ছফার পোস্ট-মর্টেম: বাঙালি মুসলমানের 'হীনম্মন্যতা'র বীরত্ব

আহমদ ছফার পরিচয় মূলত ঔপন্যাসিক হিসেবে হলেও তাঁর দর্শন চিন্তা যে কতটা সুগভীর ছিলো, তার বীজ পাওয়া যায় “বাঙালি মুসলমানের মন” প্রবন্ধে। লেখাটি যেমন আহমদ ছফার চিন্তাশীলতার চরম একটি নিদর্শন, সেই সাথে সবচেয়ে বিতর্কিত লেখাও বটে! 

Bengali Musolman.jpg

প্রবন্ধে ছফা মূলত চিরাচরিত বাঙালি মুসলমানের মানসিকতার পোস্ট মর্টেম করার চেষ্টা করেছেন, সে লক্ষ্যেই আশ্রয় নিয়েছেন মধ্যযুগের পুঁথি সাহিত্যের। তদনীন্তন মুসলিম পুঁথি লেখক ও পাঠকদের মানসিকতা, চাহিদা এবং সাহিত্য ভাবনার মধ্য দিয়েই তৎকালীন মুসলিম সমাজকে চিত্রায়নের চেষ্টা করা হয়েছে।

যেমন তৎকালীন মুসলিম মানসকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করত হিন্দুবিদ্বেষ, যার কারণ যতটা ধর্মীয় তার থেকে অনেক বেশি ছিল সামাজিক এবং অর্থনৈতিক। অধিকাংশ মুসলিম যারা পূর্বে নিম্নবর্ণের হিন্দু ছিল, তারা ছিল মূলত ব্রাহ্মণদের সামাজিক এবং অর্থনৈতিক শোষণের শিকার।

পুঁথি সাহিত্যগুলোয় এই ক্রোধের বহিঃপ্রকাশ লক্ষণীয়। যেমন কারবালা কাহিনীতে সিরিয়ার মরুভূমির মধ্যে হযরত হোসেনের কাটা মস্তক দিয়ে  এক ব্রাহ্মণ পরিবারকে সপরিবারে মুসলমান করানোর কাহিনী বর্ণিত হয়েছে।

কিন্তু এই পুঁথি লেখক সিরিয়ার মরুভূমিতে বাঙালি ব্রাহ্মণ পেলেনইবা কিভাবে, কাটা মাথাই বা কালেমা পড়ালো কিভাবে, কতশত বিচারের সময়ও পাননি, তার সেই তাগিদও ছিল না। কারণ পাঠকরাও এত বিচার করে পুঁথি পড়বেনা,  বরং ওই ব্রাহ্মণ বিদ্বেষ, যা হয়তো তাদের জন্য খানিকটা যৌক্তিকও বটে, পুঁথির বিক্রি বাড়াবে।

একইভাবে ছফা দেখিয়েছেন বাঙালি মুসলমানের পাল্লায় পড়ে ইসলামের ইতিহাস কতভাবে বিকৃত হয়েছে। হামজা (রা) থেকে হযরত আলী (রা) অথবা তাঁর কল্পিত পুত্র মুহাম্মদ হানিফা, প্রত্যেককেই দেখানো হয়েছে এমন বীররুপে যারা একের পর এক রাজ্য জয় করে সেখানকার নারীদের পাণিগ্রহণ করেন।

আবার অনেক রাজ্যের অধিপতি সুন্দরী ব্রাহ্মণ কন্যা। বলাই বাহুল্য যে এসবের সঙ্গে সত্যিকারের ইতিহাসের বিন্দুমাত্র মিল নেই। কিন্তু আগ্রহের বিষয়টা এই জায়গায় তাহলে এই ইতিহাস লেখার পেছনে কাজ করেছে কেমন চিন্তাধারা? 

বাঙালি মুসলমানের পৌরুষ এবং শৌর্যের যে ধারণা তা ব্যাপকভাবে প্রভাবিত হয়েছে প্রতিবেশী হিন্দুদের দ্বারা এবং তাদের ইতিহাসকে টপকে যাবার বাসনা থেকে। যেহেতু শ্রীকৃষ্ণ শত গোপি নিয়ে বৃন্দাবনে মত্ত থেকেছেন, তাহলে মুহাম্মদ হানিফাকেও তার থেকে বেশি নারী পরিবেষ্টিত না করলে বীরত্ব আর থাকল কই?

সুতরাং মোটাদাগে পুঁথির বিষয়বস্তুগুলো শিক্ষায় পিছিয়ে থাকা এবং পূর্বতন অপমানের প্রতিশোধ গ্রহণে উন্মুখ প্রতিক্রিয়াশীলতারই ফসল মাত্র।

এরপর এই প্রবন্ধে সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো আহমদ ছফা এখানে বাঙালি মুসলমানের রূপান্তর এবং ক্রমবিকাশ পর্যালোচনা করেছেন। সেখানে তিনি দেখিয়েছেন এই অঞ্চলে ইসলাম বিস্তারের কারণ। তবে এই প্রবন্ধ পাঠে প্রথমেই প্রশ্ন ওঠে, ছফা যাদের বাঙালি মুসলমান বলে চিহ্নিত করেছেন তারা আসলে কারা?

এই প্রবন্ধে মূলত ছফা বাঙালি মুসলমান বলতে যাদেরকে চিত্রিত করেছে তাদের ধারণার সঙ্গে বর্তমান সমাজব্যবস্থার বাঙালি মুসলমানের ধারণা কখনো মিলবে না। মুসলমান বলতে এই প্রবন্ধ মূলত ধর্মান্তরিত নিম্ন বর্ণের হিন্দুদের কথায় বারবার উল্লেখ করা হয়েছে, কিন্তু তা ব্যতীত সমাজের যে বড় অংশের মুসলমান ছিল তাদের কথা ছফা সেভাবে তুলে আনেননি।

মুসলমানিকরণের ব্যাখ্যায় ছফা আশ্রয় নিয়েছেন দিনেশচন্দ্র সেনের ; রিচার্ড ইটন কিংবা ড. এনামুল হকদের তিনি সযত্নে এড়িয়ে গেছেন। 

ছফা দেখিয়েছেন মুসলিম রাজশক্তি এই অঞ্চল শাসন করলেও সমাজব্যবস্থায় কোন ব্যাপক পরিবর্তনই আনেনি। ইতিহাস পর্যালোচনা করলেও আমরা এই অভিযোগের সত্যতা দেখতে পাই।  ফার্সি ভাষায় দীক্ষিত শাসক গোষ্ঠী শাসন চালাতে গিয়ে বরাবরই এই অঞ্চলের অভিজাতদের উপরই নির্ভর করেছে, যারা মোটাদাগে হিন্দু ছিল। এর প্রমাণ পাওয়া যায় ফারসি ভাষা শিখতে প্রথম অগ্রগণ্য হয়েছিল হিন্দু উচ্চ বংশীয়রাই।

সুতরাং ধর্মান্তকরণের ফসল হিসেবে কেউ কেউ রাজনুকূল্য পেলেও গোটা মুসলিম সমাজের ভাগ্য কখনোই পরিবর্তিত হয়নি। 

ভাষার প্রশ্নেও আরবি, ফারসি, উর্দুর প্রতি বাঙালি মুসলমানের মজ্জাগত অনুরাগের শেকড় প্রোথিত ছিল অনেক গভীরে। কিন্তু ভাষা শিক্ষার সুযোগের অভাবের দরুনই হোক, কিংবা অক্ষমতার জন্যই হোক মাতৃভাষাতেই লিখতে তারা বাধ্য হয়েছিলেন।অর্থাৎ এই মাতৃভাষা প্রেম যতটা না অন্তর থেকে উঠে আসা, তার থেকে অনেক বেশি বাধ্য হয়ে চর্চা করা।

তাই আবদুল হাকিম এর মত কবি যার হাত দিয়ে “যেসব বঙ্গেতে জন্মি হিংসে বঙ্গবাণী / সেসব কাহার জন্ম নির্ণয় ন জানি” – এর মত পঙক্তি রচিত হতে পারে, আবার সেই তিনি অন্য কবিতায় বাংলার উপরে আরবি ফার্সির জয় গান গেয়েছেন।

যেকোনো উপনিবেশিক শাসনামলে বিদেশী শাসকরাজ এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে সেতুর মতো কাজ করে স্থানীয় অভিজাতশ্রেণী।

ভারতীয় মুসলিমদের ক্ষেত্রে উত্তর ভারতের মুসলিম অভিজাতশ্রেণী স্যার সৈয়দ আহমেদের নেতৃত্বে সফল হলেও বাঙালি মুসলিম অভিজাত শ্রেণিটি চরমভাবে ব্যর্থ হয়। তারা না পেরেছিল বৃটিশদের থেকে আনুকূল্য অর্জন করতে, আবার না পেরেছিল কালচার ব্যবধান ডিঙিয়ে স্থানীয় জনগের নেতৃত্ব গ্রহণ করতে। তবে এতে “বৃটিশ আমলে বাঙালি মুসলমানের অধঃপতন শুরু হয়” এই চিন্তা প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করলে সেটাও অসত্য হবে।

কারণ মোগল বা নবাবী আমলেও বাঙালি মুসলমানের স্থানীয় গোষ্ঠীটি বরাবরই বঞ্চিতই ছিলো, তার ভাগ্যের পরিবর্তন কখনোই ঘটেনি।

পুরো প্রবন্ধে আহমদ ছফার অন্তর্দৃষ্টি যেমন মুগ্ধ করে, তেমনি তার একপেশে বিচারধারা শংকিত করার মতও বটে। বাঙালি মুসলমানের আচরণের প্রভাবক হিসেবে তিনি ধর্মীয় অনুশাসন কিংবা রাজনৈতিক বাস্তবতাকে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন। মাত্র পঁচিশ বছরের ব্যবধানে দুটি রাষ্ট্রের সৃষ্টির কৃতিত্বও যথাযথভাবে দেওয়া হয়নি।

তবে বাঙালি মুসলমান, যারা এথনিসিটির বিচারে আরব মুসলিমদের পরেই সংখ্যায় সবচেয়ে বেশি, ঐতিহাসিকভাবেই নির্যাতিত এবং নিপীড়িত, তা নিয়ে কোন সন্দেহ নেই।