শীতের ৪ মাস খেজুর গাছ কাটতে তারা পাড়ি দেন ১০০ মাইল
গ্রামের ভেতর দিয়ে যাওয়া রাস্তার দুই ধারে সারি সারি প্রায় অর্ধসহস্রাধিক খেজুর গাছ। সকাল আর রাতে রস কিনতে মানুষের ভিড় লেগেই থাকে। এই রস থেকেই তৈরি হয় পিঠা, পায়েস, ক্ষীর। গাছিরা বানান ঝোলা আর পাটালি গুড়। এসব গুড় চলে যায় দেশে-বিদেশে থাকা আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুদের কাছে উপহার হিসেবে।
শীতের ৪ মাস খেজুর গাছ কাটতে তারা পাড়ি দেন ১০০ মাইল
গ্রামের ভেতর দিয়ে যাওয়া রাস্তার দুই ধারে সারি সারি প্রায় অর্ধসহস্রাধিক খেজুর গাছ। সকাল আর রাতে রস কিনতে মানুষের ভিড় লেগেই থাকে। এই রস থেকেই তৈরি হয় পিঠা, পায়েস, ক্ষীর। গাছিরা বানান ঝোলা আর পাটালি গুড়। এসব গুড় চলে যায় দেশে-বিদেশে থাকা আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুদের কাছে উপহার হিসেবে।
এক পাশে মধুমতী নদী, অন্য পাশে নবগঙ্গা। গ্রামের নাম পলাশবাড়ী। মাগুরা জেলার মোহাম্মাদপুর উপজেলার এই গ্রামটি শীত এলেই মানুষের কাছে আলাদা আগ্রহের জায়গা হয়ে ওঠে। কারণ একটাই—খেজুরের রস আর তা থেকে তৈরি খাঁটি গুড়।
গ্রামের ভেতর দিয়ে যাওয়া রাস্তার দুই ধারে সারি সারি প্রায় অর্ধসহস্রাধিক খেজুর গাছ। সকাল আর রাতে রস কিনতে মানুষের ভিড় লেগেই থাকে। এই রস থেকেই তৈরি হয় পিঠা, পায়েস, ক্ষীর। গাছিরা বানান ঝোলা আর পাটালি গুড়। এসব গুড় চলে যায় দেশে-বিদেশে থাকা আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুদের কাছে উপহার হিসেবে।
তবে এই গ্রামের একটি বিশেষ দিক হলো—গুড় তৈরির কারিগরেরা কেউই স্থানীয় নন। প্রায় ১০০ মাইল পথ পাড়ি দিয়ে তারা এসেছেন রাজশাহীর বাঘা উপজেলা থেকে। শীতের চার মাসের জন্য গ্রামেই একটি ছোট ঘর তুলে থাকেন। প্রায় নয় বছর ধরে পলাশবাড়ীর খেজুর গাছকে ঘিরেই গড়ে উঠেছে তাদের সাময়িক জীবন ও জীবিকা।

গাছে ওঠার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
৯ বছর আগে একদিন
প্রায় নয় বছর আগে চাকরিসূত্রে রাজশাহীতে ছিলেন পলাশবাড়ীরই বাসিন্দা দাউদ হোসেন মোল্লা। সেখানে কয়েকজন গাছিকে দেখে তার মনে পড়ে যায় নিজ গ্রামের খেজুর গাছগুলোর কথা। তখনই তিনি তাদের পলাশবাড়ীতে আসার প্রস্তাব দেন। গ্রামে এসে খেজুর গাছ আর মানুষের আতিথেয়তায় মুগ্ধ হন গাছি হাফিজুর রহমান। সেখান থেকেই শুরু হয় এই গ্রামের সঙ্গে তার দীর্ঘদিনের সম্পর্ক।
হাফিজুর রহমান বাঘা উপজেলার বাসিন্দা। ১০ বছর বয়স থেকেই খেজুর গাছ কেটে রস সংগ্রহ আর গুড় তৈরির কাজ করছেন। রাজশাহীতে গুড়ের দাম তুলনামূলক কম হওয়ায় আশপাশের এলাকাতেও কাজ করতেন তিনি। তবে মাগুরায় এসে চিত্রটা বদলে যায়। এখানে গুড়ের চাহিদা বেশি, দামও ভালো। তাই শীতের মৌসুমে মাগুরাকে বেছে নিতে বেশি ভাবতে হয়নি তাকে।
এবার পাঁচজন গাছি দুই দলে ভাগ হয়ে কাজ করছেন। হাফিজুরের দলে আছেন তিনজন। কার্তিক মাসের শুরুতেই তারা গ্রামে এসে গাছগুলো পরিষ্কার করে রস সংগ্রহের উপযোগী করতে শুরু করেন। এতে কয়েক সপ্তাহ সময় লেগেছে। গ্রামের এক পাশে ভাড়া বাসায় থাকেন তারা। মাঘ মাসের শেষে ফিরে যাবেন নিজ এলাকায়।

এই গ্রামে ৪ মাস থাকেন গাছিরা।
গাছিদের দিন শুরু হয় খুব ভোরে। তীব্র শীতেও সূর্য ওঠার আগেই কাজে নামতে হয়। ভোরে রস নামিয়ে আনার পর শুরু হয় গুড় তৈরির প্রক্রিয়া। বিকেলে আবার হাঁড়ি বাঁধতে গাছে উঠতে হয়। রাতে অনেক তরুণ আসেন কাঁচা রস খেতে। তাদের জন্যও আবার গাছ থেকে রস পেড়ে আনতে হয়।
হাফিজুর জানান, পলাশবাড়ীর সারি সারি গোছানো খেজুর গাছ দেখেই তার জায়গাটা ভালো লেগেছিল। তার দল এবার প্রায় ৩২০টি গাছ নিয়েছে। প্রতিদিন সব গাছের রস সংগ্রহ করা হয় না। গাছগুলো দুই ভাগ করে সপ্তাহে তিন দিন করে রস নামানো হয়, বাকি তিন দিন গাছগুলোকে বিশ্রাম দেওয়া হয়।
গুড়ের ব্যাপক চাহিদাই তাদের টেনে আনে
দুপুরের পর কাজ করতে করতেই একের পর এক ক্রেতা আসছিলেন গুড় কিনতে। কিন্তু অনেককেই ফিরতে হয় খালি হাতে। ঘরে প্রস্তুত গুড় নেই। নতুন করে তৈরি করতে হবে। এজন্য অন্তত এক সপ্তাহ আগে অর্ডার দিতে হয়। হাফিজুরের হাত ধরেই এই গ্রামে এসেছিলেন মোহাম্মাদ আফতাব। একজন সহযোগী নিয়ে তিনি গ্রামের অন্য পাশে দুই বছর ধরে গাছ কাটছেন।

রসের আগাম অর্ডার দিচ্ছেন তারা।
তিনি জানান, আশপাশের এলাকার চাহিদা মেটাতেই তাদের হিমশিম খেতে হয়। মাগুরার বাইরেও অর্ডার আসে, তবে সব অর্ডার রাখা সম্ভব হয় না।
গাছিরা বলেন, গুড়ের চাহিদা এত বেশি যে কোনো গুড়ই মজুত করে রাখা যায় না। এখন শুধু স্থানীয় এলাকাই নয়, দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে, এমনকি দেশের বাইরে থেকেও অর্ডার আসে। প্রবাসীরা খাঁটি দেশি গুড়ের স্বাদ পেতে চান। কেউ আত্মীয়স্বজনের মাধ্যমে, কেউ ব্যবসায়িকভাবে অর্ডার দেন। এসব অর্ডার পূরণ করতেই তৈরি হওয়া গুড়ের বড় একটি অংশ চলে যায়।
“বিদেশ থেকে একজন ৬০ কেজি গুড়ের অর্ডার দিয়েছেন। এমন অর্ডার প্রায় প্রতিদিনই আসে। কিন্তু সব দিতে পারি না। অনেক অর্ডার বাতিল হয়ে যায়,” জানালেন এক গাছি।
মাগুরার ছেলে হানিফ হোসেন ঢাকায় ব্যবসা করেন। তিনি ১৩ কেজি পাটালি গুড়ের অর্ডার দিয়েছেন। এগুলো ঢাকায় নিয়ে যাবেন বন্ধুদের জন্য। গুড় এখনও প্রস্তুত হয়নি, তাই আবারও খোঁজ নিতে এসেছেন তিনি।

রাস্তার দুই ধারে সারি সারি খেজুর গাছ।
হানিফ বলেন, “আমার বন্ধুবান্ধব সবাই শুনেছে, আমার এলাকায় ভালো গুড় পাওয়া যায়। এই ভেজালের যুগে সবাই তো ভালোটা চায়। তাই ওদের জন্য নিচ্ছি। খাইয়ে ভালো বললে আবারও নেব।”
খেজুরের রসের চাহিদাও কম নয়। কাঁচা রস পান করতে ভোরে আর রাতে পলাশবাড়ীর রাস্তায় ভীষণ ভিড় জমে। সকাল ও সন্ধ্যায় প্রতি লিটার কাঁচা রস ৭০ টাকা করে বিক্রি হয়। রস বেশি বিক্রি হওয়ায় গুড় বানানোর সুযোগ কমে যাচ্ছে।
গাছি আফতাব জানান, রস বিক্রি তুলনামূলকভাবে বেশি লাভজনক। গুড় তৈরিতে বাড়তি পরিশ্রম আর জ্বালানির দরকার হয়। তাই দিন দিন গুড়ের উৎপাদন কমছে। তবে রস হোক বা গুড়—পলাশবাড়ীতে এসে কাজ করে তারা লাভবান হচ্ছেন।

গাছিরা খুশি, লাভবান গৃহস্থ
গাছপ্রতি মালিকদের দুই কেজি করে গুড় দিতে হয় গাছিদের। কেউ কেউ কাঁচা রস নেন। বাকি রস দিয়ে যা উৎপাদন হয়, তা গাছিদেরই থাকে।
আফতাব জানান, শীতের চার মাস রস আর গুড় বিক্রি করে ভালো পরিমাণ আয় নিয়ে তারা গ্রামে ফেরেন। গরমের মৌসুমে আমের বাগান কিনে ব্যবসা করেন। শীত এলেই আবার পলাশবাড়ীতে ফিরে আসেন।
এবার আফতাব আর তার সহযোগী মফিজের গাছের সংখ্যা ১২০টি। এর মধ্যে ৬০টি গাছের রস দিয়ে দিনে ১৮ থেকে ২০ কেজি গুড় তৈরি করা যায়। এতে আশপাশের এলাকার চাহিদা মোটামুটি মিটে যায়। দিনরাত নিরবচ্ছিন্ন পরিশ্রমের ন্যায্য মূল্য পাচ্ছেন তারা।
গাছিদের কাজকর্ম আর আচরণে গাছের মালিকেরাও সন্তুষ্ট। দাউদ হোসেন জানান, প্রায় নয় বছর ধরে কোনো ঝামেলা ছাড়াই তারা গ্রামে এসে কাজ করছেন।

তিনি বলেন, “গাছিদের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক ভালো। আমরা কোনো টাকাপয়সা নিই না। ওরা আমাদের রস খাওয়ায়, পিঠা-পায়েসের জন্য গুড় দেয়, আত্মীয়স্বজনদের দিই। এতেই আমরা খুশি। ওদেরও রোজগার হচ্ছে, আমরাও গুড় পাচ্ছি।”
একসময় এলাকার অনেক খেজুর গাছই পড়ে ছিল অলস। হাফিজ-আফতাবরা আসার পর সেগুলো থেকে আবার রস নামছে। তাই এলাকার মানুষও তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতার কথা জানান।
ভ্যানচালক মোহাম্মাদ শাহজাহান মোল্লা বলেন, “বছর দশেক আগেও এসব গাছ কেটে রস নামানোর কেউ ছিল না। লোকের অভাব ছিল। বাইরের গাছিরা এসে এই গাছগুলো থেকে রস নামাচ্ছে। এখন তো মাগুরা জেলার মধ্যেই এই জায়গার নাম হয়ে গেছে।”
খেজুর গাছ বাড়ানোর তাগিদ সবার
মোহাম্মাদপুর বাজারে ঢুকলেই চোখে পড়ে নানা ধরনের গুড়। কেজিপ্রতি দাম ১৫০ টাকা থেকে শুরু। তবে স্থানীয় ক্রেতাদের অভিযোগ, এসব গুড়ের বেশির ভাগই ভেজাল। রং, ঘনত্ব আর স্বাদে কৃত্রিমতার ছাপ স্পষ্ট।
এর বিপরীতে পলাশবাড়ীর খাঁটি খেজুর গুড়ের দাম কেজিপ্রতি ৪০০ থেকে সাড়ে ৪০০ টাকা। দাম বেশি হলেও সচেতন মানুষ খাঁটি গুড় সংগ্রহের চেষ্টা করেন। ভেজালের ঝুঁকি এড়াতে বাড়তি দাম দিতেও তারা রাজি। তবে বাস্তবতা হলো, এই দামে গুড় কেনা সবার পক্ষে সম্ভব হয় না। অনেকেই চাইলেও পিছু হটতে বাধ্য হন।

শাহজাহান মোল্লা বলেন, একসময় কম দামেই ভালো মানের গুড় পাওয়া যেত। তখন খেজুর গাছ ছিল বেশি, গাছিরও অভাব ছিল না। এখন রান্নার খড়ির সংকট, গাছি না পাওয়া আর মানুষের অনীহার কারণে অনেকেই খেজুর গাছ কেটে ফেলেছেন। ফলে গুড় হয়ে উঠেছে দুষ্প্রাপ্য, আর ভেজালে ভরে গেছে বাজার।
স্থানীয়দের মতে, মাগুরাসহ দেশের দক্ষিণাঞ্চল একসময় খেজুর গুড়ের জন্য বিখ্যাত ছিল। এখন গাছির অভাব আর অযত্নে খেজুর গাছের সংখ্যা কমে গেছে। উৎপাদন কমায় গুড়ের দামও বেড়েছে কয়েক গুণ। তারা জানান, ভবিষ্যৎ প্রজন্ম যেন খাঁটি খেজুর গুড়ের স্বাদ থেকে বঞ্চিত না হয়, সেই চিন্তা থেকেই নতুন করে খেজুরের চারা রোপণ করছেন তারা।
আশার কথা শোনান কয়েকজন তরুণ উদ্যোক্তা। তাদের একজন মোহাম্মাদপুরের হাসিব শেখ। তিনি অনলাইনে গুড়ের ব্যবসা করেন। তার ভাষ্য, এই মৌসুমি উদ্যোগ যেমন আয়ের সুযোগ তৈরি করছে, তেমনি বাজারেও নতুন গতি আনছে। ভবিষ্যতের কথা ভেবে তারা খেজুর গাছ রোপণের ওপর জোর দিচ্ছেন। তাদের বিশ্বাস, গাছ বাড়লে রস মিলবে, রস থাকলে গুড়ও থাকবে। আজকের এই উদ্যোগই আগামী দিনে খাঁটি খেজুর গুড়ের সরবরাহ নিশ্চিত করবে—এমন আশাই করছেন তারা।
ছবি: জুনায়েত রাসেল/টিবিএস