বাংলাদেশকে মোটা অঙ্কের ক্ষতিপূরণ দিলে ভারত ম্যাচ খেলবে পাকিস্তান

টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপে ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ নিয়ে তৈরি হওয়া অচলাবস্থা নিরসনে তৎপরতা আরও জোরদার হয়েছে। ভারতের বিপক্ষে নির্ধারিত ম্যাচটি বয়কটের বিষয়ে পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড (পিসিবি) এখন সরকারের কাছ থেকে সুনির্দিষ্ট নির্দেশনার পাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে।

BCB-PCB-ICC
ছবি: পিসিবি

পিসিবি, আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল (আইসিসি) ও বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) মধ্যে পাঁচ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে চলা ম্যারাথন বৈঠকের পর এই গুরুত্বপূর্ণ মোড় সামনে এলো।

এদিকে সূত্রের বরাত দিয়ে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ভারত ম্যাচ খেলতে রাজি হয়েছে পাকিস্তান, কিন্তু সেজন্য তিনটি প্রধান শর্ত জুড়ে দিয়েছে পিসিবি। শর্ত তিনটি হচ্ছে: ১. বাংলাদেশকে মোটা অঙ্কের ক্ষতিপূরণ দেওয়া, ২. বিশ্বকাপ থেকে বাদ দেওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশকে একটি অংশগ্রহণ ফি দেওয়া এবং ৩. ভবিষ্যতে আইসিসির কোনো টুর্নামেন্ট আয়োজনের স্বত্ব পাকিস্তানকে দেওয়া।

এনডিটিভির সূত্রগুলো আরও বলেছে, পিসিবির কিছু কর্মকর্তা কলম্বোতে ভারতের বিপক্ষে ম্যাচটি খেলার পক্ষে থাকলেও বোর্ড চেয়ারম্যান নকভি এখনও এ বিষয়ে অনড় অবস্থানে রয়েছেন। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার নকভি সোমবার ফের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের সঙ্গে দেখা করে তার পরামর্শ নেবেন।

ভারত ম্যাচ বয়কট নিয়ে আলোচনা করতে লাহোরের গাদ্দাফি স্টেডিয়ামে পিসিবি চেয়ারম্যান মহসিন নকভির সঙ্গে আইসিসির ডেপুটি চেয়ারম্যান ইমরান খাজা বৈঠকে বসেন। বিসিবি সভাপতি আমিনুল ইসলাম বুলবুলও তাতে উপস্থিত ছিলেন।

সূত্রমতে, বাংলাদেশের দাবিগুলোর প্রতি আইসিসি ইতিবাচক সাড়া দিয়েছে। বিসিবির অভিযোগগুলো সুরাহার জন্য একটি ফর্মুলাও তৈরি করা হয়েছে। আইসিসি ও বিসিবি পরস্পরের সঙ্গে বিভিন্ন প্রস্তাব বিনিময় করেছে। এই আলোচনায় প্রধান সমন্বয়কের ভূমিকা পালন করেছে পিসিবি।

এই ম্যারাথন বৈঠক শেষে ইমরান খাজা প্রস্তাবগুলোর চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য আইসিসি সদর দপ্তরে ফিরে গেছেন। অন্যদিকে, বিসিবি সভাপতি আমিনুল ইসলাম বাংলাদেশ সরকারকে বিষয়টি অবহিত করতে দেশে রওনা হয়েছেন। 

সূত্র জানিয়েছে, ‘এই ফর্মুলার বিষয়ে উভয় পক্ষ একমত হলে আইসিসি ও বিসিবি কর্মকর্তারা আগামীকাল (আজ) বিকেলে পরবর্তী পদক্ষেপগুলো চূড়ান্ত করতে ফের বৈঠকে বসবেন।’

এদিকে ভারত ম্যাচের বিষয়ে পাকিস্তানের চূড়ান্ত অবস্থান কী হবে, সে বিষয়ে সরকারি দিকনির্দেশনা পেতে আগামী দুই দিনের মধ্যে প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের সঙ্গে পিসিবি চেয়ারম্যানের দেখা করার কথা রয়েছে। 

সূত্র অনুযায়ী, এই ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণে পাক প্রধানমন্ত্রীই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেবেন।

এর আগে ১৫ ফেব্রুয়ারি নির্ধারিত ভারতের বিপক্ষে ম্যাচটি পাকিস্তান বয়কটের ঘোষণা দেওয়ার পর পিসিবি-প্রধানের সঙ্গে আলোচনার জন্য লাহোরে পৌঁছান ইমরান খাজা। 

তারও আগে বিসিবি সভাপতি পাকিস্তানে এসে মহসিন নকভির সঙ্গে আলাদাভাবে বৈঠক করেন।

টুর্নামেন্টকে কেন্দ্র করে আইসিসির সঙ্গে বাংলাদেশের বিরোধপূর্ণ অবস্থানে সমর্থন দেওয়ার জন্য বিসিবি সভাপতি পাকিস্তানকে ধন্যবাদ জানান।  বৈঠক চলাকালে নকভি ও বুলবুল বর্তমান সংকট নিরসনে নিজেদের মতামত বিনিময় করেন।

সূত্রমতে, বিসিবি-প্রধান আইসিসির জরুরি সভায় যোগ দেবেন। সেখানে অন্যান্য বোর্ড সদস্যদেরও উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে। 

আইসিসির পক্ষপাতমূলক আচরণণের অভিযোগে পাকিস্তান ১৫ ফেব্রুয়ারির ম্যাচ বর্জনের যে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, সে প্রেক্ষাপটেই এই নতুন নাটকীয়তা শুরু হয়েছে। বাংলাদেশও এই বিরোধের একটি কেন্দ্রীয় পক্ষ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

সংকট ও বাণিজ্যের দোলাচলে ভারত-পাকিস্তান লড়াই

উগ্র হিন্দুত্ববাদীদের দাবির মুখে ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগ (আইপিএল) থেকে বাংলাদেশের তারকা পেসার মোস্তাফিজুর রহমানকে বাদ দেওয়ার ঘটনায় বাংলাদেশ ও ভারতের ক্রিকেট বোর্ডের মধ্যে উত্তেজনা চরম আকার ধারণ করেছে। ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড—বিসিসিআইয়ের নির্দেশে মোস্তাফিজকে বাদ দেওয়ার এই সিদ্ধান্তে ঢাকায় তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।

পরে বিসিবি নিরাপত্তা শঙ্কায় বিশ্বকাপে তাদের ম্যাচগুলো ভারত থেকে সরিয়ে নিতে আইসিসিকে অনুরোধ জানায়। তবে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের নিয়ন্ত্রক সংস্থা সেই আবেদন প্রত্যাখ্যান করে। বিসিবি তাদের অবস্থানে অনড় থাকলে আইসিসি বাংলাদেশকে বাদ দিয়ে স্কটল্যান্ডকে টুর্নামেন্টে অন্তর্ভুক্ত করে। 

অন্যদিকে ভারত ম্যাচ বয়কটের সিদ্ধান্ত নিয়ে পিসিবির পক্ষ থেকে আইসিসির সঙ্গে আলোচনার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে বলে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে যে দাবি করা হয়েছে, পিসিবি তা সরাসরি নাকচ করে দিয়েছে। 

ভারত-পাকিস্তান ম্যাচের বাণিজ্যিক গুরুত্ব

ক্রিকেট বিশ্বে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ভারত ও পাকিস্তানের লড়াই মানেই কোটি কোটি ডলারের বাণিজ্য। সম্প্রচার স্বত্ব, স্পন্সরশিপ ও বিজ্ঞাপন থেকে এই ম্যাচ বিশাল অঙ্কের রাজস্ব আনে। 

প্রাক্কলন অনুসারে, বাণিজ্যিক পরিমণ্ডলে একটি ভারত-পাকিস্তান টি-টুয়েন্টি ম্যাচের মোট মূল্য প্রায় ৫০০ মিলিয়ন ডলার বা প্রায় ৪৫ হাজার কোটি ভারতীয় রুপি। এর মধ্যে সম্প্রচার স্বত্ব, বিজ্ঞাপনের প্রিমিয়াম, স্পন্সরশিপের সক্রিয়তা, টিকিট বিক্রি ও অন্যান্য আনুসঙ্গিক বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ড রয়েছে।

একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভারত-পাকিস্তান টি-টুয়েন্টি ম্যাচে মাত্র ১০ সেকেন্ডের একটি বিজ্ঞাপনের স্লটের দাম ২৫-৪০ লাখ ভারতীয় রুপি পর্যন্ত হতে পারে। এই মূল্য ভারতের অন্য বড় কোনো দলের বিপক্ষে নক-আউট ম্যাচের বিজ্ঞাপন মূল্যের চেয়েও অনেক বেশি।

শিল্প খাতের প্রাক্কলন অনুযায়ী, শুধু এই একটি ম্যাচ থেকে বিজ্ঞাপন বাবদ আয় প্রায় ৩০০ কোটি ভারতীয় রুপি হতে পারে। ফলে ম্যাচটি না হলে সবচেয়ে বেশি আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়বে অফিশিয়াল সম্প্রচারকারী সংস্থা।