দিবারাত্রির কাব্য: প্রেম ও অস্তিত্বের দ্বন্দ্ব
কিছু কিছু বই সময়ের পরিবর্তন কে হার মানায়। হয়ে ওঠে কালজয়ী। তখন মনে স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন জাগে, লেখকের ব্যক্তিগত সত্ত্বা কতটুকু বিকশিত হলে সমস্ত যুগের পাঠকের কাছে সমান গ্রহণযোগ্যতা পায়।
দিবারাত্রির কাব্য: প্রেম ও অস্তিত্বের দ্বন্দ্ব
কিছু কিছু বই সময়ের পরিবর্তন কে হার মানায়। হয়ে ওঠে কালজয়ী। তখন মনে স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন জাগে, লেখকের ব্যক্তিগত সত্ত্বা কতটুকু বিকশিত হলে সমস্ত যুগের পাঠকের কাছে সমান গ্রহণযোগ্যতা পায়।
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের দিবারাত্রির কাব্য পড়তে বসেছিলান প্রেমের উপন্যাস ভেবেই। কিন্তু যখন গল্প এগুতে লাগল সাথে সাথে একটা ভিন্ন অনুভূতি এসে ধাক্কা দিল যে এটি কেবল একটি প্রেমের গল্প নয় বরং প্রেমের সাথে মিশে থাকা যন্ত্রণা, শূন্যতা ও মানসিক দ্বন্দ্বের যে গোলকধাঁধা তৈরী হয় তার নিখুঁত অনুসন্ধান। বাংলা সাহিত্যে প্রেমকে আমরা প্রায়শই রোমান্টিক বা পরিণত সুখের দিকে এগিয়ে যেতে দেখি।
কিন্তু এখানে প্রেম কে দেখানো হয়েছে এক অস্থির এবং প্রায় আত্মবিধ্বংসী অভিজ্ঞতা রূপে। উপন্যাসটি পড়তে পড়তে মনে হয়েছে, মানুষ আসলে মানুষকে ভালোবাসে না। ভালোবাসে নিজের ভিতরের এক অপূর্ণ আকাঙ্ক্ষাকে যার কোনো স্থায়ী পরিণতি নেই।
উপন্যাসের গঠনটা আমাকে বিশেষ ভাগে আকর্ষণ করেছে। তিন ভাগে বিভক্ত এই উপন্যাসের প্রতিটি অংশের শুরুতে কবিতা আছে। ফলে পুরো উপন্যাসটি যেন গদ্যের ভেতরে লুকানো এক দীর্ঘ কাব্য হয়ে ওঠে। ‘দিনের কবিতা’, ‘রাতের কবিতা’ এবং ‘দিন ও রাতের কবিতা’, এই তিন স্তর আসলে মানুষের চেতনার তিনটি অবস্থাকে নির্দেশ করে। দিনের অংশে হেরম্ব ও সুপ্রিয়ার সম্পর্ক বাস্তবতার আলোয় দাঁড়িয়ে থাকে।
আর জমাট বাঁধতে থাকে অসম প্রেম, সামাজিক বাধ্যবাধকতা এবং অপূর্ণ আকাঙ্ক্ষা। সুপ্রিয়ার ভালোবাসা প্রবল যা প্রায় আত্মসমর্পণের পর্যায়ে পৌঁছানো। অথচ অন্যদিকে হেরম্বের অনুভূতি সংযত ও শীতল। এইখানেই সৃষ্টি হয় প্রেমের দুই মেরুর মুখোমুখি দ্বন্দ। এই দ্বন্দ্ব আমাকে কেন জানি বারবার অস্বস্তিতে ফেলেছে। কারণ এখানে প্রেম ভেতরে লুকিয়ে আছেন একপাক্ষিক আকুলতা।
‘রাতের কবিতা’ অংশে অনাথ, মালতী এবং আনন্দের জীবনে প্রবেশ করলে উপন্যাস আরও রহস্যময় ও মনস্তাত্ত্বিক হয়ে ওঠে। অনাথ ও মালতীর সম্পর্কের ভেতরে যে শূন্যতা তা আনন্দের চরিত্রে এসে এক অদ্ভুত বিষণ্ণে রূপ নেয়। আনন্দকে আমার কাছে মনে হয়েছে উপন্যাসের সবচেয়ে জীবন্ত অথচ সবচেয়ে করুণ চরিত্র। তার নাচ, তার উচ্ছ্বাস, তার প্রেম সবকিছুই যেন গভীর বিষাদের আবরণকে ঢাকার চেষ্টায় ব্যস্ত।
আনন্দ যখন প্রেমের উত্তেজনায় জীবনকে আঁকড়ে ধরতে চায়, তখনই বোঝা যায় সে আসলে নিঃসঙ্গতার বিরুদ্ধে লড়ছে। পাঠক হিসেবে এই অংশ পড়তে গিয়ে মনে হয়েছে, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় মানুষের মনের জটিলতা যেন ছুরি দিয়ে কেটে দেখছেন।
হেরম্ব চরিত্রটি বিশেষভাবে আমাকে ভাবিয়েছে। সে প্রেমকে ভয় পায়। কারণ তার কাছে প্রেম ক্ষণস্থায়ী এবং প্রাণঘাতী। তার বিখ্যাত ধারণা, প্রেম বেশিদিন বাঁচে না যা উপন্যাসের মূল দর্শনকে সামনে নিয়ে আসে। হেরম্ব যেন আত্মঅহম ও বুদ্ধিবৃত্তিক সংযমের প্রতীক। অন্যদিকে সুপ্রিয়া আনন্দ, আবেগ ও আকাঙ্ক্ষার প্রতিনিধিত্ব করে। এই জায়গায় মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখায় ফ্রয়েডীয় মনোসমীক্ষণের প্রভাব স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
চরিত্রগুলো যেন পূর্ণ মানুষ নয়, মানুষের মনের ভাঙা অংশ। ইদ, ইগো ও সুপার ইগোর সংঘর্ষে তৈরি মানসিক প্রতিচ্ছবি। পাঠক হিসেবে আমার মনে হয়েছে, লেখক ইচ্ছাকৃতভাবেই চরিত্রগুলোকে অসম্পূর্ণ রেখেছেন কারণ মানুষের মন নিজেই অসম্পূর্ণ।
তৃতীয় অংশে এসে উপন্যাসটি এক ধরনের ট্র্যাজিক পরিণতির দিকে এগিয়ে যায়। সুপ্রিয়ার ঈর্ষা, হেরম্বের দ্বিধা এবং আনন্দের আত্মবিসর্জন সব একসাথে গভীর অস্তিত্ব সংকট তৈরি করে। আনন্দের শেষ নৃত্যের দৃশ্যটি পড়ার সময় মনে হয়েছে, এটি কেবল একটি চরিত্রের মৃত্যু নয় বরং প্রেমের ব্যর্থতার এক প্রতীকী সমাপ্তি। সেই মুহূর্তে উপন্যাসটি আর ব্যক্তিগত সম্পর্কের গল্প থাকে না, হয়ে ওঠে মানুষের চিরন্তন একাকিত্বের কাব্য।
এই বইটি পড়তে গিয়ে সবচেয়ে বেশি যে বিষয়টি আমাকে স্পর্শ করেছে তা হলো এর বিষণ্ন সৌন্দর্য। এখানে কেউ সুখী নয়, কেউ পূর্ণতা পায় না। তবুও চরিত্রগুলোকে ভুলে থাকা যায় না। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় প্রেমকে সুখের প্রতিশ্রুতি হিসেবে দেখাননি বরং দেখিয়েছেন প্রেম কীভাবে মানুষের অস্তিত্বকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়। উপন্যাসের ভাষা কখনো দার্শনিক, কখনো স্বপ্নময়, আবার কখনো নির্মম বাস্তব। এই ভিন্নতাই বইটিকে আলাদা করে তোলে।
আমার মনে হয়েছে, দিবারাত্রির কাব্য এমন একটি উপন্যাস যা ধীরে ধীরে পড়তে হয়। অনুভব করে পড়তে হয়। যারা শুধুমাত্র ঘটনাপ্রধান গল্প খুঁজবেন, তাদের কাছে এটি সুখপাঠ্য নাও মনে হতে পারে। কিন্তু যারা মানুষের মন, প্রেমের প্রকৃতি এবং অস্তিত্বের গভীর প্রশ্ন নিয়ে ভাবতে ভালোবাসেন, তাদের জন্য এই বই নি:সন্দেহে অবশ্যপাঠ্য। বাংলা সাহিত্যে মনস্তাত্ত্বিক উপন্যাসের যে ধারা পরে শক্তিশালী হয়েছে, তার সূচনালগ্নের বিশাল বড় অবদান আছে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় এর দিবারাত্রির কাব্য।
পরিশেষে, বইটি আমাকে এই উপলব্ধি করিয়েছে যে দিন হোক বা রাত, মানুষ আসলে নিজের ভেতরের শূন্যতার সঙ্গেই বসবাস করে। প্রেম সেই শূন্যতাকে কখনো আলোকিত করে, আবার কখনো আরও গভীর অন্ধকারে ডুবিয়ে দেয়, ঠিক যেন দিন আর রাতের মত। আর এই দ্বৈততার মধ্যেই দিবারাত্রির কাব্য তার অনন্য সৌন্দর্য খুঁজে পায়।