রঙ বদলের গল্প: যান্ত্রিক জীবনের আড়ালে মানবিকতার দর্পণ
রঙ বদলের গল্প: যান্ত্রিক জীবনের আড়ালে মানবিকতার দর্পণ
লেখাটি যেমন চিন্তাশীলতার চরম একটি নিদর্শন, সেই সাথে প্রাত্যহিক জীবনের যত্নে লুকিয়ে রাখা দীর্ঘশ্বাসগুলোর এক জীবন্ত দলিলও বটে!
গ্রন্থে লিপু মূলত চিরাচরিত বাঙালি মধ্যবিত্ত, নিম্ন-মধ্যবিত্ত এবং খেটে খাওয়া মানুষের মানসিকতার পোস্ট-মর্টেম করার চেষ্টা করেছেন। সে লক্ষ্যেই আশ্রয় নিয়েছেন প্রাত্যহিক জীবনের ছোট ছোট ঘটনার।
একজন পেশাজীবীর কলমে যখন সাহিত্যের রূপায়ণ ঘটে, তখন তা কেবল পড়া যায় না, তীব্রভাবে অনুভব করা যায়। বইয়ের পাতা উল্টাতেই এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা গ্রাস করে, যা পাঠককে নিজের যান্ত্রিক জীবনের দিকেই নতুন করে তাকাতে বাধ্য করে।
সমসাময়ীক মানুষকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করে অর্থনৈতিক টানাপোড়েন ও টিকে থাকার লড়াই। ‘জিপারের ব্যবচ্ছেদ’ গল্পটি পড়ার সময় বুকের ভেতরটা আক্ষরিক অর্থেই কেঁপে ওঠে। যখন পড়ি যে, বায়ারের ইনস্পেকশনের ঠিক আগে ৩৪০ পিস পোশাক রিজেক্ট হয়ে গেছে, তখন ফ্লোরের সেই দমবন্ধ করা চাপ, কোয়ালিটি কন্ট্রোলের উৎকণ্ঠা আর শ্রমিকদের ঘাম মেশানো পরিশ্রমের কথা কেবল একটি কারখানার চিত্র থাকে না।
প্রোডাকশন ফ্লোরের সেই পরিচিত ব্যস্ততা, কাজের দক্ষতা বা অপারেটর পারফরম্যান্স বাড়ানোর নিরন্তর লড়াই যেন চোখের সামনে জীবন্ত হয়ে ওঠে। মনে হয়, এই তো আমাদেরই প্রতিদিনের লড়াই, যেখানে প্রতিটি সেলাই, প্রতিটি জিপার পরিবর্তনের মাঝে লুকিয়ে থাকে শত মানুষের না-বলা স্বপ্ন আর টিকে থাকার নিরন্তর জেদ।
একইভাবে ‘পদ্মরাজবংশীর এগিয়ে যাওয়ার গল্প’-এ তারাসিমা অ্যাপারেলস-এর একজন সাধারণ অপারেটরের বোন থেকে কোয়ালিটি ইন্সপেক্টর হয়ে ওঠা এবং বৃত্তির মাধ্যমে উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন ছোঁয়ার আখ্যান চরমভাবে আলোড়িত করে। অন্যদিকে ‘কোট কাহিনী’তে লাইন লিডার লিটন শিকদারের নিজের একটি উক্তি (কোট) অফিসের নোটিশ বোর্ডে দেখার যে আকাঙ্ক্ষা; তা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে, করপোরেট কাঠামোর ভেতরেও প্রতিটি মানুষের নিজস্ব আত্মপরিচয় ও স্বীকৃতির তৃষ্ণা কতটা প্রবল। এগুলো পড়ে নিজের অজান্তেই চোখ ভিজে আসে, কারণ এই চরিত্রগুলো আমাদের চারপাশেরই মানুষ, হয়তো আমরা নিজেরাই।
এই পেশাজীবী লেখক কারখানার ফ্লোরে বা রাস্তার ধুলোয় জীবনের এই সূক্ষ্ম রঙগুলো পেলেনই বা কীভাবে? এর উত্তর মেলে ‘রমা কাকা’ কিংবা ‘রেমিট্যান্স যোদ্ধা রহিমার গল্প’ পড়ার সময়। হাইওয়ের পাশে জুতো পালিশ করা এক বৃদ্ধের বংশপরম্পরায় পাওয়া দারিদ্র্য এবং নীরব সংগ্রাম যখন পড়ি, কিংবা প্রবাসে একাকী নারীর নিঃশব্দ হাহাকার যখন অনুভব করি, তখন বুকের ভেতরটা ভারী হয়ে আসে।
চারপাশের যে মানুষগুলোকে আমরা প্রতিদিন উপেক্ষা করে যাই, তাদের ভেতরেও কত বিশাল এক স্বপ্নের জগৎ লুকিয়ে আছে, তা ভেবে এক ধরনের অপরাধবোধ ও তীব্র শ্রদ্ধার মিশ্র অনুভূতি তৈরি হয়।
“মানুষ বেচাকেনা” গল্পে শ্রমিকের শ্রম বিক্রির যে রূঢ় বাস্তবতার চিত্র ফুটে উঠেছে, তা আধুনিক যুগের এক নীরব দাসপ্রথার প্রতিচ্ছবি বলে মনে হয়। বয়সের ভারে ন্যুব্জ মানুষগুলো যখন বাজারের পণ্যের মতো বিক্রি হওয়ার অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকে, তখন সমাজের প্রতি এক তীব্র বিতৃষ্ণা জন্ম নেয় পাঠকের মনে।
এই গল্পটি পড়ার পর নিজের চারপাশের সুবিধাভোগী জীবন নিয়ে একধরনের অপরাধবোধ কাজ করে। লেখক এখানে কেবল গল্প বলেননি, বরং সমাজের গভীরে লুকিয়ে থাকা পচনশীল ব্যবস্থাটিকে আমাদের সামনে নগ্ন করে দিয়েছেন।
‘চা বাগানের মালীর সেন্ড মানি’ গল্পটি পড়ার পর এক অন্যরকম মানবিক শূন্যতায় ভুগতে হয়। ভুল করে বিকাশে আসা দশ হাজার টাকা এবং সেই টাকা ফেরত পাওয়ার পর ওপার থেকে ভেসে আসা স্বস্তির নিশ্বাস যেন আমাদের সমাজের তলানিতে পড়ে থাকা সততার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
আধুনিকতার পাল্লায় পড়ে মানুষের আবেগ ও সম্পর্কগুলো কতভাবে পরিবর্তিত হয়েছে, তা দেখিয়েছেন লিপু। ‘অদম্য অনু’ বা ‘ডিজিটাল হালখাতা’র মতো গল্পে প্রযুক্তির সাথে মানবিকতার যে দ্বন্দ্ব, তা অত্যন্ত নিপুণভাবে তিনি তুলে এনেছেন। তাঁর গল্পে কোনো অতিমানবীয় বীরত্ব নেই, বরং দৈনন্দিন ঘাত-প্রতিঘাতের মাঝেই তিনি সাধারণের বীরত্ব খুঁজেছেন।
অফিসের ভারী পরিবেশ আর কাজের চাপের মাঝে ‘টি ব্রেক’ গল্পের তেঁতুল চা পানের দৃশ্যটি যেন করপোরেট জীবনের এক পরম স্বস্তির জায়গা তৈরি করে দেয়। এই অনুভূতিগুলো এতটাই প্রগাঢ় যে, বইটির প্রতিটি পর্ব তা সে ‘মেঘ ও মাটির গন্ধ’ হোক বা ‘জীবন যেখানে যেমন’ পাঠকের মনস্তত্ত্বে গভীর ছাপ ফেলে যায়।
এরপর এই গ্রন্থের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো লিপু এখানে গ্রামীণ মানুষ ও করপোরেট জীবনের রূপান্তর এবং ক্রমবিকাশ পর্যালোচনা করেছেন। সেখানে তিনি দেখিয়েছেন এই অঞ্চলে সাধারণ মানুষের টিকে থাকার পেছনের চালিকাশক্তি।
তবে এই গ্রন্থ পাঠে প্রথমেই প্রশ্ন ওঠে, লিপু যাদের জীবনের রঙ বদলের কথা বলেছেন তারা আসলে কারা? এই গ্রন্থে মূলত লিপু প্রান্তিক বা সাধারণ মানুষ বলতে যাদেরকে চিত্রিত করেছেন তাদের ধারণার সঙ্গে বর্তমান সমাজব্যবস্থার শহুরে সুবিধাভোগীদের ধারণা কখনো মিলবে না।
পুরো গ্রন্থে রাশেদুল ইসলাম লিপুর অন্তর্ভৃষ্টি যেমন মুগ্ধ করে, তেমনি তাঁর আখ্যানের কিছু সীমাবদ্ধতা বা একপেশে বিচারধারা আক্ষেপ জাগানোর মতও বটে। আবেগের এই তীব্র প্রবাহের মাঝেও একজন মুগ্ধ পাঠক হিসেবে একটি অতৃপ্তি মনের ভেতর রয়ে যায়। চরিত্রগুলোর মানসিক রূপান্তরের সাথে যখন সবেমাত্র এক গভীর আবেগের সম্পর্ক তৈরি হতে শুরু করে, ঠিক তখনই গল্প ফুরিয়ে যায়।
মনে হয়, চরিত্রগুলোর মনস্তাত্ত্বিক বিস্তৃতি নিয়ে যদি লেখক আরও কিছুটা সময় কাটাতেন, তবে এই অনুভূতিগুলো হয়তো আরও দীর্ঘস্থায়ী দাগ কাটতে পারত। মাত্র কয়েক পৃষ্ঠার ব্যবধানে একেকটি জীবনের গভীরতার স্বীকৃতিও যথাযথভাবে দেওয়া হয়নি।
তবে সাধারণ মানুষ, যারা শেকড় থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে শহরের বুকে বা গ্রামীণ প্রান্তরে প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করছে, ঐতিহাসিকভাবেই তারা যে জীবনের নানা রঙের পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যায় এবং সমাজ বাস্তবতায় নিষ্পেষিত হয়, তা নিয়ে কোন সন্দেহ নেই।
“রঙ বদলের গল্প” পড়া শেষে মনে হয় না যে অন্য কারও লেখা পড়লাম; বরং মনে হয়, প্রতিদিনের আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের ভেতরের বদলে যাওয়া রঙগুলোকেই নতুন করে আবিষ্কার করলাম। এই বই পাঠককে কাঁদায়, ভাবায় এবং পরিশেষে একটি গভীর প্রশান্তির শ্বাস ফেলতে সাহায্য করে।