যুক্তরাষ্ট্রে পিএইচডি ডিগ্রি নিয়ে বাড়ছে দুশ্চিন্তা, দলে দলে চাকরি ছাড়ছেন গবেষকেরা

যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে শীর্ষস্থানীয় পিএইচডি প্রোগামগুলো নতুন শিক্ষার্থী ভর্তি কমিয়ে দিচ্ছে। ফলে বিদেশি শিক্ষার্থীরা এখন উচ্চশিক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের বদলে অন্য দেশের দিকে ঝুঁকছেন। শুধু তা–ই নয়, দেশটির বিভিন্ন সরকারি গবেষণা সংস্থা থেকে পিএইচডি ডিগ্রিধারী কর্মীরা চাকরি ছাড়ছেন। 

Untitled-1.jpg
Illustration: TBS Graduates

নানা দিক থেকেই যুক্তরাষ্ট্রে এখন কঠিন সময় পার করছে পিএইচডি ডিগ্রি। শিক্ষাজীবনের সর্বোচ্চ অর্জন হিসেবে বিবেচিত, গবেষণা ও পাণ্ডিত্যের প্রতীক এই ডিগ্রি এখন অস্তিত্বসংকটে। বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে গবেষণা ও উচ্চতর প্রশিক্ষণে ট্রাম্প প্রশাসন বরাদ্দ কমিয়ে দেওয়ায় বড় ধরনের ধাক্কা লেগেছে এই খাতে।

যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে শীর্ষস্থানীয় পিএইচডি প্রোগামগুলো নতুন শিক্ষার্থী ভর্তি কমিয়ে দিচ্ছে। ফলে বিদেশি শিক্ষার্থীরা এখন উচ্চশিক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের বদলে অন্য দেশের দিকে ঝুঁকছেন। শুধু তা–ই নয়, দেশটির বিভিন্ন সরকারি সংস্থা থেকে পিএইচডি ডিগ্রিধারী কর্মীরা দলে দলে চাকরি ছাড়ছেন। 

এ ছাড়া সুবিধাবঞ্চিত ও সংখ্যালঘু শিক্ষার্থীদের পিএইচডি প্রোগ্রামে নিয়ে আসার যে দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টা ছিল, তাও এখন বাধার মুখে পড়েছে।

কারও কারও মতে, এত দিন প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত পিএইচডি ডিগ্রিধারী তৈরি হচ্ছিল, তাই এখন সংখ্যাটা কমিয়ে ভারসাম্য আনা হচ্ছে। তবে অধিকাংশ বিশ্লেষকই বর্তমান পরিস্থিতিতে চিন্তিত। তারা মনে করছেন, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গণিতের ক্ষেত্রে বিশ্বজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের যে একচ্ছত্র আধিপত্য ছিল, সাম্প্রতিক এই ঘটনাপ্রবাহের ফলে তা হুমকির মুখে পড়তে পারে।

গত বছর যুক্তরাষ্ট্রের নামী গবেষণা বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তাদের পিএইচডি প্রোগ্রামে ভর্তি কমানোর বা স্থগিত করার ঘোষণা দিয়েছে। গত আগস্টে ইউনিভার্সিটি অব শিকাগো যখন জানায় যে আর্থিক চাপের কারণে তারা বেশ কিছু বিভাগে ভর্তি কার্যক্রম স্থগিত বা কমিয়ে দেবে, তখন উচ্চশিক্ষার আঙিনায় রীতিমতো তোলপাড় শুরু হয়। তাদের এই সিদ্ধান্তে সমাজবিজ্ঞান, কলা ও মানবিক বিভাগগুলোই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

তবে শুধু শিকাগো নয়, অক্টোবরে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ও নতুন পিএইচডি শিক্ষার্থী ভর্তির সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে কমানোর ইঙ্গিত দিয়েছে। ইয়েল, কলম্বিয়া, ব্রাউন, ইউনিভার্সিটি অব সাউদার্ন ক্যালিফোর্নিয়া, বোস্টন ইউনিভার্সিটি ও ইউনিভার্সিটি অব পেনসিলভানিয়ার মতো বিখ্যাত প্রতিষ্ঠানগুলোও এখন শিক্ষার্থী ভর্তি কমিয়ে দিয়েছে, স্থগিত করেছে বা পুরোপুরি বন্ধ রেখেছে। 

বাদ যায়নি বড় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও। ইউনিভার্সিটি অব উইসকনসিন, মিশিগান স্টেট ইউনিভার্সিটি ও ইউনিভার্সিটি অব ওয়াশিংটনও একই পথে হেঁটেছে।

যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে পিএইচডি ভর্তি কমানোর হার ঠিক কতটা ব্যাপক, তার সঠিক পরিসংখ্যান পাওয়া বেশ কঠিন। কারণ, অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগ কেন্দ্রীয় প্রশাসনের কোনো নির্দেশনা ছাড়াই নিরবে নিজেদের মতো করে শিক্ষার্থী কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে বিভিন্ন ঘটনা ও তথ্যে বোঝা যাচ্ছে, অলক্ষ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের শিক্ষাঙ্গনে এই সংকোচনের চিত্র ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে।

পিএইচডি প্রোগ্রাম ছোট করার এই ধারা এখনো অব্যাহত। চলতি মাসেই জর্জ ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটি ঘোষণা দিয়েছে, তারা ডক্টরেট শিক্ষার্থীদের আর্থিক সহায়তা বা বৃত্তির পরিমাণ ৭ শতাংশ কমিয়ে দিচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়টি ১৩টি প্রোগ্রামে আগের চেয়ে কম শিক্ষার্থী ভর্তি করাবে। 

আর ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি, নৃবিজ্ঞান, হিউম্যান পেলিওবায়োলজি, রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও গণিত—এই পাঁচটি বিভাগে নতুন করে কোনো শিক্ষার্থীই নেওয়া হবে না।

এর মধ্যে ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিতে ভর্তি স্থগিত করার বিষয়টি বেশ নজরে পড়ার মতো। কারণ, ঐতিহাসিকভাবে অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ে এই বিভাগটিতেই সবচেয়ে বেশি আবেদন জমা পড়ে।

গবেষণায় বড় ধাক্কা

শিক্ষার্থী বা স্কলারদের সুযোগ কমিয়ে দেওয়াকে বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণার জন্য বড় ধাক্কা হিসেবে দেখছেন জর্জ ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটির বায়োলজিক্যাল সায়েন্স বিভাগের চেয়ারম্যান গুইলারমো ওরটি।

তিনি বলেন, ‘যেকোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা কার্যক্রম টিকিয়ে রাখার মূল চালিকাশক্তি হলেন পিএইচডি গবেষকেরা। আপনি যদি শিক্ষার্থী ভর্তির প্যাকেজ বা সুযোগ-সুবিধায় কাটছাঁট করেন, তার মানে হলো আপনি আসলে বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা করার সক্ষমতাটাই কমিয়ে দিচ্ছেন।’

অধিকাংশ পিএইচডি প্রোগ্রামের, বিশেষ করে বিজ্ঞানের বিষয়গুলোর তহবিলের মূল উৎস যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় সরকার। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ন্যাশনাল ইনস্টিটিউটস অব হেলথ (এনআইএইচ), ন্যাশনাল সায়েন্স ফাউন্ডেশনসহ বিভিন্ন সরকারি সংস্থার বাজেটে বড় অঙ্কের কাটছাঁটের প্রস্তাব করেছেন। 

যদিও কংগ্রেস এসব প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করতে পারে বলে মনে হচ্ছে, তবুও কেন্দ্রীয় সরকারের এই অস্থিরতায় বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ঝুঁকি নিতে চাইছে না। গবেষণা ও উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে তারা এখন ‘ধীরে চলো’ নীতি বা বেশ সতর্ক অবস্থান নিয়েছে।

যদিও যুক্তরাষ্ট্রের এই নড়বড়ে পরিস্থিতির সুযোগ নিতে শুরু করেছে অন্য দেশগুলো। গত ডিসেম্বরেই বিদেশি গবেষক ও গবেষণা দলগুলোকে নিজেদের বিশ্ববিদ্যালয়ে টানতে আগ্রাসী কৌশল নিয়েছে কানাডা। এ কাজে তারা প্রায় ১২০ কোটি মার্কিন ডলার বিনিয়োগের পরিকল্পনা করেছে। এর মধ্যে ১৩ কোটি ৩৬ লাখ ডলার খরচ করা হবে আগামী তিন বছরে ৬০০ মেধাবী পিএইচডি শিক্ষার্থী এবং ৪০০ পোস্ট-ডক্টরাল গবেষককে কানাডায় নিয়ে যাওয়ার জন্য। যুক্তরাষ্ট্র থেকেও অনেকেই এই সুযোগ লুফে নেবেন।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা ও অভিবাসন নীতির সাম্প্রতিক পরিবর্তন। বিদেশি শিক্ষার্থীদের আবেদনের হার নাটকীয়ভাবে কমে যাওয়ার পেছনে একেই দায়ী করা হচ্ছে। অথচ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির বিষয়গুলোতে ঐতিহ্যগতভাবে বিদেশিরাই বেশি আগ্রহ দেখাতেন।

‘গ্লোবাল এনরোলমেন্ট বেঞ্চমার্ক সার্ভে’র তথ্যমতে, গত বছর যুক্তরাষ্ট্রে নতুন বিদেশি গ্রাজুয়েট শিক্ষার্থী ভর্তির হার ১৯ শতাংশ কমেছে। দেশটির প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ বিশ্ববিদ্যালয় জানিয়েছে, তাদের গ্রাজুয়েট শিক্ষার্থী কমেছে। তবে এশিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এই হার ৩ শতাংশ বেড়েছে। ইউরোপ ও যুক্তরাজ্যে বেড়েছে যথাক্রমে ৫ ও ৩ শতাংশ।

বিশ্ববিদ্যালয়গুলো লাগাম টানার আগে থেকেই অবশ্য পিএইচডি ভর্তিতে একধরনের স্থবিরতা চলছিল। ২০২৫ সালের সেশনে যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চশিক্ষায় মোট ভর্তি ১ শতাংশ বাড়লেও তা মূলত স্নাতক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের কারণে বেড়েছে। ‘ন্যাশনাল স্টুডেন্ট ক্লিয়ারিংহাউস রিসার্চ সেন্টার’-এর সর্বশেষ প্রতিবেদনে দেখা গেছে, গত শরতে ডক্টরেট পর্যায়ে ভর্তি কমেছে ০.৩ শতাংশ। অর্থাৎ, শিক্ষার্থী কমেছে দুই হাজারের বেশি।

কেন ছাড়ছেন চাকরি?

যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি গবেষণা সংস্থাগুলো থেকেও পিএইচডি ডিগ্রিধারী কর্মীরা দলে দলে চাকরি ছাড়ছেন। হোয়াইট হাউসের অফিস অব পারসোনেল ম্যানেজমেন্টের তথ্যের ভিত্তিতে সায়েন্স সাময়িকীর এক নতুন বিশ্লেষণে এই উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। সায়েন্স মোট ১৪টি সংস্থায় জরিপ চালিয়ে দেখেছে, ২০২৫ সালে সেখানে নতুন কর্মী নিয়োগের তুলনায় চাকরি ছেড়ে যাওয়ার হার ১১ গুণ বেশি। এর ফলে সংস্থাগুলো মোট ৪ হাজার ২২২ জন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি (স্টেম) শাখার পিএইচডি গবেষককে হারিয়েছে।

গবেষণানির্ভর সংস্থাগুলোতে এই পরিস্থিতি সবচেয়ে ভয়াবহ। বিশেষ করে ন্যাশনাল ইনস্টিটিউটস অব হেলথ (এনআইএইচ) এবং ন্যাশনাল সায়েন্স ফাউন্ডেশনের (এনএসএফ) অবস্থা নাজুক। ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার আগে ২০২৪ সালে যে পরিস্থিতি ছিল, তার তুলনায় ২০২৫ সালে প্রতিটি সংস্থাতেই স্টেম শাখার পিএইচডি কর্মী হারানোর হার বেড়েছে।

তালিকার শীর্ষে থাকা এনআইএইচ থেকে ২০২৫ সালে ১ হাজার ১০০–র বেশি পিএইচডিধারী চাকরি ছেড়েছেন, যেখানে ২০২৪ সালে এই সংখ্যা ছিল ৪২১। এনএসএফের চিত্র আরও করুণ। গত বছরের জানুয়ারি থেকে নভেম্বরের মধ্যে সেখানে স্টেম পিএইচডি কর্মীর সংখ্যা কমেছে ২০৫ জন। 

ট্রাম্প আসার আগে সেখানে মোট ৫১৭ জন পিএইচডি কর্মী ছিলেন; অর্থাৎ মাত্র কয়েক মাসেই সংস্থাটি তার মোট জনশক্তির ৪০ শতাংশ হারিয়েছে।

গড়ে ওই ১৪টি সংস্থায় ২০২৪ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে প্রায় তিন গুণ বেশি বিশেষজ্ঞ চাকরি ছেড়েছেন। বিপরীতে নতুন নিয়োগের হারও ২০২৫ সালে উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। সব মিলিয়ে দেখা গেছে, ২০২৪ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৫ সালের নভেম্বরের মধ্যে এই সংস্থাগুলোতে স্টেম পিএইচডি কর্মীর সংখ্যা গড়ে ১৭ শতাংশ কমেছে।

সায়েন্স সাময়িকী কর্মীদের চাকরি ছাড়ার কারণও খতিয়ে দেখেছে। তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সরকারিভাবে কর্মী ছাঁটাই বা জনবল কমানোর উদ্যোগের কারণে খুব কম মানুষই চাকরি হারিয়েছেন। বরং অধিকাংশ সংস্থায় অবসর নেওয়া বা নিজ থেকে ইস্তফা দেওয়াই ছিল চাকরি ছাড়ার প্রধান কারণ।

প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, ‘যদিও সরকারি নথিতে এসব ঘটনাকে ‘স্বেচ্ছায় চাকরি ছাড়ার’ তালিকায় ফেলা হয়েছে, তবুও এর পেছনে বাইরের নানা চাপের ভূমিকা ছিল। চাকরিচ্যুতির ভয়, এককালীন অর্থের বিনিময়ে চাকরি ছাড়ার লোভনীয় প্রস্তাব কিংবা ট্রাম্পের নীতিগুলোর সঙ্গে তীব্র মতপার্থক্য—এমন নানা কারণেই হয়তো অনেকে চাকরি ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।’