পেপার স্টুডিও: এক সৃজনশীল যাত্রার গল্প

উচ্চমানের কর্পোরেট স্টেশনারি থেকে শুরু করে নান্দনিক বিয়ের নিমন্ত্রণপত্র, উপহার বাক্স, বই ও ইভেন্ট সামগ্রী প্রস্তুতের মাধ্যমে পেপার স্টুডিও বাংলাদেশে কাগজের রুচিসম্মত ব্যবহারকে কমিউনিকেশন সামগ্রীর একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ করে তুলেছে।

10th April web

বাংলাদেশে ফাইন পেপারের ধারণা প্রথম প্রবর্তন করে পেপার স্টুডিও গড়ে তুলেছে বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত কাগজের উৎকর্ষের এক নতুন মানদণ্ড। আজ কনকয়ারার (Conqueror) কেবল একটি কাগজের নাম নয়—এটি গুণগত মান ও বিশ্বাসযোগ্যতার প্রতীক, যা দেশের গ্রাফিক ডিজাইনার, পরিবর্তনের অগ্রদূত, কর্পোরেট নেতৃত্ব এবং সৃজনশীল চিন্তাধারার ব্যক্তিদের কাছে সমানভাবে স্বীকৃত।

উচ্চমানের কর্পোরেট স্টেশনারি থেকে শুরু করে নান্দনিক বিয়ের নিমন্ত্রণপত্র, উপহার বাক্স, বই ও ইভেন্ট সামগ্রী প্রস্তুতের মাধ্যমে পেপার স্টুডিও বাংলাদেশে কাগজের রুচিসম্মত ব্যবহারকে কমিউনিকেশন সামগ্রীর একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ করে তুলেছে। আজ তাদের গ্রাহক পরিসর বিস্তৃত—ফ্রিল্যান্স আলোকচিত্রী থেকে জাতীয় পর্যায়ের নেতৃত্ব, বুটিক ব্র্যান্ড থেকে প্রিমিয়াম প্রতিষ্ঠান—যারা প্রত্যেকেই আস্থা রাখেন তাদের ভাবনা ও সৃজনশীলতাকে যত্ন, চিন্তা ও দক্ষতার সঙ্গে বাস্তব রূপ দেওয়ার দায়িত্ব পেপার স্টুডিওর হাতে তুলে দিতে।

পেপার স্টুডিওর যাত্রা শুরু হয় ২০০৭ সালে। সেই পথচলার শুরুতেই এক ঐতিহাসিক মাইলফলক হিসেবে বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো বিশ্বখ্যাত ফাইন পেপার কনকয়ারার পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয় এবং সাফল্যের ধারাবাহিকতায় ২০২৫ সালে যুক্ত হয় ২০০ বছরের অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ জার্মান ব্র্যান্ড গামুন্ড (Gmund)। 

সাধারণ কাগজের সরবরাহ থেকে যে যাত্রা শুরু হয়েছিল, তা ধীরে ধীরে রূপ নেয় এক নীরব বিপ্লবে—যেখানে কাগজকে দেখা, ছোঁয়া ও মূল্যায়নের দৃষ্টিভঙ্গিই বদলে যায়। শুরু থেকেই তাদের লক্ষ্য ছিল স্পষ্ট—ফাইন পেপারকে কেবল একটি মাধ্যম নয়, বরং শৈল্পিকতা, কারুশিল্প, কারুনৈপুণ্য এবং নিখুঁত স্বতন্ত্রতার এক পরিশীলিত প্রকাশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা।

যেভাবে শুরু 

১৯৯৮ সালে ফারযিন খান চৌধুরী নিজের বিয়ের নিমন্ত্রণপত্র ছাপানোর জন্য একটি সাধারণ ক্রিম রঙের টেক্সচারড কাগজ খুঁজছিলেন। সে সময় চট্টগ্রাম বা ঢাকায় এমন কাগজ সহজলভ্য ছিল না। শেষ পর্যন্ত ঢাকায় নিউ মার্কেটের মডার্ন স্টেশনারিতে তিনি নিজের পছন্দের কাছাকাছি একটি কাগজ খুঁজে পান। পরবর্তীতে সেগুনবাগিচার একটি ছাপাখানায় দাঁড়িয়ে থেকে সোনালি রঙের কালিতে ছিমছাম নকশার কার্ড ছাপান।

এই অভিজ্ঞতাই পরবর্তীকালে তার মনে নিজের মতো কিছু করার ভাবনার জন্ম দেয়। ফাইন পেপার নিয়ে কাজ করার সুযোগ আসে আরও কিছুটা পরে।
ইংল্যান্ডের কাগজ প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান আর্যভিগিনস (Arjowiggins) একসময় তাদের কাগজের একটি সোয়াচ বুক পাঠায় পারিবারিক প্রতিষ্ঠান গ্রাফিকস লিমিটেডে। কিন্তু কাগজ বাজারজাত করার মতো সময় ও সুযোগ তাদের ছিল না। তাই প্রস্তাবটি বিবেচনার জন্য পাঠানো হয় ফারযিনের কাছে।

বাংলাদেশে ডিজাইনারদের কাছে এত ধরনের ফাইন বা প্রিমিয়াম পেপার তখন প্রায় অচেনা। কাগজের সীমাবদ্ধতা যে সৃজনশীলতাকেও সীমিত করে—এ বিষয়টি তিনি গভীরভাবে উপলব্ধি করেন। তাই তিনি উদ্যোগটি গ্রহণ করেন, যদিও জানা ছিল এই কাগজের গ্রাহক সংখ্যা শুরুতে খুব বেশি হবে না। কাগজগুলো ছিল প্রচলিত কাগজের তুলনায় কয়েকগুণ দামি, আর পরিচিতিও ছিল না।

বিয়ের কার্ডই হয়ে উঠল প্রথম পরিচয়

২০০৫ সাল থেকেই তিনি কনকয়ারারের বাজার যাচাই শুরু করেন। বিজ্ঞাপনী সংস্থাগুলোকে প্রথম লক্ষ্যবস্তু করা হয়—কারণ তারাই কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রচারণা সামগ্রী তৈরি করে। 

অ্যাডকম, বিটপি, এশিয়াটিকের মতো সংস্থায় কনকয়ারারের কাগজ নিয়ে যাওয়া হয়। ডিজাইনাররা কাগজ দেখে মুগ্ধ হলেও, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত যেহেতু কর্পোরেট হাউজ ও প্রোডাকশন ডিপার্টমেন্টের হাতে, তাই খরচের প্রশ্নে কাজ পাওয়া সহজ ছিল না।

ঠিক এমন সময়ে এক বন্ধুর বিয়ের কার্ড তৈরি করার অনুরোধ আসে। মেটাল আইস গোল্ড পেপারে ন্যূনতম নকশায় তৈরি সেই কার্ডটি ব্যাপক সাড়া ফেলে। 

ফারযিন বলেন, “আমাদের দেশে বিয়েতে সাধারণত অনেক মানুষকে দাওয়াত দেওয়া হয়। আমরা ছাপিয়েছিলাম হাজারখানেক কার্ড। ফলে কার্ডটিই আমাদের কাজকে বহু মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়। এই প্রথম আমাদের হাতে এমন একটি নমুনা এলো, যা সবাইকে আকৃষ্ট করেছিল।”

এই কার্ডটিকে নমুনা হিসেবে ব্যবহার করে কর্পোরেট হাউজ ও বিজ্ঞাপনী সংস্থায় উপস্থাপন করলে ফলও পাওয়া যায়।

ছাপাখানা থেকে স্বয়ংসম্পূর্ণ প্রতিষ্ঠান

গুণমানের ব্যাপারে ফারযিন কখনোই আপস করতেন না। একসময় আরেকটি বিয়ের নিমন্ত্রণপত্র ছাপাতে গিয়ে বড় বিপর্যয় ঘটে—কালি না শুকিয়ে লেপ্টে যায়। তখনই তিনি সিদ্ধান্ত নেন, নিজস্ব ছাপাখানা ছাড়া আর চলবে না। 

গ্রাফিকস লিমিটেড থেকে একটি ডেমো মেশিন ধার নেন, নিয়োগ দেন একজন গ্রাফিক ডিজাইনার। নকশা রাখা হতো সচেতনভাবেই সাদামাটা—যাতে কাগজের বৈশিষ্ট্যটাই প্রধান হয়ে ওঠে। 

এর মধ্যেই নকিয়া, ব্র্যাক ব্যাংক, সিটি ব্যাংকের মতো প্রতিষ্ঠানের কাজ আসতে শুরু করে। অবশেষে ২০০৭ সালের জুন মাসে বাংলাদেশে পেপার স্টুডিও ও কনকয়ারারের আনুষ্ঠানিক আত্মপ্রকাশ ঘটে।

নতুন প্রজন্মের হাতে ফাইন পেপার

ফারযিন বলছিলেন, ‘২০০৭ ছিল এক দারুণ সময়। সেবাখাতে বিনিয়োগ বাড়ছিল, লোকাল ব্র্যান্ডগুলোও তাদের মার্কেটিং বাজেট বাড়াচ্ছিল, রেডিসন ব্লুর মতো আন্তর্জাতিক হোটেল চেইনগুলো কার্যক্রম শুরু করেছিল, তাই সময়টা কাজের জন্য ছিল ভালো।” 

তিনি বলেন, “কনকয়ারারের মার্কেট ছোট্ট কিন্তু রুচিশীল বলেই আমরা প্রচারণার জন্য বিশেষ কার্যক্রম হাতে নিয়েছিলাম। স্থপতি, আলোকচিত্রী, শিল্পী, সাংবাদিকসহ সৃজনশীল সাতটি মাধ্যমের সাতজনের হাতে আমরা কাগজটি তুলে দিয়েছিলাম, তারা নিজেদের মতো করে তাতে সৃষ্টিশীলতার প্রকাশ ঘটিয়েছিল। দলটিতে ছিলেন শিল্পী শিশির ভট্টাচার্য, কবি ও সাংবাদিক সাজ্জাদ শরীফ, মুখোশ শিল্পী সাইদুল হক জুইস, স্থপতি সালাউদ্দিন আহমেদ, আলোকচিত্রী আবীর আব্দুল্লাহ, স্থপতি মেরিনা তাবাস্সুম। তাদের সৃষ্ট শিল্পকর্ম নিয়ে পরে বেঙ্গল আর্ট গ্যালারিতে একটি প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়েছিল।”

২০১০ সালে জাপানের খ্যাতনামা সোশ্যাল আর্টিস্ট হিরোমি ইনায়োশি পেপার স্টুডিওর হয়ে সিসিআইডি (কনকয়ারার কর্পোরেট আইডেনটিটি ডিজাইন) কনটেস্ট পরিচালনা করেন। এটি ছিল একটি বড় আয়োজন। প্রস্তুতিও ছিল বড়। আয়োজন সম্পর্কে জানাতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর চারুকলা বা স্থাপত্য বিভাগে পোস্টার লাগানো ও নানান মাধ্যমে প্রচার করা হয়।

সারাদেশ থেকে এক হাজারের বেশি প্রতিযোগী এতে অংশ নেন এবং কনকয়ারারের কাগজে লোগো নকশা করেন। প্রতিযোগিতায় বিচারক ছিলেন অ্যাডকমের গীতি আরা সাফিয়া চৌধুরী, স্থপতি বশিরুল হক, বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের লুভা নাহিদ চৌধুরী ও ব্র্যাক এন্টারপ্রাইজের তামারা আবেদ। 

প্রধান বিচারক ছিলেন নোবেল বিজয়ী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনুস। এই আয়োজনের মাধ্যমে কনকয়ারারের কাগজ দেশের তরুণ ও উদীয়মান ডিজাইনারদের মধ্যে ব্যাপক পরিচিতি পায়। পরবর্তীতে এই প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া অনেক ডিজাইনারই নিজ নিজ ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত নাম হয়ে ওঠেন।

ফারযিন খান বললেন, “নতুন প্রজন্মকে ফাইন পেপার পরিচয় করাতে পেরে আমরাও সন্তুষ্টি ও সাফল্য অর্জন করলাম। তারা জানল ফাইন পেপার কী, প্রিন্টিং মেটেরিয়াল কী এবং কাগজ সৃজনশীলতাকে কতটা প্রভাবিত করে। ২০১০ সালের মধ্যে আমরা বলা চলে একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছি। আমাদের প্রিন্টিং প্রেস আছে, ডিজাইন টিম আছে, কাগজ তো আছেই।” 

“ততদিনে কাস্টমাইজড প্রিন্টিং সলিউশনে পেপার স্টুডিও হয়ে ওঠে অনন্য এবং একইসঙ্গে বিশ্বনন্দিত কনকয়ারারের কাগজটিও। ইউরোপ, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়াসহ সারা বিশ্বে কাগজের গোল্ড স্ট্যান্ডার্ড এই কনকয়ারার ব্র্যান্ডের পরিচয় রয়েছে,” বলেন তিনি। 

২০১০ সালের পর থেকে পেপার স্টুডিও এবং কনকয়ারার উভয়েরই পরিচিতি বৃদ্ধি পায়। ২০১৫ সালে পেপার স্টুডিও দ্বিতীয়বারের মতো সিসিআইডি কনটেস্ট আয়োজন করে। ততদিনে পৃথিবী ডিজিটাল হতে উঠেপড়ে লেগেছে। নানা রকম চাইনিজ পেপার চলে এসেছে বাজারে, প্রতিযোগিতা তৈরি হয়েছে। সে প্রেক্ষিতে দ্বিতীয় সিসিআইডি কনটেস্ট ছিল গুরুত্বপূর্ণ। ‘শাশ্বত বাংলা’ ছিল সেবারের প্রতিযোগিতার বিষয়। সম্পূর্ণ কনটেস্ট পরিচালনা করেন দূরদর্শী ও সৃজনশীল ডিজাইনার খালিদ মাহমুদ। একই সঙ্গে অত্যন্ত বিশিষ্ট এক জুরি গঠন করা হয়। যাদের মধ্যে ছিলেন স্বনামধন্য স্থপতি সালাউদ্দিন আহমেদ, প্রফেশনাল গ্রাফিক ডিজাইনার লরা বনোপেজ ও ইউসুফ হাসান, কর্পোরেট ব্যক্তিত্ব ইফতেখার এ. খান, সৃজনশীল ও মননশীল চিন্তাধারক জনাব আলী যাকের।

আর্যভিগিনস ক্রিয়েটিভ পেপারের লাক্সারি কমিউনিকেশন এক্সপার্ট ক্রিস্টোফার বালারেস্ক এই আয়োজনের অতিথি হয়ে এসেছিলেন। দুই দিনের এই সময়ে তার সময়সূচি ছিল অত্যন্ত কার্যকর ও ব্যস্ততাপূর্ণ। এই সময়ে তিনি শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ইন্টারঅ্যাক্টিভ সেমিনার, ক্রিয়েটিভ ডিরেক্টরস সেশন, ডিসিশন মেকারস সেশন ও ব্র্যান্ড মার্কেটিং সেশনে অংশগ্রহণ করেন, যেখানে তিনি ক্রিয়েটিভ পেপার, লাক্সারি ব্র্যান্ডিং এবং কমিউনিকেশন স্ট্রাটেজি নিয়ে বাস্তব অভিজ্ঞতা শেয়ার করেন।

শত রকমের কাগজ

শত রকমের কাগজ আছে কনকয়ারারের। এর মধ্যে কনকয়ারার সিএক্স ডাবল টু আল্ট্রা স্মুথ পেপার কর্পোরেট স্টেশনারি, লাক্সারি ব্রোশিওর, প্রিমিয়াম ইনভিটেশন এবং প্রফেশনাল রিপোর্টের জন্য উপযোগী। এটি পরিবেশবান্ধব এবং পুরোপুরি নবায়নযোগ্য। 

অমসৃণ কনকয়ারার লেইড কাগজ ফরমাল স্টেশনারি, এলিগ্যান্ট ব্র্যান্ডিংয়ের জন্য ভালো। পাওয়া যায় ব্রিলিয়ান্ট হোয়াইট, হাই হোয়াইট ওয়াটার রংয়ে। নরম অনুজ্জ্বল (ম্যাট) কাগজ কনকয়ারার উভ পাওয়া যায় ব্রিলিয়ান্ট হোয়াইট, হাই হোয়াইট এবং ক্রিম রংয়ে। প্রফেশনাল রিপোর্ট এবং পারসোনাল স্টেশনারির জন্য ভালো। 

অনেকগুলো রঙে পাওয়া যায় কিউরিয়াস মেটালিকস কাগজ। রঙগুলোর মধ্যে মেটাল আইস গোল্ড, মেটাল হোয়াইট গোল্ড, মেটাল ব্লু স্টিল, মেটাল গোল্ড লিফ অন্যতম। ফ্যান্সি ইনভিটেশন এবং লাক্সারিয়াস প্যাকেজিংয়ের জন্য এটি ভালো।

কনকয়ারারের একটি বিশেষ কাগজ হলো কিউরিয়াস ম্যাটার। এর পৃষ্ঠতল অমসৃণ, পাওয়া যায় গয়া হোয়াইট রংয়ে, সফিস্টিকেটেড ব্র্যান্ড আইডেনটিটির জন্য ভালো। 

আরও আছে কিউরিয়াস স্কিন, যা পাওয়া যায় স্কিন ব্ল্যাক, স্কিন ডার্ক ব্লু রংয়ে—প্যাকেজিংয়ের জন্য এ কাগজ বেশি ভালো। আরও আছে অলিন কালার, অলিন ডিজাইন, রিভস, টাকোটা ইত্যাদি। 

টাকোটা পাওয়া যায় এক্সট্রা হোয়াইট এবং ন্যাচারাল হোয়াইট রঙের। আর্ট বুক, স্টেটমেন্ট স্টেশনারি ও নিমন্ত্রণপত্রের জন্য এ কাগজ ভালো। একশ, একশ বিশ, একশ ষাট, আড়াইশ, তিনশ জিএসএম পুরুত্বের হয়ে থাকে কাগজগুলো।

কনকয়ারারের আরও আছে গোটস্কিন পার্চমেন্ট, যা বস্তুত একটি আর্কাইভাল পেপার। এসিড-ফ্রি এ কাগজ ৫০০ বছর টিকে থাকার গ্যারান্টি দেওয়া হয়। সনদ, নথি ইত্যাদির জন্য কাগজটি ভালো।

আকার, প্রকার ও পুরুত্বভেদে কনকয়ারারের কাগজের দাম বিভিন্ন। একশ জিএসএমের লেইড ব্রিলিয়ান্ট হোয়াইট—ডব্লিউএমকে টেক্সচার (সাড়ে ১৭ বাই ২৫ ইঞ্চি) ৫০ টাকা। দুইশ পঞ্চাশ জিএসএমের লেইড হাই হোয়াইট টেক্সচার (সাড়ে ১৭ বাই ২৫ ইঞ্চি) ১৩৫ টাকা। দুইশ বিশ জিএসএমের লেইড ভেলাম টেক্সচার (সাড়ে ২৮ বাই ৪০ ইঞ্চি) ২৭০ টাকা। নব্বই জিএসএমের উভ হাই হোয়াইট—ডব্লিউএমকে স্মুথ (১৭ বাই ২৪ ইঞ্চি) ৩৫ টাকা। তিনশ জিএসএমের উভ ক্রিম স্মুথ (সাড়ে ২৮ বাই ৪০ ইঞ্চি) ৪০০ টাকা।

বই প্রকাশনার নতুন অধ্যায়

২০২০ সালে কোভিড-১৯ মহামারিতে পেপার স্টুডিও বড় ধাক্কা খায়। সামাজিক অনুষ্ঠান তখন বন্ধ ছিল। কিন্তু ঠিক তখনই খুলে যায় আরেকটি দরজা—বই মুদ্রণের। ইউএনডিপির জন্য পাবলিকেশন তৈরি করার মাধ্যমে শুরু হয় নতুন অধ্যায়।

ফারযিন চৌধুরী বলছিলেন, “২০০৭ সালে আমরা ভাবিনি এমন একটি দিন আসবে, যখন নিজেদের কাগজে নিজেদের ছাপানো কাজ দিয়েই পেপার স্টুডিও তার প্রচারের সুযোগ পাবে। তখন ভাবতাম বিদেশে প্রকাশিত ক্যাটালগ, সুভেনির আনিয়ে নিয়ে কাজ চালাব, এখন বইগুলোই আমাদের হয়ে কথা বলছে। ডিজাইনারদের প্রায় সবাই আমাদের চেনেন। আর্কিটেক্ট কমিউনিটি শুরু থেকেই আমাদের কাগজের প্রতি আগ্রহ দেখিয়েছে। এখন এটা একটি সার্থকতার জায়গাও তৈরি করেছে।”

পেপার স্টুডিওর আয়োজনে প্রকাশিত বই

“‘আপনার সৃজনশীল প্রকল্পকে জীবন্ত করে তুলতে প্রয়োজন উপযোগী কাগজ, নিখুঁত ছাপা এবং কারিগরি দক্ষতা। সেরা উপকরণ দিয়ে আমরা আপনার স্বপ্ন বাস্তবায়নে সাহায্য করব,” — এই বক্তব্য সামনে রেখে পেপার স্টুডিওর আয়োজনে যে বইগুলো প্রকাশিত হয়েছে, তার তালিকা দীর্ঘ নয়, তবে আকর্ষণীয়। 

বইগুলোর মধ্যে আছে—ব্র্যাকের প্রতিষ্ঠাতা স্যার ফজলে হাসান আবেদের জীবন ও কর্ম নিয়ে ‘সেলিব্রেটিং দ্য লাইফ অ্যান্ড লিগেসি অব স্যার ফজলে হাসান আবেদ কেসিএমজি (১৯৩৬–২০১৯)’, বাংলাদেশ প্রেস ফটো কনটেস্ট ২০২২ ও ২০২৩, বুদ্ধিস্ট হেরিটেজ অব বাংলাদেশ, আনফোল্ডিং দ্য পাস্ট: কনজারভেশন অব বড় সরদারবাড়ি ইত্যাদি। 

এছাড়া স্থপতি মাজহারুল ইসলামের ১০১তম জন্মবার্ষিকী উদযাপন উপলক্ষে কনকয়ারারের অলিন ১২০ গ্রাম ন্যাচারাল হোয়াইট কাগজে বেঙ্গল ইনস্টিটিউট প্রকাশ করেছে ‘মাজহারুল ইসলাম: আ ফোলিও অব বিল্ট ওয়ার্কস’।

বই ছাড়াও আরও যেসব

প্রতিদিনের অথবা বিশেষ দিনের ব্যবহার্য স্টেশনারি প্রস্তুত করে থাকে পেপার স্টুডিও, যা ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের পরিচিতিকে স্বতন্ত্র ও বিশেষ করে তোলে। এগুলোর মধ্যে আছে লেটারহেড, বিজনেস কার্ড, এনভেলপ, ক্যারিং ব্যাগ, প্রেজেন্টেশন ফোল্ডার ও নোটবুক। অনুষ্ঠানাদিকে স্মরণীয় করে রাখতে জন্মদিনের নিমন্ত্রণপত্র, ঈদ শুভেচ্ছা, এনিভার্সারি কার্ডও প্রকাশ করে। ঈদের সালামি দেওয়ার জন্য ঈদি এনভেলপও প্রস্তুত করে পেপার স্টুডিও।

নকশা শিল্পী মলয় চন্দন সাহা শুরু থেকেই পেপার স্টুডিওর কাগজের সঙ্গে পরিচিত। তিনি বললেন, “নকশার সঙ্গে যদি তার প্রকাশ মাধ্যমটিও যথাযথ হয়, তবে আকর্ষণ বেড়ে যায়। কনকয়ারারের কাগজগুলোর নিজস্ব সৌন্দর্য রয়েছে, যা নকশায় নতুন মাত্রা যোগ করে। পেপার স্টুডিওর সব কাগজ আবার কেবল প্রিন্টিংয়ের জন্য নয়, একেক কাগজের একেক গুরুত্ব। কোনোটি প্যাকেজিংয়ের জন্য ভালো, কোনোটি বিয়ের কার্ডের জন্য, কোনোটি আবার শুভেচ্ছাপত্র হিসেবে ভালো। একারণে ডিজাইনাররা আগের তুলনায় বেশি ফ্রিডম পাচ্ছেন।”

ডিজিটাল এই সময়ে একেকবার আশঙ্কা তৈরি হয়, পৃথিবীটা বুঝি কাগজশূন্য হয়ে যাবে। তবে কাগজে যা হয়, যান্ত্রিক মাধ্যমে তা পাওয়া মুশকিল। তাই আশা করা যায়, কাগজের আবেদন কোনোদিনই ফুরোবে না। আর সেটি যদি এমন কাগজ হয়, যা নিজেই কিছু না কিছু বলে, তাহলে তো ভালোবাসা উত্তরোত্তর বাড়ে—যেমনটা দেখা যাচ্ছে পেপার স্টুডিওর কাগজের প্রতি।

ছবি: ইশতিয়াক করিম/ পেপার স্টুডিও