ঠাণ্ডা আবহাওয়া কেন ঘুমকে প্রভাবিত করে, শীতের রাতে ভালো ঘুমের জন্য যা করতে পারেন

ড. গারলি বলেন, ‘মানুষ সাধারণত কত ঘণ্টা ঘুমালো তা নিয়ে ভাবে। কিন্তু আপনার ঘুমটা গভীর হচ্ছে কি না, সেটা ভাবাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

sleep
Photo: Collected

দিন ছোট হওয়া, রাত বড় হওয়া ও তাপমাত্রা কমে যাওয়া আমাদের দৈনন্দিন জীবনের ওপর এক ধরনের প্রভাব ফেলে। তবে শীতের সময় ঘুমের অভ্যাসে যে পরিবর্তন আসে, তা আরও বেশি সমস্যার সৃষ্টি করে।

কনকনে ঠাণ্ডায় ঘরে অস্বস্তিকর রাত কাটানো থেকে শুরু করে সকালে ঘুম থেকে উঠে ঝিমুনি ভাব, সব মিলিয়ে শীতের মাসগুলোতে ভালো ঘুমের ক্ষেত্রে বেশ অসুবিধা হয়ে থাকে।

‘দ্য বেটার স্লিপ ক্লিনিক’-এর পরিচালক ও চিকিৎসক ডেভিড গারলি জানিয়েছেন, শীতের ঠাণ্ডা আবহাওয়া এবং দিনের বেলার কাজকর্মে পরিবর্তন—উভয়ই শীতের এই সময়টাতে ঘুমের ওপর গভীর প্রভাব ফেলে।

তিনি বিষয়টি এভাবে ব্যাখ্যা করেন, ‘যখন আপনি ঘুমের জন্য প্রস্তুতি নেন, তখন আপনার শরীরের তাপমাত্রা প্রায় ০.৫ থেকে ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস কমে যায়। তাই আপনার শরীর যদি খুব উষ্ণ থাকে, তাহলে ঘুমের ক্ষেত্রে অসুবিধা হতে পারে। ঠিক এ কারণেই অনেক মানুষের গ্রীষ্মকালে ঘুমের সমস্যা হয়।’

অতিরিক্ত গরম যেমন ঘুমের জন্য অসুবিধা, ঠিক তেমনি অতিরিক্ত ঠাণ্ডাও ঘুমের ক্ষেত্রে সমস্যা তৈরি করতে পারে।

ড. গারলি বলেন, সবার জন্য আরামদায়ক তাপমাত্রা এক নয়। শোয়ার ঘর শীতল হওয়া ভালো। তবে সেটা যেন বরফের মতো ঠাণ্ডা না হয়। এমন ঘর ভালো ঘুমের জন্য সহায়ক। 

ঠাণ্ডা কি ঘুমের ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলে?

ড. গারলি ব্যাখ্যা করেন, যদি ঘর খুব ঠাণ্ডা হয়, তাহলে শরীর ঘুমানোর বদলে নিজের তাপমাত্রা ঠিক রাখার দিকে বেশি মনোযোগ দেয়। উদাহরণস্বরূপ, যদি আপনি বিছানায় শীতে কাঁপতে থাকেন, তবে আপনার পক্ষে ঘুমানো কঠিন। এ অবস্থায় আপনার ঘরের পরিবেশ কিছুটা উষ্ণ করার উপায় খুঁজে বের করা প্রয়োজন।

ঠাণ্ডা কি ঘুমের মানের ওপর প্রভাব ফেলে?

ড. গারলি বলেন, ‘মানুষ সাধারণত কত ঘণ্টা ঘুমালো তা নিয়ে ভাবে। কিন্তু আপনার ঘুমটা গভীর হচ্ছে কি না, সেটা ভাবাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। হঠাৎ অতিরিক্ত ঠাণ্ডার কারণে যদি ঘুমে ব্যাঘাত ঘটে, তবে তা হয়তো আপনাকে পুরোপুরি জাগিয়ে দেবে না, কিন্তু আপনাকে গভীর ঘুম থেকে হালকা ঘুমে নিয়ে আসবে, যা খুব একটা আরামদায়ক নয়।’

তিনি বলেন, ‘শরীর যখন তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে ব্যস্ত থাকে, তখন আপনার ঘুম পাতলা হয়ে যেতে পারে বা আপনি জেগেই যেতে পারেন। যেমন ধরুন, ক্যাম্পিং করার সময় এমনটা অনেক বেশি ঘটে।’

ড. গারলি বলেন, ‘ক্যাম্পিং করার সময় দেখা যায় ভোর ৩টার দিকে যখন তাপমাত্রা খুব কমে যায়, তখন তারা ঘুম থেকে জেগে ওঠে এবং জমে যাওয়ার মতো ঠাণ্ডা অনুভব করে।’

শীতকালীন অসুস্থতা কি ঘুমের মান এবং পরিমাণের ওপর প্রভাব ফেলে?

ড. গারলির ভাষ্য, ‘যদি আপনার নাক বন্ধ থাকে, নাক দিয়ে পানি পড়ে, কাশি বা গলা ব্যথা থাকে, তবে আপনার জন্য ঘুমানো বেশ কঠিন।’ 

সাধারণ সর্দি-কাশি ‘অবস্ট্রাকটিভ স্লিপ অ্যাপনিয়া’র মতো ঘুমের সমস্যার লক্ষণগুলোকে আরও খারাপ করে তুলতে পারে। স্লিপ অ্যাপনিয়া হলো নাক ডাকার সাথে যুক্ত একটি সমস্যা, যেখানে ঘুমের মধ্যে শ্বাসনালী বারবার বন্ধ হয়ে যায় এবং নিঃশ্বাস নিতে বাধা সৃষ্টি হয়, ফলে ঘুম বারবার ভেঙে যায়।

ড. গারলি জানান, যদি আপনার আগে থেকেই স্লিপ অ্যাপনিয়া হওয়ার সম্ভাবনা থাকে এবং তারপর সর্দি লাগে, তবে আপনার ঘুমের মান অনেক খারাপ হয়ে যেতে পারে এবং বারবার ঘুম ভেঙে যাওয়ার মতো অসুবিধা হতে পারে।

এছাড়াও মানসিক স্বাস্থ্য এবং ঘুম একে অপরের সাথে গভীরভাবে জড়িত।

ড. গারলি বলেন, ‘(যেকোনো ধরনের) উদ্বেগ ঘুমকে কঠিন করে তুলতে পারে এবং বিষণ্নতার কারণে ভোর হওয়ার আগেই ঘুম ভেঙে যেতে পারে।’ 

আবার গবেষণায় দেখা গেছে, ঠিকমতো ঘুম না হলে উদ্বেগ ও বিষণ্নতা তৈরি হতে পারে। তাই ঋতু পরিবর্তনের কারণে যদি আপনার মন খারাপ বা বিষণ্নতা তৈরি হয়, তবে সেই মানসিক অবস্থা অবশ্যই আপনার ঘুমে প্রভাব ফেলবে।

ঠাণ্ডা আবহাওয়া আরও কীভাবে ঘুমের ওপর প্রভাব ফেলে?

ঋতুর এই পরিবর্তন এবং শীতের আবহাওয়া মানুষের দৈনন্দিন রুটিন বদলে দেয়। আর এর সরাসরি প্রভাব ঘুমের ওপর পড়ে। ড. গারলির মতে, শীতের সময়ে দিন ছোট ও রাত বড় হওয়ায় বাইরে মানুষের আনাগোনা কমে যায়, ঠাণ্ডার কারণে অনেকেই ব্যায়াম করা থেকে বিরত থাকেন। এছাড়া এই সময়টাতে নিয়মিত রোদের দেখাও মেলে না। অথচ ভালো ঘুমের জন্য এসব বিষয় খুবই জরুরি।

শীতে ভালো ঘুমের জন্য কিছু পরামর্শ

রুটিন মেনে চলা: ড. গারলির মতে, অন্ধকার বা ঠাণ্ডা যাই হোক না কেন, আপনার প্রতিদিনের রুটিন বা কাজগুলো যতটা সম্ভব স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করুন। ঋতু পরিবর্তনের কারণে নিজের রুটিন বদলে ফেলবেন না। নিজের জীবনের নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে রাখুন।

সক্রিয় থাকা

ড. গারলি বলেন, ‘ব্যায়াম করলে রাতের বেলা শরীর আরও ভালো ঘুমের জন্য প্রস্তুত হয়। যদি বাইরের ঠাণ্ডা এবং অন্ধকারের কারণে ব্যায়াম করা অসুবিধা হয়, তাহলে ঘরের ভেতরেই করা যায় এমন ব্যায়ামগুলো নিয়মিত করুন। 

একাধিক কম্বল ব্যবহার করা

তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ ও ভালো ঘুমের জন্য একাধিক শীতের মধ্যে একাধিক কম্বল ব্যবহার সহায়ক। ড. গারলি বলেন, ‘আপনি যদি একটি ভারী কম্বল ব্যবহার করেন, তবে মাঝরাতে ঘেমে গিয়ে  আপনার ঘুম ভেঙে যেতে পারে। তাই কয়েকটি পাতলা চাদর বা কম্বল ব্যবহার করা ভালো উপায়।’

ঘরের তাপমাত্রা আরামদায়ক রাখা

আপনার জন্য আরামদায়ক তাপমাত্রা নির্দিষ্ট করুন। ড. গারলি বলেন, ‘আপনার শোয়ার ঘর শীতল হওয়া উচিত, তবে একদম ঠাণ্ডা নয়।’

হাঁটতে বের হন

বাইরে দিনের আলোতে কিছুটা সময় কাটান। শরীরের প্রাকৃতিক ঘড়ি বা ঘুমের চক্র ঠিক রাখার জন্য দিনের আলো পাওয়া খুবই জরুরি।

জোর করে ঘুমানোর চেষ্টা না করা

যদি ঘুম না আসে, তবে বিছানা থেকে উঠে পড়ুন এবং যতক্ষণ না আবার ঘুম পায় ততক্ষণ কোনো কাজে নিজেকে ব্যস্ত রাখুন। ঘুম এলে এরপর আবার বিছানায় যান। যদি আপনি বিছানায় শুয়ে ঘুমানোর জন্য ছটফট করেন বা বিরক্ত হন, তবে সেই বিরক্তিই আপনার ঘুম আসার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াবে।