ডার্ক এনার্জি নিয়ে রহস্য আরও বাড়ল; কেন মহাবিশ্ব ধ্বংস হতে পারে ‘মহাসংকোচনে’
এত দিন মনে করা হতো, মহাবিশ্ব অনন্তকাল ধরে প্রসারিত হবে। কিন্তু নতুন তত্ত্ব বলছে, এই প্রসারণ হয়তো একদিন থেমে যাবে, এরপর মহাবিশ্ব সংকুচিত হতে হতে একসময় ধ্বংস হয়ে যেতে পারে।
ডার্ক এনার্জি নিয়ে রহস্য আরও বাড়ল; কেন মহাবিশ্ব ধ্বংস হতে পারে ‘মহাসংকোচনে’
এত দিন মনে করা হতো, মহাবিশ্ব অনন্তকাল ধরে প্রসারিত হবে। কিন্তু নতুন তত্ত্ব বলছে, এই প্রসারণ হয়তো একদিন থেমে যাবে, এরপর মহাবিশ্ব সংকুচিত হতে হতে একসময় ধ্বংস হয়ে যেতে পারে।
এতোদিন ধরে বিজ্ঞানীদের ধারণা ছিল, মহাবিশ্ব ক্রমেই দ্রুতগতিতে প্রসারিত হচ্ছে। এমনকি এই ধারণার ওপর ভিত্তি করে নোবেল পুরস্কারও দেয়া হয়েছে। তবে সাম্প্রতিক এক গবেষণা বলছে, মহাবিশ্বের প্রসারণের গতি আসলে বাড়ছে না, বরং ধীর হয়ে আসছে।
মহাবিশ্বের এই প্রসারণের পেছনে মূল চালিকাশক্তি রহস্যময় ‘ডার্ক এনার্জি’। দক্ষিণ কোরিয়ার এক গবেষক দলটির বিশ্লেষণে ইঙ্গিত মিলেছে, এই শক্তি এমনভাবে বদলে যাচ্ছে, যা সময় ও মহাকাশ সম্পর্কে আমাদের এত দিনের জানাশোনা বদলে দিতে পারে।
এত দিন মনে করা হতো, মহাবিশ্ব অনন্তকাল ধরে প্রসারিত হবে। কিন্তু নতুন তত্ত্ব বলছে, এই প্রসারণ হয়তো একদিন থেমে যাবে। এরপর শুরু হবে উল্টো যাত্রা। গ্যালাক্সিগুলো মাধ্যাকর্ষণের টানে আবার একে অপরের দিকে ফিরে আসতে পারে। অর্থাৎ মহাবিশ্ব সংকুচিত হতে হতে ধ্বংস হয়ে যাবে। বিজ্ঞানের ভাষায় মহাবিশ্বের এই পরিণতির নাম দেওয়া হয়েছে ‘বিগ ক্রাঞ্চ’ বা মহাসংকোচন।
সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, তাদের এই অনুমান যদি সত্যি হয়, তবে তা হবে বর্তমান প্রজন্মের জ্যোতির্বিজ্ঞানে সবচেয়ে বড় আবিষ্কারগুলোর একটি।
তবে সব বিজ্ঞানী এ বিষয়ে একমত নন। অনেকেই এই ফলাফল নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন। কিন্তু একই সঙ্গে এটাও সত্য, সমালোচকেরা এখনো দক্ষিণ কোরিয়ার গবেষণা দলের দাবি পুরোপুরি উড়িয়ে দিতে পারেননি।
ডার্ক এনার্জি আসলে কী?
এত দিন বিজ্ঞানীদের ধারণা ছিল, প্রায় ১ হাজার ৩৮০ কোটি বছর আগে ‘বিগ ব্যাং’ এর মাধ্যমে মহাবিশ্বের সৃষ্টি। এরপর থেকে এটি প্রসারিত হচ্ছে। তবে বিজ্ঞানীদের অনুমান ছিল, মাধ্যাকর্ষণের প্রভাবে এই প্রসারণের গতি ধীরে ধীরে কমে আসবে।
কিন্তু ১৯৯৮ সালে বিজ্ঞানীরা ‘ডার্ক এনার্জি’র অস্তিত্বের সন্ধান পান। সুপারনোভা পর্যবেক্ষণ করে তারা দেখেন, মহাবিশ্বের প্রসারণের গতি কমছে না, উল্টো বাড়ছে। দূরের গ্যালাক্সিগুলো একে অপরের কাছ থেকে দ্রুতগতিতে দূরে সরে যাচ্ছে।
এ নিয়ে তখন কিছু তত্ত্ব সামনে আসে। বলা হয়, মহাবিশ্বের এই প্রসারণ অনির্দিষ্টকাল ধরে চলতেই থাকবে। একসময় নক্ষত্রগুলো এত দূরে সরে যাবে যে রাতের আকাশে আর কিছুই দেখা যাবে না। এমনকি প্রসারণের চূড়ান্ত পর্যায়ে পরমাণুর কণাগুলোও ছিঁড়েখুঁড়ে আলাদা হয়ে যেতে পারে। মহাবিশ্বের এই পরিণতির নাম দেওয়া হয় ‘বিগ রিপ’।
অন্যদিকে কিছু জ্যোতির্বিদরা মনে করতেন, মহাকর্ষ বলের প্রভাবে এই প্রসারণ একসময় কমবে এবং মহাবিশ্ব আবার সংকুচিত হয়ে নিজের ভেতরেই ধসে পড়বে।
চলতি বছরে পাওয়া কিছু প্রাথমিক তথ্য-উপাত্ত এখন এই দ্বিতীয় ধারণাটির দিকেই ইঙ্গিত করছে। নতুন করে এই বিতর্কের শুরু হয় গত মার্চ মাসে। যুক্তরাষ্ট্রের অ্যারিজোনার মরুভূমিতে বসানো একটি বিশেষ টেলিস্কোপ থেকে পাওয়া তথ্যে ‘বিগ ক্রাঞ্চ’ তত্ত্বের পক্ষেই প্রাথমিক সমর্থন মিলছে। ‘ডার্ক এনার্জি স্পেকট্রোস্কোপিক ইনস্ট্রুমেন্ট’ বা ‘ডেসি’ নামের ওই যন্ত্রে গত মার্চে কিছু অপ্রত্যাশিত ফলাফল ধরা পড়ে, যা বিজ্ঞানীদের নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে।
ডার্ক এনার্জির ‘দুর্বল’ হয়ে পড়া
ডার্ক এনার্জির রহস্য ভেদ করতেই মূলত ‘ডেসি’ তৈরি করা হয়েছিল। লাখ লাখ গ্যালাক্সির গতিবেগ ও ত্বরণ অত্যন্ত নিখুঁতভাবে পর্যবেক্ষণ করেছে যন্ত্রটি। কিন্তু সেখান থেকে যে ফলাফল পাওয়া গেছে, তা বিজ্ঞানীদের একেবারেই প্রত্যাশায় ছিল না।
ডেসি প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের অধ্যাপক ওফার লাহাভ বলেন, তথ্যে দেখা যাচ্ছে গ্যালাক্সির ত্বরণ সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হয়েছে, যা প্রচলিত ধারণার সঙ্গে মেলে না।
গত নভেম্বরে রয়্যাল অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল সোসাইটি (আরএএস) দক্ষিণ কোরিয়ার একটি গবেষক দলের গবেষণা প্রকাশ করে। সেখানে ডার্ক এনার্জির এই অদ্ভুত আচরণের বিষয়টি আরও জোরালো হয়।
সিউলের ইয়নসেই ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ইয়ং উক লি এবং তার দল ২৭ বছর আগের সেই সুপারনোভার তথ্য-উপাত্তগুলো নিয়ে আবারও কাজ করেছেন—যে তথ্য প্রথমবার ডার্ক এনার্জির অস্তিত্ব জানান দিয়েছিল।
সুপারনোভার উজ্জ্বলতা মহাবিশ্বের দূরত্ব পরিমাপ করতে ব্যবহৃত হয়।তবে এবার তারা সুপারনোভার উজ্জ্বলতাকে গ্যালাক্সির বয়সের সঙ্গে সমন্বয় করে নতুন করে হিসাব কষেছেন। দেখা যাচ্ছে, ডার্ক এনার্জি সময়ের সঙ্গে শুধু বদলায়নি, বরং মহাবিশ্বের প্রসারণের গতিও কমিয়ে দিচ্ছে।
অধ্যাপক লির ফলাফল অনুযায়ী, ডার্ক এনার্জি গ্যালাক্সিগুলোকে একে অপরের থেকে দূরে ঠেলে দিচ্ছে, তা যদি দুর্বল হয়ে পড়ে, তবে একসময় মহাকর্ষ বল বা গ্রাভিটিই জিতে যাবে। তখন গ্যালাক্সিগুলো আবার একে অপরের দিকে ছুটে আসবে।
অধ্যাপক লি বলেন, ‘সে ক্ষেত্রে মহাবিশ্বের সমাপ্তি ‘বিগ রিপ’ না হয়ে ‘বিগ ক্রাঞ্চ’ দিয়ে হওয়ার সম্ভাবনাই এখন বেশি। তবে শেষ পর্যন্ত কী হবে, তা নির্ভর করছে ডার্ক এনার্জির আসল প্রকৃতির ওপর, যা আমরা এখনো পুরোপুরি জানি না।’
অধ্যাপক লির এই গবেষণা ইতিমধ্যে সংশ্লিষ্ট খাতের অন্য বিশেষজ্ঞরা যাচাই-বাছাই করেছেন। রয়্যাল অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল সোসাইটির (আরএএস) জার্নালে তা প্রকাশিতও হয়েছে। কিন্তু অনেকই তার এই দাবি মেনে নিতে পারছেন না। তাদেরই একজন কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব অ্যাস্ট্রোনমির অধ্যাপক জর্জ এফস্টাথিউ।
অধ্যাপক এফস্টাথিউ বলেন, ‘আমার মনে হয়, সুপারনোভার কিছু জটিল ও বিশৃঙ্খল বিষয়কেই এখানে বড় করে দেখানো হয়েছে। গ্যালাক্সির বয়সের সঙ্গে সুপারনোভার উজ্জ্বলতার সম্পর্ক খুব একটা জোরালো নয়। তাই এর ওপর ভিত্তি করে তথ্যে কোনো ‘সংশোধন’ আনা বা সিদ্ধান্তে আসাটা বিপজ্জনক। আমার কাছে প্রমাণটি বেশ দুর্বল মনে হয়েছে।’
অধিকাংশ বিজ্ঞানী এখনো মূলধারার এই মতই পোষণ করেন যে মহাবিশ্বের প্রসারণের গতি বাড়ছে এবং ডার্ক এনার্জির তেমন কোনো পরিবর্তন হচ্ছে না।
তবে এসব সমালোচনার পরও নিজের অবস্থানে অনড় অধ্যাপক লি। তিনি বলেন, ‘আমাদের এই ফলাফল ৩০০টি গ্যালাক্সির তথ্যের ওপর ভিত্তি করে পাওয়া। পরিসংখ্যানগতভাবে এখানে ভুল হওয়ার বা কাকতালীয়ভাবে মিলে যাওয়ার সম্ভাবনা ‘ওয়ান-ইন-আ-ট্রিলিয়ন’। তাই আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, আমাদের এই গবেষণা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।’