টাইগার্স বিটুইন এম্পায়ারস: রাশিয়ার আমুর বাঘ রক্ষার লড়াইয়ের এক মহাকাব্যিক গল্প
বইয়ের একটি অংশে বিষয়টি এভাবে উল্লেখ করা হয়েছে- একবার এক শিকারি মিকেলকে বলেছিলেন, তিনি বনের মধ্যে ওলগাকে দেখেও গুলি করেননি। কারণ, তিনি বাঘটিকে চিনতে পেরেছিলেন।
টাইগার্স বিটুইন এম্পায়ারস: রাশিয়ার আমুর বাঘ রক্ষার লড়াইয়ের এক মহাকাব্যিক গল্প
বইয়ের একটি অংশে বিষয়টি এভাবে উল্লেখ করা হয়েছে- একবার এক শিকারি মিকেলকে বলেছিলেন, তিনি বনের মধ্যে ওলগাকে দেখেও গুলি করেননি। কারণ, তিনি বাঘটিকে চিনতে পেরেছিলেন।
‘একদিন আমি এসব নিয়ে একটা বই লিখব।’ বন্যপ্রাণী জীববিজ্ঞানী জোনাথন স্লাট তাদের ২৫ বছরের বন্ধুত্বে ডেল মিকেলকে এ কথা শতবার বলতে শুনেছেন। ৩০ বছরেরও বেশি সময় ধরে রাশিয়ার পূর্বাঞ্চলে বাঘ সংরক্ষণে দায়িত্ব পালন করে আসছেন মিকেল। তার কাছে বলার মতো বহু গল্প ছিল। তবে তার এই গল্পগুলো নিয়ে একটা বই লেখার কথা থাকলেও সেটি আর হয়নি।
মিকেল ও স্লাট দুজনই ওয়াইল্ডলাইফ কনজারভেশন সোসাইটিতে কর্মরত। ২০২১ সালে স্লাট একবার মিকেলকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন যে তিনি এসব গল্প নিয়ে আদৌ বইটি লিখবেন কি না। মিকেল জানিয়েছিলেন, তিনি সম্ভবত বইটি লিখবেন না।
জবাবে স্লাট তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘তাহলে আমি যদি লিখি, কেমন হয়?’
এরপর কেটে গেছে চারটি বছর। স্লাট প্রকাশ করেছেন ৫১২ পৃষ্ঠার একটি বই- ‘টাইগার্স বিটুইন এম্পায়ারস’। বইটিতে উঠে এসেছে এক অসাধারণ গল্প। স্লাট এটিকে বিশ্বের সবচেয়ে দীর্ঘ বাঘ গবেষণা কার্যক্রম- ‘সাইবেরিয়ান টাইগার প্রজেক্ট’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
তার এই গবেষণা কার্যক্রমে আরও যুক্ত ছিলেন মার্কিন বিজ্ঞানীরা। তারা এ প্রকল্পে তহবিল ও প্রযুক্তি দিয়ে সহায়তা করেছেন, যার লক্ষ্য ছিল আমুর বাঘ বা সাইবেরিয়ান বাঘের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ ও অনুসরণ করা।
এ কার্যক্রমে নেতৃত্ব দিয়েছেন সাবেক মুজ (উত্তর আমেরিকা ও ইউরেশিয়ার বিশাল আকারের এক ধরনের হরিণ) জীববিজ্ঞানী মিকেল এবং রুশ ইঁদুর গবেষক জেনিয়া স্মার্নভ।
ইতিহাস, লোককথা, বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার এবং বুনো অভিযানের সংমিশ্রণে রচিত এই বই একইসাথে শিক্ষামূলক এবং রোমাঞ্চকর। এটি পাঠকদের রাশিয়ার দুর্গম, হিমশীতল ও সুদূর পূর্বাঞ্চলে নিয়ে হাজির করে, যেখানে অবাধ শিকার ও বন উজারের কবল থেকে বিশ্বের বৃহত্তম বিড়াল প্রজাতিটিকে বাঁচানোর লড়াই চলছে।
বিষয়টি নিয়ে সিএনএনের সঙ্গে ভিডিও কলে কথা হয় স্লাটের। তিনি বলেন, ‘এটা এমন একটা গল্প যা সবার জানা উচিত।’ তিনি যোগ করেন, প্রকল্পটি প্রমাণ করে যে ‘ভিন্ন ভিন্ন প্রেক্ষাপটের মানুষ যখন একই লক্ষ্যের প্রতি আবেগ নিয়ে কাজ করে, তখন একসঙ্গে কাজ করে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করা সম্ভব।’
যৌথ প্রচেষ্টা
স্লাট লিখেছেন, ঊনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে রাশিয়ার বাঘের সংখ্যা ছিল প্রায় ৩ হাজার। সেখানে ১৯৩০-এর দশকে এটি কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৩০টিতে।
শিকারের ওপর বিধিনিষেধ এবং সংরক্ষিত বনাঞ্চলের কারণে বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে বাঘের সংখ্যা উল্লেখজনক বাড়লেও ১৯৯১ সালের শেষের দিকে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভাঙার পর চোরাশিকার আবার বেড়ে যায়।
সৌভাগ্যবশত, এর কয়েক মাস পরেই যাত্রা শুরু হয় সাইবেরিয়ান টাইগার প্রজেক্টের। সেই সময়ে, বন্যপ্রাণীর গতিবিধি নজরে রাখার জন্য রেডিও টেলিমেট্রি কলারের ব্যবহার যুক্তরাষ্ট্রে ব্যাপক প্রচলিত থাকলেও সোভিয়েত ইউনিয়নের বিজ্ঞানীদের কাছে তা সহজলভ্য ছিল না। মার্কিন বিজ্ঞানীদের বাঘ ট্র্যাক করা বা ধরার কোনো ধারণা ছিল না।
অন্যদিকে রাশিয়ার সংরক্ষণ কর্মকর্তারা জানতেন না কীভাবে নিরাপদে এই বাঘদের কীভাবে অচেতন করে গলায় কলার পরাতে হয়। তাই তারা যৌথভাবে এটি নিয়ে কাজ শুরু করেন।
স্লাট বলেন, ‘সাইবেরিয়ান টাইগার প্রজেক্টের মতো যখন আপনার কাছে ৩০ বছরের ডেটা বা তথ্যভাণ্ডার থাকে, যখন আপনি একটি বাঘকে তার জীবনের প্রথম বছর থেকে মৃত্যু পর্যন্ত অনুসরণ করতে পারেন, তখন যে তথ্যগুলো পাওয়া যায়—তাতে এরা আর কেবল নাম-পরিচয়হীন গবেষণার প্রাণী হয়ে থাকে না।’
এই প্রকল্পের আওতায় তারা ওলগা নাম দেওয়া একটি বাঘের কলায় প্রথম কলার পরিয়েছিলেন। বাঘটির অল্প বয়স থেকে শুরু করে মৃত্যু পর্যন্ত ১৩ বছর ধরে পর্যবেক্ষণ করা হয়েছিল। আর এ কারণে এটি মোটামুটি সবার কাছেই পরিচিত হয়ে উঠেছিল। বইয়ের একটি অংশে বিষয়টি এভাবে উল্লেখ করা হয়েছে- একবার এক শিকারি মিকেলকে বলেছিলেন, তিনি বনের মধ্যে ওলগাকে দেখেও গুলি করেননি। কারণ, কলার দেখে তিনি বাঘটিকে চিনতে পেরেছিলেন।
স্লাট আরও বলেন, ‘তারা (বাঘগুলো) খুব দ্রুতই একেকটি স্বতন্ত্র ব্যক্তিত্ব হয়ে উঠেছিল এবং আমি সেটাকেই তুলে ধরতে চেয়েছিলাম।’
রেডিও কলার এবং পরবর্তীতে জিপিএস কলার থেকে পাওয়া তথ্যের মাধ্যমে গবেষকেরা ধীরে ধীরে এই লাজুক শিকারি প্রাণীদের অজানা জীবন সামনে আনতে সক্ষম হন। এর মধ্যে ছিল তাদের খাদ্যাভ্যাস, শিকারের হার এবং পারিবারিক সীমানা উত্তরাধিকার—যেখানে একটি মা বাঘ তার প্রতিষ্ঠিত এলাকা মেয়েদের দিয়ে যায়। ফলে একই এলাকায় বাঘের একটি বংশধারা তৈরি হয়।
স্লাট লিখেছেন, বড় বিড়ালজাতীয় এই প্রাণীদের বাস্তুসংস্থান সম্পর্কে নতুন এই জ্ঞানের ফলে বাঘ, চিতাবাঘ ও তাদের শিকার সম্পর্কে প্রায় ২০০টি বৈজ্ঞানিক প্রকাশনা সম্ভব হয়েছে।
গলায় কলার থাকা সত্ত্বেও প্রাণীগুলোর দেখা পাওয়া ছিল বিরল: ১৩ বছরে ওলগাকে বুনো পরিবেশে মাত্র ১৫ মিনিটের জন্য দেখা গিয়েছিল। স্লাট বলেন, ‘টেলিমেট্রি ছাড়া আসলে এই প্রাণীদের দেখা পাওয়া কিংবা তারা কী করছে সে সম্পর্কে ধারণা পাওয়া অসম্ভব ‘
‘সংক্ষিপ্ত, সহিংস জীবন’
বইটির পুরো গল্পেই অবশ্য মানুষ ও বাঘের সব মিথস্ক্রিয়াই সুন্দর নয়।
প্রকল্পের প্রথম ১০ বছরের তথ্যে দেখা যায়, বাঘের মৃত্যুর ৭৫ শতাংশ কারণ ছিল চোরাশিকার, যে হুমকি আজও বিদ্যমান। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর রাশিয়ার সুদূর পূর্বাঞ্চল দীর্ঘস্থায়ী অর্থনৈতিক সংকটের মুখে পড়ে। ওই সময় দারিদ্র্যের কারণে মানুষ বাঘ শিকার করত ব্যবসার জন্য। আর হরিণ মারত নিজেদের খাদ্যের জন্য।
বাঘেদের বেঁচে থাকার এই ‘সংগ্রাম’ স্লাটকে অবাক করেছিল যে ‘মানুষের ধারণা বাঘ মানেই বিশাল, রাজকীয় এক প্রাণী। ছবিতে দেখা যায় তারা বসে গা চাটছে, যেন বেশ আয়েশে সময় কাটাচ্ছে। কিন্তু বাস্তবতা খুব কঠিন। তাদের জীবন সংক্ষিপ্ত ও সহিংস।’
প্রথম ২০ বছরে এই প্রকল্প বাঘ ধরার প্রাণঘাতী-নয় এমন সব পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছিল, যা পরবর্তীতে এশিয়াজুড়ে বাঘের বিচরণক্ষেত্রে সংরক্ষণ কর্মকর্তারা এবং বিজ্ঞানীরা অনুসরণ করেছেন। এছাড়া সাইবেরিয়ান টাইগার প্রজেক্টের জরিপ থেকে পাওয়া তথ্য নতুন সংরক্ষিত এলাকা তৈরির সুপারিশে সহায়তা করেছে, যার ফলে সংরক্ষিত জমির পরিমাণ আগের তুলনায় দ্বিগুণ হয়েছে।
তবে বইটিতে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০১০ সাল থেকে বিদেশি সংস্থাগুলোকে রুশ সরকার সন্দেহের চোখে দেখতে শুরু করে। আর ২০১৬ সালের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ওয়াইল্ডলাইফ কনজারভেশন সোসাইটির সমর্থিত সাইবেরিয়ান টাইগার প্রজেক্ট তার প্রভাবের অনেকটাই হারিয়ে ফেলে। (স্লাট লিখেছেন, ২০১৩ সালে মিকেলকে সাময়িকভাবে রাশিয়ায় প্রবেশে বাধা দেওয়া হয়েছিল, যা সম্পর্কের অবনতির ইঙ্গিত দিচ্ছিল।)
২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আগ্রাসনের পর পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটে। তখন ডব্লিউডব্লিউএফ এবং গ্রিনপিস-সহ অনেক বিদেশি এনজিওর কার্যক্রম রাশিয়ায় নিষিদ্ধ করা হয়। ওই সময় রাশিয়ার সুদূর পূর্বাঞ্চালে ৩০ বছর বসবাসের পর মিকেল স্থায়ীভাবে যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে যান।
২০২২ সালে, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন দাবি করেন, ২০১০ সালের তুলনায় দেশে বাঘের সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। অর্থাৎ ৩৯০টি প্রাপ্তবয়স্ক বাঘের সংখ্যা বেড়ে ৭৫০টি হয়েছে। তবে ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অফ ন্যাচারের (আইইউসিএন) ২০২২ সালে প্রকাশিত সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রাপ্তবয়স্ক বাঘের সংখ্যা ২৬৫ থেকে ৪৮৬-এর মধ্যে, যাকে তারা স্থিতিশীল বলে মনে করে।