স্টেশন থেকে বিমানবন্দর, সর্বত্র রাজত্ব করা সস্তা পেপারব্যাক বই চিরতরে হারিয়ে যাওয়ার পথে

বইয়ের দোকানের বদলে আগে রেলস্টেশন, বিমানবন্দর বা মুদি দোকানে এসব আকারে ছোটখাটো, খুবই সাধারণ মানের কাগজে ছাপা সস্তা মলাটের বই বিক্রি করা হতো। তবে পাঠক এখন ঝুঁকেছেন ই-বুক, ডিজিটাল অডিওবুক কিংবা একটু দামী ‘হার্ডকভার’ ও ‘ট্রেড পেপারব্যাক’-এর দিকে।

9th FEB WEB
ছবি: সংগৃহীত

২০০০ সালে যখন ‘ব্রিজারটন’ সিরিজের প্রথম বইটি প্রকাশিত হয়, তখন দেখেই বোঝা যেত এটি একটি রোমান্টিক উপন্যাস। গোলাপি আর বেগুনি রঙের মলাট, পেঁচানো অক্ষরের লেখা। তখনকার বেশিরভাগ জনপ্রিয় উপন্যাসের মতোই এটি প্রকাশিত হয়েছিল ম্যাস মার্কেট পেপারব্যাক সংস্করণে। 

আকারে ছোটখাটো, খুবই সাধারণ মানের কাগজে ছাপা সস্তা মলাটের বইগুলোকে ম্যাস মার্কেট পেপারব্যাক বলা হয়। বইয়ের দোকানের বদলে মূলত রেলস্টেশন, বিমানবন্দর বা মুদি দোকানে খুব কম দামে এসব বই বিক্রি করা হতো। অল্প কিছু টাকা দিয়েই কেনা যেত এসব বই। 

খুঁজলে হয়তো এখনও এরকম বইয়ের সন্ধান মিলতে পারে। তবে, সময়ের পরিক্রমায় আগের সেই পরিচিত দৃশ্য এখন প্রায় উধাও। 

প্রায় এক শতাব্দী ধরে দাপটের সঙ্গে টিকে থাকার পর মাস মার্কেট পেপারব্যাক এখন বিলুপ্তির পথে। গত কয়েক বছর ধরে এসব বইয়ের বিক্রি আশঙ্কাজনকভাবে কমেছে। পাঠক এখন ঝুঁকেছেন ই-বুক, ডিজিটাল অডিওবুক কিংবা একটু দামী ‘হার্ডকভার’ ও ‘ট্রেড পেপারব্যাক’-এর দিকে।

পরিস্থিতি এতটাই বদলেছে যে, গত বছর ‘রিডারলিংক’ – যারা যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবন্দর, ওষুধের দোকান বা ওয়ালমার্টের মতো বড় চেইন শপগুলোতে বই সরবরাহ করে – জানিয়েছে তারা আর এই ধরনের সস্তা পেপারব্যাক বই রাখবে না। 

এক সময় এসব বইয়ের রমরমা ব্যবসা করত পুতনাম, ডাটন ও বার্কলের মতো প্রকাশনা সংস্থাগুলো। এসব প্রতিষ্ঠানের প্রেসিডেন্ট ইভান হেল্ড বলেন, ‘হয়তো এখনো কিছু জায়গায় এগুলো খুঁজে পাওয়া যাবে। তবে বইয়ের একটি ধরণ বা ফরম্যাট হিসেবে এর দিন শেষ হয়ে গেছে বললেই চলে।’ 

বইয়ের বাজারে এখন জায়গা করে নিচ্ছে বড় আকৃতির ও উন্নত মানের কাগজ। ফুরিয়ে আসছে সস্তায় পড়ে ফেলে দেওয়ার দিন, শৌখিন পাঠকেরা এখন বরং বই সংগ্রহে রাখতেই বেশি আগ্রহী। 

পেপারব্যাকের সেই শুরুর গল্প

বইয়ের দুনিয়ায় পেপারব্যাক বিপ্লবের ইতিহাস বেশ পুরনো। ‘আমেরিকান পাল্প’ বইয়ের লেখক পলা রবিনোউইৎস এই ইতিহাসের শেকড় খুঁজতে গিয়ে ফিরে গেছেন ১৯৩০-এর দশকে। আধুনিক পেপারব্যাক বা সস্তা কাগজের এই বইয়ের প্রচলন শুরু হয়েছিল অনেকটা গল্পের মতোই।

ঘটনাটি ১৯৩০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ের। ব্রিটিশ সম্পাদক অ্যালেন লেন একবার ইংল্যান্ডের এক রেলস্টেশনে ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করছিলেন। হাতে সময় কাটাতে একটি ভালো বই খুঁজছিলেন তিনি, কিন্তু স্টেশনে পড়ার মতো মানসম্মত কোনো বই পেলেন না। তখনই তিনি জেদ ধরলেন, ভালো মানের গল্প সাধারণ মানুষের কাছে আরও সহজে পৌঁছে দিতে হবে।

এরপর তিনি ছোট আকারের এবং দেখতে সুন্দর ‘পেপারব্যাক’ বই প্রকাশ করতে শুরু করলেন। এসব বই শপিং মল বা তামাকের দোকানে বিক্রি হতো। আর দাম ছিল বড়জোর এক প্যাকেট সিগারেটের সমান। সস্তা হওয়ায় দ্রুতই সাধারণ মানুষের হাতে পৌঁছে গেল ভালো মানের সব সাহিত্য। 

পলা রবিনোউইৎস এই উদ্ভাবন সম্পর্কে বলেন, ‘এটি ছিল বিশ্বের ইতিহাসের অন্যতম সেরা প্রযুক্তি। কারণ, এই বইগুলো সহজেই পকেটে বা ভ্যানিটি ব্যাগের কোণে গুঁজে রাখা যেত।’

সহজে বহনযোগ্য আর হাতের নাগালে দাম—এই দুই গুণই এক সময় পেপারব্যাক বইকে বিশ্বজুড়ে তুমুল জনপ্রিয় করে তুলেছিল। অথচ সেই সময়ের সেরা ‘প্রযুক্তি’ আজ ডিজিটাল যুগের দাপটে হারিয়ে যেতে বসেছে।