুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে এলইডি মিররের ঝকঝকে বিজ্ঞাপন।
অনলাইনে বেশ সুনামের সঙ্গে ব্যবসা করছে ‘মিরর ডেকর বিডি’। তাদের প্রচারণার মূল বক্তব্য—ঘরের সৌন্দর্য এবং ব্যক্তিত্ব, দুটোই একসঙ্গে ফুটে উঠবে তাদের এলইডি টাচ মিররে।
প্রতিষ্ঠানটির মালিক জানান, তাদের প্রধান ক্রেতা নারীরা। বিশেষ করে তরুণীদের লক্ষ্য করেই অনলাইন বিজ্ঞাপন সাজানো হয়।
তিনি বলেন, “মূলত আপুরাই মিররগুলো বেশি পছন্দ করেন। পার্লারে মেকআপ করা কিংবা বাড়িতে সাজগোজের জন্য আমাদের কাছ থেকে আয়না নিচ্ছেন তারা।”
দামের দিক থেকে অবশ্য অফলাইন দোকানগুলো খুচরা ক্রেতাদের জন্য তুলনামূলক সুবিধাজনক। ‘মিররস ওয়ার্ল্ড’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান জানায়, তারা প্রতি বর্গফুট এক হাজার থেকে বারোশো টাকা দরে আয়না বিক্রি করে।
অন্যদিকে মেসার্স সামসু গ্লাস হাউসে কিছুটা কম দামে পাওয়া যায় এসব আয়না। এখানে প্রতি বর্গফুট ৭০০ থেকে ৯৫০ টাকার মধ্যেই এলইডি মিরর পাওয়া যায়। প্রতিটি আয়নায় রয়েছে দুই বছরের ওয়ারেন্টি।
সোহাগ জানান, আয়নাগুলো স্ট্যান্ডসহ তৈরি করা যায় এবং ক্রেতার চাহিদা অনুযায়ী যে কোনো সাইজে বানিয়ে দেওয়া সম্ভব। ফ্রন্ট লাইট এবং ব্যাক লাইট—দুই ধরনের অপশনই রয়েছে। এর পাশাপাশি রয়েছে বিভিন্ন কাস্টমাইজেশনের সুবিধা।
চাইলে আয়নায় কোনো প্রতিষ্ঠানের নাম, লোগো কিংবা ব্যক্তিগত নামও যুক্ত করা যায়। ডিজাইন, আকৃতি এবং আলোর ধরন অনুযায়ী দামও কমবেশি হয়। এছাড়া তাদের কাছে ‘স্টোন এলইডি মিরর’ নামে আকর্ষণীয় কিছু ডিজাইনও রয়েছে বলে জানালেন সোহাগ।
তবে মধ্যবিত্তের সাধ্যের মধ্যে এই আয়না এসেছে মূলত দেশীয় উৎপাদন শুরু হওয়ার পর থেকেই। হাতিরপুলের দোকানগুলোয় একসময় প্রতি বর্গফুট এলইডি মিররের দাম ছিল ২ হাজার ৪০০ টাকা। এখন তা নেমে এসেছে ৮০০ থেকে ৯০০ টাকায়।
হাতিরপুলের আয়নার দোকানি মো. রশিদ (ছদ্মনাম) জানান, এলইডি মিররের কেনাবেচা এখন বেশ ভালোই চলছে। প্রায় দুই বছরের অভিজ্ঞতায় তিনি মানুষের মধ্যে এ আয়না নিয়ে আগ্রহ বাড়তে দেখেছেন।
তার ভাষ্যে, “আগে মানুষ শুধু সাধারণ আয়নাতেই অভ্যস্ত ছিল, এখন সেই ঝোঁক স্পষ্টভাবে এলইডি মিররের দিকে যাচ্ছে।”
ভবিষ্যতেও এলইডি মিররের ব্যবসায় সম্ভাবনা দেখছেন প্রায় সব বিক্রেতাই।