ডিজিটাল যুগে কেন এখনো লাইব্রেরির গুরুত্ব আছে?

বর্তমানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এবং নতুন সব গণমাধ্যম খুবই কাজের জিনিস, কিন্তু এগুলো বইয়ের আবেদনকে ছাপিয়ে যেতে পারে না। এখন আমাদের নিজস্ব সত্তাকে আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন। আর পড়াশোনা ও গভীর জ্ঞানচর্চার মাধ্যমেই তা সবচেয়ে ভালোভাবে করা সম্ভব।

image_34
অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক আন্তোনিও লা কাভা ইতালির বাসিলিকাতা অঞ্চলের ছোট শহরগুলোতে তার নিয়মিত যাত্রাপথে বইভর্তি তিন চাকার যান চালাচ্ছেন। সূত্র: রয়টার্স/আলেসান্দ্রো গারোফালো

নব্বইয়ের দশকের শেষের দিকের কথা। দক্ষিণ ইতালির ব্যাসিলিকাটা অঞ্চলের প্রাথমিক স্কুলের শিক্ষক আন্তোনিও লা কাভা বেশ চিন্তিত হয়ে পড়েছিলেন। তিনি লক্ষ্য করলেন, তার ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে বইয়ের কোনো আত্মিক সম্পর্ক নেই, অথচ এই বইগুলোই তার নিজের ছোটবেলাকে রাঙিয়েছিল।

পরিস্থিতি বদলাতে তিনি স্থানীয় এক কারিগরের সঙ্গে জোট বাঁধলেন। একটি তিন চাকার ডেলিভারি ভ্যানকে রূপান্তর করলেন ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরিতে, যার নাম দিলেন ‘বিব্লিওমটোক্যারো’। উদ্দেশ্য ছিল, ব্যাসিলিকাটার দুর্গম এলাকাগুলোর শিশুদের কাছে বই পৌঁছে দেওয়া।

১৯৯৯ সাল থেকে হালকা নীল রঙের ভ্যানটি নিয়ে ছুটে চলেছেন লা কাভা। ২০১০ সালে শিক্ষকতা থেকে অবসর নিলেও তার এই অভিযান থামেনি। ইতালির সংবাদমাধ্যম একে ‘ইতালির সবচেয়ে ছোট লাইব্রেরি’ বলে ডাকে। ব্যাসিলিকাটা ও এর আশেপাশের পাহাড়-সমতল মিলিয়ে তিনি প্রায় ৩ লাখ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়েছেন।

মলিতারনো শহরে শিশুদের সঙ্গে আড্ডার ফাঁকে সাক্ষাৎকার দিলেন ৮০ বছর বয়সী লা কাভা। ইউরোপের অন্যান্য দেশের তুলনায় ইতালিতে বই পড়ার হার কম। ডিজিটাল যুগেও কেন লাইব্রেরির প্রয়োজন আর কী কী কারণে বই পড়ার বিকল্প নেই সেসব নানা বিষয় আলাপ হলো তার সঙ্গে।

১৯৯৯ সাল থেকে হালকা নীল রঙের ভ্যানটি নিয়ে ছুটে চলেছেন লা কাভা। ইতালির সংবাদমাধ্যম একে ‘ইতালির সবচেয়ে ছোট লাইব্রেরি’ বলে ডাকে।

প্রশ্ন: ক্রমশ ডিজিটাল হতে থাকা এই বিশ্বে লাইব্রেরির গুরুত্ব কতটুকু?

উত্তর: বই পড়া সব সময়ই গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এবং নতুন সব গণমাধ্যম খুবই কাজের জিনিস, কিন্তু এগুলো বইয়ের আবেদনকে ছাপিয়ে যেতে পারে না। এখন আমাদের নিজস্ব সত্তাকে আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন। আর পড়াশোনা ও গভীর জ্ঞানচর্চার মাধ্যমেই তা সবচেয়ে ভালোভাবে করা সম্ভব।

প্রশ্ন: ইতালিতে পাঠকের সংখ্যা কম, বিশেষ করে দক্ষিণাঞ্চলে। এই প্রবণতা বদলাতে কী করা যেতে পারে?

উত্তর: আমি এখনো আশা করি, শিক্ষা ও সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় বই পড়ার প্রতি মানুষের আগ্রহ বাড়াতে এগিয়ে আসবে। বই ছাড়া চলা অসম্ভব। আমি ব্যাসিলিকাটার সবচেয়ে ছোট শহর সান পাওলো আলবানিজে যেতাম কেবল দুটি শিশুর জন্য—এক ভাই ও বোন। ওদের হাতে বই তুলে দিতে আমাকে ১০০ কিলোমিটারের বেশি পথ পাড়ি দিতে হতো।

প্রশ্ন: আপনি তিন চাকার ভ্যান কেন বেছে নিলেন? এটি তো ছোট, ধীরগতির এবং খুব একটা আরামদায়কও নয়।

উত্তর: ঠিক এই কারণগুলোর জন্যই আমি ওটা বেছে নিয়েছিলাম। বইগুলোকে তাদের ‘আয়েশি’ জায়গা থেকে সরানোর দরকার ছিল। ভুলে গেলে চলবে না, বহু যুগ ও শতাব্দী ধরে বলা হতো সংস্কৃতি সবার জন্য নয়। ইতালিতে সংস্কৃতি ছিল কেবল উচ্চবিত্তদের দখলে। আমি বললাম, ‘প্রিয় বই, তোমাদের ওই উঁচু ও অভিজাত তাক ছেড়ে বেরিয়ে এসো।’ আমি বইগুলোকে একটি সাধারণ তিন চাকার গাড়ির সাদামাটা তাকে রাখলাম। বই ও সংস্কৃতিকে হতে হবে সবার এবং সবার জন্য—যা সব মানুষের মানসিক বিকাশের হাতিয়ার হবে।

প্রশ্ন: আপনি কতটি শহরে গিয়েছেন? আর আপনার সবচেয়ে দীর্ঘ ভ্রমণ কোনটি ছিল?

উত্তর: ব্যাসিলিকাটার ১৩১টি শহরের মধ্যে ১২১টিতেই আমি গিয়েছি। সাধারণত স্কুল বা স্থানীয় কর্তৃপক্ষ আমাকে আমন্ত্রণ জানায়। আমি শত শত বই ধার দিয়েছি এবং নিয়ম করে মাসে একবার সেসব গ্রামে যাই বই ফেরত আনতে। কয়েক বছর আগে নেপলসে গিয়েছিলাম, ওটাই ছিল আমার সবচেয়ে দীর্ঘ ভ্রমণ। সময় লেগেছিল ১১ ঘণ্টা।

লা কাভার মতে,বই ও সংস্কৃতিকে হতে হবে সবার এবং সবার জন্য, যা সব মানুষের মানসিক বিকাশের হাতিয়ার হবে।

প্রশ্ন: গত ৩০ বছরে মানুষের আগ্রহ ও পড়ার অভ্যাসে কোনো পরিবর্তন লক্ষ্য করেছেন?

উত্তর: একদম ছোটদের মধ্যে বই পড়ার আগ্রহ বেড়েছে। কিন্তু ১৩-১৪ বছর বয়সের কিশোরদের মধ্যে একটা অদ্ভুত ব্যাপার দেখা যায়। তারা বলতে শুরু করে, ‘আমি তো আর বাচ্চা নই—আমাকে এখনো পড়তে হবে?’ এটা খুবই, খুবই উদ্বেগের বিষয়।

‘বিব্লিওমটোক্যারো’র ভেতরে বাচ্চাদের বসার জায়গা আছে, যেখানে তারা বই নিয়ে তৈরি স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র দেখতে পারে। এটা অনেকটা বাড়ির মতো, একটা আশ্রয়ের মতো। কঠিন একটা দিন শেষে বাড়ি ফিরে আমরা যেমন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলি, ভাবি ‘আমি নিরাপদ’, বইও ঠিক তেমন। বই হলো একটা আশ্রয়। বাচ্চারা সবচেয়ে বেশি পড়ে ‘জেরোনিমো স্টিলটন’ (এলিজাবেট্টা দামির লেখা ইতালির শিশুতোষ সিরিজ) এবং ‘ডেভিড কপারফিল্ড’ বা ‘টুয়েন্টি থাউজেন্ড লিগস আন্ডার দ্য সিস’-এর মতো ধ্রুপদী বইগুলো।

প্রশ্ন: আপনি স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র দেখান, বই পড়তে দেন। লেখার ব্যাপারে কোনো উদ্যোগ আছে?

উত্তর: আমাদের কার্যক্রমের মধ্যে ‘সাদা বই’ বা ‘হোয়াইট বুকস’ বেশ চমকপ্রদ ও কাজের। এই বইগুলোর গল্প লেখে বিভিন্ন শহরের শিশুরা। এক শহরের কোনো শিশু গল্পটা শুরু করে, এরপর আমি যখন অন্য শহরে যাই, তখন সেখানকার কোনো শিশু হয়তো গল্পটা পড়ে বাকি অংশটুকু লেখে। এটা একটা ভ্রাম্যমাণ লেখালেখির কর্মশালা। তবে এর চেয়ে বড় কথা, এটি নিজেকে প্রকাশ করার দারুণ সুযোগ। আমি সব সময় অভিভাবক ও শিক্ষকদের বলি: শিশুদের একাকীত্বের দিকে খেয়াল রাখুন। এই সাদা বইগুলো সেই একাকীত্ব কাটাতে সাহায্য করে। কারণ যখন একটি শিশু কিছু লেখে এবং জানে যে অন্য শহরের শিশুরা সেটা পড়বে, তখন সে এক ধরনের আনন্দ পায়।

প্রশ্ন: আপনার প্রিয় বই কোনগুলো? আপনি প্রথম কোন বইটা পড়েছিলেন?

উত্তর: আমার পড়া প্রথম বই হলো ইগনাজিও সিলোনের ‘ফন্টামারা’। বইটা আমি কোনো লাইব্রেরি বা দোকান থেকে কিনিনি, পেয়েছিলাম ‘বিব্লিওবাস’ (ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরি) থেকে।

লা কাভার স্বপ্ন, ইতালির প্রতিটি প্রদেশে এমন ‘বিব্লিওমটোক্যারো’ ছড়িয়ে পড়ুক এবং তৈরি হোক নতুন প্রজন্মের লাইব্রেরিয়ান।

প্রাদেশিক স্কুল বোর্ডের সেই উদ্যোগই আমাকে ‘বিব্লিওমটোক্যারো’ তৈরিতে অনুপ্রাণিত করেছিল। আমার মনে আছে, বইটা বুকে চেপে ধরে বাড়ি ফিরেছিলাম। ছোটবেলার কল্পনায় ভেবেছিলাম, ‘এটা শুধু আমার জন্যই এসেছে।’ গ্রামে শিশুদের হাতে বই তুলে দেওয়ার সময় আজও আমার সেই দৃশ্য মনে পড়ে।

প্রশ্ন: ‘বিব্লিওমটোক্যারো’ শুরুর পর থেকে আপনার সেরা ও সবচেয়ে খারাপ অভিজ্ঞতার কথা বলবেন?

উত্তর: আমি ইতালির একাধিক রাষ্ট্রপতির কাছ থেকে সম্মাননা পেয়েছি। কিন্তু শিশুদের সঙ্গে দেখা করাটাই আমার কাছে সবচেয়ে বড় তৃপ্তি। তখন মনে হয়, সকাল ৬টায় ঘুম থেকে ওঠা এবং মাঝে মাঝে স্টার্ট নিতে ঝামেলা করা গাড়িটা নিয়ে বেরিয়ে পড়া সার্থক।

তবে শুরুর দিকটা খুব কঠিন ছিল। ‘বিব্লিওমটোক্যারো’র প্রথম ১২-১৩ বছর আমাকে খুব নিঃসঙ্গ ও তিক্ত সময় পার করতে হয়েছে। এরপর রাষ্ট্রীয় সম্প্রচার মাধ্যম ‘রাই’-তে আমাকে নিয়ে ৫৬ সেকেন্ডের একটা ক্লিপ দেখানো হয়, তারপরই মানুষ আমাকে চিনতে শুরু করে।

প্রশ্ন: ‘বিব্লিওমটোক্যারো’ নিয়ে ভবিষ্যতে আপনার স্বপ্ন কী?

উত্তর: আমি কিশোর অপরাধীদের একটি সংশোধনাগারের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছি, যেখানে ১৭ জন কিশোর আছে। আমি তাদের চারজনের সঙ্গে দেখা করব এবং ‘বিব্লিওমটোক্যারো’র কাজ সম্পর্কে জানাব। আমি যখন স্কুলে স্কুলে যাব, তখন এই চারজনের কেউ কেউ আমার সহকারী হবে। আমি আর একা থাকব না। আমার সঙ্গে সংশোধনাগারের একজন অতিথি থাকবে। আমার স্বপ্ন হলো, এখন যে তরুণটি সংশোধনাগারের চারদেয়ালে বন্দি, ভবিষ্যতে হয়তো সেই-ই হবে ‘বিব্লিওমটোক্যারো’র চালক।