এক দিনের স্বর্গপাখি
নাচগান আর পালকের আড়ম্বরের জন্য স্বর্গপাখিরা বিশ্বখ্যাত। আহারের প্রাচুর্যে পরিপূর্ণ ও সম্পূর্ণ শত্রুহীন ‘পাপুয়া’ দ্বীপে চার কোটি বছরের বিবর্তনে অভূতপূর্ব বাড়াবাড়ি হয়েছে স্বর্গপাখিদের সাজসজ্জা ও পূর্বরাগের আচার-অনুষ্ঠানে। অস্ট্রেলিয়ার উত্তরে অরণ্যে আবৃত বিশাল এ দ্বীপটি বাংলাদেশ থেকে সাত হাজার কিলোমিটার দূরে।
এক দিনের স্বর্গপাখি
নাচগান আর পালকের আড়ম্বরের জন্য স্বর্গপাখিরা বিশ্বখ্যাত। আহারের প্রাচুর্যে পরিপূর্ণ ও সম্পূর্ণ শত্রুহীন ‘পাপুয়া’ দ্বীপে চার কোটি বছরের বিবর্তনে অভূতপূর্ব বাড়াবাড়ি হয়েছে স্বর্গপাখিদের সাজসজ্জা ও পূর্বরাগের আচার-অনুষ্ঠানে। অস্ট্রেলিয়ার উত্তরে অরণ্যে আবৃত বিশাল এ দ্বীপটি বাংলাদেশ থেকে সাত হাজার কিলোমিটার দূরে।
ডেভিড অ্যাটেনবরোকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, মানবজীবন থেকে ছুটি নিয়ে এক দিনের জন্য অন্য কোনো প্রাণী হতে পারলে তিনি কী হবেন! অ্যাটেনবরো বলেছিলেন: ‘একটি স্বর্গপাখি হয়ে সারা দিন নেচে নেচে দেখব আমি কয়টি পাখির দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারি।’ স্বর্গপাখি হলে এক দিনে কত পাখির নজর কাড়া যায়, তা আমাদের জানা নেই; কিন্তু অ্যাটেনবরোর মতো মানুষ হলে শত বছরে ১০০ কোটি লোকের দৃষ্টি কাড়া যে সম্ভব, তাতে সন্দেহ নেই।
নাচগান আর পালকের আড়ম্বরের জন্য স্বর্গপাখিরা বিশ্বখ্যাত। আহারের প্রাচুর্যে পরিপূর্ণ ও সম্পূর্ণ শত্রুহীন ‘পাপুয়া’ দ্বীপে চার কোটি বছরের বিবর্তনে অভূতপূর্ব বাড়াবাড়ি হয়েছে স্বর্গপাখিদের সাজসজ্জা ও পূর্বরাগের আচার-অনুষ্ঠানে। অস্ট্রেলিয়ার উত্তরে অরণ্যে আবৃত বিশাল এ দ্বীপটি বাংলাদেশ থেকে সাত হাজার কিলোমিটার দূরে। দ্বীপের পুবে ‘পাপুয়া নিউ গিনি’ নামে একটি স্বাধীন দেশ হয়েছে এবং পশ্চিম দিকটা ইন্দোনেশিয়ার অংশ রয়ে গেছে। পঞ্চাশ হাজার বছর আগে আদি মানুষেরা এখানে বসতি গড়েছে, যাদের সঙ্গে বিশ্বের যোগাযোগ আজও অত্যন্ত ক্ষীণ।
আমার সৌভাগ্য, বছর চারেক আগে পশ্চিম পাপুয়া গিয়ে প্রাণভরে স্বর্গপাখির নাচ দেখতে পেরেছি। স্বর্গপাখি দেখার সেই সুযোগ যে পেলাম, তার পেছনেও অ্যাটেনবরোর অবদান আছে। স্বর্গপাখি দেখার আশায় বনবাসী লোকের সাথে তিনি যোগাযোগ স্থাপন করেন ১৯৭১ সালে এবং ২৫ বছর লেগে থাকার পর ‘উইলসন স্বর্গপাখি’ প্রথম ক্যামেরাবন্দী করেন। আজব সেই পাখির ছেলেদের লেজে অতিকায় দুটি বাঁকানো পালক থাকে, যা দেখতে ধাতব স্প্রিংয়ের মতো। তাঁর ক্যামেরাতেই আমরা আরও দেখেছি ‘বারো-শলা স্বর্গপাখি’। এ প্রজাতির পুরুষ পাখি লেজহীন মনে হলেও লেজের বারোটি পালক আসলে শলাকার মতো সরু, যা দিয়ে পূর্বরাগে সে বারবার স্ত্রীর মুখ স্পর্শ করে।
অ্যাটেনবরো ও তাঁর দলের কারণেই পাপুয়ার আদিবাসীরা আমাদের মতো ‘আধুনিক’ মানুষকে আতিথ্য দিতে অভ্যস্ত হয়েছে। তাঁর দলই আদিবাসী পুরুষদের শিখিয়েছে আমাদের মতো পাখিদর্শকের গাইড হতে এবং নারীদের শিখিয়েছে আমাদের উপযোগী রসুইঘর গড়ে নিতে। তাই আদিবাসী ভাষার একটি শব্দ না জেনেও আমরা স্বচ্ছন্দে তাদের অতিথি হতে পেরেছি। পাপুয়ার বনে অ্যাটেনবরোর দল সর্বশেষ যে বিশ্রামের স্থান ও পাখি দেখার ‘হাইড’ গড়েছিল, তা-ও আমরা ব্যবহার করেছি। স্বচক্ষে স্বর্গপাখি দেখার জন্য তাঁর কাছে কিঞ্চিৎ ঋণ স্বীকার না করে তাই আমাদের উপায় নেই।

বায়ে সরু-চঞ্চু ফিঞ্চ; ডানে ধাবক-কোয়া, ভূচর কোকিল
স্বর্গপাখির তালাশে পাপুয়ার পাহাড়ি বনে প্রবেশের এক দশক আগেই মাদাগাস্কারের অনুপম উদ্ভিদ ও প্রাণীর ভিডিও উপস্থাপন করতে শুরু করেছিলেন অ্যাটেনবরো। মাদাগাস্কারও পাপুয়ার মতোই সমুদ্রঘেরা একটি বিছিন্ন দ্বীপ। এখানে কোনো স্বর্গপাখি নেই; নেই পঞ্চাশ হাজার বছর আগের কোনো মনুষ্যবসতি। দক্ষিণপূর্ব এশিয়ায় মালাগাছি ভাষায় কথা বলে এমন মানুষেরা দুই শহস্রাব্দ আগে মহাসাগর পাড়ি দিয়ে মাদাগাস্কার দ্বীপে গিয়ে বসতি করেছে। দীর্ঘকাল মানুষের নাগালের বাইরে থাকায় এই দ্বীপে উদ্ভব হয়েছে অনেক আজব প্রাণী, যা আজও বিশ্বের অন্য কোথাও নেই।
অ্যাটেনবরোর দলটিই ‘লেমুর’ নামের অনন্য এক স্তন্যপায়ী পরিবারের সদস্যদের প্রথম ক্যামেরাবন্দী করেছিল আমাদের জন্য। মাদাগাস্কার দ্বীপে আজও এ পরিবারের শতাধিক প্রজাতি টিকে আছে, যার একটিও বিশ্বে কোথাও নেই। লেমুর পরিবারের সবচেয়ে বড় প্রজাতিটির নাম ‘ইন্দ্রি’; এবং মালাগাছি কিংবদন্তিতে ইন্দ্রির উপাধি ‘বাবাকোটো’–অর্থাৎ পূর্বপুরুষ। কিংবদন্তি যা-ই হোক না কেন, লেমুরের সাথে মানুষের জেনেটিক উপাদানের মিল ৯১%।
বিশ্বের বৃহত্তম পাখির কথাও অ্যাটেনবরোই প্রথম আমাদের জানিয়েছিলেন। দশ ফুট উঁচু ও পৌনে এক টন ওজনের সেই পাখি মাত্র এক হাজার বছর আগেও মাদাগাস্কার দ্বীপে টিকে ছিল। বিলুপ্ত সে পাখির নাম দেওয়া হয়েছে ‘এলিফ্যান্ট বার্ড’ বা ‘হাতিপাখি’। অতিকায় হাতিপাখি উড়তে পারত না এবং জনহীন দ্বীপে লক্ষ বছর ধরে দাপটের সাথেই টিকে ছিল। দ্বীপে মানুষের বসতি গড়ে উঠলে হাতিপাখির সুদিন শেষ হয়ে যায়। দ্বীপবাসী লোকেরা মাটি থেকে ডিম চুরি করেই হয়তো হাতিপাখিকে বিলুপ্তির পথে ঠেলে দিয়েছিল। দ্বীপের এক বালক সেই পাখির একটি ভাঙা ডিমের খোসাগুলো অ্যাটেনবরোকে এনে দিয়েছিল। খোসার সেই টুকরোগুলো জোড়া লাগিয়ে তিনি হাতিপাখির বিশাল ডিমের আকার বুঝতে পেরেছিলেন। তিনি বলেছেন: ‘হাতিপাখির ডিম ১৪০টি মুরগির ডিমের সমান।’
‘অ্যাটেনবরো ও অতিকায় ডিম’ নামের ডকুমেন্টারিটিই বছর দশেক আগে আমাদের উৎসাহ দিয়েছিল বাংলাদেশ থেকে সাড়ে ছয় হাজার কিলোমিটার দূরে ভারত মহাসাগরের প্রান্তে লুকানো ওই দ্বীপে যেতে। মাদাগাস্কার দ্বীপের একটি জাদুঘরে হাতিপাখির ডিম ও কঙ্কাল দেখার ভাগ্য হয়েছিল আমাদের। সেই অসম্ভাব্য সফরটির জন্যও ডেভিড অ্যাটেনবরোর কাছে আমরা ঋণী। মাদাগাস্কার সফরে গিয়ে দেখতে পেয়েছিলাম অতিকায় পানির ট্যাংকের মতো বাওবাব বৃক্ষ, যার আকর্ষণীয় বর্ণনা তিনি দিয়েছেন অনেক ডকুমেন্টারিতেই। তিনি বলেছেন, বাওবাব বৃক্ষ ও কাঁটাঝোপের নিচে সৃষ্টিছাড়া কমলা রঙের তপ্ত বালিতে ছুটে চলে ‘কোয়া’ নামের ভূচর কোকিল না দেখলে তাঁর আফসোস থেকে যেত। মাদাগাস্কার ছাড়া আর কোথাও এ পাখির দেখা মেলে না।

মানুষের হাতে হাতিপাখির ডিম
ডেভিড অ্যাটেনবরোর উপাস্থনায় গালাপাগোস দ্বীপপুঞ্জের থ্রি-ডি ডকু দেখার পর থেকে মাদাগাস্কার দ্বীপের মতোই ইসাবেলা ও সান্তাক্রুজ দ্বীপ আমাদের জন্য অত্যন্ত কাক্সিক্ষত গন্তব্য হয়ে উঠেছিল। অ্যাটেনবরো বলেছেন: ‘জীবনভর প্রকৃতি নিয়ে ফিল্ম বানানোর কাজে বিস্ময়কর সব স্থানে গেলেও গালাপাগোস দ্বীপপুঞ্জের চেয়ে অসাধারণ কিছু দেখিনি।’ তিরিশ লক্ষ বছরের কম সময়ে অগ্নিগিরির লাভা জমে এই দ্বীপপুঞ্জ তৈরি হয়েছে। এখানে যত রকমের অনন্য উদ্ভিদ ও প্রাণী আছে, তার বিবর্তনও হয়েছে এই স্বল্প সময়ের মধ্যে। তাঁর মতে, উদ্ভিদ ও প্রাণীর বিবর্তনের চিত্র এখানে যত সহজে আমাদের চোখে ধরা পড়ে, আর কোথাও ততটা নয়।
অ্যাটেনবরোর ডকুমেন্টারি দেখেই আমরা জেনেছি, গালাপাগোস দ্বীপপুঞ্জের অধিকাংশ দ্বীপেই আলাদা আলাদা প্রজাতির অতিকায় কাছিম, ছোট্ট ফিঞ্চ ও মকিংবার্ড আছে। দুর্বিপাকে পড়ে লক্ষ বছর আগে এখানে এসে এদের পূর্বপুরুষ দ্বীপের ভয়ংকর পরিবেশে টিকে থাকার চেষ্টা করতে বাধ্য হয়েছিল। যারা টিকতে পারেনি, তারা বিলুপ্ত হয়েছে। যারা টিকেছে, তাদের প্রজনন হয়েছে। প্রজন্ম-প্রজন্মান্তরে তাদের দেহ নতুন পরিবেশে খাপ খাইয়ে নিয়েছে। কালক্রমে পূর্বপুরুষের সাথে তাদের দৈহিক পার্থক্যগুলো অনেক বড় হয়েছে; এবং একসময় তারা ভিন্ন প্রজাতি হয়ে গেছে।
অ্যাটেনবরোর ডকুমেন্টারি দেখেছিলাম বলেই গালাপাগোসের পাঁচটি দ্বীপে নানা প্রজাতির অতিকায় কাছিমের খোলসে যে গড়নের ভিন্নতা আছে, তার ব্যাখ্যা আমাদের জানা ছিল। বিভিন্ন প্রজাতির ফিঞ্চ পাখির চঞ্চুর আকারে অনেক পার্থক্যও আমাদের কাছে তা ব্যাখ্যার অতীত মনে হয়নি। মাদাগাস্কার দ্বীপের মতোই গালাপাগোস দ্বীপপুঞ্জে দশ দিনের সফরে ডেভিড অ্যাটেনবরোই ছিলেন আমাদের অদৃশ্য গাইড। অমন অভিজ্ঞ গাইড ছিল বলেই আমরা বুঝতে পেরেছি এই দ্বীপপুঞ্জে বিবর্তনের গতি কত দ্রুত এবং তার কারণই বা কী।

আদিবাসী পরিবারের সাথে লেখক। আলোকচিত্রী: অণু তারেক
‘লাইফ ইন দ্য ফ্রিজার’ নামে অ্যান্টার্কটিকা নিয়ে ডেভিড অ্যাটেনবরো একটি ডকুমেন্টারি করেছিলেন ১৯৯৩ সনে। ভাগ্যক্রমে তার চার বছর পরে অ্যান্টার্কটিক পেনিনসুলা ভ্রমণের সুযোগ এসেছিল আমার; এবং অ্যাটেনবরো আখ্যায়িত ‘ফ্রিজারের’ প্রান্ত বরাবর পায়ে হেঁটে কয়েকটি দিন সেখানকার ‘লাইফ’ স্বচক্ষে দেখার অভিজ্ঞতা অর্জন করেছিলাম ১৯৯৭ সালে। তাঁর ডকুমেন্টারি না দেখলে হয়তো ধাবমান জেন্টু পেঙ্গুইন ও নিদ্রামগ্ন ঐরাবতী সিলের ছবি তুলেই আমার ভ্রমণ সমাপ্ত হতো। অনন্য এই মহাদেশটিতে বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ভয়াবহতা এবং অসাধারণ এই প্রাণীদের একমাত্র গ্রীষ্মের আবাস ও প্রজননভূমিতে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব আমাদের চোখে কমই ধরা পড়ত।
অ্যান্টার্কটিকাই পৃথিবীর একমাত্র মহাদেশ, যা কোনো দেশের শাসনাধীন নয়। এমন অনন্য মহাদেশের প্রকৃতি সংরক্ষণের আবেদন নিয়ে দীর্ঘকাল ধরে অ্যাটেনবরো আকর্ষণীয় ডকুমেন্টারি উপহার দিয়েছেন। জানি না, সাধারণ মানুষের মনে এবং প্রভাবশালী দেশের নীতিনির্ধারক মহলে তা কতটুকু প্রভাব ফেলেছে। অ্যান্টার্কটিকা নিয়ে গবেষণার কাজে নিযুক্ত যুক্তরাজ্যের নতুন জাহাজ তাঁর নামেই নামকরণ হয়েছে জেনে আমরা প্রীত হয়েছিলাম। তাই ২০২৪ সালে অ্যান্টার্কটিকার উপকূলে ‘আর আর এস স্যার ডেভিড অ্যাটেনবরো’ জাহাজকে কর্মরত দেখে আমরা অত্যন্ত উদ্দীপিত হয়েছি।
অ্যান্টার্কটিকা, গালাপাগোস, মাদাগাস্কার, পাপুয়া ইত্যাদি বিচিত্র, বিশিষ্ট ও পরিবেশগতভাবে বিপন্ন স্থানে ডেভিড অ্যাটেনবরোকে অনুসরণ করে ভ্রমণ করেছি বলে ভাববেন না যে আমরা কেবল তাঁর প্রদর্শিত পথেই চলতে পারি। অ্যাটেনবরোর আগেই আমরা বাংলাদেশ থেকে দিব্যি উত্তর মেরু পৌঁছে গেছি এবং মেরু-ম্যারাথনে অংশ নিয়েছি ২০০৭ সালে। তার তিন বছর পর ‘টু দি এন্ড অব দি আর্থ’ শিরোনামে ডকুমেন্টারি করতে ডেভিড অ্যাটেনবরো সেখানে গেছেন ২০১০ সালে।
এখানেই শেষ নয়। সুন্দরবন নামে পৃথিবীর বৃহত্তম প্যারাবনে একবারও ভ্রমণ করেননি ডেভিড অ্যাটেনবরো; আমরা করেছি শতবার। তবে মনে করবেন না যে সুন্দরবন সম্পর্কে তিনি অজ্ঞ কিংবা উদাসীন। তাঁর উপস্থাপনায় সুন্দরবনকে তিনি অনন্য, অতুলনীয় ও ঝুঁকিপূর্ণ একটি বনভূমি বলে উল্লেখ করেছেন। একই সঙ্গে তিনি বাঘের বুদ্ধিমত্তার উৎকীর্ণ করেছেন এবং সুন্দরবনসংলগ্ন গ্রামের মানুষের জীবনে ঝুঁকি প্রশমনের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। বাঘ ও মানুষের বিবাদ এবং তা প্রশমনের জন্য সচেষ্ট হওয়ার কথাও তিনি বলেছেন।

গালাপাগোসের অতিকায় কাছিম
তবে ডেভিড অ্যাটেনবরো সশরীরে সুন্দরবনে আসেননি। এলে অনন্য এই বনভূমি সংরক্ষণে তিনি সম্ভবত খুব গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারবেন। দক্ষিণ ও দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার প্রাকৃতিক ইতিহাসে তার আগ্রহের শিকড় বহুদূর পর্যন্ত বিস্তৃত। বোর্নিওর বনে তিনি বহুবার গেছেন এবং ‘স্তন্যপায়ীর জীবন’ ও ‘বোর্নিওর বন্য প্রাণী’ ইত্যাদি শিরোনামে গুরুত্বপূর্ণ ডকুমেন্টারি উপহার দিয়েছেন। ওরাং-উতানের বুদ্ধিমত্তা ও মানুষকে অনুকরণ করার ক্ষমতা নিয়ে তিনি অন্তহীন আগ্রহ দেখিয়েছেন।
পাপুয়ার পাহাড়ি বনেও দীর্ঘকাল ধরে কষ্টসাধ্য কাজ করেছেন ডেভিড অ্যাটেনবরো। বিস্তৃত পাপুয়া মালভূমির নরখাদক বলে পরিচিত ‘বিয়ামি’ জাতির আদিবাসীদের সাথে ১৯৭১ সালে তিনি কাজ শুরু করেন। তিনি বলেছেন, তাদের সাথে যোগাযোগের জন্য তাঁর কাছে ছিল শুধু মুখের হাসি, যা বিশ্বের সর্বজনীন ভাষা। হাসি ও হাতের ইশারা দিয়েই সেখানে তাদের সাথে যোগাযোগ হতো। আমার জানা নেই, হাতের ইশারায় কী করে বলা যায়, তোমরা খুব ক্ষুধার্ত হলে কি আমার জীবন বিপন্ন হবে!
তার পঞ্চাশ বছর পরে আমরা যখন পাপুয়া গেলাম, তখনো আদিবাসী ও আগন্তুকের মধ্যে যোগাযোগব্যবস্থার বড় কোনো পরিবর্তন হয়নি। এখনো হাসি ও হাতের ইশারা দিয়েই আমাদের অধিকাংশ কাজ সারতে হয়। তবে আদিবাসীরা এখন আর নরখাদক বলে পরিচিত নয় এবং পাখি দেখার জন্য গহিন বনে সারা দিন বসে থাকলে তারা মনে করে না যে অতিথির ওপর ভূতের আছর হয়েছে। বরং অতিথিকে পাখি দেখানোর জন্য খাড়া পাহাড়ে উঠে যাওয়ার জন্য তাদের আগ্রহে বেশ বাড়াবাড়িই লক্ষ করা যায়।

ধাবমান জেন্টু পেঙ্গুইন
হাসি ও হাতের ইশারা দিয়ে যোগাযোগ শুরু করে পঞ্চাশ বছরে ডেভিড অ্যাটেনবরো পাপুয়ার আদিবাসীদের স্বর্গপাখি সংরক্ষণে উদ্বুদ্ধ করেছেন। স্বর্গপাখির পালক দিয়ে দেহসজ্জা করার হাজার বছরের পুরোনো প্রথা তারা ত্যাগ করতে পেরেছেন। তারা এখন জানেন যে বিশ্বের অনেক মানুষ স্বর্গপাখি দেখতে চায়; এবং স্বর্গপাখি দেখতে হলে বিশ্ববাসীদের পাপুয়ার পাহাড়ে পা রাখতেই হবে।
ডেভিড অ্যাটেনবরো একবার সুন্দরবন এলে এ অঞ্চলে সংরক্ষণের ক্ষেত্রে সম্ভবত একটি নতুন মাত্রা যোগ হবে। সুন্দরবন এলে তিনি মহাবিপন্ন ‘প্যারাপাখি’ ও বিরল ‘প্যারাশুমচা’ দেখতে পাবেন। সুন্দরবন ছাড়া অন্য কোথাও এদের দেখা পাওয়া ভার। তিনিই তো বলেছেন, “No one will protect what they don’t care about; and no one will care about what they have never experienced.”