পুতুল বুকে জড়িয়ে ছোট্ট পাঞ্চের লড়াই

জাপানি ম্যাকাক প্রজাতির বানর ‘পাঞ্চ’। জন্মের পরই মা তাকে ফেলে চলে যায়। এমন পরিস্থিতিতে চিড়িয়াখানার কর্মীরা তাকে ওরাংওটাংয়ের একটি পুতুল খেলতে দেন। মায়ের আদর না পাওয়া পাঞ্চের সেই পুতুল আঁকড়ে ধরে থাকার দৃশ্য এরই মধ্যে আন্তর্জাতিক মহলের নজর কেড়েছে।

baby_macaque_punch
ছবিঃ এক্স

মায়ের ভালোবাসা পায়নি সে। উল্টো জুটেছে অন্য বানরদের অবহেলা আর মারধর। এই নিঃসঙ্গ অবস্থায় একটি খেলনা পুতুলই তার একমাত্র ভরসা।

জাপানের একটি চিড়িয়াখানার এই বানর ছানার গল্প ছুঁয়ে গেছে সারা বিশ্বের মানুষের হৃদয়।

গত সপ্তাহে চিড়িয়াখানার অন্য বানরদের উৎপীড়নের শিকার হওয়া ও মায়ের প্রত্যাখ্যানের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর আলোচনায় আসে সে।

বানর ছানাটির নাম ‘পাঞ্চ’। সে জাপানি ম্যাকাক প্রজাতির বানর। গত জুলাইয়ে জাপানের ইচিকাওয়া চিড়িয়াখানায় জন্ম তার। জন্মের পর মা তাকে ফেলে চলে যায়। এমন পরিস্থিতিতে চিড়িয়াখানার কর্মীরা তাকে ওরাংওটাংয়ের একটি নরম পুতুল খেলতে দেন। মায়ের আদর না পাওয়া পাঞ্চের সেই পুতুল আঁকড়ে ধরে থাকার দৃশ্য আন্তর্জাতিক মহলের নজর কেড়েছে।

অন্য বানরদের সঙ্গে কীভাবে মিশতে হবে, মায়ের কাছে তা শেখার সুযোগ পায়নি পাঞ্চ। তাই নিজেকে শান্ত রাখতে ওই পুতুলটিই এখন তার একমাত্র আশ্রয়। চিড়িয়াখানার খাঁচায় বয়স্ক বানরেরা তাকে ধাওয়া করছে বা টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যাচ্ছে—এমন দৃশ্য বেশ কয়েকবার ক্যামেরায় ধরা পড়েছে।

ছড়িয়ে পড়া শুরুর দিকের ভিডিওগুলোতে দেখা যায়, অন্য বানরেরা তাড়িয়ে দেওয়ার পর পুতুলটি নিয়ে একা একা ঘুরছে পাঞ্চ। আর যখনই কেউ তাকে জ্বালাতন করছে, ভয়ে সে পুতুলটিকে শক্ত করে বুকে জড়িয়ে ধরছে। এর মধ্যে অবশ্য একটি ভিডিওতে দেখা যায়, অন্য একটি বানর তাকে আদর করছে, যা দেখে দর্শকেরা কিছুটা স্বস্তি পেয়েছিলেন।

তবে কয়েক দিন পেরোতে না পেরোতেই নতুন আরেকটি ভিডিও সামনে আসে। সেখানে দেখা যায়, পাঞ্চ আবারও আক্রমণের শিকার। এবার তার চেয়ে বেশ বড়সড় একটি বানর তাকে টেনেহিঁচড়ে রীতিমতো বৃত্তাকারে ঘুরিয়ে চরমভাবে হেনস্তা করছে। মার খেয়ে দৌড়ে একটি পাথরের পেছনে লুকিয়ে পড়ে ছোট্ট পাঞ্চ, আর তখনো তার বুকে শক্ত করে জড়ানো ছিল সেই সাধের পুতুল।

পাঞ্চের ভিডিওগুলো ছড়িয়ে পড়ার পর মানুষের মনে একটি প্রশ্নই বারবার ঘুরেফিরে আসছে—বানরেরা কেন নিজের ছানাকে এভাবে ফেলে চলে যায়? এ নিয়ে কথা বলেছেন অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির প্রাইমেট (বানর ও বনমানুষ জাতীয় প্রাণী) বিশেষজ্ঞ অ্যালিসন বেহি। তিনি জানান, বানরের এমন আচরণ সাধারণত দেখা যায় না। তবে বয়স, স্বাস্থ্য ও অনভিজ্ঞতার কারণে কখনো কখনো এমনটা ঘটতে পারে।

পাঞ্চের প্রসঙ্গ টেনে এই বিশেষজ্ঞ বলেন, পাঞ্চের মা এবারই প্রথম সন্তানের জন্ম দিয়েছে। ফলে তার মধ্যে মাতৃত্বের অভিজ্ঞতার ঘাটতি ছিল। এ ছাড়া চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, পাঞ্চের জন্ম হয়েছিল তীব্র দাবদাহের মধ্যে। চারপাশের এমন প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকার লড়াইয়ে মায়েরা অনেক সময় নিজের স্বাস্থ্য ও ভবিষ্যতে আবার মা হওয়ার বিষয়টিকে বেশি গুরুত্ব দেয়। এ কারণে পরিবেশের বিরূপ প্রভাবে ঝুঁকিতে পড়া ছানাকে তারা অবলীলায় ফেলে যেতে পারে।

মা ফেলে যাওয়ার পর পাঞ্চের বুকে আঁকড়ে ধরার জন্য প্রথমে বিভিন্ন আকারের তোয়ালে পেঁচিয়ে দিয়েছিলেন চিড়িয়াখানার কর্মীরা। কিন্তু তাতে খুব একটা কাজ হয়নি। এরপরই বিকল্প হিসেবে ওই ওরাংওটাং পুতুলটি দেওয়া হয়।

চিড়িয়াখানার রক্ষক কোসুকে শিকানো বলেন, ‘জাপানি ম্যাকাক প্রজাতির ছানারা পেশিশক্তি বাড়াতে জন্মের পরপরই মায়ের শরীর শক্ত করে আঁকড়ে ধরে। কোনো কিছু ধরে রাখার মাধ্যমে তারা একধরনের নিরাপত্তাবোধও করে। কিন্তু মায়ের আদর না পাওয়ায় পাঞ্চের আসলে আঁকড়ে ধরার মতো কিছুই ছিল না।’

পুতুল দেওয়ার কারণ হিসেবে এই কর্মী আরও বলেন, ‘আমরা ভেবেছিলাম, দেখতে বানরের মতো হওয়ায় এই পুতুলটি হয়তো পাঞ্চকে ভবিষ্যতে দলের অন্য বানরদের সঙ্গে সহজে মিশতে সাহায্য করবে।’

ওরাংওটাংয়ের পুতুলটি প্রসঙ্গে বিশেষজ্ঞ অ্যালিসন বেহি বলেন, ‘পাঞ্চের বয়স এখন মাত্র ছয় মাস। এ বয়সে তার মাতৃস্নেহ খুব দরকার। পুতুলটি তার কাছে মায়ের শূন্যস্থান পূরণের কাজ করছে বলে মনে হয়।’

অ্যালিসন বেহি আরও বলেন, পাঞ্চের প্রতি অন্য বানরদের এই আচরণ আসলে ‘উত্ত্যক্ত’ করা বা অস্বাভাবিক কিছু নয়। এটি তাদের স্বাভাবিক সামাজিক আচরণেরই অংশ।

তার মতে, জাপানি ম্যাকাকদের মধ্যে মাতৃবংশীয় কঠোর একধরনের পদমর্যাদা মেনে চলার চল রয়েছে। সেখানে অপেক্ষাকৃত শক্তিশালী বা ওপরের সারির পরিবারগুলো নিচের সারির পরিবারগুলোর ওপর ছড়ি ঘোরায়। বেহি বলেন, পাঞ্চের মা সঙ্গে থাকলেও হয়তো তাকে এ ধরনের আচরণের শিকার হতেই হতো।

এদিকে সাম্প্রতিক দিনগুলোতে একনজর পাঞ্চকে দেখতে চিড়িয়াখানায় দর্শনার্থীদের উপচে পড়া ভিড়। পরিস্থিতি সামলাতে খাঁচার চারপাশে আরও মজবুত বেষ্টনী দিয়েছে কর্তৃপক্ষ। সেই সঙ্গে দর্শনার্থীদের শান্ত থাকতে, ছবি তোলার জন্য  সিঁড়ি ব্যবহার না করতে এবং খাঁচার সামনে বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে না থাকতে অনুরোধ করা হয়েছে।

অস্ট্রেলিয়ার অ্যাডিলেড ইউনিভার্সিটির সংরক্ষণ মনোবিজ্ঞানী কার্লা লিচফিল্ড জানান, জাপানি ম্যাকাক বেশ বুদ্ধিমান প্রাণী। এ কারণে জাপানে চিকিৎসাবিজ্ঞান ও স্নায়ুবিজ্ঞানের গবেষণায় এই বানরগুলোর ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। আবার ফসল নষ্ট করার কারণে জাপানে অনেক সময় এদের মেরেও ফেলা হয়।

লিচফিল্ড বলেন, ‘পাঞ্চের এই ঘটনাটি আমাদের আবাসস্থল ধ্বংস, জলবায়ু পরিবর্তন এবং চিড়িয়াখানার প্রাণীদের কল্যাণের মতো বিষয়গুলো চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। একই সঙ্গে প্রাণীজগৎ ও মানুষের মধ্যে সংযোগ তৈরিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ক্ষমতার বিষয়টিও তুলে ধরে।’

তবে এই বিশেষজ্ঞ একটি আশঙ্কার কথাও জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লাখ লাখ লাইক আর মানুষের এই বিপুল আগ্রহ যেন বানর ছানা অবৈধভাবে কেনাবেচার বিষয়টিকে উসকে না দেয়। কারণ, বানর ছানা দেখতে খুব আদুরে হওয়ায় অনেকেই এদের শখ করে পুষতে চান।’

তার মতে, ‘বানরেরা খুব দ্রুত বড় হয়ে যায়। মাত্র চার বছরের মধ্যেই পাঞ্চ পূর্ণবয়স্ক হয়ে যাবে। তখন কিন্তু তাদের আর আদুরে মনে হবে না, সামলানোও কঠিন হয়ে পড়বে। বানরদের জায়গা অন্য বানরদের সঙ্গেই। এরা সামাজিক প্রাণী। শারীরিক ও মানসিক সুস্থতার জন্য এদের নিজেদের প্রজাতির সঙ্গেই থাকা প্রয়োজন।’

চিড়িয়াখানার কোনো প্রাণীর বিশ্বজুড়ে এমন তারকাখ্যাতি পাওয়ার ঘটনা অবশ্য পাঞ্চই প্রথম নয়। এর আগে ২০২৪ সালে থাইল্যান্ডের চিড়িয়াখানায় থাকা পিগমি জলহস্তীর ছানা ‘মু ডেং’–ও তার মজার ও একগুঁয়ে স্বভাব দিয়ে নেটিজেনদের মন জয় করে নিয়েছিল।