অবশেষে শেষ হলো বিশ্বকাপ
অবশেষে শেষ হলো বিশ্বকাপ
আজ ভোরে সরকারিভাবে ঘোষণা দেওয়া হলো, বাংলাদেশে “বিশ্বকাপকালীন জাতীয় আবেগ ব্যবস্থাপনা অধ্যাদেশ” সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে। রাতের ফাইনাল ম্যাচের শেষ বাঁশি বাজতেই দেশের সব অস্থায়ী আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, স্পেন, ইংল্যান্ড ও ফ্রান্স প্রজাতন্ত্রের নাগরিকরা আবার বাংলাদেশে ফিরে এসেছেন।
সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখা গেল, গত এক মাস ধরে ছাদে উড়তে থাকা বিদেশি পতাকাগুলো কেমন যেন ক্লান্ত হয়ে গেছে। বাতাসও যেন বুঝে গেছে, তার আর এত দায়িত্ব নেই। যে বাড়ির ছাদ দেখে মনে হতো সেটি হয়তো বুয়েনস আয়ার্স কিংবা রিও ডি জেনেইরোর কোনো উপশহর, আজ সেখানে আবার কাপড় শুকোচ্ছে।
পাড়ার মেহেদী, যে গতকাল পর্যন্ত নিজেকে “আর্জেন্টাইন বাই হার্ট” বলে পরিচয় দিত, আজ ফেসবুকে লিখেছে, “কেউ কি ভালো কোনো চাকরির খবর জানেন?” সজীব, যে তিন সপ্তাহ ধরে ব্রাজিলের জার্সি ছাড়া আর কোনো পোশাক পরেনি, সে আজ আবার বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাসাইনমেন্ট জমা দেওয়ার শেষ সময় নিয়ে উদ্বিগ্ন।
দেশ বদলে গেছে। চায়ের দোকানে ঢুকতেই কেমন অস্বস্তি লাগল। গত এক মাস ধরে যেখানে “হাই প্রেস”, “ফলস নাইন”, “পজেশন ফুটবল”, “এক্সজি”, “ট্যাকটিক্যাল ব্লক” এসব শব্দে আড্ডা জমে থাকত, সেখানে আজ আবার তেলের দাম, বাসভাড়া, চাকরির বাজার আর বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। মনে হলো, বিশ্বকাপ শুধু একটা টুর্নামেন্ট নয়। এটি ছিল একটি জাতীয় ছুটি, যেখানে বাস্তবতা থেকে সাময়িক অব্যাহতি পাওয়া যায়।
বিশ্বকাপ চলাকালে বাংলাদেশের এক অদ্ভুত রূপ দেখা যায়। এই দেশ হঠাৎ করেই পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ফুটবল বিশ্লেষক উৎপাদনকারী রাষ্ট্রে পরিণত হয়। যিনি সারা বছর নিজের অফিসের ফাইল গোছাতে পারেন না, তিনিই অনায়াসে বলতে পারেন কোন কোচ কোথায় ভুল করলেন। যে মানুষটি নিজের এলাকার রাস্তার গর্ত নিয়ে কখনও কথা বলেন না, তিনি অবলীলায় ব্যাখ্যা করেন কেন কোনো দলের মিডফিল্ড কমপ্যাক্ট ছিল না।
এই প্রতিভার কোনো সীমা নেই। এক মাসের জন্য আমাদের প্রত্যেকের ভেতরে একজন আন্তর্জাতিক কোচ, একজন ধারাভাষ্যকার, একজন রেফারি এবং একজন ক্রীড়া সাংবাদিক জন্ম নেয়। তারপর ফাইনালের শেষ বাঁশির সঙ্গে সঙ্গেই তারা সবাই অবসরে চলে যান।
সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো, বিশ্বকাপের সময় বাংলাদেশে পরিচয়েরও এক নতুন সংজ্ঞা তৈরি হয়। কেউ জন্মসূত্রে বাংলাদেশি নন; সবাই যেন অন্য কোথাও জন্মেছিলেন। কারও রক্তে আর্জেন্টিনা, কারও শিরায় ব্রাজিল, কারও আত্মায় পর্তুগাল, কারও স্বপ্নে ইংল্যান্ড। কেবল পাসপোর্টটাই ভুলবশত বাংলাদেশি হয়ে গেছে।
বিশ্বকাপের সময় প্রতিবেশীরা একে অপরের সঙ্গে এমনভাবে তর্ক করেন, যেন হার-জিতের ওপর তাদের ব্যক্তিগত সম্পত্তির ভাগ্য নির্ভর করছে। বন্ধুত্ব ভাঙে, প্রেমে অভিমান হয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আনফ্রেন্ড করা হয়, আবার নতুন নতুন রাজনৈতিক জোটের মতো ফুটবল জোটও গড়ে ওঠে।
কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, একই মানুষ নিজের এলাকার কোনো সমস্যা নিয়ে কখনও এত আবেগী হন না। আমাদের রাস্তার পাশে যে খেলার মাঠটি ধীরে ধীরে বিল্ডিংয়ের নিচে হারিয়ে গেল, সেটি নিয়ে কোনো মিছিল হয়নি। পাড়ার যে লাইব্রেরিটি বন্ধ হয়ে গেল, সেটি নিয়ে কোনো পতাকা ওড়েনি। যে ছেলেটি টাকার অভাবে খেলাধুলা ছেড়ে দিয়েছে, তাকে নিয়ে কেউ রাত জাগেনি। কিন্তু সাত সমুদ্র তেরো নদীর ওপারের একটি দলের পরাজয়ে আমাদের ঘুম হারাম হয়ে যায়। এটাই হয়তো আমাদের সময়ের সবচেয়ে সফল বিনোদন। আমরা বাস্তবতার সঙ্গে লড়াই করার বদলে ধার করা আবেগে বেঁচে থাকতে শিখেছি।
বিশ্বকাপ চলাকালে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমও যেন অন্য এক গ্রহে চলে যায়। দেশের সংবাদ, শিক্ষা, গবেষণা, সংস্কৃতি, পরিবেশ কিংবা অর্থনীতিনসবকিছু অদৃশ্য হয়ে যায়। টাইমলাইনে শুধু গোল, অফসাইড, রেফারি, মিম, ট্রল আর পতাকার রঙ। মনে হয়, পুরো দেশ এক বিশাল স্টেডিয়ামে পরিণত হয়েছে।
তারপর একদিন হঠাৎ করেই সব শেষ। জার্সিগুলো আলমারিতে উঠে যায়। পতাকাগুলো ভাঁজ হয়ে যায়। রাত জাগা বন্ধ হয়। টাইমলাইন আবার আগের মতো হয়ে যায়। যে সমস্যাগুলোকে আমরা এক মাসের জন্য বিরতি দিয়েছিলাম, তারা আবার আমাদের দরজায় কড়া নাড়ে। দ্রব্যমূল্য অপেক্ষা করছিল। বেকারত্ব অপেক্ষা করছিল। শিক্ষাব্যবস্থার সংকট অপেক্ষা করছিল। নগরীর যানজট অপেক্ষা করছিল। পরিবেশ দূষণ অপেক্ষা করছিল। তারা কেউ কোথাও যায়নি। শুধু আমাদের অপেক্ষা করছিল।
তবু ভুল বুঝবেন না। ফুটবল ভালোবাসা কোনো অপরাধ নয়। খেলাধুলা মানুষকে আনন্দ দেয়, এক করে, আশা দেয়। সমস্যা ফুটবল নয়। সমস্যা তখনই শুরু হয়, যখন আমরা খেলাকে ভালোবাসার চেয়ে খেলার আড়ালে বাস্তবতাকে ভুলে থাকতে বেশি ভালোবাসি। যখন অন্য দেশের পতাকা আমাদের কাছে নিজের দেশের দায়িত্বের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। যখন বিদেশি খেলোয়াড়ের প্রতিটি পাস আমরা বিশ্লেষণ করি, অথচ নিজের সমাজের প্রতিটি ব্যর্থতাকে বলি, “এসব নিয়ে ভেবে লাভ কী?”
হয়তো এ কারণেই বিশ্বকাপ আমাদের কাছে শুধু একটি ক্রীড়া আসর নয়; এটি বাস্তবতা থেকে পালানোর উৎসব। যেখানে আমরা কয়েক সপ্তাহের জন্য নিজেদের পরিচয়, সমস্যা, দায়িত্ব, ব্যর্থতা সবকিছু স্টেডিয়ামের বাইরে রেখে আসি। তারপর শেষ বাঁশি বাজে। আমরা আবার বাস্তবে ফিরে আসি। আবার অফিসে যাই। আবার ক্লাস করি। আবার বাজারের হিসাব মেলাই। আবার অভিযোগ করি। আবার অপেক্ষা করি। আর ধীরে ধীরে ছাদের বিদেশি পতাকাগুলো নামিয়ে রেখে পরের বিশ্বকাপের জন্য যত্ন করে ভাঁজ করে রাখি।
কারণ আমরা জানি, চার বছর পর আবার আমাদের নতুন করে ব্রাজিলিয়ান, আর্জেন্টাইন, ইংলিশ কিংবা স্প্যানিশ হয়ে উঠতে হবে। বাংলাদেশি তো আমরা সারাবছরই থাকি। শুধু বাংলাদেশকে নিয়ে সারাবছর ততটা আবেগী থাকি না।