সুন্দরী এক পাখির গল্প

সেই সুন্দরী পাখিরা আকারে ছিল পোষা মুরগির সমান। উজ্জ্বল বেগুনি রঙের পালকে মোড়া ছিল তার শরীর, কপালজুড়ে টকটকে লাল বর্ম। ঠোঁটও তার টুকটুকে লাল। লম্বা আঙ্গুলওয়ালা লালচে পা দুটো দেখতে চমৎকার।

screenshot_2026-01-24_at_2.06.51_pm (1)
ছবি: লেখক

বাড়ির পাশেই চরসিন্দুর বাজার। সেখানে আজও কবুতর আর হাঁস মুরগির হাট বসে। একসময় এই হাটে নিয়মিত বেচাকেনা হতো নানা জাতের বন্য জন্তু আর পাখি। তখন বন্যপ্রাণী সম্পর্কিত আইনের তেমন কোনো প্রচলন কিংবা প্রয়োগ ছিল না। আর প্রকৃতিতে তখন বন্যপ্রাণীরাও বেশ ভালো অবস্থায় ছিল। বুনো খরগোশ, সরালি, ডাহুক, কোড়া, রঙ্গিলা, চ্যাগা আর বিভিন্ন জাতের বকসহ নানা ধরনের বন্যপ্রাণী উঠত হাটে। 

এদের প্রত্যেককেই ধরা হতো ফাঁদ পেতে। এক এক ধরনের প্রাণী ধরার জন্য এক এক রকমের ফাঁদ ব্যবহার করা হতো। শৈশব থেকেই সেই হাটে ছিল আমার নিয়মিত যাতায়াত। সেখানে আসা এক পাখি আমার নজর কেড়েছিল। দেখতে সে ছিল অনিন্দ্য সুন্দর। মাঝেমধ্যেই ফাঁদে আটকা পড়া এসব পাখি বাজারে নিয়ে আসা হতো। অনেকে এদের সুন্দরী পাখি নামে ডাকত। সেই সুন্দরী পাখিরা আকারে ছিল পোষা মুরগির সমান। উজ্জ্বল বেগুনি রঙের পালকে মোড়া ছিল তার শরীর, কপালজুড়ে টকটকে লাল বর্ম। ঠোঁটও তার টুকটুকে লাল। লম্বা আঙ্গুলওয়ালা লালচে পা দুটো দেখতে চমৎকার। মোটকথা এই পাখির দিকে কেউ একবার তাকালে মোহিত হয়ে যেত। আমিও তাই শৈশবে তার প্রেমে পড়ে গিয়েছিলাম।

এতক্ষণ যে সুন্দরী পাখির কথা বললাম, তার নাম হচ্ছে কালিম, কোথাও একে কায়েম নামেও ডাকা হয়। ইংরেজিতে এদেরকে বলা Purple Swamphen আর বৈজ্ঞানিক নাম Porphyrio Porphyrio. এরা হচ্ছে বাংলাদেশের খুবই পরিচিত এক জলজ পাখি। দেশের প্রায় প্রতিটি প্রাকৃতিক জলাশয়েই একসময় এদের দেখা যেত। আমাদের বাড়ির পাশের চরসিন্দুরের চরেও একসময় কালিম আসত। আমার শিকারি বাবা শরতের গভীর রাতে বন্দুক নিয়ে রওনা দিতেন চরের উদ্দেশ্যে। 

বর্ষার শেষে চরের বুক থেকে পানি কমে গেলে, কৃষকেরা কাদার উপর খেসারি আর মসুরের ডালের বীজ ছিটিয়ে দিত। বিস্তীর্ণ জায়গা জুড়ে ছড়িয়ে থাকা ডালের বীজ ছিল কালিমের খুবই প্রিয় খাদ্য। ক্ষেতের বুকে ঝাঁকে ঝাঁকে কালিম নেমে আসত শেষ রাতের দিকে। শুধু বাবার মতো বন্দুকধারী শিকারি নয়, খাঁচা বন্দি পোষা কালিম আর জালের ফাঁদ নিয়ে অন্যান্য শিকারাও কালিম শিকারের উদ্দেশ্যে এসে হাজির হতো চরের বুকে।

শিকারি জীবনে জানতে পারা কালিম সম্পর্কিত আরেকটি তথ্য এখানে উপস্থাপন করতে হয়। কালিম এবং কোড়া (Water Cock), দুটোই জলচর পাখি। এদের প্রজনন ঋতু হচ্ছে বর্ষাকাল। এই দুই ধরনের পাখিই বাসা বানাতে পছন্দ করত লক্ষ্মীদীঘা কিংবা আমন ধান খেতে। তবে কোড়া ঠিক যে জায়গা থেকে ধান গাছের পাতা সংগ্রহ করত, সেখানেই বাসা তৈরি করত। আর কালিম ধান গাছের পাতা কেটে মুখে নিয়ে খেত থেকে দূরে অন্য জায়গায় বাসা বানাত। 

তবে কালিম এবং কোড়া শুধু ধান খেত নয়, অন্য জায়গা, যেমন জলাভূমির পার্শ্ববর্তী ঝোপ-জঙ্গল অথবা কচুরিপানার দামের উপরও বাসা তৈরি করত। কালিমের ডিমের সংখ্যা ৫ থেকে ৭টি পর্যন্ত। ডিম থেকে বাচ্চা ফুটে বের হওয়ার সর্বোচ্চ সময় ২৭ দিন। গ্রামের বিলগুলোতে ছোট ছোট ছানাদের নিয়ে কালিম যখন জলাভূমির বুকে ঘুরে বেড়াতো তখন এক অভাবনীয় দৃশ্যের অবতারণা ঘটতো।

ধান, পোকামাকড়, শামুক, মাছ ইত্যাদি হচ্ছে কালিমের প্রধান খাদ্য। তবে কখনো কখনো এরা জলাভূমির আশপাশে জন্ম নেওয়া ঘাসও খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করে থাকে।

শিকারি জীবনের ইতি ঘটিয়ে আমি যখন ওয়াইল্ড লাইফ ফটোগ্রাফি শুরু করি তখন একবার কালিমের ছবি দরকার হয়। কিন্তু নানান জায়গায় ঘুরেও ভালো ছবি পাওয়া যাচ্ছিল না। এ সময় হঠাৎ একজন আমাকে একটা বিশেষ জায়গার সন্ধান দেয়। 

২০০১ সাল, আমি গিয়ে হাজির হই নরসিংদী জেলার মনোহরদী উপজেলার কাচিকাটা গ্রামে। খুবই আশ্চর্য হয়ে লক্ষ্য করলাম, প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই পোষা হাঁস মুরগির মতো ঘুরে বেড়াচ্ছে কালিম পাখি। জানা গেল, এটা এখানকার প্রাচীন ঐতিহ্য। যুগের পর যুগ ধরে লোকজন এখানে কালিম পুষে আসছে। এসব কালিম দিয়ে যেমন ওরা বন্য কালিম শিকার করে, তেমনি বিভিন্ন হাটবাজারে পোষা এবং ফাঁদ পেতে ধরা কালিম বিক্রি করে থাকে। 

দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে শিকারিরা এখানে আসে। কালিমের বাচ্চা সংগ্রহ করার জন্য। ঘুরতে গিয়ে মনে হলো এ যেন এক ‘কালিম গ্রাম’। বিভিন্ন স্থানে ঘুরে কালিমের ভালো কিছু ছবি তুলতে খুব একটা বেগ পেতে হলো না। এই লেখার সঙ্গে কালিমের যেসব ছবি সংযুক্ত করা হলো, সেগুলি ওই কাচিকাটা গ্রাম থেকেই তোলা।

অনিন্দ্য সুন্দর এই জলজ পাখিটিকে এক সময় বাংলাদেশের প্রায় সব প্রাকৃতিক জলাভূমিতে দেখতে পাওয়া যেত। কিন্তু বর্তমানে অন্যান্য পাখির মতো এদের জীবনও বিপন্ন হয়ে উঠেছে। কালিমের সংখ্যা কমে যাওয়ার প্রধানতম কারণ হচ্ছে, প্রাকৃতিক জলাশয় সমূহ মাছের খামারে রূপান্তরিত হওয়া। 

আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে এ বিষয়ে কিছু আলোকপাত করতে হয়। নরসিংদীর সুলতানপুর গ্রামে তিনটি প্রাকৃতিক জলাশয় বা বিল ছিল। তিনটি বিলেই ছিল দেশি মাছ এবং অন্যান্য জলজ প্রাণী; ছিল অসংখ্য জলজ উদ্ভিদ। মাছের খামার তৈরির উদ্দেশ্যে, বিষ প্রয়োগ করে মেরে ফেলা হয়েছে সমস্ত দেশি মাছ, ঘাস মারার ওষুধ দিয়ে পুড়িয়ে ফেলা হয়েছে সমস্ত জলজ উদ্ভিদ। আর তিনটি বিল এভাবেই রূপান্তরিত হয় মাছের খামারে। চারদিকে শুধু বিস্তীর্ণ জলরাশি, কোথাও নেই জল বন। কী করে বাঁচবে কালিম পাখি?

আসলে সারাদেশেই এ ধরনের অবস্থা বিরাজমান। প্রকৃতি ধ্বংসের এই ধাবমান কালো স্রোত রুখতে না পারলে, শুধু কালিম নয়, অন্যান্য পাখিরাও একসময় হারিয়ে যাবে। তাই বাংলাদেশের পাখিদের খাদ্য, বাসস্থান এবং জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দরকার একটি শক্তিশালী পরিবেশ আন্দোলন।