মহাকাশ
মহাকাশ
আমি দীপা। আমার বাবা সবসময় বলতেন, আমি নাকি তার লাইটহাউস, তাই আমার নাম রেখেছিলেন দীপা।
থেকে থেকে এখন হঠাৎ করে সব কথা মনে পড়ছে। হয়তো মহাকাশে অনেককাল ভেসে থাকার ফল এটা। কতদিন? কয়েকশ বছর হয়তো। কিছুক্ষণের মধ্যে এই যাত্রা শেষ হবে বলে মনে হচ্ছে।
আমার বয়স যখন কুড়ির কোঠায়, তখন একটা গোপন মহাকাশ সংস্থার সাথে কাজ করা শুরু করি। ফান্ডের কখনোই অভাব হত না সেই সংস্থায়। ঘটনাক্রমে আমাকে পৃথিবীর কক্ষপথে থাকা টেলিস্কোপগুলোর একটি সিস্টেমে দায়িত্ব দেয়া হল, প্রজেক্টটির নাম ছিল Project Cielo। কিন্তু এই প্রজেক্টের রেজাল্ট কখনোই আমাদের জানানো হত না, এমনকি আমরা এটাও জানতাম না এই প্রজেক্ট কেন পরিচালনা করা হচ্ছে।
যাই হোক, কিছু payload specialist-কে সে বার জরুরি ভিত্তিতে মিশনে যাবার জন্য ডাকা হল। আমাকে মহাকাশচারী ফেলিক্সের সাথে কাজ করতে দেয়া হয়েছিল। মিশন তেমন কিছুই না, ultraviolet telescope-গুলোর কিছু ছোটখাটো আপগ্রেড করার কাজ, যা ১২০০ থেকে ৩১০০ অ্যাংস্ট্রম স্পেকট্রাল রেঞ্জে ছবি তুলতে সক্ষম। মহাকাশে এটা আমার দ্বিতীয় মিশন, তাই এভাবে জরুরিভাবে ডাকা কেমন যেন অদ্ভুত ঠেকছিল।
১০ই মার্চ, ২১৪২ সালে, আমি আমার পরিবারের কাছ থেকে বিদায় নিলাম, আমার পোষা বিড়ালটাকে অনেক করে আদর করে দিলাম। বাবা আমাকে বললেন, “দীপা, বলে যাও যেদিন আসবে সেদিন আব্বু তোমার জন্য কোন কেক বানাবে।” দেখা সাক্ষাৎ শেষে ফেলিক্স, আমি এবং আরও ৩ জনের দল নিয়ে আমাদের যাত্রা শুরু করলাম।
মহাকাশ অনেক সুন্দর, অনেক বড়। কিন্তু আমাদের কাজের চাপ মারাত্মক বেশি ছিল। দিনের পর দিন স্লিপ ক্যাপস্যুল আর ট্যাবলেট এর অভ্যাস থাকলেও শরীর যেন ভার ছেড়ে দিয়েছিল। খালি প্রার্থনা করতাম, যাতে মিশনটা দ্রুত শেষ হয়।
অবশেষে আমরা আমাদের ওয়ার্ক স্টেশনে পৌঁছালাম। আমি আর ফেলিক্স একটা স্পেসল্যাব প্যালেটে গিয়ে কাজ শুরু করলাম, যেটা পেলোড বে এর উপর বসানো ছিল।
প্যালেটে কাজ করার সময় আড়চোখে দেখলাম মহাকাশের বিস্তৃতি। সেটা কীভাবে যে ব্যাখা করব, জানিনা।
সেসময় ফেলিক্স আমাকে ডাক দিল কিছু একটা বলতে, আর সে সময়ই আমরা দেখলাম উল্টো দিক থেকে কিছু একটা ছুটে আসছে! ফেলিক্স খুব দ্রুতই আমাকে বলল শাটলের সাথে নিজেকে বেঁধে নিতে। আমরা দুইজনই আমাদের সিটের সাথে নিজেদের সিকিউর করে ফেললাম।
মুহূর্তেই ঐ বিশাল জিনিসটা আমাদের শাটলটাকে আঘাত করল। শাটলটার একদিকে যে ক্ষতি হয়েছে সেটা স্ক্রিনে আসার আগেই আমরা বুঝে গিয়েছিলাম। আমরা দ্রুতই আমাদের মূল স্টেশনের সাথে কমিউনিকেটর-এ কথা বলার চেষ্টা করা শুরু করলাম, কিন্তু শাটলের যে দিকে ঐ বস্তুটা আঘাত করেছিল, সেটা খুব সম্ভবত আমাদের স্যাটেলাইট-টাকে বেশ ভালোভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত করেছিল।
ঠিকমতো ধাতস্থ হয়ে উঠতে না উঠতেই আমাদের শাটলের আরেকদিকের হ্যান্ডলেও কিছু একটা আঘাত করল। চোখের সামনেই দেখলাম, আমাদের শাটলটা আলাদা হয়ে ছিটকে গেল। আমাদের সাথে মূল স্টেশনের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল চোখের পলকেই!
কতক্ষণ কিছু না করে বসে ছিলাম, জানা নেই। মনে হচ্ছিল সারা দেহে এক অবসন্ন ভাব। নিজের দেহের ভার নিজের কাছেই অসহ্য লাগছিল। এতদিনের এত ট্রেইনিং, এত পরীক্ষা, এত পড়াশোনা- সব বৃথা মনে হওয়া শুরু করল। হয়তো কয়েক সেকেন্ডের জন্যই… কিন্তু আমি ঐ কয়েক মুহূর্তের জন্য মহাকাশের এই বিশালতাকে ঘৃণা করা শুরু করেছিলাম।
এমন সময় ফেলিক্স আর আমি আবিষ্কার করলাম, আমাদের পার্সোনাল কমিউনিকেটরও কাজ করছে না। অর্থাৎ আমাদের নিজেদের মধ্যে কথা বলার কোন উপায় নেই। আমরা দুইজনই নিজেদের মধ্যে চোখাচোখির মাধ্যমে বুঝে নিলাম, আমাদের অন্য কোন যোগাযোগ ব্যবস্থা করে নিতে হবে।
দিন গেল, সপ্তাহ গেল। আমরা আশা নিয়ে বসেই থাকলাম সেই ছোট শাটলের ভিতর। হাত-পা কেমন অবশ হয়ে আসছিল, তাও আমরা এ কয়দিনে নিজেদের মধ্যে কথা বলার উপায় খুঁজে বের করলাম।
কত কথাই না বললাম এ সময়ে। আমার বিড়ালটার কথা আমি ফেলিক্সকে বললাম, ফেলিক্স আমাকে বলল তার বাগানের কথা। ছোটকালের স্কুলের কথাও আমরা যেমন বলতাম, তেমনই চিন্তা করতাম আমরা এবার পৃথিবীতে যখন ফিরে যাব, তখন এখনকার স্কুলের কারিকুলামের কী কী পরিবর্তন প্রস্তাব করা যায়, তা নিয়ে। আমাদের মধ্যে মনের অজান্তেই অনেক ভালো তাল মিল হয়ে গেল।
পুরোটা মহাকাশে দুইটা মানুষ তাদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে তাদের জীবনের সবচেয়ে মুল্যবান মুহূর্তগুলো একে অপরের সাথে বিনিময় করছে। কেন জানি, এটাই বেঁচে থাকার কারণ হয়ে দাঁড়ালো আমাদের জন্য।
দিনের হিসাব দেখতে দেখতে খানিকটা হতাশ হয়ে পড়েছিলাম। তাই আমাদের ক্লকটা আমরা বন্ধ করে দিলাম, মন আবার একটু শক্ত হল। তখনও আমরা ভাবছিলাম, নিশ্চয় আমাদেরকে খোঁজার জন্য কোন না কোন দল কাজ করছে। এভাবে নিশ্চয় আমাদের মহাকাশের গর্ভে হারিয়ে যেতে দেয়া হবে না।
আস্তে আস্তে খাবার শেষ হয়ে আসলো। আমরা আমাদের রিসার্ভের অক্সিজেন নিয়ে বের হয়ে আসতে বাধ্য হলাম।
আমাদের স্পেশাল স্যুট পরে আমরা শাটল থেকে বের হয়ে আসলাম। বাঁচার আশা তখনও আমাদের মনে আছে, যা রীতিমত অসম্ভব হয়ে পড়েছিল তখন। একটা safety tether ব্যবহার করে আমরা নিজেদেরকে পরস্পরের স্যুটের সাথে আটকে রাখলাম, যাতে বিচ্ছিন্ন না হয়ে যাই।
কত সময় অতিবাহিত হয়েছে তার হিসাব আমরা আর রাখতে পারলাম না। রাখার চেষ্টা করাও ছেড়ে দিয়েছিলাম। মনে হল যেন মহাকাশ আমাদের ধ্যানস্থল। দুইজন বিজ্ঞানীর পক্ষে এমন ভাবাটা অস্বাভাবিক শোনালেও যেন তাই হল।
এমনই একসময় একটা তীক্ষ্ণ শব্দে আমাদের শাটলটা বিস্ফোরিত হল। শাটলের বিভিন্ন পার্টস এদিক সেদিক ছড়িয়ে পড়লো।
আমরা কিছু বুঝে উঠতে পারার আগেই একটা ধারালো অংশবিশেষ আমাদের tether-টায় আঘাত করল। আমরা দুইজন বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলাম। প্রথমবারের মতো, আমি আমার শরীরে একটা শক্তি অনুভব করলাম। আমি সর্বশক্তি দিয়ে চিৎকার করে ফেলিক্সকে ডাকার চেষ্টা করলাম। কিন্তু পারলাম না।
সে দূরে চলে গেল ধীরে ধীরে, যতক্ষণ না তার মুখের বিবরণ আমার দৃষ্টির বাইরে চলে গেল। তার চোখের তারকারা যেন স্তব্ধ হয়ে গেল। আর আমি পরে রইলাম আমার একার শুন্যতা ধরে।
একটা সময়, বহুদিন আগে, আমি তার সাথে আমার বাবার কেক বানানোর গল্প করেছিলাম। সে বলেছিল আমার ছোটবেলার স্কুল দেখতে যাবে আমার সাথে।
আমি আজও মহাকাশে ভেসে আছি।