যখন আমার বিড়াল আর্জেন্টিনা পছন্দ করে
যখন আমার বিড়াল আর্জেন্টিনা পছন্দ করে
ভালো সমস্যায়ই পড়েছি আমার পোষা বিড়ালটাকে নিয়ে। অনেকেই ভাবছেন, নিশ্চয়ই মাছ চুরি করে, সোফা আঁচড়ায় কিংবা যখন তখন গাছে উঠে যেয়ে নামার আর পথ খুঁজে পায় না। না, ওসব কিছুই করে না সে। আমার বিড়ালটা ভালোই ভদ্র এবং সামাজিক। প্রতিবেশীর মুরগির বাচ্চাদের পর্যন্ত সম্মান করে।
সমস্যা মাত্র একটাই। সে আর্জেন্টিনা সাপোর্ট করে। আর আমি? আমি পর্তুগালের লোক। বলতে গেলে ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর চাকরি না পেলেও ভক্তির দিক থেকে স্থায়ী কর্মচারী।
শুরুতে বিষয়টা বুঝতে পারিনি। একদিন দেখি আমি পর্তুগালের জার্সি পরে টিভির সামনে বসেছি। বিড়ালটা এসে আমার দিকে এমনভাবে তাকিয়ে রইল, যেন আমি জাতীয় কোনো অপরাধ করে ফেলেছি। তারপর ধীরে ধীরে এসে আমার কোলে না উঠে টিভির সামনে গিয়ে বসে পড়ল। পর্দায় আর্জেন্টিনার পুরোনো ম্যাচের হাইলাইটস চলছিল। সেদিনই প্রথম সন্দেহ।
পরের দিন বাজার থেকে একটা লাল-সবুজ বল কিনে আনলাম। ভাবলাম, দেশপ্রেম শেখাই। বিড়ালটা বলের দিকে তাকালও না। কিন্তু পাশের বাসার ছোট ছেলেটা নীল-সাদা ডোরাকাটা একটা বল নিয়ে আসতেই সে এমন দৌড় দিল, যেন বহুদিনের হারানো আত্মীয়কে খুঁজে পেয়েছে।
বিষয়টা আর হালকাভাবে নেওয়া গেল না। তারপর থেকে ওর ওপর নজরদারি শুরু করলাম। দেখলাম, ইউটিউবে পর্তুগালের গোল চালু করলেই সে ঘুমিয়ে পড়ে। আর মেসির ভিডিও চালু করলেই কান খাড়া করে বসে থাকে। একদিন তো দেখি টিভির পর্দায় মেসি আসতেই সে পর্দায় আলতো করে থাবা রাখল। আমি এতদিন ভেবেছিলাম বিড়াল শুধু মানুষকে ভালোবাসে। এখন বুঝলাম, সে বাম পায়ের ম্যাজিকও ভালোবাসে।
আমি শেষ চেষ্টা হিসেবে তাকে বোঝাতে গেলাম। বললাম, “দেখো, রোনালদো পাঁচটা ব্যালন ডি’অর জিতেছে।” সে হাই তুলল। বললাম, “ইউরো জিতেছে।” সে লেজ নাড়ল। বললাম, “ন্যাশনস লিগও জিতেছে।” সে উঠে গিয়ে খাবারের বাটিতে মুখ দিল। কিন্তু পাশের বাসার ছেলেটা এসে শুধু বলল, “মেসি…” ব্যাস! আমার বিড়াল দৌড়ে গিয়ে তার কোলে উঠে বসে পড়ল।
আমি সেদিন বুঝলাম, যুক্তি দিয়ে এর ফুটবল সমর্থন বদলানো যাবে না। এখন সোজা আঙুলে ঘি না উঠলে তো আঙুল বাঁকাতেই হবে। এরপর আমি কৌশল পাল্টালাম। ভাবলাম, যেহেতু সে বিড়াল, নিশ্চয়ই মাছের লোভ সামলাতে পারবে না। একটা প্লেটের নিচে রোনালদোর ছবি রাখলাম, আরেকটার নিচে মেসির। রোনালদোর প্লেটে বেশি মাছ আছে আর মেসির প্লেটে একদম অল্প। সে বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করে মেসির ছবিওয়ালা প্লেটটাই বেছে নিল।আমি জীবনে প্রথমবার একটা বিড়ালের কাছে রাজনৈতিকভাবে পরাজিত হলাম।
সমস্যা এখানেই শেষ নয়। বিশ্বকাপ এলেই বাড়ির পরিবেশ উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। আমি পর্তুগালের পতাকা ঝুলাই, আর সে জানি কোথা থেকে একটা নীল-সাদা কাপড় টেনে এনে সোফার ওপর ফেলে রাখে। আমার মা এখনো বিশ্বাস করেন, এগুলো বাতাসে উড়ে আসে। আমি জানি, এর পেছনে এক গভীর ষড়যন্ত্র আছে।
সবচেয়ে বড় অপমানের ঘটনাটা ঘটল গতকাল। বিকেলে বাসায় আমার কিছু আত্মীয় এসেছে। সবাই গল্প করছি আমরা। ঠিক তখনই টিভিতে মেসির একটা ছবি ভেসে উঠল। আমার সেই তথাকথিত ভদ্র বিড়ালটা লাফ দিয়ে টিভির সামনে গিয়ে এমন ভঙ্গিতে বসে পড়ল, যেন আজীবন আর্জেন্টিনা সমর্থকদের প্রতিনিধি হয়ে এসেছে। ঘরে উপস্থিত সবাই একসঙ্গে আমার দিকে তাকিয়ে হাসতে লাগল। চাচা বললেন, “দেখেছিস? বিড়ালেরও ফুটবল জ্ঞান আছে।” আমি সেদিন থেকে চাচার সঙ্গে অপ্রয়োজনীয় কথা বলা বন্ধ করে দিয়েছি।
তবে ঘটনাগুলো আমাকে একটা বিষয় শিখিয়েছে। আমরা মানুষরা ফুটবল নিয়ে যতটা যুদ্ধ করি, বিড়ালটা ততটা করে না। সে আমাকে কখনো রোনালদোকে অপমান করতে বলেনি। আমি পর্তুগালের গোল হলে যেমন চিৎকার করি, সে তখনও নিশ্চিন্তে ঘুমায়। আর আর্জেন্টিনা জিতলে সে শুধু একটু বেশি গরগর শব্দ করে।
অর্থাৎ সমস্যা আসলে বিড়ালের নয়। সমস্যা আমার অহংকারের। আমি চেয়েছিলাম, আমার পোষা প্রাণীও আমার মতোই ভাবুক। আমার মতোই দল সমর্থন করুক। যেন ভালোবাসারও একটা নির্দিষ্ট ইউনিফর্ম থাকে। কিন্তু বিড়ালটা আমাকে প্রতিদিন শেখায়, একই বাড়িতে থেকেও ভিন্ন মত থাকা যায়।
তাই এখন আর তাকে বদলানোর চেষ্টা করি না। আমি পর্তুগালের ম্যাচ দেখি, সে আর্জেন্টিনার হাইলাইটস দেখে। আমি রোনালদোর গোল দেখে হাততালি দিই, সে মেসির ড্রিবলিং দেখে চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে থাকে।
তবে একটা কথা আজও বুঝতে পারিনি। মাছ কিনে আনি আমি। ভেটেরিনারির বিল দিই আমি। রাতে ঘুম ভেঙে খাবার দিই আমি। তারপরও আমার নিজের বাড়িতে সবচেয়ে বড় আর্জেন্টিনা সমর্থক হয়ে বসে আছে… আমারই পোষা বিড়াল!