বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে প্রাণিবিদ্যা: শিক্ষা, গবেষণা ও কর্মক্ষেত্রের বিশ্লেষণ

প্রাণিবিদ্যা (Zoology) জীববিজ্ঞানের একটি মৌলিক ও বহুমাত্রিক শাখা, যা প্রাণীকুলের বৈচিত্র্য, বিস্তরণ, গঠন, আচরণ, শারীরতত্ত্ব, বিবর্তন, শ্রেণিবিন্যাস, রোগতত্ত্ব এবং পরিবেশ ও বাস্তুতন্ত্রের সঙ্গে প্রাণীদের পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়ে অধ্যয়ন, গবেষণা ও সংরক্ষণমূলক কার্যক্রম পরিচালনা করে।

royal_bengal_tiger_sundarbans_3
সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সুন্দরবনের বাংলাদেশ অংশে অন্তত ১১৪টি বেঙ্গল টাইগার বাস করে। ছবি: রয়টার্স

স্থলজ, জলজ ও সামুদ্রিক প্রাণীজগৎ থেকে শুরু করে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, জলবায়ু পরিবর্তন, পরিবেশ ব্যবস্থাপনা, ওয়ান হেলথ, টেকসই উন্নয়ন ও সুনীল অর্থনীতির মতো সমসাময়িক বৈশ্বিক ইস্যুতেও প্রাণিবিদ্যার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভবিষ্যৎ পৃথিবীতে মানবসভ্যতার টেকসই অস্তিত্ব রক্ষার ক্ষেত্রে এই বিষয়টি একটি অপরিহার্য জ্ঞানভিত্তি হিসেবে বিবেচিত।

দুর্ভাগ্যজনকভাবে, বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে প্রাণিবিদ্যা শিক্ষাব্যবস্থায় সমসাময়িক বৈশ্বিক বিষয়গুলোর যথাযথ সংযোজন সীমিত ছিল। অতিরিক্ত মুখস্থনির্ভরতা, প্রথাগত কাঠামোর জড়তা এবং গবেষণাভিত্তিক চিন্তার ঘাটতির কারণে এ বিষয়টি অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের মধ্যে গবেষণাবিমুখতা সৃষ্টি করেছে। এর ফলে প্রাণিবিদ্যার প্রকৃত সম্ভাবনা ও বহুমুখী কর্মক্ষেত্র সম্পর্কে শিক্ষার্থীরা পর্যাপ্তভাবে অবগত হতে পারেনি। তবে সাম্প্রতিক সময়ে এই পরিস্থিতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন লক্ষ করা যাচ্ছে। দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে কিছু শিক্ষক ও গবেষকের উদ্যোগে প্রাণিবিদ্যা শিক্ষা ও গবেষণায় নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হচ্ছে, যদিও এই অগ্রগতি এখনও প্রধানত ব্যক্তিগত ও স্বউদ্যোগভিত্তিক।

সাধারণভাবে নতুন শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রাণিবিদ্যা বলতে পরীক্ষাগারে তেলাপোকা বিচ্ছেদ, খাতা ভর্তি চিত্রাঙ্কন কিংবা অসংখ্য বৈজ্ঞানিক নাম মুখস্থ করার ধারণাই বেশি প্রচলিত। এর মূল কারণ উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের পাঠ্যক্রমে প্রাণিবিদ্যার একটি সীমিত অংশ, বিশেষত মানবদেহ ও শ্রেণিবিন্যাস, অতিরিক্ত গুরুত্ব পাওয়া। বাস্তবে প্রাণিবিদ্যা হলো নিজেকে, নিজের চারপাশের পরিবেশ-প্রতিবেশ এবং প্রকৃতিকে জানার বিজ্ঞান; একই সঙ্গে তা সংরক্ষণের দায়বদ্ধতার শিক্ষা। এক অর্থে, এটি ভবিষ্যৎ পৃথিবীর জন্য সচেতন ও দায়িত্বশীল নাগরিক গড়ে তোলার একটি বিষয়।

প্রাণিবিদ্যা অধ্যয়নের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য নিয়ে সমুদ্রে গবেষণা, গহিন অরণ্যে বন্যপ্রাণী অনুসন্ধান, পাহাড়-জঙ্গল-জলাভূমিতে মাঠপর্যায়ের কাজ, প্রাণীর আচরণ ও জীবনচক্র বিশ্লেষণ, রোগতত্ত্ব, জেনেটিক্স ও মলিকুলার বায়োলজির মতো আধুনিক গবেষণাক্ষেত্রে যুক্ত হওয়ার সুযোগ পায়। একই সঙ্গে পরিবেশ ও আবাসস্থল সংরক্ষণ, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা এবং জীববৈচিত্র্য রক্ষায় সক্রিয় ভূমিকা পালনের সুযোগ সৃষ্টি হয়।

বাংলাদেশে বর্তমানে ঢাকা, জাহাঙ্গীরনগর, জগন্নাথ, নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, চট্টগ্রাম ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রাণিবিদ্যা বিষয়টি পড়ানো হয়। পাশাপাশি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত দেশের প্রায় সব জেলায় স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে প্রাণিবিদ্যা শিক্ষা কার্যক্রম চালু রয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগ ১৯৫৪ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে শিক্ষা, গবেষণা ও প্রাণিসংরক্ষণে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখে আসছে। এই বিভাগের বহু প্রাক্তন শিক্ষার্থী দেশ-বিদেশে শিক্ষা ও গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন, যার স্বীকৃতি হিসেবে ২০২৫ সালে বিভাগটি জাতীয় পর্যায়ে সর্বোচ্চ সম্মাননা অর্জন করে।

স্নাতক পর্যায়ে প্রাণিবিদ্যায় অমেরুদণ্ডী ও মেরুদণ্ডী প্রাণী, পরিবেশ ও বাস্তুতন্ত্র, জেনেটিক্স, শ্রেণিবিন্যাস, প্রাণী আচরণ, বিবর্তন, জীবাশ্মবিদ্যা, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, মৎস্যবিদ্যা, কীটতত্ত্ব, পরজীবিবিদ্যা, পাবলিক হেলথ ও বন্যপ্রাণী জীববিদ্যাসহ বিস্তৃত বিষয় পড়ানো হয়। স্নাতকোত্তর পর্যায়ে শিক্ষার্থীরা মৎস্যবিজ্ঞান, কীটতত্ত্ব, বন্যপ্রাণীবিদ্যা, পরজীবিবিদ্যা, জেনেটিক্স ও মলিকুলার বায়োলজি, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ইত্যাদি বিশেষায়িত শাখায় অধ্যয়ন করার সুযোগ পায়।

প্রাণিবিদ্যায় কর্মক্ষেত্র মূলত শিক্ষার্থীর ব্যক্তিগত দক্ষতা, অধ্যবসায় ও পেশাগত প্রস্তুতির ওপর নির্ভরশীল। দেশি ও আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয়, এনজিও, কনসালটেন্সি ফার্ম, সরকারি গবেষণা সংস্থা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং আন্তর্জাতিক সংস্থায় এই বিষয়ের শিক্ষার্থীদের কাজের সুযোগ রয়েছে। পাশাপাশি বিসিএস, ব্যাংকিং ও অন্যান্য প্রশাসনিক ক্ষেত্রেও প্রাণিবিদ্যার শিক্ষার্থীদের উল্লেখযোগ্য সাফল্য রয়েছে।

বর্তমান বিশ্বে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, জলবায়ু পরিবর্তন, ব্লু ইকোনমি, খাদ্যনিরাপত্তা, মহামারি প্রতিরোধ, বায়োটেকনোলজি ও মলিকুলার বায়োলজি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কর্মক্ষেত্র হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। জীববৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ বাংলাদেশে এসব ক্ষেত্রে প্রাণিবিদ্যার শিক্ষার্থীদের জন্য সম্ভাবনার ক্ষেত্র ক্রমেই সম্প্রসারিত হচ্ছে।

প্রথাগত পাঠ্যক্রমের পাশাপাশি সহশিক্ষা কার্যক্রম, মাঠপর্যায়ের গবেষণা, সেমিনার ও ওয়ার্কশপে অংশগ্রহণ, গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পৃক্ততা এবং পেশাগত নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা প্রাণিবিদ্যার শিক্ষার্থীদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নিয়মিত শিক্ষা সফর ও মাঠভিত্তিক অভিজ্ঞতা শিক্ষার্থীদের বাস্তব জীববৈচিত্র্য বোঝার সক্ষমতা বৃদ্ধি করে এবং ভবিষ্যৎ গবেষণা ও সংরক্ষণ কার্যক্রমে কার্যকর ভূমিকা রাখতে সহায়তা করে।

সবকিছু মিলিয়ে, প্রাণিবিদ্যা এমন একটি বিষয়—যার সফলতা নির্ভর করে একজন শিক্ষার্থী কীভাবে নিজেকে গড়ে তোলে তার ওপর। পরিশ্রম, ধৈর্য, একাগ্রতা ও দূরদর্শী চিন্তার মাধ্যমে এই বিষয় থেকে দেশ ও আন্তর্জাতিক পরিসরে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা সম্পূর্ণ সম্ভব।


  • আশিকুর রহমান সমী: বন্যপ্রাণী বিষয়ক গবেষক, পরিবেশবিদ ও লেখক