13

রুহান বড় খামখেয়ালি ছেলে। পড়াশুনার সাথে তার সম্পর্ক আদায় কাঁচকলা হলেও প্রকৃতির বেলায় তা আবার উল্টো। বিশেষ করে মেঘলা বিকেলগুলোকে সবসময় রুহানের আলাদা মনে হতো।

তার মনে হয় আকাশেরও কিছু না বলা গল্প থাকে। সেই গল্প পড়ার চেষ্টায় ব্যস্ত মনেই তৈরী হয় তার সকল খামখেয়ালিপনা। সে যখন তার  গ্রামের সরু রাস্তা দিয়ে হাঁটত তখন তার  মনে হতো পৃথিবীটা অনেক বড়। অথচ তার জীবনটা খুব ছোট্ট আর শান্ত।

রুহানের বয়স তখন মাত্র তের। স্কুল শেষ হলেই বাসায় ফিরে সে বই ছুঁড়ে রেখে দৌড়ে বেরিয়ে যেত। মা পেছন থেকে চিৎকার করতেন,

— “এই! হাত-মুখ ধুয়ে যা, রুহান।”

কিন্তু সে শুনত না। কারণ বাইরে তার জন্য অপেক্ষা করত একটা পুরো পৃথিবী। যার অজানা গল্পের নতুন পাতা পড়াই তার প্রধান ব্যস্ততা।

ধানক্ষেতের পাশের রাস্তা, কচুপাতায় জমে থাকা পানি, শুকনো খড়ের গন্ধ, আর দূরের বাঁশবাগান সবই যেন তার কাছে বন্ধু। তবে সবচেয়ে প্রিয় ছিল তার ছোট বোন মীরা। মীরা ছিল অদ্ভুত রকমের চঞ্চল। সারাক্ষণ কথা বলত। কখনো পাখিদের সাথে, কখনো গাছের সাথে, কখনো নিজের ছায়ার সাথেও। মানুষজন তাকে দূর থেকে দেখলে পাগল ভাবত। কিন্তু তার পাশে শক্ত দেয়ালের মত দাঁড়িয়ে থাকত রুহান। মীরার হাত শক্ত করে ধরে। মীরাও জানত,  এই হাত তাকে সব কিছু থেকে রক্ষা করবে।

একদিন বিকেলে তারা দুই ভাইবোন সেই রাস্তা ধরে হাঁটছিল। আকাশ ভরা ধূসর মেঘ। বাতাসে বৃষ্টির গন্ধ। বৃষ্টি আসল বলে।  মীরা হঠাৎ দাঁড়িয়ে গেল। দুই হাত আকাশের দিকে তুলে বলল,

— “ভাইয়া, আমি যদি উড়তে পারতাম!”

রুহান হেসে বলল,

— “কই যেতি?”

মীরা চোখ বড় বড় করে বলল,

— “মেঘের কাছে। জিজ্ঞেস করতাম ওদের  ওরা থেকে থেকে এত মন খারাপ করে কেন!”

রুহান হেসে গড়িয়ে পড়ল।

— “মেঘের আবার মন খারাপ হয় নাকি?”

মীরা খুব গম্ভীর হয়ে বলল,

— “হয়। না হলে কাঁদে কেন?”

ছোট মীরার গভীর অনুধাবন রুহানের মনে নাড়া দেয়৷ সে মীরাকে ঘাড়ে তুলে নেয়। মীরা দুই হাত ছড়িয়ে দেয় দুইপাশে যেন সে আসলেই উড়ছে।  তারপর দুজনেই বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে দৌড় দিল।

তাদের ছোটবেলাটা এমনই ছিল। বৃষ্টির পানিতে কাগজের নৌকা ভাসানো, গাছ থেকে কাঁচা আম পেড়ে পালানো, দুপুরবেলা লুকিয়ে পুকুরে নামা আর রাতে বিদ্যুৎ চলে গেলে আকাশের তারা গোনা। তখন পৃথিবীটা খুব সহজ ছিল। কষ্ট মানে ছিল মা’র বকা খাওয়া।  ভয় মানে ছিল পরীক্ষায় কম নম্বর পাওয়া। আর সুখ মানে ছিল বিকেলবেলা বন্ধুদের সাথে মাঠে যাওয়া। কিন্তু মানুষ বুঝতে পারে না যে সবচেয়ে সুন্দর সময়গুলো খুব দ্রুত চুপচাপ শেষ হয়ে যায়।

এক বর্ষার রাতে মীরা খুব অসুস্থ হয়ে পড়ল। প্রথমে সবাই ভাবল সাধারণ জ্বর। কিন্তু রাত বাড়ার সাথে সাথে তার অবস্থা খারাপ হতে লাগল। গ্রামের ছোট ক্লিনিকে নেওয়া হল। তারপর শহরে। রুহান শুধু দেখছিল। চোখে ভীষণ ভয়। কিন্তু তখনো আঁকড়ে ধরে আছে মীরার ছোট হাত দুইটি। দেয়াল হয়ে যেন লড়াই করছে তারা দুই ভাইবোন অশুভ কোন শক্তির সাথে।

রুহানের প্রথমবারের মতো মনে হচ্ছিল পৃথিবীটা এত সহজ না। এত সুন্দর সব কিছুর ভীড়ে দু:খ ও কষ্ট যেন ছদ্মবেশে থাকে।  হাসপাতালের সাদা দেয়াল, ডাক্তারদের ব্যস্ত মুখ, মা’র কান্না, বাবার ভেঙে পড়া, সবকিছু কেমন অচেনা লাগছিল তার।

মীরা কয়েকদিন পর একটু সুস্থ হলো ঠিকই, কিন্তু আগের মতো আর দৌড়াতে পারত না। ডাক্তার কী যেন বলেছে তার বাবা-মাকে। তারা শুধু কাঁদে। কিন্তু রুহান কে কিছুই বলে না। কিন্তু রুহান বুঝতে পারে অনেক বড় ঝড় আসছে।  তার আগলিয়ে রাখতেই হবে মীরাকে। কিন্তু কীভাবে সে জানে না।  মীরার জীবন অদ্ভুত ভাবে কাটতে লাগল। চঞ্চল এই মেয়ে এখন সবচেয়ে শান্ত।  সে আগের মতো মাঠে যেত না। আসলে যেতে দিত না।  ডাক্তারের নিষেধ। শুধু জানালার পাশে বসে আকাশ দেখত। রোজ একবেলা করে ডাক্তার আসত দেখতে। আর সপ্তাহে হাসপাতালে যেত।  প্রতিবার বাবা ফিরত আরো বেশি বিধ্বস্ত হয়ে আর মা আড়ালে চলে যেত কান্না করতে। 

একদিন বিকেলে রুহান তার পাশে গিয়ে বসেছিল। বাইরে তখন মেঘলা আকাশ। মীরা আস্তে করে বলল,

— “ভাইয়া…”

— “হুম?”

— “আমাকে আবার ওই রাস্তায় হাঁটতে নিয়ে যাবে?”

রুহান জোর করে হাসল।

— “অবশ্যই যাব।”

কিন্তু সে জানত, ডাক্তার নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে সে নিয়ে যেতে পারবে না। তাও অনেক কষ্টে অনেক দিন ধরে বার বার চেয়ে অবশেষে একদিন মীরার অবস্থা ভালো হলে ডাক্তার অল্প একটু যাওয়ার অনুমতি দেয়। রুহান মীরাকে নিয়ে সেদিন সন্ধ্যার আগে বের হলো। ঘাড়ে তুলে নিল মীরাকে ।  ধীরে ধীরে হাঁটতে হাঁটতে তারা সেই পরিচিত রাস্তায় পৌঁছাল।

ধানক্ষেতের উপর হালকা বাতাস বয়ে যাচ্ছিল। দূরে সাদা বক উড়ছিল। হয়ত ঘরে ফিরতে বড্ড দেরী করে ফেলেছে। এই জন্য খুব দ্রুত ডানা ঝাপটাচ্ছে।  মীরা অনেকক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর খুব আস্তে দুই হাত আকাশের দিকে তুলল। ঠিক ছোটবেলার মতো। রুহানের বুকটা হঠাৎ মোচড় দিয়ে উঠল। মীরা হাসল।

— “দেখছ ভাইয়া? মেঘগুলা এখনও আগের মতোই আছে।”

রুহান কিছু বলল না। কারণ সে বুঝতে পারছিল, মানুষ বদলে যায়, সময় বদলে যায়, কিন্তু কিছু বিকেল কখনো বদলায় না। সেদিন ফেরার পথে মীরা বলেছিল,

— “যদি কোনোদিন আমি হারিয়ে যাই, তুমি এই রাস্তায় এসে দাঁড়াবে। আমি বাতাস হয়ে আসব।”

রুহান তখন  রাগ করে বলেছিল,

— “ফালতু কথা বলবি না।” 

মীরা শুধু হেসেছিল।

তারপর একদিন সত্যিই সে হারিয়ে গেল। খুব নীরবে। খুব অল্প বয়সে। গ্রামের মানুষজন কাঁদল। মা ভেঙে পড়লেন। বাবা চুপচাপ হয়ে গেলেন। আর রুহান? সে যেন হঠাৎ করেই বড় হয়ে গেল। 

তারপর কেটে গেল অনেক বছর। রুহান শহরে চাকরি পেল। ব্যস্ত হয়ে গেল জীবন নিয়ে। কিন্তু মেঘলা বিকেল দেখলেই তার বুকের ভেতর কেমন খালি খালি লাগত। একদিন বহু বছর পর সে আবার গ্রামে ফিরল। সেই রাস্তা এখনও আছে। শুকনো খড়ের স্তূপ আছে। ধানক্ষেত আছে। শুধু মীরা নেই। রুহান ধীরে ধীরে রাস্তার মাঝখানে গিয়ে দাঁড়াল। আকাশে ধীরে ধীরে  ধূসর মেঘ জমেছে। হঠাৎ বাতাস এসে তার মুখ ছুঁয়ে গেল। সাথে সাথে তার মনে হলো কেউ যেন খুব পরিচিত কণ্ঠে বলছে,

— “ভাইয়া, মেঘগুলা এখনও আগের মতোই আছে…”

রুহানের চোখ ভিজে উঠল। সে ধীরে ধীরে দুই হাত আকাশের দিকে তুলল। সাথে সাথে  বৃষ্টি নামল। হয়ত মেঘরাও কাঁদছিল রুহানের সাথে।