গ্যাসহীন শহরে মাটির চুলা: সংকটের ভেতরে জন্ম নেওয়া নতুন পেশা
ঢাকা শহরের নানা এলাকায় গ্যাস সংকট যখন নিম্নমধ্যবিত্ত ও নিম্ন আয়ের মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে কঠিন করে তুলেছে, তখন এই সুলভ চুলাগুলো অনেক পরিবারের শেষ ভরসা। আর সেই ভরসার পেছনে দাঁড়িয়ে আছেন কামরাঙ্গীচরের এই নারীরা। সংকটকে সুযোগে বদলে তারা গড়ে তুলেছেন নিজেদের ছোট্ট একটি পেশা।
গ্যাসহীন শহরে মাটির চুলা: সংকটের ভেতরে জন্ম নেওয়া নতুন পেশা
ঢাকা শহরের নানা এলাকায় গ্যাস সংকট যখন নিম্নমধ্যবিত্ত ও নিম্ন আয়ের মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে কঠিন করে তুলেছে, তখন এই সুলভ চুলাগুলো অনেক পরিবারের শেষ ভরসা। আর সেই ভরসার পেছনে দাঁড়িয়ে আছেন কামরাঙ্গীচরের এই নারীরা। সংকটকে সুযোগে বদলে তারা গড়ে তুলেছেন নিজেদের ছোট্ট একটি পেশা।
কামরাঙ্গীচর শেখ জামাল স্কুল সংলগ্ন বেড়িবাধের সামনে ভরদুপুরে বসে আছেন একদল নারী। দূর থেকে মনে হতে পারে এ হয়তো তাদের মধ্যাহ্নভোজন পরবর্তী গল্পের আসর। কিন্তু একটু কাছে এগিয়ে এলে দেখা যায় তারা নদীর ধারের কচুরিপনা পরিষ্কার করে মাটি তুলছেন একখানা গামলায়। মাটিগুলো জমতে জমতে একটা স্তুপে পরিণত হচ্ছে।
মাটি তোলা যখন শেষ পর্যায়ে কয়েকজন উবু হয়ে বসে শুরু করলেন মাটির উনুন (চুলা) বানানোর কাজ। দিন গড়িয়ে সন্ধ্যে নামে, তবু তারা কাদামাখা হাতে অতি মমতায় চলে চুলা বানানোর কাজখানা। কিন্তু সারি সারি এত চুলা কী কাজে লাগতে পারে তাদের?

দাম কম হলেও ব্যবহারিক দিক থেকে এসব চুলা অনেকের জন্য স্বস্তির।
বিষয়টি খোলাসা করা যাক তবে। ঢাকা শহরে লেগে থাকে নিত্যনতুন সমস্যা। এবারে নতুন সংযোজন গ্যাসের সংকট। শহরের অনেক এলাকাতেই সেটি প্রকট হয়ে উঠছে ইদানিং। কিছু কিছু এলাকায় বিষয়টি আরও তীব্রতর। হাজারীবাগ, লালবাগ, সিকশন, মিরপুর, কামরাঙ্গীরচর, কেরানীগঞ্জ এর কথা না বললেই নয়।
একদিকে লাইনের গ্যাসের সংকটের কারণে রাজধানীবাসীর ভোগান্তি চরমে। চুলায় চাল বসানো হয়েছে ঘন্টা দুই। তবু ভাত হচ্ছে না গ্যাসের গতি স্বল্পতার কারণে। একদিন, দুইদিন না। রোজই এক সমস্যা। আবার তার উপর সিলিন্ডার গ্যাসের দামও বেড়ে চলেছে। চড়া দাম দিয়ে সিলিন্ডার গ্যাস কিনে রান্না খাওয়ার মতন আর্থিক সামর্থ্য নেই নুন আনতে পান্তা ফুরোনো পরিবারগুলোর।
কিন্তু এ থেকে উত্তরণের পথ কী? সেই পথ বের করতে এগিয়ে এসেছে কামরাঙ্গীচরের অতি সাধারণ এই নারীরা।

এই কাজ করতে গিয়ে নারীদের দিন কাটে ব্যস্ততায়।
গ্যাস সমস্যায় যাদের প্রাণ ওষ্ঠাগত তাদের অধিকাংশ মানুষ এখন বেঁচে আছে মাটির চুলার উপর ভর করে। ঢাকা শহরে মাটিও অমূল্য। তাই চুলা বানানোর ইচ্ছা থাকলেও উপায় মেলে না। এছাড়া পাকা বাসাবাড়িতে মাটির চুলা তোলার অনুমতি মেলাও দায়। তবে অনেক নিম্নবিত্ত মানুষের নিরাপদ ভরসা হয়ে উঠেছে এই এলাকার নারীদের হাতে করে বানানো মাটির চুলা।
সকালের আলো ঠিকভাবে ছড়িয়ে পড়ার আগেই নূরজাহান বেগম ঘর ছেড়ে বেরিয়ে পড়েন। সাদা-কালো চুলের ষাটোর্ধ্ব এই বৃদ্ধার তাতে কোনো বিরক্তি নেই। বরং বেশ উৎসাহ নিয়েই কাজটি করেন। বেড়িবাঁধ এলাকার এই নারী প্রতিদিন নদীর ধারে যান। সেখানে নেমে নিজ হাতে তুলে নেন মাটি। সেই মাটিই তার সারাদিনের সঙ্গী, জীবিকার উৎস।
নদী থেকে মাটি এনে শুরু হয় চুলা বানানোর কাজ। মনোযোগের সাথে চলে ডিজাইন করার কাজও। এভাবে সকাল গড়িয়ে দুপুর, দুপুর পেরিয়ে সন্ধ্যা নামে। কাজ শেষে যত্নে গড়া মাটির চুলা সারিবদ্ধ করে রোদে শুকানোর জন্য রাখেন তিনি। তারপর আবার একই রুটিনে কাজ চলে তার। নানান স্থান থেকে ক্রেতারা আসেন, দেখে যান। কেউ কেউ যাচাই-বাছাই সেরে কিনে নেন পছন্দের চুলাটি।
নূরজাহানের এই কাজে আসা মাস চারেক আগে। সবে বরিশাল থেকে এসেছেন এই এলাকায়। অন্যদের দেখাদেখিতে শুরু করেছেন। তবে এই বেড়িবাঁধ এলাকায় মাটির চুলা তৈরির ইতিহাস আরও পুরোনো। প্রায় বছর দশেকের মতো সময় ধরে চলছে এই কাজখানা।

কাজ শেষে যত্নে গড়া মাটির চুলা সারিবদ্ধ করে রোদে শুকানো হয়।
সাধারণত শীতকালেই মাটির চুলা বানানোর মৌসুম। কারণ এই সময়েই গ্যাসের সংকট প্রকট হয়ে ওঠে। তবে এবার পরিস্থিতি একটু ভিন্ন। লাইনে গ্যাস একেবারেই না থাকা, সিলিন্ডারের দাম বেড়ে যাওয়া সব মিলিয়ে সংকট আরও তীব্র। ফলে শীত-গ্রীষ্মের হিসাব ভেঙে এখন প্রায় প্রতিদিনই চুলা বানাতে হচ্ছে তাদের। প্রতিদিনই কেউ না কেউ এসে কিনেও নিয়ে যাচ্ছেন।
পঁচিশ বছর বয়সী ঝুমুরের এই কাজে আসা বছরখানেক আগে। মূলত দর্জির কাজ করেন তিনি। তবে সে আয়ে সংসারের খরচ জোগানো কঠিন হয়ে পড়ে। তাই চুলা তৈরির কাজও করছেন। এরই মধ্যে নিজের তৈরি করা দশটি চুলা বিক্রি করেছেন।
ঝুমুর ভাষ্যে, কামরাঙ্গীচরের প্রায় ছয় থেকে সাতজন নারী নিয়মিত এই কাজ করছেন। এর মধ্যে তিনি নিজে বিক্রি করেছেন প্রায় দশটির মতো চুলা। বিক্রি ভালো হওয়ায় অন্য নারীরাও এই কাজ করার উৎসাহ পাচ্ছেন। ঝুমু নিজে এই কাজ করছেন প্রায় দুই বছর ধরে। সংসারের দায় দায়িত্ব, নিত্যদিনের খরচ-সব মিলিয়ে এই আয় তাদের জন্য বড় ভরসার জায়গা তৈরি করেছে।
শুধু কামরাঙ্গীচরের মানুষরা নয়, হাজারীবাগ, লালবাগ, সিকশন, কেরানীগঞ্জ, মিরপুর, গাবতলী-ঢাকার নানা প্রান্ত থেকে আসা মানুষ কিনে নিচ্ছেন এসব মাটির চুলা। চুলার দাম নির্ভর করে আকার ও নকশার ওপর। ছোট চুলা পাওয়া যায় ২০০ টাকায়। মাঝারি চুলার দাম ৩০০ টাকা। আর বড়, ভালো ডিজাইন করা, শক্ত মাটির চুলার দাম ৫০০ টাকা পর্যন্ত। কোথাও কোথাও ১০০ বা ৪০০ টাকাতেও চুলা বিক্রি হয়। দাম কম হলেও ব্যবহারিক দিক থেকে এসব চুলা অনেকের জন্য স্বস্তির।

নিম্নবিত্ত মানুষের নিরাপদ ভরসা হয়ে উঠেছে এই এলাকার নারীদের হাতে করে বানানো মাটির চুলা।
মানুষের কেনার কারণও স্পষ্ট। সেমিপাকা বাসা, অনিয়মিত গ্যাস সংযোগ কিংবা একেবারেই গ্যাস না থাকা পরিবারগুলো রান্নার জন্য বিকল্প খুঁজছেন। সিলিন্ডারের দাম বেড়ে যাওয়ায় অনেকের কাছেই তা এখন বিলাসী পণ্য। ফলে ভরসা বলতে লাকড়ির চুলা।
এই কাজ করতে গিয়ে নারীদের দিন কাটে ব্যস্ততায়। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত চুলা বানানো, শুকানো, সাজিয়ে রাখা। এর ফাঁকেই চলে রান্না, সংসারের অন্য কাজ। নূরজাহান বলেন, এই কাজে তিনি খুশি। নিজের হাতে কিছু টাকা আসে। মানুষের উপকার হয়। তাছাড়া অবসর সময়টাও কাজে লাগছে। শুরুতে মাত্র চারটি চুলা বানিয়েছিলেন। সেগুলো বিক্রি করে সেদিন আয় হয়েছিল দুই হাজার টাকা। সেই দিন থেকেই এই কাজের প্রতি তার আলাদা টান।
তবে এ কথা বলতে দ্বিধা নেই, ঢাকা শহরের নানা এলাকায় গ্যাস সংকট যখন নিম্নমধ্যবিত্ত ও নিম্ন আয়ের মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে কঠিন করে তুলেছে, তখন এই সুলভ চুলাগুলো অনেক পরিবারের শেষ ভরসা। আর সেই ভরসার পেছনে দাঁড়িয়ে আছেন কামরাঙ্গীচরের এই নারীরা। সংকটকে সুযোগে বদলে তারা গড়ে তুলেছেন নিজেদের ছোট্ট একটি পেশা।