health_0
Illustration: TBS

পবিত্র মাহে রমজান সংযম, আত্মশুদ্ধি ও ইবাদতের মাস। দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকার এই মাসে শরীরের ওপর পড়ে বিশেষ চাপ। ইফতার ও সেহরিতে ভুল খাদ্যাভ্যাস বদহজম, দুর্বলতা, পানিশূন্যতা ও নানা রোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। তাই রোজাকে সহজ ও স্বাস্থ্যসম্মত রাখতে প্রয়োজন পরিকল্পিত খাবার নির্বাচন।

চিকিৎসক ও পুষ্টিবিদদের মতে, কিছু নিয়মনীতি ও পরামর্শ অনুসরণ করলে কষ্ট ছাড়াই রোজা পালন করা যায়। বিভিন্ন দেশে ও সংস্কৃতি ভেদে রমজান মাসে সেহরি ও ইফতারের খাবারের ধরন ভিন্ন হয়ে থাকে। যেমন বাংলাদেশে ভাজাপোড়া খাবার বেশ প্রচলিত যা সাধারণত খুব একটা স্বাস্থ্যকর হয় না, বিশেষত তেলটা যদি ভালো না হয়। স্বাস্থ্যের কথা বিবেচনা করে ভাজাপোড়া খাবার বাদ দিয়ে দেবেন এমন মানুষ হয়তো খুঁজে পাওয়া কঠিন।
তাই তেমন খাবার পুরোপুরি বাদ না দিলেও পরিমিতি বজায় রেখে খাওয়ার কথা বলেন অনেক বিশেষজ্ঞ।

মনে রাখতে হবে, অস্বাস্থ্যকর ইফতার ও সেহরি নানা রোগ-ব্যাধির ঝুঁকি বাড়ায়। দিনভর রোজা রেখে শরীরে যে শক্তি ও পুষ্টির চাহিদা থাকে, তা পূরণে সেহরি ও ইফতারের এমন খাবার খেতে হবে যেগুলোতে পর্যাপ্ত প্রোটিন, কার্বোহাইডেট, ভিটামিন ও মিনারেল সমৃদ্ধ থাকে।

কেন রমজানে খাদ্যাভ্যাস গুরুত্বপূর্ণ

রমজানে প্রতিদিন প্রায় ১৩–১৫ ঘণ্টা না খেয়ে থাকতে হয়। এই সময় শরীর তার শক্তির উৎস হিসেবে জমা গ্লুকোজ ও চর্বি ব্যবহার করে। ইফতার ও সেহরিতে যদি হঠাৎ অতিরিক্ত তেল, চিনি বা ভারী খাবার গ্রহণ করা হয়, তাহলে
• পাকস্থলীর ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে
• হজমে সমস্যা হয়
• রক্তে শর্করার ভারসাম্য নষ্ট হয়
• ক্লান্তি ও অস্বস্তি বাড়ে

এ কারণে রমজানে খাবার হতে হবে পরিমিত, পুষ্টিকর ও সহজপাচ্য।

ইফতারে কী খাবেন

১. খেজুর দিয়ে শুরু করুন
খেজুরে প্রাকৃতিক চিনি, পটাশিয়াম ও ফাইবার থাকে। এটি দ্রুত শক্তি দেয় এবং রক্তে শর্করার মাত্রা ধীরে বাড়ায়। তাই হঠাৎ দুর্বলতা কমে।

২. পানি ও তরল খাবার
ইফতারে প্রথমে পানি বা হালকা শরবত পান করা উচিত। এতে শরীরের পানিশূন্যতা দূর হয় এবং পাকস্থলী খাবারের জন্য প্রস্তুত হয়।

৩. ফল ও সালাদ
শসা, টমেটো, আপেল, কমলা, মৌসুমি ফল ও সালাদ হজমে সাহায্য করে। এগুলো কোষ্ঠকাঠিন্য কমায় এবং শরীরে ভিটামিন ও খনিজ সরবরাহ করে।

৪. হালকা প্রোটিন ও শর্করা
সিদ্ধ ছোলা, ডাল, ঘরে তৈরি নুডলস বা স্যুপ শরীরে শক্তি দেয় এবং দীর্ঘ সময় পেট ভরা রাখে।

৫. রাতের ভারসাম্যপূর্ণ খাবার
তারাবির নামাজের পর ভাত বা রুটি, মাছ বা মুরগি, ডাল ও সবজি খাওয়া ভালো। এতে প্রোটিন, কার্বোহাইড্রেট ও ভিটামিনের ঘাটতি পূরণ হয়।

কী খাবেন সেহরিতে

রোজার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খাবার হলো সেহরি। সেহরির ওপরই নির্ভর করে সারাদিন আপনি কতটা সুস্থ ও কর্মক্ষম থাকবেন। সেহরি ঠিকমতো না খেলে রোজা রাখতে ক্লান্তি, মাথাব্যথা ও দুর্বলতা দেখা দিতে পারে। তাই সেহরিতে এমন খাবার খেতে হবে, যা সহজে হজম হয়, দীর্ঘ সময় শক্তি জোগায় এবং শরীরকে সতেজ রাখে।

১. ভাত বা রুটি সঙ্গে সবজি ও আমিষ
সেহরিতে ভাত বা রুটির সঙ্গে মিশ্র সবজি, মাছ, মাংস বা ডিম খাওয়া ভালো। এতে শরীর প্রয়োজনীয় প্রোটিন ও শর্করা পায়, যা সারাদিন শক্তি ধরে রাখতে সাহায্য করে।

২. আঁশযুক্ত খাবার (ফাইবার)
শাকসবজি, ফল, চিড়া, ওটস বা ডাল জাতীয় খাবারে আঁশ বেশি থাকে। এসব খাবার পেটে দীর্ঘ সময় থাকে, ফলে দিনের বেলা ক্ষুধা কম লাগে।

৩. দুধ ও দই
এক গ্লাস দুধ বা এক বাটি দই হজমে সহায়তা করে এবং শরীরকে সতেজ রাখে। যারা ভারী খাবার খেতে পারেন না, তারা দুধ-কলার সঙ্গে চিড়া বা দই খেতে পারেন।

৪. ফলমূল
কলা, আপেল, পেঁপে, কমলা জাতীয় ফল সেহরিতে রাখলে শরীরে ভিটামিন ও খনিজের ঘাটতি পূরণ হয়।

তবে অনেকেই ভাবেন, বেশি খেলে হয়তো সারাদিন ক্ষুধা কম লাগবে। কিন্তু বাস্তবে তা হয় না। কারণ—
• খাবার ৪–৫ ঘণ্টার মধ্যেই হজম হয়ে যায়
• অতিরিক্ত খেলে গ্যাস ও বদহজম হয়
• ঘুম ও কাজের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে

তাই সেহরিতে পেট ভরে নয়, প্রয়োজন অনুযায়ী খাবেন।

রমজানে যেসব খাবার ও অভ্যাস এড়িয়ে চলা জরুরি

রমজান মাসে দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকার ফলে শরীর স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি সংবেদনশীল হয়ে পড়ে। এই সময়ে ভুল খাদ্যাভ্যাস শরীরে দুর্বলতা, বদহজম, পানিশূন্যতা ও নানা জটিলতা তৈরি করতে পারে। তাই কিছু খাবার ও অভ্যাস সচেতনভাবে এড়িয়ে চলা প্রয়োজন।

১। অতিরিক্ত ভাজাপোড়া ও তেলযুক্ত খাবার

পেঁয়াজি, বেগুনি, আলুর চপ, সমুচা ও অন্যান্য ভাজাপোড়া খাবারে অতিরিক্ত তেল থাকে। এসব খাবার পাকস্থলীতে গ্যাস, অম্বল ও বুকজ্বালার সৃষ্টি করে। দীর্ঘ সময় রোজা রাখার পর এ ধরনের খাবার খেলে হজমের সমস্যা আরও বেড়ে যায়। পাশাপাশি একই তেল বারবার ব্যবহার করলে তা স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হয়ে ওঠে।

২। অতিরিক্ত মিষ্টি ও চিনিযুক্ত খাবার

জিলাপি, বুন্দিয়া, মিষ্টান্ন, কোল্ডড্রিংকস ও প্যাকেটজাত জুসে অতিরিক্ত চিনি থাকে। এসব খাবার রক্তে শর্করার মাত্রা হঠাৎ বাড়িয়ে দেয়, ফলে দুর্বলতা, মাথা ঘোরা ও ক্লান্তি দেখা দিতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে এটি ওজন বৃদ্ধি ও ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়ায়।

৩। অতিরিক্ত লবণ ও লবণাক্ত খাবার

সেহরি বা ইফতারে বেশি লবণযুক্ত খাবার খেলে শরীরে পানির চাহিদা বেড়ে যায়। ফলে সারাদিন তীব্র পিপাসা অনুভূত হয় এবং পানিশূন্যতার ঝুঁকি বাড়ে। আচার, চিপস, লবণাক্ত স্ন্যাকস এড়িয়ে চলাই ভালো।

৪। কার্বোনেটেড ও এনার্জি ড্রিংক

সোডা, সফট ড্রিংক ও এনার্জি ড্রিংক সাময়িকভাবে স্বস্তি দিলেও এগুলো শরীর থেকে পানি বের করে দেয়। এতে ডিহাইড্রেশন বাড়ে এবং গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা দেখা দেয়। এসব পানীয়তে অতিরিক্ত চিনি ও কেমিক্যাল থাকায় তা স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর।

৫। চা, কফি ও ক্যাফেইনজাতীয় পানীয়

চা ও কফিতে থাকা ক্যাফেইন প্রস্রাবের প্রবণতা বাড়ায়। ফলে শরীর দ্রুত পানিশূন্য হয়ে পড়ে। বিশেষ করে সেহরিতে চা-কফি পান করলে দিনের বেলায় ক্লান্তি ও মাথাব্যথা বাড়তে পারে।

৬। অতিরিক্ত ঝাল ও মসলাযুক্ত খাবার

অতিরিক্ত ঝাল ও মসলা পাকস্থলীর আস্তরণে জ্বালা সৃষ্টি করে। এতে বুকজ্বালা, গ্যাস্ট্রিক ও বদহজমের সমস্যা দেখা দেয়। রোজার সময় পাকস্থলী দীর্ঘ সময় খালি থাকায় এই সমস্যা আরও প্রকট হয়।

৭। সেহরি বাদ দেওয়া বা শুধু পানি খাওয়া

অনেকে ওজন কমানোর আশায় সেহরি না খেয়ে বা শুধু পানি পান করে রোজা রাখেন। এটি শরীরের জন্য ক্ষতিকর। এতে রক্তচাপ কমে যেতে পারে, দুর্বলতা ও মাথাব্যথা দেখা দেয়। সেহরি ছাড়া রোজা রাখা দীর্ঘমেয়াদে স্বাস্থ্যের ক্ষতি করে।

৮। অতিভোজন বা একবারে বেশি খাওয়া

ইফতার বা সেহরিতে একসঙ্গে অনেক বেশি খাবার খেলে পাকস্থলীর ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে। ফলে গ্যাস, বদহজম ও ঘুমের সমস্যা দেখা দেয়। প্রয়োজনের তুলনায় বেশি খাওয়াই রমজানে অসুস্থতার অন্যতম কারণ।

৯। ধূমপান ও মাদকদ্রব্য

সিগারেট ও অন্যান্য নেশাজাতীয় দ্রব্য শরীরকে দুর্বল করে এবং রোজার স্বাভাবিক ছন্দ নষ্ট করে। হঠাৎ বন্ধ করলে অস্বস্তি হতে পারে, তাই ধীরে ধীরে কমানো সবচেয়ে নিরাপদ।

রমজানে সুস্থ থাকার জন্য পরিমিত, পুষ্টিকর ও স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়া জরুরি। ইফতার ও সেহরিতে প্রচুর পানি পান করতে হবে, ভাজাপোড়া ও প্রক্রিয়াজাত খাবার এড়িয়ে চলতে হবে এবং হালকা ব্যায়াম বা সচল থাকার চেষ্টা করতে হবে। এভাবে খাবারের প্রতি সচেতন থাকলে রোজা রেখে সুস্থ থাকা সম্ভব।