স্মার্টফোন ছেড়ে বাটন ফোন, ‘এক্স-ফ্লুয়েন্সারদের’ উত্থান—জীবন নিয়ে ২০২৬-এর ১০ ভবিষ্যদ্বাণী
স্মার্টফোন ছেড়ে বাটন ফোন, ‘এক্স-ফ্লুয়েন্সারদের’ উত্থান—জীবন নিয়ে ২০২৬-এর ১০ ভবিষ্যদ্বাণী
চমকে ঠাসা এই বিশ্বে অনেক কিছুই ঘটে। কিন্তু আপনি কি কখনো ভেবেছিলেন, ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় খোদ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সুগন্ধি বা পারফিউম বিক্রি করবেন? কিংবা ইলন মাস্ক ও বিবেক রামাস্বামীর সেই বিখ্যাত ‘ডোজ’ (DOGE) জুটিতে ফাটল ধরবে? অথবা ‘মিনিমালিজম’ বা ছিমছাম থাকার চল উঠে গিয়ে মানুষ আবার ঘরভর্তি শৌখিন জিনিসে (যেমন: লাবুবু পুতুল) মজে উঠবে?
তাহলে ২০২৬ সালে আমাদের জন্য নতুন কী চমক অপেক্ষা করছে? সেই উত্তর খুঁজতেই নিউ ইয়র্ক টাইমসের সৌজন্যে তারই কিছু আগাম ধারণা।
আভিজাত্যের নতুন প্রতীক ‘বাটন ফোন’
স্মার্টফোন আমাদের জীবনযাত্রার মান কমাচ্ছে বা আমাদের ‘বোকা’ বানিয়ে দিচ্ছে—এমন ধারণায় এখন অনেকেই একমত। তাই অবাক হওয়ার কিছু নেই যে বাজারে এখন সাধারণ মানের বা কম প্রযুক্তির ফোনের (লো-টেক ডিভাইস) কদর বাড়ছে।
তবে পুরোনো আমলের এই ফোনগুলো ফিরে আসা নিয়ে উত্তেজনার পাশাপাশি একধরনের বিভ্রান্তিও কাজ করছে। বিষয়টি অনেকটা এমন—প্রথমে কোম্পানিগুলো আমাদের হাতে স্মার্টফোন তুলে দিল। আর এখন সেই স্মার্টফোনের আসক্তি কাটাতে তারাই আবার আমাদের কাছে নতুন পণ্য বিক্রি করছে।
আশা করা যায়, সাধারণ এই ‘ডাম্ব ফোন’ বা বাটন ফোনগুলো হয়তো আমাদের অনবরত নোটিফিকেশনের যন্ত্রণা থেকে মুক্তি দেবে। কিন্তু শঙ্কার বিষয় হলো, এটি শেষ পর্যন্ত আভিজাত্যের প্রতীক হয়ে উঠতে পারে।
উবার বা লিফটের মতো অ্যাপ-নির্ভর একজন চালক চাইলেই স্মার্টফোন ছেড়ে দিতে পারেন না। তার রুজিরুটির জন্য অ্যাপ দরকার। অথচ শৌখিন কোনো কলেজছাত্র চাইলেই স্মার্টফোন ফেলে দিয়ে নিজেকে প্রযুক্তিবিরোধী হিসেবে জাহির করতে পারেন।
২০২৬ সালে এই ফ্লিপ ফোন বা বাটন ফোন হয়তো আমাদের একটি বেশ অস্বস্তিকর প্রশ্নের মুখে দাঁড় করাবে: ‘যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকার বিলাসিতা আসলে কাদের সাজে?’
সবকিছুই এখন ‘মার্কেটিং’
সিনেমার পোস্টার সাঁটানো বা সংবাদ সম্মেলন এখন পুরোনো খবর। ‘বার্বি’ বা ‘উইকেড’ সিনেমার লাল গালিচার সাজপোশাক আমরা দেখেছি। তবে ২০২৬ সালে সিনেমার প্রচার পৌঁছাবে নতুন এক উচ্চতায়।
সিনেমার কাল্পনিক চরিত্ররাই এখন সত্যিকারের ‘সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সার’ হয়ে উঠবে। তাদের নামে বাজারে নিজস্ব পণ্য বিক্রি হবে, বসবে পপ-আপ দোকান। মার্টি সুপ্রিম চরিত্রটি দিয়ে এই নতুন ধারার কেবল শুরু হয়েছে মাত্র।

ছবি: দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস
অতি নিখুঁত ‘এআই’ বনাম মানুষের অসম্পূর্ণতা
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই এখন মানুষের মতো ছবি বা লেখা তৈরি করছে। তবে এআইয়ের কাজে একধরনের কৃত্রিম নিখুঁত ভাব থাকে, যা বড্ড বেশি মসৃণ ও যান্ত্রিক। কোনো খুঁত থাকে না বলে এতে প্রাণের ছোঁয়া পাওয়া যায় না। একে বলা হয় ‘স্লপ’ নাহয় জগাখিচুড়ি, যা দেখতে আসলে মানুষের কাজের চেয়েও বেশি চকচকে।
২০২৬ সালে মানুষ এআইয়ের এই অতি-নিখুঁত কাজের প্লাবনে বিরক্ত হয়ে উঠবে। তারা আবার ফিরে আসবে মানুষের তৈরি শিল্পের কাছে। জাপানি দর্শন ‘ওয়াবি-সাবি’র মতো মানুষ তখন অসম্পূর্ণতা বা খুঁতের মধ্যেই খুঁজবে আসল সৌন্দর্য ও আনন্দ।

ছবি: দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস
হোয়াইট হাউসে প্রেম ও গুঞ্জনের ‘সোপ অপেরা’ চলবেই
বাইডেন জমানার সেই শান্তশিষ্ট ভাব আর নেই। ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের প্রথম বছরটি ছিল একদম ‘সোপ অপেরা’ বা টিভি সিরিয়ালের মতো। হোয়াইট হাউসজুড়ে ছিল সংসার ভাঙা-গড়া, বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক, বিচ্ছেদ আর নানা রোমান্টিক গুঞ্জনের ছড়াছড়ি।
কিছু কিছু গুঞ্জন তো রীতিমতো বড় খবরের জন্ম দিয়েছে। এফবিআই পরিচালক কাশ প্যাটেলের কথাই ধরা যাক। এক উদীয়মান কান্ট্রি গায়িকার সঙ্গে তার প্রেমের সম্পর্কের জেরে সরকারি নিরাপত্তার অপব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অন্যদিকে স্বাস্থ্যমন্ত্রী রবার্ট এফ কেনেডি জুনিয়রও এক সাংবাদিকের সঙ্গে তার পুরোনো ‘ভার্চ্যুয়াল’ সম্পর্কের জের এখনো টেনে বেড়াচ্ছেন।
বছরের শেষ দিকে ডোনাল্ড ট্রাম্প জুনিয়র, মার্জরি টেইলর গ্রিন ও লরা লুমারের মতো ট্রাম্প-ঘনিষ্ঠদের বাগদান পর্ব আলোচনার ঝড় তুলেছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বরাবরই নাটকীয়তা পছন্দ করেন, আবার তার চারপাশে সুন্দর মানুষের ভিড়ও বেশি। তাই ২০২৬ সালেও হোয়াইট হাউস থেকে এমন রোমাঞ্চকর খবর যে আরও আসবে, তা বলাই বাহুল্য।

ছবি: দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস
আবেগ লুকিয়ে রেখে ‘কুল’ সাজার দিন শেষ
২০২৬ সাল কি তবে আবেগের বাঁধ ভাঙার বছর? গায়িকা মাইলি সাইরাস তার গানে যেমন বলেছেন, ‘কাল যদি পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যায়, তবে আজ আমাকে কীভাবে জড়িয়ে ধরবে?’ চারপাশে যখন দুঃসংবাদ আর অনিশ্চয়তা, তখন মাইলি সাইরাসের এই গানই হয়তো পথ দেখাবে।
ভবিষ্যৎবাণী হলো—২০২৬ সালে আবেগ লুকিয়ে রাখা, ভাব ধরা বা ‘কুল’ সাজার দিন শেষ। ভালোবাসার ক্ষেত্রেও তাই।
চারপাশে অস্থিরতা আর ‘পৃথিবী শেষ হয়ে যাচ্ছে’—এমন ভাবনা মানুষকে আসলে সাহসী করে তোলে। কেউ হয়তো হুট করে ধূমপান শুরু করবে, কেউ জমানো টাকা খরচ করে দামি মার্সিডিজ গাড়ি কিনবে, আবার কেউ হয়তো ৪০ বছর বয়সের আগেই অবসরে যাওয়ার কথা ভাববে।
তবে সবচেয়ে ভালো হয় যদি ভালোবাসার ঝুঁকিটা নেওয়া যায়। ২০২৬ সালে মেকি গাম্ভীর্য বা ‘প্লেয়িং ইট কুল’ বিষয়টি একেবারেই সেকেলে হয়ে যাবে। বরং মানুষ মন খুলে ভালোবাসার কথা জানাবে, সম্পর্ক গড়বে সচেতনভাবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই সঙ্গীর ওপর মানুষ বিরক্ত হয়ে উঠবে, খুঁজবে সত্যিকারের মানুষের সঙ্গ। কালকের দিনটি আসবে কি না, তা যখন নিশ্চিত নয়, তখন আজই সেই কাজগুলো করা উচিত, যা করতে আমরা আগে ভয় পেতাম।

ছবি: দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস
ফ্যাশনে ফিরছে পুরোনো দিনের পাইপ
ভ্যাপ বা ই-সিগারেট দেখতে বড়ই বেখাপ্পা, কেমন যেন যান্ত্রিক। এর মধ্যে কোনো জৌলুস নেই। সম্ভবত এ কারণেই গত বছর মানুষ আবার সাধারণ সিগারেটে ফিরেছিল। তবে ২০২৬ সালে ফ্যাশন হবে আরও পুরোনো ও ভারী ঘরানার।
এবার পকেট বা ব্যাগ থেকে বের হবে তামাক খাওয়ার ভারী পাইপ। হালফিলের ‘স্ন্যুস’-এর জায়গা দখল করবে পুরোনো দিনের ‘নস্যি’। অ্যালগরিদম আর প্রযুক্তির এই খটমটে সময়ে মানুষ আসলে চার্লস ডিকেন্সের আমলের একটু আভিজাত্য খুঁজছে। সবাই চায়, কেউ তাকে দেখে বলুক—বেশ ‘ফিটফাট’ বা কেতাদুরস্ত!
রাজনীতি শেষে এবার রিয়েলিটি শো নিয়ে বাজি
নিউ ইয়র্ক সিটির মেয়র নির্বাচনের সময় ‘কালশি’ নামের একটি প্ল্যাটফর্ম টাইমস স্কয়ারে বিশাল বিলবোর্ড টাঙিয়েছিল। জোহরান মামদানির জয়ের ভবিষ্যদ্বাণী তারা আগেই করেছিল। সেই নির্বাচনে প্ল্যাটফর্মটিতে ১২ কোটি ডলারের বাজি ধরা হয়েছিল!
ভবিষ্যদ্বাণীর এই বাজার এখন শত কোটি ডলারের শিল্প হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাজনীতি শেষে তাদের পরবর্তী লক্ষ্য বিনোদন জগৎ। ‘রিয়েল হাউসওয়াইভস’-এর মতো জনপ্রিয় রিয়েলিটি শো-তে সামনে কী ঘটবে, তা নিয়ে এখন শেয়ার বাজারের মতো বাজি ধরা হবে।

নতুন স্টাইল আইকন
ফার্স্ট লেডিদের ‘স্টাইল আইকন’ হিসেবে দেখতে মার্কিনিরা বরাবরই পছন্দ করেন। নিউ ইয়র্কবাসীও এবার তেমনই একজনকে পেয়েছে। তিনি রামা দুওয়াজি, নবনির্বাচিত মেয়র মামদানির স্ত্রী।
রামা কেবল মেয়রের স্ত্রী নন, তিনি একজন শিল্পী এবং ভীষণ স্টাইলিশ। এরই মধ্যে তিনি ‘দ্য কাট’ ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে জায়গা করে নিয়েছেন। ২০২৬ সালে স্বামী যখন শহরের দায়িত্ব সামলাবেন, তখন রামা তাঁর নিজস্ব স্টাইল দিয়ে ‘ভোগ’-এর মতো বিশ্বখ্যাত ম্যাগাজিনগুলোর প্রচ্ছদ মাতাবেন—এ কথা হলফ করেই বলা যায়।
মার্ভেলকে টেক্কা দিতে ভক্তদের সিনেমা
মার্ভেল ও স্টার ওয়ার্সের দিন কি তবে শেষ? বিনোদন জগতে আসছে নতুন এক ‘সিনেমেটিক ইউনিভার্স’, যার নেপথ্যে থাকবেন খোদ ভক্তরাই। ফ্যানফিকশন বা টিকটক মিউজিক্যালের জনপ্রিয়তা আমরা দেখেছি। এবার পালা সাধারণ মানুষের অর্থায়নে (ক্রাউড ফান্ডিং) সম্পূর্ণ নতুন গল্পের সিনেমা তৈরির। অ্যানিমের ক্ষেত্রে হয়ত বিষয়টি আরও প্রকট হতে যাচ্ছে।
সময় এখন ‘এক্স-ফ্লুয়েন্সার’দের
২০২০-এর দশকের শুরুতে সবাই ইনফ্লুয়েন্সার হওয়ার দৌড়ে নেমেছিলেন। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে উল্টো চিত্র—অনেকেই হচ্ছেন ‘এক্স-ফ্লুয়েন্সার’ বা সাবেক ইনফ্লুয়েন্সার। সোশ্যাল মিডিয়ার কনটেন্ট তৈরির চাপে হাঁপিয়ে উঠে অনেকেই এখন ক্যামেরা-ট্রাইপড তুলে রেখে করপোরেট চাকরিতে ফিরছেন। আউটডোর বয়েজ বা নারা স্মিথের মতো তারকারাও ভিডিও বানানো কমিয়ে এখন ব্যবসায় মন দিচ্ছেন। সামনে এই দলভারীর সংখ্যা আরও বাড়বে।