লোভনীয় ডেজার্টের আদলে বানানো মোমবাতি যেভাবে বদলে দিল দুই বোনের গল্প
জন্মদিন, বিয়ে, মেহেদি কিংবা গায়েহলুদের উপহার হিসেবেও অনেকে এখান থেকে কাস্টমাইজড অর্ডার করেন। প্রতিটি অর্ডারের সাথে তারা কার্ড যুক্ত করে বিশেষ সাজে ক্যান্ডেলগুলো সাজিয়ে দেন। ইভেন্টভিত্তিক অর্ডারের ক্ষেত্রে ডিজাইনের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয় বিধায় এগুলোর দাম কিছুটা বেশি হতে পারে।
লোভনীয় ডেজার্টের আদলে বানানো মোমবাতি যেভাবে বদলে দিল দুই বোনের গল্প
জন্মদিন, বিয়ে, মেহেদি কিংবা গায়েহলুদের উপহার হিসেবেও অনেকে এখান থেকে কাস্টমাইজড অর্ডার করেন। প্রতিটি অর্ডারের সাথে তারা কার্ড যুক্ত করে বিশেষ সাজে ক্যান্ডেলগুলো সাজিয়ে দেন। ইভেন্টভিত্তিক অর্ডারের ক্ষেত্রে ডিজাইনের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয় বিধায় এগুলোর দাম কিছুটা বেশি হতে পারে।
ফেসবুকে একখানা লোভনীয় ডেজার্টের ছবি সামনে এল আচমকা। ডেজার্ট অর্ডার করতে ডিটেইলসে ঢুকে দেখি, সুগন্ধি মোমবাতি। কেবল ঘুম থেকে উঠেছি তখন। ভাবলাম ঘুমের ঘোরে ভুল দেখছি বোধ হয়।
পাকা আমের এত সুন্দর একটা ডেজার্ট, মোমবাতি হয় কেমন করে? পেজটি স্ক্রল করতে গিয়ে বোঝা গেল, নানা খাবারের ছাঁচে বানানো মোমবাতি।
বেশ মজা লাগল ব্যাপারটা। সত্যি তো, কত শোপিস দেখি; খাবারের অনুকরণে এমন অনন্য জিনিস আগে তো কখনো দেখিনি। রেড ভেলভেট কাপকেক, ম্যাঙ্গো শেক, কিটক্যাট শেক… দেখে মনে হবার জো নেই এটি সত্যিকারের খাবার নয়। অবশ্য এই ভ্রান্তি আমার একলার নয়।
‘সেদিন আমরা দুই বোনের কেউই বাড়িতে ছিলাম না। আমাদের এক আত্মীয় টেবিলে ডেজার্ট সাজানো দেখে হাতে নিয়ে প্রায় খেতে শুরু করেছিলেন। পরে আম্মু এসে যখন বলেন এটি মোমবাতি, তিনি কিছুতেই মানবেন না। অগত্যা আম্মুকে মোমবাতি জ্বালিয়েই প্রমাণ দিতে হয়।’ হাসতে হাসতে এই মজার গল্প জানাচ্ছিলেন ‘ক্যান্ডেল ব্লো বাই সিস্টার্স’ পেজের স্বত্বাধিকারী দুই খাদ্যরসিক বোন—সুনয়না ইসলাম হ্রিদিতা এবং তয়রূন নূর এলিনা।

ছবি: সৌজন্যে প্রাপ্ত
শুরুর কথা
বড় বোন হ্রিদিতা বলেন, ‘ছোটবেলা থেকেই আমাদের দুজনের সৃজনশীল কাজের প্রতি আলাদা ঝোঁক ছিল। নানা রকম ক্রাফটের জিনিস আমরা বানাতাম। তবে ডিজাইনার ক্যান্ডেল তৈরির পরিকল্পনাটি মূলত আসে ছোট বোন এলিনার মাথা থেকে। সে ইনস্টাগ্রামে মোমবাতি তৈরির বিভিন্ন ভিডিও দেখত। অন্যদিকে পিনটারেস্টে নান্দনিক নকশার মোমবাতি বানানো দেখে এক ধরনের আকর্ষণ বোধ করত এলিনা। একদিন এলিনাই প্রস্তাব দিল, এখন তো সবাই অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে ছোটখাটো ব্যবসা করছে, আমরা কেন মোমবাতি নিয়ে কিছু শুরু করছি না?’
‘আমি প্রথমে বিষয়টিকে ততটা গুরুত্ব দিইনি। পড়াশোনা শেষ করে তখন আমি একটি চাকরিতে যোগ দিয়েছি, তাই ব্যবসার কথা ভাবিনি। এছাড়া কিছুটা দ্বিধাও কাজ করছিল। ক্যান্ডেল আমাদের দেশে তুলনামূলক শৌখিন ও দামি পণ্য। সাধারণ মানুষ এটি কতটুকু গ্রহণ করবে, তা নিয়ে আমি যথেষ্ট সন্দিহান ছিলাম। যখন লাভের অনিশ্চয়তার কথা বললাম, এলিনা হাসিমুখে উত্তর দিল—কেউ না কিনলেও আমরা অন্তত ভিডিও বানিয়ে ফেসবুকে দেব!’ হ্রিদিতা যোগ করেন।
শেষ পর্যন্ত ঝুঁকিটা তারা নিয়েই নিলেন। সময়টা ছিল গত বছরের জুলাই মাস। ছোট বোনের আবদার মেটাতে অবসর সময়ে মাত্র ৬ হাজার টাকা বিনিয়োগ করে শুরু হলো মোমবাতি বানানোর কাজ। কাঁচামাল ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম কেনা হলো। কেরানীগঞ্জের বাসায় বসেই তারা নিপুণ হাতে তৈরি করতে লাগলেন বিভিন্ন নকশার মোমবাতি। বানানোর পাশাপাশি এগুলোর ছবি ও ভিডিও করে আপলোড করতেন পেজে। শুরুতে প্রত্যাশা ছিল সামান্য। এমনকি এক বছরের মধ্যে বিক্রি হবে কি না, সেটি নিয়েও ছিল সংশয়। একেবারে নতুন পেজ হওয়ায় রেসপন্সও আসছিল ধীরলয়ে। কিন্তু সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে মানুষের পছন্দের তালিকায় জায়গা করে নিল তাদের কাজ।

ছবি: সৌজন্যে প্রাপ্ত
হ্রিদিতা স্মৃতিচারণা করে বলেন, ‘একদিন একটি আমের মিল্কশেকের ছবি দেখে মাথায় এল, এই ডিজাইনটি যদি মোমবাতির মাধ্যমে করা যায়, তবে কেমন হবে? আমরা দুজনেই খেতে খুব ভালোবাসি, তাই ডেজার্টের ছাঁচে মোমবাতি তৈরির আইডিয়াটা সেখানেই দানা বাঁধে। সেই ভাবনা থেকেই প্রথম ডেজার্ট থিম ক্যান্ডেল বানানো শুরু করি। মানুষ দেখে সত্যিই অবাক হতো, অনেকে বুঝতেই পারত না যে ওটা ক্যান্ডেল, ভাবত আসল খাবার!’
শুরুতে তাদের কাছে পর্যাপ্ত ছাঁচ [মোল্ড] ছিল না, কারণ ভালো মানের ছাঁচ বেশ ব্যয়বহুল আর তাদের পুঁজিও ছিল সীমিত। কিন্তু অদম্য এই দুই বোন দমে যাননি। ব্যবসা শুরুর মাত্র এক সপ্তাহের মাথায় তারা প্রথম অর্ডার পান। এত দ্রুত সাড়া পাবেন, তা ছিল কল্পনারও অতীত। সেই থেকে শুরু, আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। ‘আল্লাহর রহমতে এখন প্রতি মাসেই আমাদের কাছে প্রচুর অর্ডার আসে,’ বলছিলেন হ্রিদিতা।
অর্ডার যখন ২৩০০ ক্যান্ডেল
উদ্যোক্তা হিসেবে নিজেদের ডানা মেলার গল্প শোনালেন হ্রিদিতা । ‘মাত্র ৭৫০ জন ফলোয়ার নিয়ে আমাদের ব্যবসার বয়স তখন মাত্র তিন মাস। হুট করেই পেজে নক দিয়ে এক ভাইয়া ক্যান্ডেলের দাম জানতে চাইলেন এবং একসাথে ২২০০ পিস ক্যান্ডেলের অর্ডার দিলেন! আমরা তো প্রথমে বিশ্বাসই করতে পারছিলাম না। পরে তার অফিসে গিয়ে স্যাম্পল দেখালাম। অনেক অভিজ্ঞ প্রতিযোগী থাকলেও শেষ পর্যন্ত তারা আমাদের ওপরই ভরসা রাখলেন। মূলত অফিসের একটি অনুষ্ঠানের জন্য রিটার্ন গিফট হিসেবে এই অর্ডারটি দেওয়া হয়েছিল। পরে সংখ্যাটি বেড়ে দাঁড়ায় ২৩০০ পিসে।’

ছবি: সৌজন্যে প্রাপ্ত
‘তাদের সঙ্গে চুক্তি ছিল, মাত্র ৭ দিনে সব সরবরাহ করতে হবে। অগ্রিম টাকা পাওয়ার পর থেকে শুরু হলো আমাদের কঠিনতম পরীক্ষা। দিনরাত নাওয়া-খাওয়া ভুলে মোম, ছাঁচ আর সুগন্ধি নিয়ে পড়ে থাকতাম আমরা। এমনকি একদিন তো চুলায় মোম গলতে দিয়ে বেমালুম ভুলে গিয়েছিলাম, আরেকটু হলে বড় একটা দুর্ঘটনা ঘটে যেত। এভাবে অনেকখানি চেষ্টা, আম্মার সহযোগিতা আর আমাদের নির্ঘুম রাতের গল্প ২৩০০ ক্যান্ডেলে রূপ নেয়। আমাদের ছোট্ট ব্যবসার বড় অভিজ্ঞতার গল্প এটি। এই অর্ডারই আমাদের শিখিয়েছে কোনো কিছুকেই ছোট করে না দেখতে; শিখিয়েছে নিজের ওপর আত্মবিশ্বাস রাখতে।’
দাম ও আদ্যোপান্ত
অনলাইনের পাশাপাশি অফলাইনে এখনো তাদের কোনো শোরুম নেই। তাদের পেজে মোমবাতির দাম শুরু হয় মাত্র ৪০ টাকা থেকে, যা সর্বোচ্চ ৬০০ টাকা পর্যন্ত হতে পারে। হ্রিদিতা জানান, শুরুতে অনলাইন ডেলিভারির খুঁটিনাটি খুব একটা বুঝতেন না, ছিল নানা জিজ্ঞাসা। তবে এখন পুরো প্রক্রিয়াটি তারা বেশ দক্ষতার সাথে সামলাচ্ছেন।
জন্মদিন, বিয়ে, মেহেদি কিংবা গায়েহলুদের উপহার হিসেবেও অনেকে এখান থেকে কাস্টমাইজড অর্ডার করেন। প্রতিটি অর্ডারের সাথে তারা কার্ড যুক্ত করে বিশেষ সাজে ক্যান্ডেলগুলো সাজিয়ে দেন। ইভেন্টভিত্তিক অর্ডারের ক্ষেত্রে ডিজাইনের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয় বিধায় এগুলোর দাম কিছুটা বেশি হতে পারে।

ছবি: সৌজন্যে প্রাপ্ত
এ ছাড়া এই মোমবাতিগুলোতে ব্যবহৃত হয় নানা বৈচিত্র্যময় সুগন্ধি। ক্রেতারা চাইলে ভ্যানিলা, স্ট্রবেরি, চকলেট, চন্দন বা ল্যাভেন্ডারের মতো সুগন্ধি কাস্টমাইজ করে নিতে পারেন। তবে চন্দনের ফ্লেভারটিই এখন পর্যন্ত সবথেকে জনপ্রিয় বলে জানান হ্রিদিতা। মূলত ঘর সাজাতে কিংবা এসি রুমে জমে থাকা ভ্যাপসা গন্ধ দূর করতে এই সেন্টেড ক্যান্ডেলগুলো বেশ কার্যকর।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
২০২৫ সালের জুলাইয়ে দুই বোন আনুষ্ঠানিকভাবে কেরানীগঞ্জ থেকে এই ব্যবসার যাত্রা শুরু করলেও ওই বছরের অক্টোবর মাসেই বড় এক অর্ডারের মাধ্যমে তাদের ভাগ্যের চাকা ঘুরে যায়। স্বপ্ন দেখার বয়স এখনো এক বছর পেরোয়নি, কিন্তু এরই মধ্যে অর্জনের ঝুলি বেশ সমৃদ্ধ। বর্তমানে প্রতিদিন গড়ে ১০-১৫টি অর্ডার পান তারা, আর বড় কোনো ইভেন্ট থাকলে অর্ডারের সংখ্যা শতক ছাড়িয়ে যায়।
নিজেদের ব্যবসার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে তয়রূন নূর এলিনা বলেন, ‘আমরা আমাদের এই ব্যবসাকে আরও বড় করতে চাই। অনলাইনের গণ্ডি পেরিয়ে অফলাইনে একটি দোকান খোলার ইচ্ছে আছে আমাদের। বাকিটা ওপরওয়ালার ইচ্ছা।’

ছবি: সৌজন্যে প্রাপ্ত
নতুন উদ্যোক্তাদের উদ্দেশে এলিনা পরামর্শ দেন, ‘যারা নতুন কিছু শুরু করতে চান, আগে নিশ্চিত হোন আপনি ঠিক কী করতে চান এবং কেন করতে চান। পর্যাপ্ত জানাশোনা নিয়ে ব্যবসায় নামতে হবে। অনেক সময় আমরা শুনি মাত্র ২০০ টাকা বিনিয়োগ করে কেউ সফল ব্যবসায়ী হয়েছেন; এসব কথা সব সময় সত্যি নয়। ব্যবসায় ধাপে ধাপে বিনিয়োগ বাড়াতে হয়। তাছাড়া লাভ-ক্ষতির ব্যাপারেও সচেতন থাকা জরুরি। স্রোতে গা ভাসালে কোনোভাবেই সফল হওয়া সম্ভব না।’
এই দুই বোনের গল্প কেবল একটি সফল ব্যবসার নয়, বরং ঘরে বসে নিজের স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার এক আখ্যান। কঠোর পরিশ্রম আর নিজের ওপর বিশ্বাস রাখলে ছোট্ট একটি শখও যে বিশাল সাফল্যে পরিণত হতে পারে, হ্রিদিতা ও এলিনা তারই জলজ্যান্ত প্রমাণ।