মাছ নেই সমুদ্রে; ছানাদের খাওয়ানো হচ্ছে পাথর-বালু; অনাহারে বিলুপ্তির মুখে আফ্রিকান পেঙ্গুইন
২০২৪ সালে ‘ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অব নেচার’ (আইইউসিএন) আফ্রিকান পেঙ্গুইনকে ‘অতি বিপন্ন’ প্রজাতির তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে। বর্তমানে তাদের প্রজননক্ষম জোড়ার সংখ্যা ১০ হাজারেরও কম বলে ধারণা করা হয়।
মাছ নেই সমুদ্রে; ছানাদের খাওয়ানো হচ্ছে পাথর-বালু; অনাহারে বিলুপ্তির মুখে আফ্রিকান পেঙ্গুইন
২০২৪ সালে ‘ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অব নেচার’ (আইইউসিএন) আফ্রিকান পেঙ্গুইনকে ‘অতি বিপন্ন’ প্রজাতির তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে। বর্তমানে তাদের প্রজননক্ষম জোড়ার সংখ্যা ১০ হাজারেরও কম বলে ধারণা করা হয়।
দক্ষিণ আফ্রিকার বেটিস বে সমুদ্রসৈকত। ঝলমলে রোদেলা সকালে একদল পেঙ্গুইন তাদের ধবধবে সাদা পেট সূর্যের দিকে উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এই দৃশ্যটি দক্ষিণ আফ্রিকার উপকূলে খুবই পরিচিত। তবে শঙ্কার কথা হলো, মায়াবী এই পাখিগুলো এখন চিরতরে হারিয়ে যাওয়ার পথে।
আফ্রিকান পেঙ্গুইনরা সাধারণত অ্যান্টার্কটিকার পেঙ্গুইনদের মতো নয়। হাড়কাঁপানো শীতের বদলে দক্ষিণ আফ্রিকা ও নামিবিয়ার নাতিশীতোষ্ণ আবহাওয়াতেই এরা বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। এই ছোট ও আকর্ষণীয় পাখিগুলো দেখতে প্রতিবছর হাজার হাজার পর্যটক দক্ষিণ আফ্রিকায় ভিড় করেন।
২০২৪ সালে ‘ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অব নেচার’ (আইইউসিএন) আফ্রিকান পেঙ্গুইনকে ‘অতি বিপন্ন’ প্রজাতির তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে। বর্তমানে তাদের প্রজননক্ষম জোড়ার সংখ্যা ১০ হাজারেরও কম বলে ধারণা করা হয়।
দক্ষিণ আফ্রিকার সমুদ্রতীরবর্তী পাখিদের রক্ষায় কাজ করছে ‘সাউদার্ন আফ্রিকান ফাউন্ডেশন ফর দ্য কনজারভেশন অব কোস্টাল বার্ডস’। ১৯৬৮ সাল থেকে সংস্থাটি আফ্রিকান পেঙ্গুইনদের উদ্ধারে কাজ করছে।
সংস্থাটির রিহ্যাবিলিটেশন ম্যানেজার জেড সুকু বলেন, ‘আমরা প্রতিদিন দেখছি এই পাখিগুলো মারাত্মক ট্রমা আর অপুষ্টি নিয়ে আমাদের কাছে আসছে। বুনো পরিবেশে টিকে থাকতে এদের অনেক সংগ্রাম করতে হচ্ছে।’
গবেষণা বলছে, গত ৩০ বছরে আফ্রিকান পেঙ্গুইনের সংখ্যা প্রায় ৮০ শতাংশ কমে গেছে। এর পেছনে প্রধান কারণ হিসেবে দায়ী করা হচ্ছে দূষণ, বাসস্থান ধ্বংস এবং তীব্র খাদ্যসংকটকে। তবে সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, পর্যাপ্ত খাবারের অভাব বা অনাহারই এদের মৃত্যুর প্রধান কারণ।
দক্ষিণ আফ্রিকার বন ও মৎস্য বিভাগ এবং যুক্তরাজ্যের এক্সেটার বিশ্ববিদ্যালয়ের এক যৌথ গবেষণায় দেখা গেছে, ২০০৪ থেকে ২০১১ সালের মধ্যে দেশটির দুটি প্রধান প্রজনন কেন্দ্র রবেন এবং ডাসেন দ্বীপে ৬০ হাজারেরও বেশি পেঙ্গুইন মারা গেছে স্রেফ অনাহারে।
যদি এখনই এদের রক্ষায় কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, তবে অদূর ভবিষ্যতে চিরতরে হারিয়ে যেতে পারে এই আফ্রিকান পেঙ্গুইনরা।
আফ্রিকান পেঙ্গুইনদের প্রধান খাবার হলো সার্ডিন ও অ্যাঙ্কোভির মতো ছোট আকারের সামুদ্রিক মাছ। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তন এবং অতিরিক্ত বাণিজ্যিক মৎস্য শিকারের ফলে সমুদ্রে এখন এই মাছের আকাল দেখা দিয়েছে।
দক্ষিণ আফ্রিকা উপকূলে সার্ডিন মাছের পরিমাণ এতটাই কমে গেছে যে, খাবারের খোঁজে পেঙ্গুইনদের এখন সমুদ্রের অনেক গভীরে যেতে হচ্ছে। দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে গিয়ে ক্লান্ত হয়ে পড়ছে পূর্ণবয়স্ক পেঙ্গুইনগুলো, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে তাদের ছানাদের ওপর। পর্যাপ্ত খাবার না পেয়ে অনেক ছানা মাঝপথেই মারা যাচ্ছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, গত দুই দশক ধরে পশ্চিম দক্ষিণ আফ্রিকা অঞ্চলে সার্ডিন মাছের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কম। একসময় যে পরিমাণ মাছ পাওয়া যেত, এখন তার মাত্র ২৫ শতাংশ অবশিষ্ট আছে।
এছাড়া নামিবিয়া উপকূলে—যা একসময় পেঙ্গুইনদের নিরাপদ আবাস ছিল—সেখানে সমুদ্রের তাপমাত্রা বৃদ্ধি, লবণাক্ততার পরিবর্তন এবং মাত্রাতিরিক্ত মাছ ধরার ফলে সার্ডিন মাছ প্রায় বিলুপ্ত হয়ে গেছে।
বিপন্ন এই প্রজাতির ছানাদের বাঁচাতে ‘সাউদার্ন আফ্রিকান ফাউন্ডেশন ফর দ্য কনজারভেশন অব কোস্টাল বার্ডস’ একটি বিশেষ প্রকল্প হাতে নিয়েছে। পরিত্যক্ত বা অসুস্থ পেঙ্গুইন ছানাদের উদ্ধার করে সুস্থ করে তোলা এবং পরে আবার প্রকৃতিতে ছেড়ে দেওয়াই এই প্রকল্পের লক্ষ্য।
সংস্থাটির প্রতিনিধি রবিন ফ্রেজার-নোলস বলেন, ‘মৎস্য শিল্প একটি বড় ব্যবসা এবং এটি আমাদের অর্থনীতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। আমরা চাই না মাছ ধরা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাক। তবে এখনই যদি মাছ ধরার পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করা না হয়, তবে আমাদের পুরো সামুদ্রিক বাস্তুসংস্থানই ধসে পড়বে।’
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, প্রকৃতিতে ভারসাম্য ফেরাতে টেকসই মৎস্য ব্যবস্থাপনার কোনো বিকল্প নেই। অন্যথায়, শুধু পেঙ্গুইন নয়, পুরো সামুদ্রিক পরিবেশই এক মহাবিপর্যয়ের মুখে পড়বে।
আফ্রিকান পেঙ্গুইনদের জন্য এখন বেঁচে থাকাটাই এক বড় যুদ্ধ। দক্ষিণ আফ্রিকার এসএএনসিসিওবি পুনর্বাসন কেন্দ্রে গত বছর ৯৪৮টি পেঙ্গুইনকে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। সংস্থাটির প্রতিনিধি রবিন ফ্রেজার-নোলস জানান, কেন্দ্রে আসা প্রায় প্রতিটি পেঙ্গুইনই ছিল কঙ্কালসার।
অনাহারের চিত্রটি কতটা ভয়াবহ, তা বোঝা যায় একটি উদাহরণে। সম্প্রতি একটি পূর্ণবয়স্ক পেঙ্গুইন উদ্ধার করা হয়েছে যার ওজন ছিল মাত্র ১ দশমিক ৯ কেজি। অথচ একটি সুস্থ ও স্বাভাবিক পেঙ্গুইনের ওজন হওয়া উচিত অন্তত ৪ কেজি। রবিন বলেন, ‘প্রকৃতিতে এখন আর আদর্শ ওজনের কোনো পেঙ্গুইন খুঁজে পাওয়া দুষ্কর।’
তবে সবচেয়ে হাহাকার জাগানিয়া তথ্যটি দিয়েছেন গবেষক আলবার্ট স্নাইম্যান। তার ল্যাবে এক স্তূপ পাথর জমানো আছে। এগুলো কোনো সাধারণ পাথর নয়; মারা যাওয়া পেঙ্গুইন ও করমোরেন্ট পাখির ছানাদের পেট থেকে এগুলো উদ্ধার করা হয়েছে।
গবেষকরা বলছেন, সমুদ্রে মাছ না পেয়ে ক্ষুধার্ত মা-বাবারা এতটাই মরিয়া হয়ে উঠছে যে, তারা নিজেদের ছানাদের পাথর ও বালু খাওয়াচ্ছে। আবার অনেক সময় মা-বাবা ফিরে না আসায় পরিত্যক্ত ছানারাও ক্ষুধার জ্বালায় পাথর গিলে ফেলছে। এই পাথরগুলো তাদের পাকস্থলীতে আটকে যাচ্ছে, ফলে শরীর কোনো পুষ্টি শোষণ করতে পারছে না। শেষ পর্যন্ত ধুঁকে ধুঁকে মারা যাচ্ছে ছানাগুলো।
পেঙ্গুইনরা সাধারণত জোড়ায় থাকে এবং বাবা-মা পালা করে ছানাদের দেখাশোনা করে। একজন যখন সমুদ্রে মাছ ধরতে যায়, অন্যজন তখন বাসায় ছানাদের আগলে রাখে। কিন্তু এখন সমুদ্রতীরের কাছে মাছ না থাকায় খাবারের খোঁজে তাদের অনেক গভীরে যেতে হচ্ছে।
মাঝে মাঝে মাছ ধরতে গিয়ে মা বা বাবার ফিরতে দেরি হয়, অথবা তারা শিকারির কবলে পড়ে আর ফিরেই আসে না। এমন অবস্থায় বাসায় থাকা সঙ্গীটি ক্ষুধার তাড়নায় বাধ্য হয়ে ছানাদের একা ফেলে রেখে খাবারের খোঁজে বেরিয়ে পড়ে। এভাবে অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে থেকে অনেক ছানা মারা যাচ্ছে, যা এই প্রজাতির বিলুপ্তি আরও ত্বরান্বিত করছে।