উল্টো

কিছুদিন ধরে সব উল্টো হয়ে ঘুরপাক খাচ্ছে জীবনে। ভালো করতে চাচ্ছি, খারাপ হয়ে যাচ্ছে। পরীক্ষাটা কাপিয়ে ফেলতে চাচ্ছি, পরীক্ষা আমায় কাপাচ্ছে। উত্তর যেতে চাচ্ছি, দক্ষিন চলে যাচ্ছি। 

Ulto
Illustration: TBS Graduates

এতকিছুর মাঝে, খারাপ করতে চাইলে যদি তা ভালো হয়ে যায়! সেই ভাবনাও ঘুরপাক খাচ্ছে মাথায়। তবু ইচ্ছে করে খারাপ করতে কেই বা চায়! কেই বা করে!

কিছুদিন ধরে আবার এক মেয়েকে নিয়েও বেশ ভাবছি। যেহেতু জীবনের গতি উল্টো দিকেই চলছে- ভাবছি ওঁকে যেয়ে দুটো গালি দেই! কি জানি! যদি ভালোবাসার সূচনা সেদিকেই হয়ে যায়।

এই উল্টো হয়ে যাওয়া জীবনে যদ্দুর সম্ভব সোজা হয়ে থাকার চেষ্টা করছি। চেষ্টা করছি সব ঠিক করে দেওয়ার। নিজেকে নিয়ে আত্ম-অহংকারে মেতে থাকা আমিও বিষয়টায় তেমন সাহস পাচ্ছি না।

এতকিছু ভাবতে ভাবতে বের হয়ে হাটা ধরলাম কোন এক রাস্তার প্রান্ত ধরে। মন করছে খুব দূরে কোথাও চলে যাওয়ার। হয়তো যেতে পারবো না। তবু যত পথ পেরুচ্ছি, মনে হচ্ছে ফেলে আসা রাস্তার মাঝে আরো অনেক কিছু যেন ফেলে আসছি। হয়তো কিছু সম্পর্ক, হয়তো কিছু গল্প।

মাঝরাস্তায় এক বড় গর্ত দেখতে পাচ্ছি। মন চাচ্ছে তাতে এক লাফ দেই। পাশ কেটে চলে আসলাম। পা-য়ে থাকা জুতোটা দামী।

কি করবো ভেবে না পেয়ে বাড়ির দিকে রউনা দিলাম। হাটছি হাটছি এমন সময় খেয়াল করলাম কোন এক প্রেমিক তার প্রেমিকাকে হাতে ধরে কোথায় যেন নিয়ে যাচ্ছে।

মনে জিদ হলো। নাহ! এভাবে আর বসে থাকা যায় না। এতদিন ধরে যাকে নিয়ে কল্পনায় প্রহর গুনছি, আজ হতে সেই প্রহর একসাথে গুনবো! আবার পথ ঘুরিয়ে ওর বাসার উদ্দেশ্যে রউনা দিলাম। ওর বাসা আমার বাসা হতে বেশ দূরে। হেটে যাওয়ার পথ তা নয়। তবু আমি হাটলাম। নিজেকে সময় দিতে হবে। হঠাৎ যদি মনে হয়ে উঠে আমি ভুল করছি!

কতক্ষন ধরে হাটছি ঠিক নেই। তবু ঠিক ওর বাসার সামনে এসে ওকে কল দিলাম। জিজ্ঞেস করলাম কোথায় তুমি? ও নিচে এলো। গালি দেওয়ার ভাবনাটা মাথায় এলেও তখন আর দিলাম না। শুদ্ধ, প্রকৃত এবং অসংকোচ অর্থেই মনের কথাগুলো ওকে জানালাম। ও বেশ সহজেই না করে দিলো! ওর মনে কে আছে জানি না, তবে আমি নেই। এদ্দুর বুঝলাম।

বুকে একরাশ কষ্ট নিয়ে বাসার দিকে ফিরছি। হেটেই ফিরছি। পকেটে কোন বাহনের ঘাড় করে যাওয়ার পয়সা-কড়ি থাকলেও নিজের শাস্তির অংশ হিসেবে হাটাকে নিয়েছি আজ। আজ অনেক কিছু করেছি। তার অনেকটাই করা ঠিক হয়নি।

তবু মনের মধ্যে তাকে গালি দিয়ে আপন করে নেওয়ার ধৃতিটা মাথা থেকেই সরছে না। একটা গালি নাহয় দিয়েই দেখা যেতো! কিই বা হতো! হয়তো না- এর বদলে একজোড়া চড় কপালে জুটতো। তার সেই ‘না’ ও বা মনে একরাশ চড় হতে কম লাগলো কি? আবার হয়তো আজও উল্টোটাই হতো! সে হয়তো গালি খেয়ে আমায় কাছে টেনে নিতো। হতেই পারতো।

নিজের বাড়ির নিচে এসে পৌছালাম। ঘরে ঢুকলাম না। ছাদে গিয়ে বসলাম। রেলিংবিহীন এ ছাদ থেকে নিচে তাকাচ্ছি। লাফ দিতে মন চাচ্ছে। তবু দিলাম না। পাশ কেটে নিচে নেমে এলাম। বুকে থাকা প্রাণটাও যে বেশ দামী।

সিড়ি বেয়ে নিচে নামছি। ঘরে যাচ্ছি। একটু আগেই চোখের কোণে মৃত্যু-চিন্তা টলমল করছিলো। এখন সব স্বাভাবিক। নামতে নামতে মনে হলো ছাদ থেকে এই নেমে আসাটাও কিন্তু উল্টো হচ্ছে। নিচের দিকে যে নামছি! তবু আমি মৃত্যু থেকে ছুটে যাচ্ছি জীবনের দিকে। মনে হলো সব উল্টো উটকো ঘটনাও খারাপ না। কিছু উল্টো ঘটে যাওয়া গল্পে হয়তো জীবনও খুজে পাওয়া যায়।