বাংলাদেশি গিটার নিয়ে বিশ্বজয়ের স্বপ্ন সিয়ামের
বাংলা ভাষার গানের মধ্যে অন্যতম সমৃদ্ধ ঘরানা হলো ব্যান্ড সঙ্গীত। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর পপগুরু আজম খান তার ব্যান্ড ‘উচ্চারণ’ দিয়ে দেশের সর্বস্তরের তরুণদের মাঝে ব্যান্ড সঙ্গীতের উন্মাদনা ছড়িয়ে দিয়েছিলেন। মিলেনিয়াল থেকে জেনজি—ব্যান্ড সঙ্গীতে মেতে ওঠেনি এমন কোনো প্রজন্ম নেই আমাদের দেশে।
বাংলাদেশি গিটার নিয়ে বিশ্বজয়ের স্বপ্ন সিয়ামের
বাংলা ভাষার গানের মধ্যে অন্যতম সমৃদ্ধ ঘরানা হলো ব্যান্ড সঙ্গীত। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর পপগুরু আজম খান তার ব্যান্ড ‘উচ্চারণ’ দিয়ে দেশের সর্বস্তরের তরুণদের মাঝে ব্যান্ড সঙ্গীতের উন্মাদনা ছড়িয়ে দিয়েছিলেন। মিলেনিয়াল থেকে জেনজি—ব্যান্ড সঙ্গীতে মেতে ওঠেনি এমন কোনো প্রজন্ম নেই আমাদের দেশে।
“গিটারকে আমি একজন জীবন্ত মানুষের মত দেখি। জীবনের যে যাত্রা, তা মানুষের মতো গিটারও অনুভব করে। গিটার যতো ভালোভাবে তৈরি করা হবে, তার যাত্রা হবে ততো দূর্দান্ত,” — বলছিলেন মাহবুব আলম সিয়াম।
তিনি বাংলাদেশে তৈরি একমাত্র ইলেক্ট্রিক গিটার ব্র্যান্ড ‘ওসাইরিস গিটার’ এর প্রতিষ্ঠাতা। এছাড়াও দেশের প্রথম এবং একমাত্র লুথিয়ার (তার সম্বলিত কাঠের বাদ্যযন্ত্র বিশেষজ্ঞ) হলেন মাহবুব সিয়াম।
বাংলা ভাষার গানের মধ্যে অন্যতম সমৃদ্ধ ঘরানা হলো ব্যান্ড সঙ্গীত। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর পপগুরু আজম খান তার ব্যান্ড ‘উচ্চারণ’ দিয়ে দেশের সর্বস্তরের তরুণদের মাঝে ব্যান্ড সঙ্গীতের উন্মাদনা ছড়িয়ে দিয়েছিলেন। মিলেনিয়াল থেকে জেনজি—ব্যান্ড সঙ্গীতে মেতে ওঠেনি এমন কোনো প্রজন্ম নেই আমাদের দেশে।
কিছুদিন আগেই দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক পুরষ্কার একুশে পদক দিয়ে সম্মানীত করা হয় ব্যান্ড দল ওয়ারফেজকে। একই সাথে মরণোত্তর একুশে পদক দেয়া হয় ব্যান্ড সঙ্গীতশিল্পী আইয়ুব বাচ্চুকে।
ব্যান্ড সঙ্গীতের অন্যতম অনুষঙ্গ হলো গিটার। অ্যাকুস্টিক ও ইলেক্ট্রিক—দুই ধরনের গিটারই ব্যবহার করা হয় এতে। গিটার একটি ছয় তারের বিদেশি বাদ্যযন্ত্র। দেশে যাবতীয় ইলেক্ট্রিক গিটার এখন পর্যন্ত বিদেশ থেকেই আনা হয়েছে। বিদেশি বিভিন্ন কোম্পানির গিটার বাজিয়েই অভ্যস্ত ছিলেন সব ব্যান্ড সঙ্গীত শিল্পীরা।
বিদেশি গিটারের ব্যবহারের স্রোতের বিপরীতে গিয়ে নিজের স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিয়েছেন মাহবুব আলম সিয়াম। তিনি তৈরি করেছেন দেশের প্রথম আন্তর্জাতিক মানের ইলেকট্রিক গিটারের ব্র্যান্ড ‘ওসাইরিস গিটার’। দেশি গাছের কাঠ দিয়ে তৈরি এই গিটারের শুধু বৈদ্যুতিক অংশ—যেমন তার, পিকআপ ও টিউনিং কি—বিদেশ থেকে আনা হয়। বাকি সবই ‘মেইড ইন বাংলাদেশ’। আর এসব গিটার নিজ হাতেই তৈরি করেন সিয়াম।
বন্ধুর গিটার ধার করে বাজানো থেকে শুরু করে নিজের গিটার ব্র্যান্ড গড়ে তোলা—মাহবুব সিয়ামের সেই পথচলার গল্প নিয়েই আজকের আয়োজন।

২০১৫ সালে বানানো একটি গিটার
আগ্রহের বুনন শৈশব থেকেই
মাহবুব সিয়াম বড় হয়েছেন ঢাকায়। সংস্কৃতিমনা পরিবারের সন্তান হওয়ায় ছোটবেলা থেকেই তিনি দেশি-বিদেশি নানা ভাষার গান শুনে বড় হয়েছেন। নব্বইয়ের দশকে বাংলাদেশ বেতারের জনপ্রিয় অনুষ্ঠান ‘কচিকাঁচার আসর’-এর কথা অনেকেরই মনে আছে। সিয়ামের বয়স যখন ছয়, তখন তিনি এই অনুষ্ঠানের উপস্থাপক হিসেবে কাজ করেছিলেন। সময়টা ছিল ১৯৯৮ সাল।
২০০৩ সালে ফুফুর বাসায় গিয়ে প্রথমবার গিটার দেখেন সিয়াম। গিটারের তারে একবার কম্পন তুলে যে শব্দ শুনেছিলেন, তাতেই তিনি মুগ্ধ হয়ে যান। সেখান থেকেই শুরু গিটারের প্রতি তার ভালোবাসা।
২০০৭ সালে, যখন তিনি সপ্তম শ্রেণির ছাত্র, একদিন বন্ধুর বাসায় গিয়ে আবার একটি গিটার দেখেন। এরপর বাসায় ফিরে নিজের জন্য একটি গিটার কিনে দেওয়ার আবদার করেন। মাসখানেক পর তাকে একটি বাংলা গিটার কিনে দেওয়া হয়।
কিন্তু ২০০৮ সালে গণিত পরীক্ষায় খারাপ করার কারণে সিয়ামের বাবা সেই গিটার ভেঙে ফেলেন। সিয়াম বলেন, “মিউজিক নিয়ে আমার জীবনের সবচেয়ে খারাপ স্মৃতি এটাই। ভাঙা গিটার নিয়ে মাটিতে বসে এর টুকরোগুলো জোড়া লাগানোর চেষ্টা করছিলাম আমি। এরপরে চার বছর আমি গিটার পাইনি হাতে। বন্ধুদের গিটার দিয়েই শিখেছি বাজানো।”
২০০৯ সালে নবম শ্রেণিতে থাকতে গিটার শেখার জন্য তিনি ভর্তি হন বুলবুল ললিতকলা একাডেমিতে। পরের বছর এসএসসি পরীক্ষার পর বন্ধুদের নিয়ে গড়ে তোলেন নিজেদের ব্যান্ড ‘এন্ড উই’।
ছোটবেলা থেকেই আঁকাআঁকির অভ্যাস ছিল সিয়ামের। তার বাবা ছিলেন চারুকলার ছাত্র। সিয়াম নিজেও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগে ভর্তি হয়েছিলেন। তবে ব্যক্তিগত কিছু কারণে প্রথম বর্ষের পর আর বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারেননি।

নিজ হাতে বানানো কাহন হাতে সিয়াম
প্রথম গিটার বানানোর পর উদ্যোক্তা হওয়ার গল্প
বন্ধুদের গিটার বাজানোর সময় তাদের অনুরোধে গিটারের বিভিন্ন অংশে ড্রয়িং করে দিতেন সিয়াম। ২০০৯ সালে একটি অ্যাকুস্টিক গিটারে নানা ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষাও করেন তিনি। গিটারের বিভিন্ন অংশ, যেমন—নাট, ব্রিজ ও রং বদলে নিজের পছন্দমতো সাজিয়েছিলেন। তখন থেকেই তার মনে হতে থাকে, গিটার বানানোর কাজটিও তিনি করতে পারবেন।
এর কয়েক বছর পর, ২০১২ সালে নিজেই প্রথম ইলেকট্রিক গিটার বানানোর সিদ্ধান্ত নেন সিয়াম। এসজি আকৃতির একটি গিটারের ড্রয়িং করে তিনি একজন কাঠমিস্ত্রীর কাছে যান।
সিয়াম বলেন, “গিটারের বডি আমি যত সহজে বানাতে পেরেছিলাম, এর নেক (উপরের অংশ) বানাতে গিয়ে আমি বুঝলাম কাজটা অনেক বেশি কঠিন। ফ্রেট বোর্ড (আঙুল রেখে বাজানোর অংশ) আর ট্রাস রড বানানোর পর দেখলাম বডি থেকে নেক বড় হয়ে যাচ্ছে। বুঝতে পারছিলাম যে এভাবে হবে না—আমাকে পড়াশোনা করতে হবে এ বিষয়ে। এরপরের চার বছর আমি শুধু গিটার বানানো নিয়ে পড়ালেখা করেছি অনলাইনে।”
২০১৫ সালে সিয়াম সিদ্ধান্ত নেন, তিনি নিজেই ইলেকট্রিক গিটার বানানো শুরু করবেন। তবে সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার আরও কয়েক বছর পর, ২০১৯ সালে তিনি সফলভাবে প্রথম ইলেকট্রিক গিটার তৈরি করতে পারেন। এর মধ্যে জীবিকা চালানোর জন্য মিউজিক–সম্পর্কিত বিভিন্ন ব্যবসাও করেছেন তিনি।
গিটার নিয়ে দীর্ঘদিন পড়াশোনা করতে করতে একসময় গিটার বিশেষজ্ঞ হয়ে ওঠেন সিয়াম। ২০১৫ সালে তিনি চালু করেন ‘ব্লুজডেন গিটার কেয়ার’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান। এখানে তারের বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র—বিশেষ করে ইলেকট্রিক গিটার, অ্যাকুস্টিক গিটার ও বেইজ গিটার—মেরামতের কাজ শুরু করেন তিনি। এই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে দেশের অনেক জনপ্রিয় গিটারবাদকের গিটার মেরামতের অভিজ্ঞতা হয়েছে তার।

অ্যাকুস্টিক গিটার বানানোর প্রক্রিয়া
পরের বছর, ২০১৬ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ‘বিডি কাহন’। কাহন একধরনের পারকাশন বাদ্যযন্ত্র, যার ওপর বসে ঢোলের মতো বাজানো যায়। অল্প সময়ের মধ্যেই ‘বিডি কাহন’ বা ‘ব্লুজ ডেন কাহন’ বাংলাদেশের অন্যতম জনপ্রিয় কাহন ব্র্যান্ডে পরিণত হয়। দেশি কাঠ দিয়ে নিজের হাতে বানানো এসব কাহন অনলাইনে সারা দেশে বিক্রি হতো। প্রতি মাসে গড়ে ৯০ থেকে ১০০টি কাহন বিক্রি করতেন সিয়াম। বিডি কাহনের বিশেষত্ব ছিল, এর ভেতরের স্নেয়ার (কম্পন স্প্রিং) অ্যাডজাস্ট করার সুবিধা ছিল। অন্য কোনো ব্র্যান্ডের কাহনে এই সুবিধা ছিল না।
২০২০ সাল পর্যন্ত বিডি কাহন তৈরি করেছিলেন সিয়াম। এরপর গিটার বানানোর কাজে পুরোপুরি মনোযোগী হওয়ার জন্য এই উদ্যোগের উৎপাদন বন্ধ করে দেন।
এর মধ্যেই ২০১৭ সালে নিজের বাসার গ্যারেজে তিনি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ‘ব্লুজ ডেন প্র্যাক্টিস প্যাড’। সিয়াম বলেন, “আমার প্র্যাক্টিস প্যাড খুব দ্রুত মিউজিশিয়ানদের মাঝে সাড়া ফেলেছিল। দেশের এমন কোনো বড় ব্যান্ড নাই যারা ব্লুজ ডেনে এসে প্র্যাক্টিস করে নাই। আমেরিকান ব্যান্ড গানস এন্ড রোজেসের গিটারিস্ট রন থাল বাম্বলফুট দেশে এসেছিলেন একটা প্রজেক্টে বাজানোর জন্য—তিনিও আমার প্র্যাক্টিস প্যাডে এসে সেশন করেছেন। আমার প্যাডের বিশেষত্ব ছিল এর অ্যাকুস্টিক সাউন্ড ছিল অনেক ভালো।”
২০২১ সালে ‘ব্লুজ ডেন প্র্যাক্টিস প্যাড’ও বন্ধ করে দেন সিয়াম। নিজের গিটার বানানোর কাজে পূর্ণ মনোযোগ দেওয়ার জন্যই ‘বিডি কাহন’ ও ‘ব্লুজ ডেন প্র্যাক্টিস প্যাড’-এর উদ্যোগ বন্ধ করেন তিনি। তবে গিটার মেরামতের কাজ চালিয়ে গিয়েছেন। ‘ব্লুজ ডেন গিটার কেয়ার’-এর নাম বদলে এখন এর নাম ‘গিটার কেয়ার বাংলাদেশ’।

ওয়ার্কশপ
ওসাইরিস গিটার
ছোটবেলা থেকেই মিশরীয় ও গ্রিক পুরাণের প্রতি আগ্রহ ছিল সিয়ামের। তাই নিজের গিটার ব্র্যান্ডের জন্য তিনি বেছে নেন মিশরীয় পুরাণের দেবতা ওসাইরিসের নাম। ২০১৯ সালে প্রথম সফলভাবে একটি ইলেকট্রিক গিটার তৈরি করেন তিনি। তবে প্রথম গিটার তৈরি করতে গিয়ে নানা বাধার মুখে পড়তে হয়েছে তাকে।
সিয়াম বলেন, “আমি এর আগে কয়েক বছর নানারকম ব্যবসা করেছি। কাহনের ব্যবসা, প্র্যাক্টিস প্যাডের ব্যবসা—এগুলো আমি জীবিকা নির্বাহের জন্যই করেছি। শেষ পর্যন্ত আর কিছুই কন্টিনিউ করি নাই। আমার মূল স্বপ্ন ছিল একটা কস্ট ইফেক্টিভ গিটার কোম্পানি তৈরি করা। দেশের তরুণরা যেন কম দামে ভালো মানের গিটার পেতে পারে। কিন্তু প্রথমেই বানাতে গিয়ে দেখলাম, আমাদের দেশের বাজারে ভালো গিটার বানানোর মতো কিছুই পাওয়া যায় না। কাঁচামাল জোগাড় করাই কঠিন হয়ে পড়ে।”
২০১৯ সালে যাত্রা শুরু করার এক বছরের মধ্যেই ওসাইরিস গিটার ভালো সাড়া ফেলে। এর আগেই বাংলাদেশের ব্যান্ডসংগীতের জগতে পরিচিত মুখ হয়ে উঠেছিলেন সিয়াম। ‘গিটার কেয়ার বাংলাদেশ’, ‘বিডি কাহন’ ও ‘ব্লুজ ডেন প্র্যাক্টিস প্যাড’-এর সুবাদে বড় বড় গিটারবাদকদের মধ্যে তার ভালো পরিচিতি তৈরি হয়েছিল। তাই তিনি যখন নিজের গিটার ব্র্যান্ড বাজারে আনলেন, তখন অনেকেই তাকে সাদরে গ্রহণ করেন।
প্রতিষ্ঠার এক বছরের মধ্যেই, অর্থাৎ ২০২০ সালের মধ্যে ৪৬টি গিটারের অর্ডার পেয়েছিলেন সিয়াম। সবগুলোই নিজ হাতে তৈরি করেছেন তিনি। কাজে সহায়তার জন্য বিভিন্ন সময়ে লোক নিয়োগ দিলেও, মূল কাজগুলো তিনি নিজেই করেন। তাজমহল রোডে নিজের বাসায় একটি ওয়ার্কশপ আছে তার। মোহাম্মদপুরে আরেকটি ছোট ওয়ার্কশপও তৈরি করেছেন। এখন এই দুই জায়গা মিলিয়েই কাজ চলছে।
২০২১ থেকে ২০২৫ পর্যন্ত ব্যক্তিগত কিছু কারণে ওসাইরিস গিটার তৈরির কাজ বন্ধ রেখেছিলেন সিয়াম। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর থেকে আবারও গিটারের অর্ডার নেওয়া শুরু করেন। এখন পর্যন্ত তিনি ২০টি গিটারের অর্ডার পেয়েছেন। সেগুলোর কাজ চলছে পুরোদমে।
ওসাইরিস গিটারের দাম নির্ভর করে মডেলের ওপর। এ গিটারের মোট চারটি মডেল আছে। প্রথমটি ‘রোডিও’। এই সিরিজে রয়েছে তিনটি মডেল—রোডিও ওয়ান, টু ও থ্রি। রোডিও গিটারের দাম ২৬ হাজার টাকা থেকে ৪৫ হাজার টাকার মধ্যে। সিয়ামের দাবি, বিদেশি ব্র্যান্ডের ৭০ হাজার টাকা দামের গিটারের সমমানের গুণগত মান রয়েছে ওসাইরিসের রোডিও গিটারে।

ওসাইরিস মডার্ন প্লেয়ার
এরপরের মডেল ‘মডার্ন প্লেয়ার সিরিজ’। এই সিরিজে রয়েছে চারটি মডেল। এ মডেলের গিটারের দাম ৪৫ হাজার থেকে ৯০ হাজার টাকার মধ্যে। এর পরের মডেল ‘হেরিটেজ’। হেরিটেজ সিরিজের সব গিটারের দাম এক লাখ টাকার বেশি।
শেষ মডেলের নাম ‘আল্ট্রা মডার্ন’। এ মডেলের বিশেষত্ব হলো, এগুলো সবই কাস্টম শপ গিটার। কাস্টম শপ গিটার বলতে বোঝায়, গিটারের প্রতিটি অনুষঙ্গ গিটারবাদকের পছন্দ অনুযায়ী তৈরি করে দেওয়া।
বাজানোর ধরন, পছন্দের টোন, কাঠ, গিটারের বডি ও নেকের আকার—সবই শিল্পীর চাহিদা অনুযায়ী তৈরি করে দিতে পারেন সিয়াম। আল্ট্রা মডার্ন সিরিজে সাধারণত এ ধরনের কাস্টম শপ গিটারই তৈরি করা হয়। তাই এ মডেলের কোনো নির্দিষ্ট দাম নেই। কাস্টম চাহিদা অনুযায়ী এর দাম নির্ধারণ করা হয়।
দেশের বিভিন্ন জনপ্রিয় গিটারিস্টের জন্য কাস্টম শপ সিগনেচার গিটারও তৈরি করেছেন সিয়াম। তাদের মধ্যে আছেন ইব্রাহিম আহমেদ কমল, বখতিয়ার হোসেন, নাভিদ ইমতিয়াজ ও শিশির। ওয়ারফেজের গিটারিস্ট ইব্রাহিম আহমেদ কমলের জন্য ‘অবাক ভালোবাসা’ নামের একটি সিগনেচার গিটার তৈরি করে তাকে উপহারও দিয়েছিলেন তিনি।
ওসাইরিস গিটার এখন ইলেকট্রিক গিটার তৈরি করলেও, ভবিষ্যতে অ্যাকুস্টিক গিটারও বাজারে আনার পরিকল্পনা রয়েছে তাদের। প্রয়াত ব্যান্ডসংগীতশিল্পী আইয়ুব বাচ্চুর স্মরণে একটি অ্যাকুস্টিক গিটার তৈরি করার পরিকল্পনাও আছে। সেই গিটারের নাম রাখা হবে ‘রুপালি গিটার’।

কাজ চলমান
গিটার তৈরির প্রক্রিয়া
ওসাইরিস গিটার তৈরি হয় মোট পাঁচটি ধাপে। প্রথম ধাপ হলো কাঠ প্রস্তুত করা। একটি গিটার তৈরিতে অন্তত তিন ধরনের কাঠ ব্যবহার করা হয়। গিটারের তিনটি অংশ—বডি, নেক ও ফ্রেট বোর্ডে—তিন ধরনের কাঠ লাগে। সিয়াম জানান, এই কাঠগুলো দেশ থেকেই সংগ্রহ করে প্রক্রিয়াজাত করা হয়।
গিটার তৈরির জন্য যে পাতলা কাঠ দরকার হয়, তা সরাসরি দেশে পাওয়া যায় না। প্রক্রিয়াজাত করে তা তৈরি করে নিতে হয়। একটি গাছের দাম সাধারণত ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা। তবে শুধু গাছ কিনলেই গিটার তৈরি সম্ভব নয়। গাছ কাটার পর প্রায় ৬০ শতাংশ কাঠ বাতিল হয়ে যায়। বাকি ৪০ শতাংশ কাঠ আবার দুই বছর ধরে সিজনিং করতে হয়।
সরাসরি সিজনিং করা কাঠ কিনতে গেলে প্রতি বর্গফুটের দাম পড়ে পাঁচ থেকে ছয় হাজার টাকা। কাঁচা কাঠের ৩০০ টাকা দামের একটি গুড়ি সিজনিং অবস্থায় কিনতে গেলে তার দাম বেড়ে দাঁড়ায় সাত থেকে ১০ হাজার টাকা।
বিশ্বজুড়ে মেহগনি কাঠ দিয়ে গিটার তৈরি করা হয়। আমাদের দেশেও মেহগনি একটি জনপ্রিয় কাঠ। ওসাইরিস গিটার তৈরিতেও মেহগনি ব্যবহার করা হয়। এ ছাড়া গামারি, শিরীষ, সেগুন, নিম, গাব, কাঁঠাল ও তালের কাঠও ব্যবহার করা হয়। তালগাছের কাঠ দিয়ে ভালো মানের ফ্রেট বোর্ড তৈরি করা হয়। সারা দেশ থেকেই এসব কাঠ সংগ্রহ করেন সিয়াম।
কাঠ প্রক্রিয়াজাত করার পরের ধাপ হলো গিটারের বডি ও নেকের আকৃতি দেওয়া। মডেল বা ক্রেতার চাহিদা অনুযায়ী কাঠ কেটে গিটারের আকার তৈরি করা হয়। এই ধাপেই বডির সঙ্গে নেক জোড়া দেওয়া হয়।

২০১৬ সালে গিটার বানানোর অসফল প্রচেষ্টা।
এরপর করা হয় স্যান্ডিং। বিভিন্ন যন্ত্রপাতি দিয়ে ঘষে ঘষে গিটারের বডি ও নেক মসৃণ করা হয়। এই ধাপেই লাগানো হয় ফ্রেট বোর্ড। পরের ধাপে করা হয় রঙের কাজ। স্প্রে পেইন্ট ব্যবহার করে রঙ করা হয় ওসাইরিস গিটার। শেষ ধাপে পিকআপ, নাট, ব্রিজ, ভলিউম কি, টিউনিং কি ও তারসহ বিভিন্ন বৈদ্যুতিক যন্ত্রাংশ লাগিয়ে কাজ সম্পন্ন করা হয়।
একটি গিটার তৈরি করতে ন্যূনতম ১০ দিন সময় লাগে। সব মিলিয়ে একটি কাঠকে গিটারে রূপ দিতে লাগে প্রায় ৮০ থেকে ১০০ ঘণ্টা।
‘ইউরস ট্রুলি দেশি লুথিয়ার’
সিয়াম নিজেকে দেশের একমাত্র খাঁটি লুথিয়ার হিসেবে পরিচয় দেন। লুথিয়ার হলেন তারযুক্ত কাঠের বাদ্যযন্ত্রের বিশেষজ্ঞ। শব্দটি এসেছে ফরাসি শব্দ ‘লুথ’ থেকে। লুথ হলো তারযুক্ত ও বাঁকানো একধরনের প্রাচীন বাদ্যযন্ত্র। যারা লুথ বানাতেন ও মেরামত করতেন, তাদেরই বলা হতো লুথিয়ার। এটি একটি প্রাচীন পেশা।
বিশ্বজুড়ে লুথিয়ারি একটি পরিচিত ও সম্মানজনক পেশা। ইউরোপ ও আমেরিকার বড় বড় গিটার ব্র্যান্ডে মাস্টার লুথিয়াররা কাজ করেন। বিভিন্ন কাস্টম শপ গিটার কোম্পানিতেও তাদের চাহিদা রয়েছে। লুথিয়াররা শব্দবিজ্ঞান সম্পর্কে ধারণা রাখেন। তারা বলতে পারেন, কোন শিল্পীর জন্য কোন ধরনের গিটার উপযুক্ত হবে। বিশেষ করে কাস্টম শপ গিটারের ক্ষেত্রে লুথিয়ারের সহায়তা প্রয়োজন হয়।
সিয়াম জানান, লুথিয়ার শুধু গিটার মেরামতকারী নন। একজন লুথিয়ার ক্রেতার চাহিদা অনুযায়ী কোন কাঠ ব্যবহার করা হবে, কী ধরনের ডিজাইনের গিটার তৈরি হবে এবং গিটারে কেমন টোন থাকবে—সেসব নির্ধারণ করেন। বাদকের বাজানোর ধরন, অভ্যাস এবং তিনি স্টেজে বেশি বাজান নাকি স্টুডিওতে—এসব বিবেচনায় রেখেও কাস্টম শপ গিটার তৈরি করে দেন তিনি।

গিটার তৈরিতে ব্যবহৃত সরঞ্জাম
একজন লুথিয়ার গিটার ডিজাইন করেন এর বডির আউটলাইন, স্কেল লেন্থ, নেক ও হ্যান্ড গ্রিপ, কাঠের অ্যাকুস্টিক বৈশিষ্ট্য, পিকআপের ধরন এবং শিল্পীর চাহিদা—সবকিছু মাথায় রেখে। তার কাছে গিটার ডিজাইন মানেই সাউন্ড ডিজাইন।
সিয়াম বলেন, “আমি গিটার নিয়ে দীর্ঘদিন পড়াশোনা করে, গিটার বানিয়ে, বিক্রি করে—সব মিলিয়ে একটা অভিজ্ঞতা নিয়ে ২০১৯ সালে লুথিয়ারের কাজ শুরু করলাম। কিন্তু ধীরে ধীরে বুঝলাম, আমাদের দেশ এখনো পুরোপুরি কাস্টম শপ-লুথিয়ার সংস্কৃতির জন্য প্রস্তুত না। এর মূল কারণ হলো খরচ। এছাড়াও, আমি কাজ শুরু করার পর আরো দুই-একজন নিজেকে লুথিয়ার হিসেবে পরিচয় দিয়ে ইলেকট্রিক গিটার বানানো শুরু করেছিল। কিন্তু তাদের বানানো গিটার কয়েক মাস পর আমার গিটার কেয়ারে মেরামতের জন্য আনা হতো। এ কারণেই আমি নিজেকে দেশের একমাত্র পেশাদার লুথিয়ার মনে করি।”
সিয়াম আরও জানান, বিদেশে লুথিয়ারের খরচ অনেক বেশি। কিন্তু আমাদের দেশে সে তুলনায় আয় খুবই কম। পশ্চিমা দেশগুলোতে কাস্টম শপ গিটারের দাম শুরুই হয় ২,৫০০ ডলার বা প্রায় আড়াই থেকে তিন লাখ টাকা থেকে। সেখানে লুথিয়াররা ঘণ্টা হিসেবে পারিশ্রমিক নেন। অর্থাৎ, একটি কাস্টম শপ গিটার তৈরিতে যত ঘণ্টা সময় ব্যয় হয়, সে অনুযায়ী দাম নির্ধারণ করা হয়। বিদেশি মাস্টার লুথিয়াররা প্রতি ঘণ্টায় ন্যূনতম ৩০ ডলার করে নেন।

মডার্ন সিরিজ, ওসাইরিস গিটার
সিয়ামের মতে, “আমাদের দেশে এত খরচ করে কাস্টম শপ গিটার কেনার মতো বাজার এখনো তৈরি হয়নি।”
ওসাইরিসের কাস্টম শপ গিটারের ক্ষেত্রে লুথিয়ার হিসেবে সিয়াম প্রতি ঘণ্টায় ১,৫০০ থেকে ২,০০০ টাকা পর্যন্ত পারিশ্রমিক নেন। এই খরচের মধ্যে কাঠ ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক ব্যয়ও অন্তর্ভুক্ত থাকে। তবে ইলেকট্রিকাল যন্ত্রাংশের দাম আলাদা ধরা হয়। একটি কাস্টম শপ ওসাইরিস গিটারের লুথিয়ার খরচ শুরু হয় অন্তত ১ লাখ টাকা থেকে।
ভবিষ্যৎ ভাবনা
ওসাইরিস গিটারের শোরুম কোথায়, বা কেউ এসে কিনতে চাইলে কোথায় আসতে হবে—এ প্রশ্নের জবাবে সিয়াম বলেন, “আমি কোনো দোকান দিতে চাই না গিটার বিক্রির জন্য। গিটার জিনিসটা এত বাণিজ্যিক হওয়ার কারণে আমাদের দেশে অনেক বাচ্চার গিটারিস্ট হওয়ার স্বপ্ন কখনোই বাস্তব হয় না। আমার ইচ্ছা, অনেক ভালো কোয়ালিটির গিটার কম দামে তৈরি করা ও বিক্রি করা। যার জন্য আমি ওসাইরিস গিটারের জন্য এক্সপেরিয়েন্স জোন তৈরি করতে চাই। সেখানে গিটার থাকবে, যারা কিনতে চায় তারা এসে বাজাবে। আগাগোড়া পছন্দ করে, তারপর গিটার কিনে নিয়ে যাবে।”

রোডিও গিটার
এখন ওসাইরিস গিটার পাওয়া যায় অনলাইনে, তাদের ওয়েবসাইটে। সেখানে গিয়ে নিজের পছন্দমতো গিটার অর্ডার দেওয়া যায়। এছাড়া মোহাম্মদপুরের তাজমহল রোডের ওয়ার্কশপে এসেও গিটার দেখে কেনা যায়।
দেশের সব সংগীতশিল্পী যেন সাধ্যের মধ্যে ওসাইরিস গিটার কিনতে পারেন, সে লক্ষ্যেই কাজ করে যেতে চান সিয়াম। শুধু দেশেই নয়, ওসাইরিস গিটারকে বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরার স্বপ্নও আছে তার। নিজের হাতে বানানো গিটার মানুষ ভালোভাবে ব্যবহার করুক, আর এর আফটার সেলস সার্ভিসও তিনি নিজে দিতে পারুন—আগামী দিনের জন্য এটাই তার প্রত্যাশা।