স্বপ্নের চাকরি: যে দ্বীপে থাকা-খাওয়া ফ্রি, মিলবে হাতখরচও; বিনিময়ে গুনতে হবে পাখি

দ্বীপের ভিজিটর অফিসার রব নট জানান, পাফিন গোনার এই কাজটিতে বেশ মনোযোগ দিতে হয়। পুরো দ্বীপটিকে কয়েকটি ভাগে ভাগ করা হয়। এরপর সূর্যাস্তের প্রায় দুই ঘণ্টা আগে যখন প্রচুর সংখ্যক পাফিন ডাঙায় ফিরে আসে, তখন শুরু হয় গণনা।

image_32
সফল আবেদনকারীরা দ্বীপের পাফিন সহ বন্যপ্রাণীর পাশে বসবাসের সুযোগ পাবেন। ছবি : সংগৃহীত

দক্ষিণ-পশ্চিম ওয়েলসের উপকূলের অদূরে এক চমৎকার নির্জন দ্বীপ। ছবির মতো সুন্দর এই দ্বীপটিই হতে পারে যেকারোর নতুন ঠিকানা। তবে এর জন্য একটি শর্ত মানতে হবে—তাকে পাফিন পাখি গুনতে হবে।

পেমব্রোকশায়ারের কাছে অবস্থিত এই দ্বীপের নাম ‘স্কোমার আইল্যান্ড’। ১.১৩ বর্গমাইল (২.৯২ বর্গকিলোমিটার) আয়তনের এই দ্বীপটি সামুদ্রিক পাখিদের রাজ্য। এটি পরিচালনার দায়িত্বে আছে ‘ওয়াইল্ডলাইফ ট্রাস্ট অফ সাউথ অ্যান্ড ওয়েস্ট ওয়েলস’।

স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে এই পদের জন্য কোনো স্যালারি নেই। তবে হতাশ হওয়ার কিছু নেই। কারণ ডব্লিউটিএসডব্লিউডব্লিউ থাকার জন্য বিনামূল্যে আবাসন ব্যবস্থা করবে। যুক্তরাজ্যের ভেতর যাতায়াতের সব খরচও তারা বহন করবে। এর সঙ্গে বোনাস হিসেবে থাকছে ২০০ থেকে ৪০০ পাউন্ডের একটি হাতখরচের ভাতা।

দ্বীপের ভিজিটর অফিসার রব নট জানান, পাফিন গোনার এই কাজটিতে বেশ মনোযোগ দিতে হয়। পুরো দ্বীপটিকে কয়েকটি ভাগে ভাগ করা হয়। এরপর সূর্যাস্তের প্রায় দুই ঘণ্টা আগে যখন প্রচুর সংখ্যক পাফিন ডাঙায় ফিরে আসে, তখন শুরু হয় গণনা।

পাফিন বিলুপ্তির দিক থেকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘আমরা আমাদের ‘ক্লিকার’ (হাতে টিপে গণনার যন্ত্র) নিয়ে বেরিয়ে পড়ি। মাটিতে, সাগরে এবং আকাশে থাকা সব পাফিন গুনে ফেলি।’

বিশ্বব্যাপী প্রকৃতি সংরক্ষণের সংস্থা আইইউসিএন-এর লাল তালিকায় পাফিনকে ‘বিলুপ্তির ঝুঁকিতে থাকা’ প্রজাতি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

রব নট বলেন, ‘ওদের এই তালিকায় থাকাটা বহু কারণেই ভুল এবং দুঃখজনক। কারণ একসময় এই পাখিদের সংখ্যা ছিল প্রচুর। তাই আমরা সাধ্যমতো চেষ্টা করছি যাতে এই সংখ্যাটা আবারও বাড়ানো যায়।’

বর্তমানে দ্বীপটিতে দীর্ঘমেয়াদি তিনজন স্বেচ্ছাসেবক এবং একজন সামুদ্রিক পাখি (সি-বার্ড) পর্যবেক্ষণকারী নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়েছে। উল্লেখ্য, দ্বীপটি একটি জাতীয় প্রকৃতি সংরক্ষাণাগার বা ন্যাশনাল নেচার রিজার্ভ।

প্রতি বছর বসন্তে প্রজননের জন্য কত পাখি ফিরে আসে, তার হিসাব রাখে ডব্লিউটিএসডব্লিউডব্লিউ। বিশ্বজুড়ে পাফিনের সংখ্যা কমলেও গত বছর এই দ্বীপে রেকর্ড সংখ্যক ৪৩ হাজার ৬২৬টি পাফিন দেখা গেছে।

কর্তৃপক্ষ বলছে, এর কারণ হলো দ্বীপের আশপাশে ছানাদের জন্য প্রচুর মাছ পাওয়া যায়। এ ছাড়া ইঁদুর বা শিয়ালের মতো শিকারি প্রাণী না থাকাও পাফিনের সংখ্যা বাড়ার অন্যতম কারণ।

শুধু পাফিন নয়, স্কোমার দ্বীপে ৩ লাখ ৫০ হাজার জোড়া ‘ম্যাঙ্কস শিয়ারওয়াটার’ পাখিও প্রজনন করে। এ ছাড়া হাজার হাজার গিলিমট এবং রেজরবিল পাখিরও দেখা মেলে এখানে।

চাকরির বিজ্ঞাপনে কাজের বিবরণ দিয়ে বলা হয়েছে: ‘বসন্তে আমাদের মূল নজর থাকে প্রজনন করতে আসা সামুদ্রিক পাখিদের দিকে। অর্থাৎ তখন পাফিন গোনা এবং নৌকায় করে অন্যান্য সামুদ্রিক পাখির জরিপে সহায়তা করতে হবে।’

রব নট বলেন, দ্বীপে পাফিন গণনা করা “বেশ কঠিন একটা কাজ”।

‘গ্রীষ্মে নজর থাকে ছানাদের বেড়ে ওঠার দিকে। আর শরতে আমাদের কাজের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে ধূসর সিল পর্যবেক্ষণ। এ ছাড়া দ্বীপের অন্যান্য প্রাণী যেমন—স্কোমার ভোল, সরীসৃপ, তিমি এবং মথ বা পতঙ্গদের দিকেও খেয়াল রাখতে হয়।’

স্বেচ্ছাসেবকরা মার্চ মাসের শেষ থেকে সেপ্টেম্বরের শেষ পর্যন্ত—এই সময়ের মধ্যে একেকজন একবারে তিন মাস করে দ্বীপে থাকবেন। আর সামুদ্রিক পাখি পর্যবেক্ষণ কর্মকর্তা ২৩ মে থেকে ২৩ জুন পর্যন্ত কাজ করবেন।

বছরের কোন সময়ে কাজ করছেন, তার ওপর ভিত্তি করে স্বেচ্ছাসেবকদের দায়িত্ব বদলাতে পারে। কখনো নৌকায় করে পাখি গুনতে হবে, কখনো ছানাদের উৎপাদন ক্ষমতা দেখতে হবে, আবার কখনো সিল মাছ পর্যবেক্ষণ করতে হবে।

এর পাশাপাশি দ্বীপের দৈনন্দিন কাজকর্ম পরিচালনা এবং বছরে যে ২৫ হাজার দর্শনার্থী বা পর্যটক এখানে আসেন, তাদের স্বাগত জানানোর দায়িত্বও পালন করতে হবে।

মেরিন কনজারভেশন সোসাইটি জানিয়েছে, স্কোমার এবং মারলোস উপদ্বীপের চারপাশের জলরাশিই ওয়েলসের একমাত্র সামুদ্রিক সংরক্ষণ এলাকা (মেরিন কনজারভেশন জোন)।

পাফিন গোনায় কোনো বেতন পাবার সুযোগ নেই।

স্কোমার আইল্যান্ড আসলে কোথায়?
দক্ষিণ-পশ্চিম ওয়েলসের পেমব্রোকশায়ার উপকূল থেকে প্রায় এক মাইল দূরে এর অবস্থান। দ্বীপে কোনো দোকানপাট নেই। তাই যারাই এখানে ভ্রমণে আসেন, তাদের নিজেদের খাবার ও প্রয়োজনীয় রসদ সঙ্গে করেই আনতে হয়।

দ্বীপে কি মানুষ থাকে?
স্কোমার দ্বীপে কোনো স্থায়ী বাসিন্দা নেই। তবে ওয়াইল্ডলাইফ ট্রাস্টের কর্মীরা মৌসুমভেদে বছরের প্রায় নয় মাস এখানেই বসবাস করেন। আর পর্যটকদের রাতে থাকার জন্য ট্রাস্টের হোস্টেলে সীমিত পরিসরে আবাসনের ব্যবস্থা আছে।

কীভাবে যাবেন এই দ্বীপে?
নৌকায় চড়ে স্কোমারে যাওয়া যায়। এপ্রিল থেকে আগস্ট পর্যন্ত সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১২টার মধ্যে প্রতি ৩০ মিনিট পর পর নৌকা ছাড়ে। আর ফেরার নৌকা বিকেল ৩টা থেকে শুরু হয়। সেপ্টেম্বরে যাত্রীদের চাহিদার ওপর ভিত্তি করে নৌকার সংখ্যা কমে যায় এবং সেপ্টেম্বরের শুক্রবারগুলোতে ডে-ট্রিপ বা দিনের বেলার নৌকা বন্ধ থাকে।

সফল প্রার্থীরা বসন্ত, গ্রীষ্ম বা শরতে কয়েক মাস এই দ্বীপে থাকার সুযোগ পাবেন এবং প্রকৃতি রক্ষার মহৎ কাজে অংশ নেবেন। রব নট বলেন, ঝুঁকিতে থাকা এই পাফিনগুলো ‘আইকনিক’ বা অত্যন্ত জনপ্রিয় পাখি এবং এদের গোনার কাজটিও ‘বেশ বড় একটি দায়িত্ব’।