আমাদের বন বিড়াল—এক জীবনে রক্ষা করে কোটি টাকার ফসল
এক গবেষণায় দেখা গেছে, একটি মেছো বিড়াল সারা জীবনে প্রায় ৫০ লক্ষ টাকার ফসল রক্ষা করে থাকে। আর আমি যার কথা বলছি, সে তার জীবদ্দশায় মেছো বিড়ালের চাইতে অধিকতর ইঁদুর শিকার করে থাকে। তাই সে তার এক জীবনে কত টাকার ফসল রক্ষা করে, তারও একটা হিসেব কষা প্রয়োজন আছে বৈকি।
আমাদের বন বিড়াল—এক জীবনে রক্ষা করে কোটি টাকার ফসল
এক গবেষণায় দেখা গেছে, একটি মেছো বিড়াল সারা জীবনে প্রায় ৫০ লক্ষ টাকার ফসল রক্ষা করে থাকে। আর আমি যার কথা বলছি, সে তার জীবদ্দশায় মেছো বিড়ালের চাইতে অধিকতর ইঁদুর শিকার করে থাকে। তাই সে তার এক জীবনে কত টাকার ফসল রক্ষা করে, তারও একটা হিসেব কষা প্রয়োজন আছে বৈকি।
গত আউশের মৌসুমে দেখলাম চরসিন্দুর বাজারের কীটনাশকের দোকানগুলোতে কৃষকদের ভিড় লেগে গেল ইঁদুর মারার বিষ কিনতে। শুধু তা-ই নয়, হার্ডওয়ারের দোকানগুলোতে অনেকে ছুটে গেল ইঁদুর ধরা/মারার কল কিনতে। তখন সবেমাত্র ধানের শিষ বেরিয়েছে।
এর মধ্যেই ইঁদুরের প্রবল আক্রমণে কৃষকদের বেহাল অবস্থা। আমি কয়েকজন কৃষকের ধানখেত পরিদর্শনে গিয়ে দেখি, সত্যি অবস্থা করুণ। কারও কারও প্রায় অর্ধেক খেত কেটে বিছিয়ে ফেলেছে দূরের পাল। বিষটোপ আর লোহার ফাঁদের পাশাপাশি লোকজন খেতের ভেতর পটকা ফোটাতে শুরু করল। পটকার প্রবল শব্দে যাতে ইঁদুরের পাল খেতের সীমানা ছেড়ে দূরে পালিয়ে যায়। কিন্তু কিছুতেই কিছু হলো না। একবার বিষটোপ খেয়ে ইঁদুর মারা গেলে পরে আর অন্য ইঁদুর বিষটোপে মুখ দেয় না। লোহার ফাঁদ খুব একটা কাজে দিল না। আর পটকার শব্দে খুব একটা ভয় পেল না ইঁদুরের পাল। অবশেষে ইঁদুরের এই ধ্বংসযজ্ঞকে কৃষকেরা প্রাকৃতিক বিপর্যয় হিসেবেই মেনে নিল। তাই প্রতিবছরই তাদের সহ্য করতে হয় এই অনিষ্টকারী প্রাণীদের অত্যাচার। কিন্তু এত ব্যাপকভাবে কেন বেড়ে গেল মেঠো ইঁদুরের সংখ্যা, আগে তো এমন ছিল না?
শুধু বিষটোপ আর ফাঁদ ব্যবহার করে যদি সর্বাত্মকভাবে ইঁদুর দমন করা যেত, তবে এত দিনে পৃথিবীতে ইঁদুরের অস্তিত্ব থাকত না। ধানখেতে এদের আক্রমণ অত্যন্ত ধ্বংসাত্মক। গাছে থোর আসার সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয় এদের অত্যাচার, দুধের মতো সাদা আর আঠালো মিষ্টি স্বাদের তরল থাকে কচি ধানের বুকে, যা ইঁদুরের অত্যন্ত প্রিয় খাদ্য। কচি ধান থেকে শুরু করে পাকা ধান কাটার আগপর্যন্ত চলে ইঁদুরের অত্যাচার। শুধু ধান খেয়ে ক্ষান্ত হলে কথা ছিল, কারণে-অকারণে ওরা সমানতালে ধানগাছ কেটে চলে। কারণ, ওদের নিয়ত বর্ধনশীল দাঁতের বৃদ্ধি রুখতে সব সময়ই একটা কিছু কেটে যেতে হয়। এরা শুধু খেতের ধান কেটেই ক্ষান্ত হয় না, একের পর এক পাকা ধানের শিষ কেটে নিয়ে মজুত করে রাখে নিজের গর্তের অভ্যন্তরে। আমি নিজে বহুবার রবিদাস এবং চৌহান সম্প্রদায়ের লোকদের ধান কাটার পর মাটি খুঁড়ে ইঁদুরের গর্ত থেকে বেশ ভালো পরিমাণে ধান সংগ্রহ করতে দেখেছি। সুতরাং ধান চাষের ক্ষেত্রে ইঁদুর যে এক মহা অভিশাপের নাম, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। এ ছাড়া এদের প্রজননশক্তি প্রবল। এক জোড়া মেঠো ইঁদুর থেকে বছরে কম করে হলেও ৬০০ থেকে ১০০০ ইঁদুর জন্ম নিতে পারে। তাই প্রকৃতিতে এদের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে এরা মহাবিপর্যয় হয়ে দেখা দেবে, এটাই স্বাভাবিক।
শুধু ধান নয়, গম, ভুট্টা, আলু, বাদাম, সরিষা তথা সমস্ত ফসলের মহাক্ষতির কারণ হচ্ছে মেঠো ইঁদুর। প্রতিবছর এরা কোটি কোটি টাকার ফসল নষ্ট করে থাকে। অথচ বন বিড়াল ছিল ফসলখেতের এক অতন্দ্র প্রহরী। নিঃস্বার্থভাবে যে আমাদের কোটি কোটি টাকার ফসল রক্ষা করত। আমি বহুবার তাকে দেখেছি সন্ধ্যালগ্নে গ্রামীণ বন থেকে বেরিয়ে ইঁদুরের সন্ধানে খেতের আল ধরে ঘুরে বেড়াতে। তার সেই ‘টহল’ চলত সমস্ত রাতব্যাপী। একের পর এক মেঠো ইঁদুর ভক্ষণ করে শেষরাতের দিকে সে ফিরে যেত তার গ্রামীণ বনের আস্তানায়।

ইদানীং এক গবেষণায় দেখা গেছে, একটি মেছো বিড়াল সারা জীবনে প্রায় ৫০ লক্ষ টাকার ফসল রক্ষা করে থাকে। আর আমি যার কথা বলছি, সে তার জীবদ্দশায় মেছো বিড়ালের চাইতে অধিকতর ইঁদুর শিকার করে থাকে। তাই সে তার এক জীবনে কত টাকার ফসল রক্ষা করে, তারও একটা হিসেব কষা প্রয়োজন আছে বৈকি। আর মেছো বিড়াল বসবাস করে জলাভূমির পাশের বনে, আর তার বিচরণ দেশের সমস্ত গ্রামীণ বনজুড়ে।
আমি গ্রামীণ বনের রাজা বন বিড়ালের কথা বলছি। সে হচ্ছে কৃষকের ফসলখেতের এক অতন্ত্র প্রহরী। একটা কথা আমরা সবাই জানি, ইঁদুরের অত্যাচার রুখতে মানুষজন বসতবাড়িতে বিড়াল পুষে থাকে। আর বিড়াল থাকলে স্বাভাবিকভাবেই বসতবাড়িতে ইঁদুরের উপদ্রব কমে যায়। ঠিক তেমনি ফসলখেতের আশপাশে বন বিড়াল থাকলে ইঁদুরের অত্যাচার কমে আসে। বন বিড়াল হচ্ছে মেঠো ইঁদুরের যম। প্রতি রাতে একটি বন বিড়াল কম করে হলেও পাঁচটি মেঠো ইঁদুর ভক্ষণ করে থাকে। নিজের খাদ্যাভাসের বিপরীতে সে প্রতিবছর রক্ষা করে লক্ষ লক্ষ টাকার ফসল। মেঠো ইঁদুর এতটাই ক্ষতিকারক যে ওরা শুধু ফসল খেত, তা নয়, হানা দেয় কৃষকের গোলাঘরে। প্রতিবছর এদের দ্বারা বিনষ্ট হয় শত শত মণ মজুতকৃত শস্য।
প্রকৃতি একসময় নিজের মতোই সব নিয়ন্ত্রণ করত, দরকার ছিল না কোনো বিষটোপ অথবা ফাঁদ। আসলে আমরা নিজেরাই নিজেদের পায়ে কুড়াল মেরেছি। ফসলখেতের অতন্ত্র প্রহরীর জীবনের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়েছি আমরা। তাই তো ইঁদুর-বন্যায় প্রতি মৌসুমে এখন বিপর্যয় নেমে আসে ফসলখেতের বুকে।
বন বিড়াল মাংসাশী শিকারি প্রাণী। তাই বসতবাড়ির আশপাশের নির্জন স্থানে হাঁস-মুরগির দেখা পেলে সে স্বভাববশত আক্রমণ করে বসে। এ ছাড়া কখনো কখনো ক্ষুধার তাড়নায় রাতের বেলা মানুষের বাড়িতে ঢুকে খোঁয়াড় থেকে পোষা পাখি যেমন হাঁস-মুরগি, কবুতর ইত্যাদি ধরে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। শুধু এসব কারণে বন বিড়াল হয়ে গেল গ্রামের মানুষের মহাশত্রু। যুগের পর যুগ ধরে মানুষ সুযোগ পেলেই এদের হত্যা করেছে। শুধু তা-ই নয়, কোথাও বন বিড়ালের বাচ্চা দেখতে পেলে তাদেরও মেরে ফেলা হয়েছে আদিম উল্লাসে। এটা অতি দুঃখের বিষয় যে বন বিড়াল এবং তাদের বাচ্চাদের হত্যাকাণ্ড এখনো চলমান। অথচ মানুষের সত্যটা জানা প্রয়োজন।
একটি মেঠো ইঁদুর তার জীবদ্দশায় আনুমানিক ১০ হাজার টাকার ফসলের ক্ষতি করে থাকে। আর একটি বন বিড়াল তার ১২ বছরের জীবনে প্রতি রাতে গড়ে পাঁচটি করে মেঠো ইঁদুর ভক্ষণ করে থাকে। অর্থাৎ একটি বন বিড়াল তার এক জীবনে ইঁদুর নিধনের মাধ্যমে কোটি টাকার ফসল রক্ষা করে থাকে। অথচ এমন উপকারী বন্ধুকে আমরা পিটিয়ে মেরে ফেলি নিতান্ত অজ্ঞতার কারণে।
আসুন কোটি টাকার ফসল রক্ষাকারী এই প্রাণীটি সম্পর্কে একটু জেনে নেয়া যাক। এরা সারা বাংলাজুড়ে বিচরণকারী মধ্যম আকৃতির বন বিড়াল। আকারে পোষা বিড়ালের প্রায় দ্বিগুণ, ইংরেজিতে এদের বলা হয় ঔঁহমষব পধঃ আর বৈজ্ঞানিক নাম ঋবষরং পযধঁং। এদের ধূসর বাদামি শরীরে কোনো ডোরা দাগ নেই। এরা দৈর্ঘ্যে লেজসহ প্রায় ৩ ফুট। প্রাপ্তবয়স্ক বন বিড়াল একরঙা প্রাণী হলেও শিশু এবং কিশোর বয়সে এদের শরীরে কালো ডোরা দাগ লক্ষ করা যায়। পরে অবশ্য এসব ডোরা দাগ ধূসর বাদামি রঙে মিলিয়ে যায়। এদের লেজের ডগা কালো, আর হাত-পায়ের ভেতরের দিকে কালো ডোরা দাগ রয়েছে। দেশের বিভিন্ন স্থানে এরা বাওড়াল, বন বিলাই, ঘাগড়া, বাশাকা, খাটাশ, ভাড়ল, ভাম বিড়াল ইত্যাদি আঞ্চলিক নামেও পরিচিত।
বন বিড়াল এক দুর্দান্ত শিকারি প্রাণী। তার শিকার ধরার স্টাইলটা অনেকটা বাঘ কিংবা চিতা বাঘের মতো। নিঃশব্দে এগিয়ে গিয়ে প্রবল বিক্রমে ঝাঁপিয়ে পড়ে শিকারের ওপর। এরা নিঃসঙ্গ শিকারি, কেবল মিলন ঋতুর কিছুটা সময় ছাড়া সারাটা জীবন একা একা ঘুরে বেড়ায়। যদিও এরা নিশাচর শিকারি, তবু গোধূলি আর ঊষালগ্নে এদের মধ্যে খুবই শিকারের চাঞ্চল্য লক্ষ করা যায়।
দ্রুতগতিতে ছুটে গিয়ে বুনো খরগোশ শিকারে এদের দক্ষতার অন্ত নেই। পোষা কিংবা বন্য, সুযোগ পেলে যেকোনো ধরনের পাখি শিকারে এরা সিদ্ধহস্ত। আমি এদের পাখি শিকারের সময় ১০ ফুট পর্যন্ত ওপরে লাফিয়ে উঠতে দেখেছি। ইঁদুরের পাশাপাশি কোলা ব্যাঙ, গিরগিটি, সাপ, পোকামাকড় কিংবা মাছও এদের প্রিয় খাদ্য। বন বিড়ালের কানের ডগায় রয়েছে একগুচ্ছ কালো লোম, যা মাটির নিচে মেঠো ইঁদুরের অবস্থান নির্ণয়ের এবং অন্যান্য শিকারের ক্ষেত্রে বিশেষ সেন্সর হিসেবে কাজ করে।
একটা বিষয় এখনো অনেকেরই অজানা, বন বিড়াল কিন্তু বছরে দুবার বাচ্চা দিয়ে থাকে, শীত আর বর্ষায়। বর্ষার বাচ্চারা টেকে কম। শীতের প্রায় প্রতিটি বাচ্চাকেই বড় হয়ে উঠতে দেখেছি। এরা প্রতি মৌসুমে এক থেকে চারটি পর্যন্ত বাচ্চা প্রসব করে থাকে। জন্ম দেওয়ার পর থেকে বাচ্চা লালন-পালনের পুরো দায়িত্ব মা বন বিড়াল একাই পালন করে থাকে। বাচ্চা অন্ধ হয়ে জন্মগ্রহণ করে, ১০-১২ দিনের মাথায় চোখ ফোটে। ২-৩ মাস পর্যন্ত মায়ের দুধ পান করে। ১০ মাসের মাথায় যৌন পরিপক্কতা লাভ করে। এদের গর্ভধারণকাল ৯০ দিন। পুরুষ বন বিড়াল মাদি বন বিড়ালের চেয়ে আকারে কিছুটা বড় হয়ে থাকে। পুরুষ গোলগাল, নাদুসনুদুস। আর মাদি বন বিড়াল ছিপছিপে তরুণীর মতো। মিলন ঋতুতে এরা মৌউপ মৌউপ শব্দে ডাকাডাকি করে। বন বিড়াল গভীর জঙ্গলের চেয়ে গ্রামীণ বন, ফসলের খেত কিংবা ঘাসবনে বসবাস করতে পছন্দ করে। তবে বর্তমানে গ্রামীণ জঙ্গল কমে যাওয়ায় এদের প্রায়ই বসতবাড়ির লাকড়ির ঘর কিংবা পরিত্যক্ত স্থাপনায় আশ্রয় নিতে দেখা যায়। এরা স্থানিক বা টেরিটোরিয়াল প্রাণী, নির্দিষ্ট শিকারের এলাকায় বিচরণ করে থাকে। একটি বন বিড়াল সর্বোচ্চ তিন থেকে পাঁচ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে বিচরণ করে থাকে। তবে খাদ্যাভাব দেখা দিলে এরা এক জায়গা থেকে দূরের অন্য জায়গায় স্থানান্তরিত হয়ে থাকে। এই প্রাণীগুলো ভূমিতে বিচরণে যে রকম দক্ষ, তেমনি গাছে চড়ায় পটু, আবার সাঁতারেও ভীষণ দক্ষ। আর নিজের শিকার এলাকায় এরা অন্যের উপস্থিতি পছন্দ করে না।
সরকারের উচিত এখনই বন বিড়ালের সুরক্ষায় বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করা। ব্যাপক প্রচারণার মাধ্যমে তার উপকারী পরিচয়টি জনগণের সামনে তুলে ধরতে হবে। বন বিড়ালের উপকারিতা-সংবলিত লিফলেট বিলি করতে হবে গ্রামের প্রতিটি বাড়িতে। সেই সঙ্গে সকল সচেতন নাগরিককে এগিয়ে আসতে হবে কৃষকের এক পরম বন্ধুর অস্তিত্ব রক্ষার জন্য। বন বিড়াল বাঁচলে ফসল বাঁচবে, ফসল বাঁচলে কৃষক বাঁচবে। আর কৃষক বাঁচলে বাঁচবে বাংলাদেশ। সবাই যার যার জায়গা থেকে বন বিড়ালের সুরক্ষায় এগিয়ে আসুন।
আলোকচিত্র: মো. তানভীর তাসনিম অভি