নেক্রপলিস ঢাকা: এক রক্তাপ্লুত সূর্যোদয়
মার্চের শেষে গুমোট গরম পুরো ঢাকা জুড়ে।
নেক্রপলিস ঢাকা: এক রক্তাপ্লুত সূর্যোদয়
মার্চের শেষে গুমোট গরম পুরো ঢাকা জুড়ে।
রুদ্ধদ্বার বৈঠক চলছে ক্ষমতা হস্তান্তরের আর তার অন্তরালে নীরবে আঁকা হচ্ছে এক কূটনৈতিক নীলনকশা। কয়েকধাপে অনেক আগেই সিদ্ধান্ত হয়ে গেছে এই বিষয়ে।
চট্টগ্রাম বন্দরে যারা এতে সায় দিচ্ছে না, বিনা প্রশ্নে পদচ্যুত হচ্ছে। গুরুত্বপূর্ণ জায়গাগুলো থেকে কর্মকর্তাদের সরিয়ে নতুন কর্মকর্তাদের নিয়োগ করা হচ্ছে বিনা নোটিশে। ঢাকার মাঝে মাঝে ব্যারিকেড দেখে খবর গেলো হাই-কমান্ডে। হাই-কমান্ড সময় এগিয়ে আনলো।
রাত সাড়ে এগারোটায় ঘেরাও হলো গ্রাউন্ড জিরো — ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। যে বুদ্ধিবৃত্তিক অস্ত্রাগার থেকে বিপ্লবের প্রত্যাঘাত হতে পারে, তাকে চারিদিক থেকে ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট থেকে এম-২৪ ট্যাঙ্ক এবং ১৮, ২২ ও ৩২ ইনফ্যান্ট্রি রেজিমেন্টের ভারী অস্ত্রে সজ্জিত সেনারা ঘিরে ফেলে।
তারপর কমান্ড পাওয়ার পরেই শুরু হলো ফায়ারিং। সার্জেন্ট জহুরুল হক হল, জগন্নাথ হল, রোকেয়া হল – সর্বত্র। আন্তর্জাতিক সব ব্যক্তিত্বকে সরিয়ে ফেলা হয়েছে। ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেল থেকে তবুও ছবি লিখে আর্টিকেল পাবলিশ করলেন এক নাছোড়বান্দা সাংবাদিক, সাইমন ড্রিং।
ব্রিটেনের দ্য ডেইলি টেলিগ্রাফের হেডলাইন প্রকাশিত হলো: Tanks Crush Revolt in Pakistan: 7,000 Slaughtered, Homes Burned.
হ্যাঁ, বলছি বাংলাদেশের রক্তাক্ত জন্মবৃত্তান্ত: ২৫শে মার্চ ১৯৭১ এর কথা।
বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে ২০০ জনেরও বেশি ছাত্রকে হত্যা করা হয়। সামরিক বাহিনী বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে মেধাবী শিক্ষকদেরও খুঁজে বের করে। ফলিত পদার্থবিজ্ঞানের তরুণ লেকচারার অধ্যাপক অনুদ্বৈপায়ন ভট্টাচার্য, যিনি পরদিন উচ্চশিক্ষার জন্য লন্ডন যাওয়ার কথা ছিল, তাকে জগন্নাথ হলের লনে টেনে নিয়ে গিয়ে পয়েন্ট-ব্ল্যাঙ্ক রেঞ্জে গুলি করা হয় এবং তার মৃতদেহ একটি গণকবরে ফেলে দেওয়া হয়।
ক্যানটিন পরিচালক মধুসূদন দে (মধু দা)-কে তার স্ত্রী ও সন্তান সহ বিশ্ববিদ্যালয়ের মাঠে টেনে নিয়ে গিয়ে গুলি করে সেনারা। আমেরিকান ফোক গায়িকা জোয়ান বায়েজ পরবর্তীতে তার ‘সং অফ বাংলাদেশ’-এ এই ক্যাম্পাসের বিভীষিকাকে এভাবে বর্ণনা করেন: “The soldiers came and shot them in their beds / And terror took the dorm awakening shrieks of dread.”
এর কয়েক দিন আগের ঢাকা এক দূরদর্শী কূটকৌশলের রঙ্গমঞ্চ হিসেবে সাজানো হচ্ছিল। নিয়মিত বাঙালি ইউনিটগুলোকে পরিকল্পিতভাবে ক্যান্টনমেন্টের বাইরে পাঠানো হয় বা ছোট ছোট দলে বিভক্ত করা হয়। রেডিও যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়।
বাঙালি সেনা কর্মকর্তাদের সংবেদনশীল কমান্ড সেন্টার থেকে সরিয়ে দেওয়া হয় বা ছুটিতে পাঠানো হয়, যদিও ফেব্রুয়ারি থেকে সব ছুটি বাতিল ছিল। অন্যদিকে পশ্চিম পাকিস্তানি কর্মকর্তাদের তাদের পদে বহাল রাখা হয়। দুটি পশ্চিম পাকিস্তানি ইউনিট (১৩ ফ্রন্টিয়ার ফোর্স এবং ২২ বেলুচ রেজিমেন্ট) গোপনে বেসামরিক পিআইএ ফ্লাইটে “বিশেষ যাত্রী” হিসেবে ঢাকায় নিয়ে আসা হয়। চট্টগ্রামে ‘এমভি সোয়াত’ জাহাজ থেকে ৯,০০০ টন যুদ্ধাস্ত্র নামানোর কাজ ত্বরান্বিত করা হয়। যে বাঙালি কর্মকর্তা সাধারণ মানুষের ওপর গুলি চালাতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন, তাকে পদচ্যুত করা হয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চলে নারকীয় হত্যাযজ্ঞ। এই যজ্ঞের হোমে উৎসর্গ হয় বাংলার সবচেয়ে মধাবী সন্তানদের একটি অংশ। (১৪ ডিসেম্বর আমরা এই নীলনকশার পূর্ণ বাস্তবায়ন দেখতে পাই)। অপারেশন সার্চ লাইট এভাবেই বিপ্লবের বারুদ খুঁজে বের করে দাহ করতে শুরু করে।
সাধারণ মানুষ এবং বুদ্ধিজীবীরা সম্পূর্ণ অরক্ষিত ছিলেন। রাজারবাগ পুলিশ লাইন্স এবং পিলখানায় ইপিআর-এর বাঙালি সশস্ত্র সদস্যeরা প্রথম মরিয়া সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। পাকিস্তানি সামরিক কমান্ড বুঝতে পেরেছিল যে এই সশস্ত্র বাহিনীগুলো তাদের প্রদেশ দখলের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা হবে। তাই রাজারবাগে এক হাজার বাঙালি পুলিশকে নিরস্ত্র করতে ৩২-পাঞ্জাব রেজিমেন্ট এবং পিলখানায় ৫,০০০ বাঙালি ইপিআর সৈন্যকে নিষ্ক্রিয় করতে ২২- বেলুচ রেজিমেন্ট পাঠানো হয়।
বাঙালি অফিসাররা এই বিশ্বাসঘাতকতার আঁচ আগেই পেয়েছিলেন তাই রাজারবাগের পুলিশ সদস্যরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে অস্ত্র তুলে নেন, অস্ত্রাগার ভেঙে ফেলেন এবং পাকিস্তানের পতাকার বদলে বাংলাদেশের নতুন পতাকা উত্তোলন করে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন।
রাত ১০টায় যখন পাকিস্তানি বাহিনী আক্রমণ করে, তখন পুলিশ সদস্যরা পুরনো থ্রি-নট-থ্রি (.303) রাইফেল নিয়ে স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র ও ট্যাঙ্কের বিরুদ্ধে এক অসম যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন। পিলখানাতেও ইপিআর সদস্যরা বীরত্বের সঙ্গে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন।
মার্কিন কনস্যুলেটের তথ্য অনুযায়ী, পিলখানায় প্রায় ৭০০ ইপিআর সদস্য নিহত হন, ২০০ জন ধরা পড়েন এবং ১০০ জন অস্ত্রসহ পালিয়ে গিয়ে পরবর্তীতে গেরিলা বাহিনীতে যোগ দেন। আত্মরক্ষার প্রতিরোধ হয়ে যায় মুক্তির লড়াই, আর এভাবেই শুরু হয় — মুক্তিযুদ্ধ।
পুরো দেশেই আগুনের মতো ছড়িয়ে পড়ে এই বিভীষিকা। শেখ মুজিবুর রহমান – তৎকালীন নির্বাচনে বিজয়ী প্রতিনিধি এবং পূর্ব পাকিস্তানের মুখপাত্র তখন নিজের ৭ই মার্চের ভাষণের পরোক্ষ ঘোষণার পর সরাসরি প্রতিরোধের ঘোষণা দেন; চট্টগ্রামের কালুর ঘাট বেতারকেন্দ্র থেকে মেজর জিয়াউর রহমানের কণ্ঠে সারা বাংলাদেশ শোনে স্বাধীনতার ঘোষণা।
অপারেশন সার্চলাইট তার তাৎক্ষণিক কৌশলগত উদ্দেশ্যগুলোতে সফল হয়েছিল: ভবনগুলো দখল করা হয়েছিল, নেতাদের গ্রেপ্তার বা হত্যা করা হয়েছিল এবং প্রতিরোধ সাময়িকভাবে দমন করা হয়েছিল। তবুও, দীর্ঘমেয়াদে এটি ছিল একটি চরম অদূরদর্শী ব্যর্থতা।
পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর চরম বর্বরতা বাঙালি জাতীয়তাবাদকে নস্যাৎ করেনি; বরং এটিকে একটি অদম্য অস্ত্রে পরিণত করেছিল। ২৫শে মার্চ, ১৯৭১-এর রাতে ঝরা রক্ত যুক্ত-পাকিস্তানের মনস্তাত্ত্বিক বন্ধন চিরতরে ছিন্ন করে দিয়েছিল।
ঢাকার ধূমায়িত ধ্বংসস্তূপের ওপর সেই ভয়াল অমনিশার পর যখন সূর্য উঠেছিল, তখন তা এক অকল্পনীয় ট্র্যাজেডির দৃশ্যপটকে উন্মোচিত করে: শেয়াল-কুকুরে ছিঁড়ে নেয়া আধ-খাওয়া লাশ, ঝাঁঝরা হয়ে যাওয়া রিকশাওয়ালার বুকের ছাতি, পয়েন্ট ব্ল্যাঙ্ক রেঞ্জের গুলিতে বেরিয়ে আসা দেশের সবচেয়ে মেধাবী ছেলেটির মস্তিষ্ক আর সবথেকে চৌকস ছাত্রীর ধর্ষণের আর্তনাদ… এমনই এক রক্তাপ্লুত ভোরে একটি নতুন, স্বাধীন দেশ আত্মপ্রকাশ করেছিল — বাংলাদেশ।