ইচ্ছাশক্তিই যথেষ্ট না; যেকারণে কিছু ব্যক্তির জন্য ওজন কমানো বেশি কঠিন

‘ওয়েট ওয়াচারস’-এর মেডিকেল ডিরেক্টর ডা. কিম বয়ড বলেন, ‘ইচ্ছাশক্তি’ বা ‘আত্মনিয়ন্ত্রণ’ শব্দগুলো আসলে ভুল। মানুষকে বছরের পর বছর বলা হয়েছে কম খেতে আর বেশি নড়াচড়া করতে। কিন্তু স্থূলতা অনেক বেশি জটিল বিষয়।

18-April-Health WEB

‘মোটা মানুষের আসলে আত্মনিয়ন্ত্রণ নেই’, ‘কম খেলেই তো হয়, এত কঠিন কী!’—ওজন কমানোর ওষুধ নিয়ে লেখা এক প্রবন্ধের নিচে এমন ১,৯৪৬টি মন্তব্যের দেখা মিললো।

অনেকেই মনে করেন, স্থূলতা বা অতিরিক্ত ওজন শুধুই ইচ্ছাশক্তির অভাব। এমনকি কিছু চিকিৎসকের ধারণা, জীবনযাত্রার ধরন পাল্টালেই স্থূলতা এড়ানো সম্ভব। যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড ও যুক্তরাষ্ট্রের মানুষের ওপর করা এক গবেষণায় দেখা গেছে, ১০ জনের মধ্যে ৮ জনই মনে করেন, স্থূলতা প্রতিরোধ পুরোপুরি ব্যক্তির হাতে।

কিন্তু ২০ বছর ধরে স্থূল ও অতিরিক্ত ওজনের রোগীদের নিয়ে কাজ করা ডায়েটিশিয়ান বিনি সুরেশ এই ধারণায় বিরক্ত। তিনি বলেন, ‘আমি এমন অনেক রোগী দেখি যারা অত্যন্ত অনুপ্রাণিত, সচেতন এবং নিয়মিত চেষ্টা করেও ওজন কমাতে হিমশিম খাচ্ছেন।’

‘ওয়েট ওয়াচারস’-এর মেডিকেল ডিরেক্টর ডা. কিম বয়ড বলেন, ‘ইচ্ছাশক্তি’ বা ‘আত্মনিয়ন্ত্রণ’ শব্দগুলো আসলে ভুল। মানুষকে বছরের পর বছর বলা হয়েছে কম খেতে আর বেশি নড়াচড়া করতে। কিন্তু স্থূলতা অনেক বেশি জটিল বিষয়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্থূলতার পেছনে হাজারো কারণ থাকতে পারে, যার অনেক কিছুই এখনো পুরোপুরি বোঝা যায়নি।

জীববিজ্ঞানের সঙ্গে যুদ্ধ

ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের জেনেটিকস অব ওবেসিটি স্টাডিজের প্রধান অধ্যাপক সাদাফ ফারুকি বলেন, ‘মানুষের ওজন বাড়ার পেছনে জিনের বড় ভূমিকা আছে। কিছু জিন মস্তিষ্কের সেই পথগুলোকে প্রভাবিত করে যা ক্ষুধা ও পেট ভরার অনুভূতি নিয়ন্ত্রণ করে।’

স্থূলতার পেছনে হাজারো কারণ থাকতে পারে। ছবি: বিবিসি

তিনি জানান, স্থূলতায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে এমন কিছু জিনগত পরিবর্তন দেখা যায়, যার কারণে তারা অন্যদের চেয়ে বেশি ক্ষুধার্ত বোধ করেন এবং খাওয়ার পরও পেট ভরার অনুভূতি কম পান।

এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো এমসি৪আর জিন। বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ মানুষের মধ্যে এই জিনের একটি মিউটেশন বা পরিবর্তন রয়েছে, যা মানুষকে বেশি খেতে উৎসাহিত করে।

অধ্যাপক ফারুকি আরও বলেন, ‘কিছু জিন আমাদের মেটাবলিজম বা বিপাক ক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করে। এর মানে হলো, একই পরিমাণ খাবার খেয়েও কারও ওজন বেশি বাড়বে, আবার কেউ ব্যায়াম করেও কম ক্যালরি ঝরাবে।’

হাজার হাজার জিন ওজনের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে, যার মধ্যে মাত্র ৩০-৪০টি সম্পর্কে আমরা বিস্তারিত জানি।

ইয়ো-ইয়ো ডায়েটিংয়ের বিজ্ঞান

ব্যারিয়াট্রিক সার্জন অ্যান্ড্রু জেনকিনসন ‘হোয়াই উই ইট টু মাচ’ বইয়ের লেখক। তিনি ‘সেট ওয়েট পয়েন্ট থিওরি’র কথা বলেন। তার মতে, সবার মস্তিষ্কে ওজনের একটি নির্দিষ্ট মান বা ‘সেট পয়েন্ট’ ঠিক করা থাকে। এটি জিনগত, পরিবেশ, মানসিক চাপ ও ঘুমের ওপর নির্ভর করে।

শরীরের ওজন থার্মোস্ট্যাটের মতো কাজ করে। ওজন সেট পয়েন্টের নিচে নামলে শরীর ক্ষুধা বাড়িয়ে দেয় এবং মেটাবলিজম কমিয়ে দেয়। ডা. জেনকিনসন বলেন, ‘ইচ্ছাশক্তি দিয়ে এই সেট পয়েন্ট পরিবর্তন করা খুব কঠিন।’

এ কারণেই ‘ইয়ো-ইয়ো ডায়েটিং’ বা ওজন কমার পর আবার বেড়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটে। তিনি ব্যাখ্যা করেন, ‘ধরুন আপনার ওজন ২০ স্টোন এবং মস্তিষ্ক সেটাকেই ঠিক মনে করে। আপনি ডায়েট করে ২ স্টোন কমালেন। তখন শরীর মনে করবে আপনি না খেয়ে আছেন। ফলে প্রবল ক্ষুধা ও মেটাবলিজম কমে যাওয়ার মতো প্রতিক্রিয়া দেখা দেবে। এই ক্ষুধা উপেক্ষা করা সত্যিই কঠিন।’

তিনি লেপটিন হরমোনের কথা উল্লেখ করেন, যা মস্তিষ্কে শরীরের শক্তির মজুত সম্পর্কে সংকেত পাঠায়। কিন্তু আধুনিক খাদ্যাভ্যাসে ইনসুলিন বেড়ে গেলে লেপটিনের সংকেত বাধাগ্রস্ত হয়। ফলে মস্তিষ্ক বুঝতেই পারে না শরীরে কতটা চর্বি জমেছে।

স্বাস্থ্যকর খাবারের দাম অস্বাস্থ্যকর খাবারের চেয়ে ক্যালরি প্রতি দ্বিগুণেরও বেশি। ছবি: বিবিসি

তবে আশার কথা হলো, জীবনযাত্রায় দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন, ভালো ঘুম ও মানসিক চাপ কমানোর মাধ্যমে ধীরে ধীরে এই সেট পয়েন্ট পরিবর্তন করা সম্ভব।

যুক্তরাজ্যে স্থূলতার মহামারি

আমাদের জিন বদলায়নি, তবু কেন স্থূলতা বাড়ছে? গত এক দশকে যুক্তরাজ্যে অতিরিক্ত ওজনের মানুষের সংখ্যা বেড়েছে। হেলথ ফাউন্ডেশনের ২০২৫ সালের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, যুক্তরাজ্যের ৬০ শতাংশেরও বেশি প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ এখন এই ক্যাটাগরিতে পড়েন।

এর কারণ হিসেবে সস্তা ও নিম্নমানের প্রক্রিয়াজাত খাবারের সহজলভ্যতাকে দায়ী করা হচ্ছে। সঙ্গে যোগ হয়েছে ফাস্ট ফুড ও চিনিযুক্ত পানীয়ের আগ্রাসী বিজ্ঞাপন এবং শারীরিক পরিশ্রমের সুযোগ কমে যাওয়া।

বিশেষজ্ঞরা একে ‘ওবেসোজেনিক এনভায়রনমেন্ট’ বা স্থূলতা সহায়ক পরিবেশ বলছেন। এই পরিবেশে একজন অত্যন্ত অনুপ্রাণিত মানুষের পক্ষেও ওজন নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন।

নিউক্যাসল সিটি কাউন্সিলের জনস্বাস্থ্য পরিচালক অ্যালিস উইসম্যান বলেন, ‘চারদিকে শুধু খাবারের দোকান। স্কুলে বা কাজে যাওয়ার পথে ফাস্ট ফুডের দোকান এড়িয়ে যাওয়া অসম্ভব। শরীর অবচেতনভাবেই এসব খাবারের প্রতি প্রতিক্রিয়া দেখায়।’

যুক্তরাজ্য সরকার জাঙ্ক ফুডের বিজ্ঞাপন নিয়ন্ত্রণে নতুন নিয়ম চালু করেছে। কিন্তু উইসম্যান মনে করেন, এটি যথেষ্ট নয়। দ্য ফুড ফাউন্ডেশনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্বাস্থ্যকর খাবারের দাম অস্বাস্থ্যকর খাবারের চেয়ে ক্যালরি প্রতি দ্বিগুণেরও বেশি।

তিনি বলেন, ‘যে পরিবারে অর্থের টানাটানি, তাদের পক্ষে স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়া কঠিন। এখানে ব্যক্তিগত দায়িত্বের কথা বলে লাভ নেই। আমাদের ইচ্ছাশক্তি হঠাৎ কমে যায়নি, পরিবেশটাই বদলে গেছে।’

বিনি সুরেশও একমত। তিনি বলেন, ‘স্থূলতা চরিত্রের কোনো দোষ নয়। এটি জীববিজ্ঞান ও পরিবেশের জটিল সমীকরণ। শুধু ইচ্ছাশক্তি দিয়ে এর সমাধান সম্ভব নয়।’

তবে ভিন্নমতও আছে। অধ্যাপক কিথ ফ্রেইন মনে করেন, ‘ইচ্ছাশক্তি’ শব্দটিকে পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া ঠিক হবে না। তিনি বলেন, ‘যারা সফলভাবে ওজন কমিয়েছেন, তাদের কাছে ইচ্ছাশক্তির কোনো ভূমিকা নেই বললে তারা অপমানিত বোধ করতে পারেন।’

গত এক দশকে যুক্তরাজ্যে অতিরিক্ত ওজনের মানুষের সংখ্যা বেড়েছে। ছবি: বিবিসি

‘পলিসি এক্সচেঞ্জ’-এর গ্যারেথ লায়ন মনে করেন, আইন করে মানুষকে চিকন বানানো সম্ভব নয়। তিনি বলেন, ‘মানুষের পছন্দের খাবারের ওপর কর বা নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলে জীবন আরও কঠিন ও ব্যয়বহুল হবে।’

ইনস্টিটিউট অব ইকোনমিক অ্যাফেয়ার্স-এর ক্রিস্টোফার স্নোডেনও মনে করেন, স্থূলতা একটি ব্যক্তিগত সমস্যা। সরকারের কাজ নয় মানুষকে রোগা বানানো।

শেষ কথা

ইচ্ছাশক্তি অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, তবে এটিই একমাত্র চাবিকাঠি নয়। মনোবিজ্ঞানী ডা. এলিনর ব্রায়ান্ট বলেন, ‘ইচ্ছাশক্তি সবসময় এক থাকে না। মেজাজ, ক্লান্তি ও ক্ষুধার ওপর এটি নির্ভর করে।’

তিনি দুই ধরনের ইচ্ছাশক্তির কথা বলেন—নমনীয় ও কঠোর। যারা কঠোর, তারা একবার নিয়ম ভাঙলে পুরো হাল ছেড়ে দেন। আর নমনীয়রা ভুল শুধরে আবার চেষ্টা করেন।

বিনি সুরেশ বলেন, ‘রোগীরা যখন বোঝেন যে তাদের লড়াইটা জীববিজ্ঞানের সঙ্গে, তখন তারা মানসিক শক্তি পান। সঠিক পুষ্টি, নিয়মিত খাবার ও বাস্তবসম্মত লক্ষ্যের মাধ্যমে তাদের খাবারের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নত হয়।’