উপাচার্য, গাভী ও সিস্টেম: গাভী বিত্তান্তের অন্তর্নিহিত বাস্তবতা
দেশভাগ পরবর্তী বাঙালি মুসলিম সাহিত্যিকদের মধ্যে একদম শীর্ষে যাদের নাম থাকবে, আহমদ ছফা তাঁদেরই একজন।
উপাচার্য, গাভী ও সিস্টেম: গাভী বিত্তান্তের অন্তর্নিহিত বাস্তবতা
দেশভাগ পরবর্তী বাঙালি মুসলিম সাহিত্যিকদের মধ্যে একদম শীর্ষে যাদের নাম থাকবে, আহমদ ছফা তাঁদেরই একজন।
ক্ষণজন্মা এই লেখক তাঁর ক্ষুরধার লেখনীর মাধ্যমে সমাজ ও রাষ্ট্রকর্তৃত্বের দিকে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়েছেন বারবার। কখনো আপস করেননি অন্যায়ের সাথে। তাঁর শ্রেষ্ঠ তিন রচনার প্রথম দুটি যদি হয় “যদ্যপি আমার গুরু” এবং “বাঙালি মুসলমানের মন” – উপন্যাস হিসেবে শেষটি হবে “গাভী বিত্তান্ত”।
“গাভী বিত্তান্ত” উপন্যাসের প্রধান চরিত্র মিয়া মুহাম্মদ আবু জুনায়েদ, যিনি অত্যন্ত গোবেচারা এবং নিরীহ গােছের একজন বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাপক। এগুলো গুণ হিসেবে যত ভালোই হোক না কেন, বিশ্ববিদ্যালয় উপাচার্য হওয়ার জন্য মোটেও মানানসই নয়।
খানিকটা ভাগ্যের জোরে, খানিকটা দিলরুবা খানম নামের এক সুন্দরী শিক্ষিকার সাহায্যে তিনি বিশ্ববিদ্যালয় উপাচার্যের সিংহাসন আরোহন করেন। এরপরে তার যাবতীয় কর্মকাণ্ডকে ঘিরেই এই উপন্যাস আবর্তিত হয়েছে।
উপন্যাসে কোথাও বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম না নিলেও আসলে যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কেই ইঙ্গিত করা হয়েছে তা স্পষ্ট। চরিত্রনির্ভর উপন্যাস হলেও ছফা মূলত প্রত্যেক চরিত্রের মাধ্যমে সমাজের প্রত্যেক অংশের মানুষকে তুলে নিয়েছেন এবং একটা বিশ্ববিদ্যালয় কিভাবে সমাজের মেরুদন্ড হওয়ার দায়িত্ব অবহেলা করে অধঃপতনে যায় তার একটি পরিষ্কার চিত্র তুলে ধরেছেন।
যেমন বেগম নুরুন্নাহার বানু, যিনি উপাচার্যের স্ত্রী, তার মাধ্যমে বাংলার মধ্যবিত্ত স্ত্রীর গড়পড়তা চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। যিনি স্বামীর গর্বে গর্বিত বটে, আবার সন্দেহবাতিকও এবং পান থেকে চুন খসলেই স্বামীর জীবন দুর্বিষহ করে তোলেন। তবারক আলী হলেন ব্যবসায়ী শ্রেণীর প্রতিনিধি, যারা টাকা দিয়ে সবাইকে পোষ মানাতে পারে। যার জন্য তার দেওয়া পার্টিতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী থেকে শুরু করে সমাজের তাবড় তাবর লোকজনকে দেখা যায়।
মানুষের ব্যক্তিগত দোষ ত্রুটি এবং গুণগুলোকেও সুচারুরূপে ফুটিয়ে তুলেছেন ছফা। নারী-পুরুষের মিথস্ক্রিয়া, ঈর্ষা, ক্ষমতার প্রতি লোভ, অর্থের প্রতি আকর্ষণ, স্বার্থপরতা, হীনম্মন্যতা, ষড়যন্ত্র সবকিছুকেই ঔপন্যাসিক চিত্রায়িত করেছেন এই উপন্যাসের চরিত্রদের মাধ্যমে।
কাহিনী প্রবাহে প্রবেশ ঘটে এক বিরল প্রজাতির গাভীর, যাকে ঘিরে কাটতে থাকে উপাচার্যের দিনরাত। পুরো বিশ্ববিদ্যালয়ের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হওয়া এই গাভী, নুরুন্নাহার বানুর ঈর্ষার শিকার হয়ে বিষপানে মারা যায়। এই পুরো ঘটনাটি আসলে একটি অনন্য স্যাটায়ার, যার মাধ্যমে লেখক পুরো বিশ্ববিদ্যালয় পদ্ধতি এবং পরিবেশকেই প্রচন্ডভাবে কটাক্ষ করেছেন। গাভীকে রূপকআশ্রয়ে ব্যবহার করে পুরো বিশ্ববিদ্যালয়কেই একটি গাভী পরিচর্যা কেন্দ্র হিসেবে দেখাতে চেয়েছেন, যা জ্ঞানের চর্চা ভূমির বদলে হয়ে উঠেছে ঘাসের স্তুপ।
তবে অবশ্যই এই উপন্যাসের উল্লেখযোগ্য অংশ গুলোর মধ্যে একটি হয়ে থাকবে বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র ও শিক্ষক রাজনীতির প্রতি লেখক এর তীব্র বিতৃষ্ণা। এই অপরাজনীতির কালো থাবা কিভাবে একটা সম্ভাবনামায় বিশ্ববিদ্যালয় কে তিলে তিলে অধঃপতনের দিকে নিয়ে যায়, এই উপন্যাসে তা পড়ে কষ্ট অনুভব না করা দুষ্কর।
পুরো উপন্যাসে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক স্থবিরতার প্রতি লেখকের বিদ্রুপ সহজেই অনুভব করা যায়। প্রচলিত সিস্টেমের কাছে সকলের অসহায়ত্ব এবং চাইলেও এর কোন প্রতিকার করতে না পারাই যে স্বাভাবিক এবং গড়পড়তা ব্যাপার, তাও উপন্যাসে স্পষ্ট।
আবু জুনায়েদ, যে নিজে এই সিস্টেমের বাইরে থেকে আকস্মিকভাবে উপাচার্য নিয়োগপ্রাপ্ত হয়েছিলেন, হাজারো সদিচ্ছা থাকা সত্ত্বেও তিনি কিভাবে পদে পদে ব্যর্থ হন এবং সবশেষে গোয়াল ঘরে নতুন দল তৈরি করে নিজেই সিস্টেমের একটি অংশ হয়ে ওঠেন, তা এই উপন্যাসের মূল উপজীব্য।